ঢাকা     মঙ্গলবার   ১২ মে ২০২৬ ||  বৈশাখ ২৯ ১৪৩৩ || ২৪ জিলকদ ১৪৪৭ হিজরি

Risingbd Online Bangla News Portal

ভারতের ধর্মনিরপেক্ষ দলগুলো কেন মুসলিম সংখ্যালঘুদের আস্থা হারাচ্ছে?

পূর্ণিমা চৌহান || রাইজিংবিডি.কম

প্রকাশিত: ১৩:৩৫, ১২ মে ২০২৬   আপডেট: ১৩:৩৭, ১২ মে ২০২৬
ভারতের ধর্মনিরপেক্ষ দলগুলো কেন মুসলিম সংখ্যালঘুদের আস্থা হারাচ্ছে?

ভারতের রাজনীতিতে ‘ধর্মনিরপেক্ষতা’ শব্দটি বহু দশক ধরে একটি গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক পরিচয়। স্বাধীনতার পর থেকে কংগ্রেসসহ একাধিক আঞ্চলিক দল নিজেদের সংখ্যালঘুদের রক্ষাকর্তা হিসেবে তুলে ধরেছে। বিশেষ করে মুসলিম ভোটব্যাংককে কেন্দ্র করে তারা এমন এক রাজনৈতিক কাঠামো তৈরি করেছিল, যেখানে বিজেপির মতো দলকে ‘সাম্প্রদায়িক’ শক্তি হিসেবে দেখিয়ে নিজেদের বিকল্প হিসেবে প্রতিষ্ঠা করা হতো। কিন্তু সাম্প্রতিক বছরগুলোতে এই সমীকরণে বড় পরিবর্তন দেখা যাচ্ছে। প্রশ্ন উঠছে- ভারতের ধর্মনিরপেক্ষ দলগুলো কি সত্যিই দেশের মোট জনসংখ্যার ১৪ শতাংশের বেশি মুসলিম সমাজের আস্থা হারাতে শুরু করেছে?

এই পরিবর্তনের পেছনে প্রথম কারণ হলো প্রতীকী রাজনীতির সীমাবদ্ধতা। দীর্ঘদিন ধরে ধর্মনিরপেক্ষ হিসেবে পরিচিত দলগুলো মুসলিমদের জন্য প্রকৃত সামাজিক ও অর্থনৈতিক উন্নয়নের বদলে পরিচয়ভিত্তিক রাজনীতিকেই বেশি গুরুত্ব দিয়েছে। নির্বাচনের সময় মুসলিম নিরাপত্তা, মসজিদ, ব্যক্তিগত আইন বা সাম্প্রদায়িকতার ভয়কে সামনে আনা হলেও শিক্ষা, কর্মসংস্থান, আধুনিকীকরণ বা সামাজিক সংস্কারের মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলো প্রায়ই উপেক্ষিত থেকেছে।

ফলে মুসলিম সমাজের একাংশের মধ্যে এই ধারণা তৈরি হয়েছে যে, ধর্মনিরপেক্ষ দলগুলো আসলে তাদের উন্নয়নের জন্য নয়, বরং ভোটব্যাংক হিসেবে ব্যবহার করেছে। তারা মুসলিমদের ভয় দেখিয়ে নিজেদের রাজনৈতিক প্রয়োজন পূরণ করেছে, কিন্তু বাস্তব পরিবর্তনের জন্য দীর্ঘমেয়াদি কোনো পরিকল্পনা তৈরি করেনি।

পশ্চিমবঙ্গের সাম্প্রতিক নির্বাচন এই পরিবর্তনের একটি বড় উদাহরণ। সেখানে মুসলিম ২৬ শতাংশের বেশি। দীর্ঘদিন ধরে তৃণমূল কংগ্রেসকে মুসলিম ভোটের প্রধান আশ্রয়স্থল মনে করা হতো। কিন্তু নির্বাচনের ফলাফলে দেখা গেছে, মুসলিম-অধ্যুষিত বহু এলাকায় বিজেপি শক্তিশালী অবস্থান তৈরি করেছে। এর অর্থ এই নয় যে, মুসলিম ভোট সম্পূর্ণভাবে বিজেপির দিকে চলে গেছে, বরং এটি ইঙ্গিত দেয় যে পুরোনো ভোটব্যাংক রাজনীতিতে ফাটল ধরছে।

আসামেও একই ধরনের চিত্র দেখা গেছে। সেখানে মুসলিম ভোটকে কেন্দ্র করে কংগ্রেস ও মুসলিমভিত্তিক দলগুলোর জোট থাকলেও, রাজনৈতিক বাস্তবতা আগের মতো সহজ ছিল না। নতুন সীমানা পুনর্নির্ধারণ এবং পরিবর্তিত রাজনৈতিক পরিবেশ মুসলিম ভোটের প্রভাব সীমিত করেছে। এতে স্পষ্ট হয়েছে যে, শুধু ধর্মীয় পরিচয়কে কেন্দ্র করে রাজনৈতিক সমীকরণ ধরে রাখা এখন কঠিন হয়ে উঠছে।

কেরালায় অবশ্য পরিস্থিতি কিছুটা ভিন্ন। সেখানে মুসলিম লীগ এখনও প্রভাবশালী এবং কংগ্রেস নেতৃত্বাধীন জোটের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। তবে কেরালার রাজনীতি বহুদিন ধরেই ধর্মীয় ও সামাজিক ভারসাম্যের ওপর দাঁড়িয়ে আছে। ফলে সেখানে মুসলিমদের সমর্থন শুধু ভয়ের রাজনীতি দিয়ে ধরে রাখা সম্ভব নয়; বরং রাজনৈতিক অংশীদারিত্ব ও সামাজিক প্রতিনিধিত্বের বাস্তব প্রশ্নও গুরুত্বপূর্ণ।

তামিলনাড়ুর রাজনীতিও নতুন এক ইঙ্গিত দিয়েছে। সেখানে দীর্ঘদিনের দ্রাবিড় রাজনীতি ও সংখ্যালঘু-সমর্থনমূলক অবস্থানের বিরুদ্ধে ভোটারদের একটি অংশ প্রতিক্রিয়া দেখিয়েছে। অভিনেতা বিজয়ের নতুন রাজনৈতিক দল-টিভিকে তুলনামূলকভাবে নিরপেক্ষ অবস্থান নিয়ে সাধারণ মানুষের সমর্থন আদায়ের চেষ্টা করেছে। এটি দেখায় যে নতুন প্রজন্মের ভোটাররা শুধু পরিচয়ভিত্তিক রাজনীতির বদলে ভিন্ন ধরনের রাজনৈতিক ভাষা খুঁজছে।

ধর্মনিরপেক্ষ দলগুলোর প্রতি মুসলিমদের আস্থা কমার আরেকটি কারণ হলো সংস্কারের প্রশ্নে দ্বিচারিতা। মুসলিম সমাজে শিক্ষা, নারীর অধিকার, আধুনিক আইনব্যবস্থা বা ধর্মীয় সংস্কার নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে আলোচনা চলছে। কিন্তু বহু রাজনৈতিক দল এসব প্রশ্নে স্পষ্ট অবস্থান নিতে চায়নি। কারণ তারা আশঙ্কা করেছে, এতে ভোটব্যাংক ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।

তিন তালাক, অভিন্ন দেওয়ানি বিধি বা ওয়াকফ সংস্কারের মতো বিষয়গুলোতে অনেক ধর্মনিরপেক্ষ দল এমন অবস্থান নিয়েছে, যা মুসলিম সমাজের ভেতরে সংস্কারপন্থী অংশকে হতাশ করেছে। তাদের মনে হয়েছে, রাজনৈতিক দলগুলো মুসলিম সমাজকে আধুনিক নাগরিক সমাজের অংশ হিসেবে গড়ে তোলার বদলে পুরোনো ধর্মীয় নেতৃত্বের ওপর নির্ভরশীল রাখতে চায়। একইসঙ্গে মুসলিম সমাজের ভেতরেও আত্মসমালোচনার প্রয়োজন রয়েছে। বহু ক্ষেত্রে ধর্মীয় পরিচয়কে কেন্দ্র করে রাজনীতি এতটাই প্রভাবশালী হয়ে উঠেছে যে বৃহত্তর নাগরিক পরিচয় দুর্বল হয়ে পড়েছে। এর ফলে মুসলিম সমাজের একাংশ মূলধারার রাজনৈতিক ও সামাজিক আলোচনার বাইরে থেকে গেছে।

তবে এই সংকটের মধ্যেও কিছু ইতিবাচক দিক রয়েছে। সাম্প্রতিক সময়ে হিন্দু ও মুসলিম বুদ্ধিজীবীদের মধ্যে সংলাপ বেড়েছে। বিভিন্ন রাজনৈতিক ও সামাজিক সংগঠন পারস্পরিক অবিশ্বাস কমানোর চেষ্টা করছে। এমনকি বিজেপি ঘনিষ্ঠ মহলেও কিছু মুসলিম প্রতিনিধিকে গুরুত্ব দেওয়ার প্রবণতা দেখা যাচ্ছে। কিন্তু বাস্তব পরিবর্তনের জন্য শুধু প্রতীকী উদ্যোগ যথেষ্ট নয়। মুসলিমদের আস্থা ফিরে পেতে হলে ধর্মনিরপেক্ষ দলগুলোকে নতুন রাজনৈতিক ভাষা তৈরি করতে হবে। শুধু বিজেপি-বিরোধিতা দিয়ে আর মুসলিম ভোট ধরে রাখা সম্ভব হবে না। তাদের শিক্ষা, স্বাস্থ্য, কর্মসংস্থান, নারী অধিকার ও সামাজিক উন্নয়নের মতো বাস্তব বিষয়গুলোকে অগ্রাধিকার দিতে হবে। একইভাবে বিজেপি ও অন্যান্য হিন্দু-জাতীয়তাবাদী দলগুলোকেও বুঝতে হবে যে শুধু সংখ্যাগরিষ্ঠ রাজনীতি দিয়ে দীর্ঘমেয়াদি সামাজিক স্থিতি নিশ্চিত করা যায় না। মুসলিমদের নিরাপত্তা, মর্যাদা ও রাজনৈতিক অংশগ্রহণ নিশ্চিত না হলে বিভাজন আরও বাড়বে।

ভারতের গণতন্ত্রের ভবিষ্যৎ নির্ভর করবে এই প্রশ্নের ওপর-রাজনীতি কি ধর্মীয় পরিচয়ের গণ্ডি পেরিয়ে নাগরিক অধিকার ও উন্নয়নের দিকে এগোতে পারবে? যদি ধর্মনিরপেক্ষ দলগুলো সত্যিই মুসলিমদের আস্থা ফিরে পেতে চায়, তাহলে তাদের ভয় ও প্রতীকের রাজনীতি ছেড়ে বাস্তব উন্নয়নের রাজনীতিতে ফিরতে হবে। কারণ আজকের মুসলিম ভোটার শুধু সুরক্ষার প্রতিশ্রুতি নয়, সম্মান, সুযোগ এবং অংশীদারিত্বও চাইছে।
 

ঢাকা/তারা//

সর্বশেষ

পাঠকপ্রিয়