Risingbd Online Bangla News Portal

ঢাকা     রোববার   ০৯ মে ২০২১ ||  বৈশাখ ২৬ ১৪২৮ ||  ২৫ রমজান ১৪৪২

আনিসুজ্জামানের দৃষ্টিতে শওকত আলীর কথাসাহিত্য 

ড. মহিউদ্দিন জাহাঙ্গীর || রাইজিংবিডি.কম

প্রকাশিত: ২১:০৪, ২৬ জানুয়ারি ২০২১   আপডেট: ১২:১০, ২৭ জানুয়ারি ২০২১
আনিসুজ্জামানের দৃষ্টিতে শওকত আলীর কথাসাহিত্য 

গণমানুষের কথাকার শওকত আলী পাঁচ দশকব্যাপী বাংলা সাহিত্য নিয়ে নিবিড়ভাবে ধ্যানমগ্ন ছিলেন। উপন্যাস, ছোটগল্প, প্রবন্ধ ও শিশুতোষ রচনায় তাঁর ছিল অবাধ বিচরণ ও সতঃস্ফূর্ত পদচারণা। প্রাকৃত মানুষ ও প্রাণ-প্রকৃতি তাঁর লেখায় বাস্তবমণ্ডিত হয়ে ভাষারূপ পেয়েছে। এ প্রসঙ্গে কথা বলেছেন ড. আনিসুজ্জামান। শওকত আলী গবেষক ড. মহিউদ্দিন জাহাঙ্গীর ২০১৮ সালের ১ এপ্রিল আনিসুজ্জামানের সাক্ষাৎকারটি নেন। ২৫ জানুয়ারি ছিল শওকত আলীর তৃতীয় মৃত্যুবার্ষিকী। এ উপলক্ষ্যে সাক্ষাৎকারটি প্রকাশিত হলো।

ড. মহিউদ্দিন জাহাঙ্গীর: শওকত আলীর সঙ্গে আপনার পরিচয় ঘটে কীভাবে?

ড. আনিসুজ্জামান: শওকত আলী বয়সে আমার এক বছরের বড় হলেও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগে পড়ার সময় তিনি আমার এক বছরের ছোট ছিলেন। তিনি পূর্ব পাকিস্তানের দিনাজপুর সুরেন্দ্রনাথ কলেজ থেকে বি.এ. পাস করে যখন বাংলা বিভাগে এম.এ. প্রাথমিক পর্বে ভর্তি হন, তখন আমি এম.এ. চূড়ান্ত পর্বের ছাত্র। এ সময় আমাদের মধ্যে পরিচয় ঘটে। এর কিছুকাল পর আমি তাঁর লেখালেখির কথা জানতে পারি। এসময় তাঁর গল্প বিভিন্ন পত্রিকায় ছাপা হচ্ছিল। গল্প পড়ে আমার ভালোলাগার কথা তাঁকে জানিয়েছিলাম। এরপর আমাদের অন্যান্য বন্ধুদের সঙ্গে তাঁর পরিচয় ঘটে এবং একটি বলয় গড়ে উঠতে থাকে। এভাবেই জহির রায়হানের সঙ্গে তাঁর পরিচয়। সারা জীবনই তাঁর সঙ্গে আমার প্রীতি ও শ্রদ্ধার একটি সম্পর্ক বজায় ছিল। যদিও রাজনীতির মতাদর্শে আমরা দুজনে দুই মেরুর বাসিন্দা ছিলাম।

ড. মহিউদ্দিন জাহাঙ্গীর: শওকত আলীকে জহির রায়হানের সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দিয়েছিলেন কেন?

ড. আনিসুজ্জামান: সেসময় জহির রায়হান ছিলেন বিশিষ্ট বামপন্থী রাজনীতিবিদ, সাংবাদিক, লেখক ও চলচ্চিত্রকার। তাঁর সংস্পর্শ পেলে শওকত আলীর লেখক সত্তা বিকশিত হবে এবং বোধ আরো শাণিত হয়ে উঠবে- এমন চিন্তা থেকেই তা করেছিলাম। তাছাড়া তখন শওকত আলীর একটি কর্মসংস্থানেরও বিশেষ প্রয়োজন ছিল।

ড. মহিউদ্দিন জাহাঙ্গীর: জগন্নাথ কলেজে চাকরি পেতে তাঁকে নাকি বেশ বেগ পেতে হয়েছিল?

ড. আনিসুজ্জামান: কিছুটা তো বটেই। কারণ তৎকালে জগন্নাথ কলেজে শিক্ষকতা করতে পারা ছিল যথেষ্ঠ সুনাম ও সম্মানের ব্যাপার। বেসরকারি কলেজের মধ্যে ভালো ও বড় কলেজ হিসেবে জগন্নাথের অবস্থান ছিল শীর্ষ স্থানীয়। তাই এ কলেজে শিক্ষক হবার সুযোগ সহজসাধ্য ছিল না। ৫৪-র প্রেক্ষাপটে শওকত আলী বামরাজনীতিতে সক্রিয় থাকার কারণে প্রায় বছরখানেক জেলবন্দি ছিলেন। এর প্রভাব পড়েছিল তাঁর বি.এ. পরীক্ষায়। তিনি তৃতীয় বিভাগে পাস করায় এম.এ.-তে ভর্তি হওয়ার ক্ষেত্রে এক ধরনের অনিশ্চয়তার সৃষ্টি হয়। কিন্তু আমার পরম শ্রদ্ধেয় শিক্ষক অধ্যাপক অজিত গুহের প্রচেষ্টা ও সদিচ্ছায় শওকত আলীর চাকরিটা হয়ে যায়।

ড. মহিউদ্দিন জাহাঙ্গীর: তৎকালীন জগন্নাথ কলেজের সাহিত্যিক প্রতিবেশ কেমন ছিল?

ড. আনিসুজ্জামান: খুবই ঊর্বর আর সৃজনশীল ছিল। শওকত আলী এখানে  যোগদান করে অজিত গুহ, হাসান হাফিজুর রহমান, রাহাত খান, শামসুজ্জামান খান, আখতারুজ্জামান ইলিয়াস, আবদুল মান্নান সৈয়দ, আব্দুল্লাহ আবু সায়ীদ ও মমতাজ উদ্দিন আহমদসহ আরো খ্যাতিমান ব্যক্তিকে সহকর্মী ও শুভানুধ্যায়ী হিসেবে পেয়েছিলেন। আদর্শিক মত-পার্থক্য থাকার পরেও এসকল সম্ভাবনাময় ও প্রতিভাবান লেখক-সাহিত্যিকদের সান্নিধ্য-সাহাচর্য লেখক শওকত আলীর বোধকে শাণিত করার ক্ষেত্রে বড় রকমের ভূমিকা পালন করেছিল। ভাব বিনিময়ের একটি উপযুক্ত পরিবেশ তিনি পেয়েছিলেন। তিনি রাজনীতি সচেতন থাকার ফলে অল্পতেই নিজেকে প্রস্তুত করতে পেরেছিলেন। আর এ পথটি সুগম করে দিয়েছিলেন অধ্যাপক অজিত গুহ। তিনি প্রতিভা চিনতে ভুল করতেন না।

ড. মহিউদ্দিন জাহাঙ্গীর: শওকত আলীর লেখার ধরন বা বৈশিষ্ট্য সম্পর্কে কিছু বলবেন কি?

ড. আনিসুজ্জামান: শওকত আলীর লেখার বৈশিষ্ট্য বুঝতে গেলে প্রথমেই তাঁর রাজনৈতিক মতাদর্শকে অনুধাবন করতে হবে। তিনি ছাত্রবস্থাতেই বামপন্থী রাজনীতি করতেন এবং এ রাজনীতি করার কারণেই তাঁকে বছরখানেক জেল খাটতে হয়েছিল। তিনি যখন ঢাকায় আসেন, তখনো তাঁর মনের মধ্যে এ বামপন্থার ঝোঁক আটুট ছিল এবং তিনি বামরাজনীতির সাফল্য ও বিজয় প্রত্যাশা করতেন। কিন্তু ঘটনাক্রমে ৬০-র দশকে পূর্ব বাংলায় ক্রমশই জাতীয়তাবাদী রাজনীতির ধারা প্রবল হয়ে ওঠে। ৬৯-র গণ অভ্যুত্থানের পরেই এটা স্পষ্ট হয়ে গিয়েছিল যে, জাতীয়তাবাদী শক্তিই এদেশের রাজনীতি নিয়ন্ত্রণ করতে যাচ্ছে। আমার মনে হয়, শওকত আলীর মনে এ নিয়ে এক ধরনের দ্বন্দ্ব ক্রিয়াশীল ছিল। কারণ বামরাজনীতির রাজপথ নিয়ন্ত্রণ করা থেকে ছিটকে পড়া, নিজেদের অক্ষমতা এবং জাতীয়তাবাদী দলের নেতৃত্বে পাকিস্তানের নিগড় থেকে বাংলাদেশের অভ্যুদয়- তিনি হয়তো সহজভাবে মেনে নিতে পারেননি। উপরন্তু বামদল ও নেতাকর্মীদের মধ্যে দ্বিধা-দ্বন্দ্ব, কোন্দল-কলহ এবং বিভাজন দেখে তিনি আরো হতাশ হয়ে থাকতে পারেন। ফলে বাংলাদেশের স্বাধীনতা দেখে তিনি আনন্দিত হয়েছেন বটে, কিন্তু বাম দলীয় ভূমিকার জায়গাটি বলিষ্ঠ না থাকায় সেই অর্থে উল্লসিত বা গর্ববোধ করতে পারেননি। এ কারণে তাঁর মনে এক ধরনের হতাশা ও বেদনা সারা জীবনই ছিল।

ড. মহিউদ্দিন জাহাঙ্গীর: এর প্রভাব শওকত আলীর লেখায় পড়েছে কি?

ড. আনিসুজ্জামান: পড়েছে। আমি তাঁর প্রথম দিকের যে সব ছোটগল্প ও উপন্যাস পড়েছি, তাতে এমন প্রবণতা বা প্রভাব লক্ষ করেছি। তিনি তাঁর লেখায় যে শ্রমজীবী, খেটে খাওয়া মানুষ, কৃষক ও মধ্যবিত্ত সমাজের (তিনি নিজেও মধ্যবিত্ত পরিবারের সন্তান ছিলেন) দুঃখ-দুর্দশা, অভাব-অভিযোগ এবং শোষণ-নির্যাতনের কথা বলেছেন; বিশেষত উত্তরবঙ্গের আদিবাসী সাঁওতাল-মুর্মু-রাজবংশী-পোলিয়াদের জীবনযন্ত্রণাকে উপস্থাপন করেছেন- তাও কেমন যেন দ্বিধাগ্রস্ত। আর মধ্যবিত্তের কোনো স্বপ্নই যেন পূরণ হচ্ছে না- তা হোক রাজনৈতিক অথবা ব্যক্তিগত। তাঁর লেখায় পাত্রপাত্রীদের মাঝে যে হতাশার ভাব ও দ্বিধা-দ্বন্দ্ব প্রবল হয়ে ওঠে, এর মূলে মনে হয় শওকত আলীর ব্যক্তিগত জীবনের হতাশাই ত্রিয়াশীল থেকেছে। যা তাঁর ‘প্রদোষে প্রাকৃতজন’ ও ‘দক্ষিণায়নের দিন’ ত্রিলোজিতেও প্রতিফলিত হয়েছে। আমি ‘প্রদোষে প্রাকৃতজন’ উপন্যাসের ফ্ল্যাপের আলোচনায় এ সম্পর্কে একবার লিখেছিলাম। কারণ মধ্যযুগের সেন আমলের মৃৎশিল্পী শ্যামাঙ্গ ও তার গুরু বসুদেবের মাঝে ধর্মের নামে শিল্পীর আদর্শ ও স্বাধীনতা নিয়ে যে মত-পার্থক্য, দ্বিধা-দ্বন্দ্ব ও দ্রোহের ভাব উন্মোচিত হয়, তার সঙ্গে পাকিস্তান আমলের সাদৃশ্য খুঁজে পাওয়া যায়। শ্যামাঙ্গের এ স্বপ্নও শেষ পর্যন্ত সফল হয় না, বাস্তবে রূপ নিতে পারে না। যা ত্রিলোজি ‘দক্ষিণায়নের দিন’- এ মনি ও সেজানের ক্ষেত্রেও সমানভাবে প্রযোজ্য। এরা প্রত্যেকেই যে অপার সম্ভাবনা নিয়ে উপন্যাসে আবির্ভূত হয়েছিল, শেষ পর্যন্ত সে ধারা বজায় থাকেনি, বরং এক ধরনের আত্মসমর্পণ ও আনতভাব পরিলক্ষিত হয়। লীলাবতী ও রাখী চরিত্রের সমাজবহির্ভূত যৌথজীবন-যাপনের মাধ্যমে তিনি যে প্রথাভাঙা বা অস্বীকার করার ক্ষেত্রে একধরনের বিদ্রোহের ইঙ্গিত দিয়েছিলেন-তাও শেষ পর্যন্ত সামাজিক-সামষ্টিক বিদ্রোহে রূপ না নিয়ে ব্যক্তিগত-ব্যষ্টিক রূপে সীমিত হয়ে পড়েছে। তাই আমার মনে হয়, শওকত আলীর লেখায় এ প্রবণতার পেছনে তাঁর রাজনৈতিক মতাদর্শগত স্বপ্ন ভঙ্গের বেদনাই কার্যকর ছিল।

ড. মহিউদ্দিন জাহাঙ্গীর: ‘প্রদোষে প্রাকৃতজন’ উপন্যাসটি বিশিষ্ট মাত্রা পাবার কারণ কী?

ড. আনিসুজ্জামান: শওকত আলীর সাহিত্যকর্মের মধ্যে এটি সেরা একটি কাজ। তিনি মধ্যযুগের সেন আমলের পতন-উন্মুখ পরিস্থিতিতে তুর্কিদের বাংলায় আগমনজনিত কারণে রাজনৈতিক নৈরাজ্য ও সামাজিক ভাঙন ও তার প্রেক্ষাপট অত্যন্ত দক্ষতার সঙ্গে উপস্থাপন করেছেন। কাহিনি বুনন, ভাষা ব্যবহার ও শ্রেণিচরিত্র নির্মাণে তিনি যে মেধা ও মননশীলতার পরিচয় দিয়েছেন তা কম কৃতিত্বের কথা নয়। অসংখ্য পার্শ্বচরিত্র নির্মাণের পরেও এরা প্রত্যেকেই স্বতন্ত্র ও সহজাত বৈশিষ্ট্যে প্রাণবন্ত। আবার তিনি গুরু-শিষ্যের মধ্যে আদর্শিক দ্বন্দ্ব ও মতপার্থক্য দেখানোর পরেও গুরু বসুদেবকে কখনোই খাটো করে চিত্রায়িত করেননি। এখানেও তাঁর প্রাগ্রসর চিন্তার প্রতিফলন ঘটেছে। কারণ মধ্যযুগে শিল্প-সাহিত্যের পৃষ্ঠপোষকতা করতেনই কেবল সামন্তশাসক, রাজা-জমিদার ও ভূস্বামীরা। ফলে শিল্পনির্মাণ ও সাহিত্য সৃজনে এ গোষ্ঠীর প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ প্রভাব সবসময়ই বজায় ছিল। এ প্রভাবকে অস্বীকার বা অতিক্রম করে যাওয়া সে সময়ের প্রেক্ষাপটে রীতিমতো দুঃসাধ্যই ছিল। ‘প্রদোষে প্রাকৃতজন’ উপন্যাস নিয়ে আমার একটি মূল্যায়ন এ বইয়ের ফ্ল্যাপে জুড়ে দেয়া হয়েছিল।

ড. মহিউদ্দিন জাহাঙ্গীর: প্রদোষে প্রাকৃতজন রচনার ক্ষেত্রে ৭১-র প্রেক্ষাপট ক্রিয়াশীল ছিল কি?

ড. আনিসুজ্জামান: এ কথা বা মতের সঙ্গে পূর্ব থেকেই আমি পরিচিত। অনেকে এ রকম কথা বললেও এটি নিশ্চিতভাবে বলা যাবে না। যদিও তিনি এটি বাংলাদেশ স্বাধীন হবার পরে লিখেছেন এবং ৭১-র পূর্বে অর্থাৎ পাকিস্তান আমলের শুরু থেকেই বাঙালি আর পাকিস্তানিদের মধ্যে ধর্ম ও সামাজিক বিষয় নিয়ে এক ধরনের শোষণ ও বঞ্চনাজাত নৈরাজ্য বিরাজমান ছিল। এ ধর্মীয় উন্মাদনা ও সামাজিক শোষণ ছাড়া আর তো কিছু মেলে না। কারণ ‘প্রদোষে প্রাকৃতজন’ উপন্যাসে গুরু ও শিষ্যের মধ্যে যে স্বপ্ন ও ভালোবাসা প্রকাশ পেয়েছে, তা সমাজ নির্ধারিত ও শাস্ত্রসম্মত। সেটা ধর্মশাস্ত্রও হতে পারে; আবার শিল্পশাস্ত্রও হতে পারে। তা না মেনে নিয়ে একজন শিল্পীর নিজস্বতাকে বড় করে তোলার সুযোগ তো কেবল ৭১-এ বাংলাদেশ স্বাধীন হবার পরেই পাওয়া গিয়েছিল। কারণ স্বাধীন দেশই কেবল ব্যক্তিকে সমাজের ঊর্ধ্বে ওঠার স্থান করে দিয়েছিল। আর এমন প্রেক্ষাপট ‘প্রদোষে প্রাকৃতজন’-এ পাওয়া যায় না। কাজেই এ বক্তব্যকে সর্বাংশে গ্রহণ করা যায় না।

ড. মহিউদ্দিন জাহাঙ্গীর: শওকত আলীর লেখায় মুক্তিযুদ্ধের চেতনা কতটুকু প্রতিফলিত হয়েছে?

ড. আনিসুজ্জামান: শওকত আলীর মনে মুক্তিযুদ্ধের অনিবার্যতা সর্বদাই ছিল। তবে মুক্তিযুদ্ধের বিজয় বামপন্থীদের দ্বারা পুরোপুরি অর্জিত না হয়ে জাতীয়তাবাদী শক্তির মাধ্যমে প্রতিষ্ঠিত হলো- এ নিয়ে তাঁর কিছুটা অভাববোধ ও অতৃপ্তি বরাবরই ছিল। অর্থাৎ স্বাধীনতাকে তিনি দু’হাত বাড়িয়ে আগ্রহভরে যেভাবে নেওয়া যায়, সেভাবে হয়তো নেননি- একটু দ্বিধাগ্রস্থভাব ছিল। যা তাঁর ‘যাত্রা’, ‘অপেক্ষা’, ‘উত্তরের খেপ’, ‘ঘরবাড়ি’ ও ‘হিসাব-নিকাশ’ উপন্যাসের মধ্য দিয়ে উন্মোচিত হয়েছে। তবে তিনি মুক্তিযুদ্ধের  প্রেক্ষাপট, প্রথম প্রতিরোধের প্রহর ও উত্তরকালীন সংকটকে ধরবার যে প্রচেষ্টা-প্রয়াস চালিয়েছেন তা অসামান্য।

ড. মহিউদ্দিন জাহাঙ্গীর: শওকত আলীর ছোটগল্পে কোন বিষয়টি আপনার কাছে মৌলিক বা ব্যতিক্রম মনে হয়?

ড. আনিসুজ্জামান: আমি শওকত আলীর ‘উন্মূল বাসনা’, ‘লেলিহান সাধ’ ও ‘শুন হে লখিন্দর’ গল্পগ্রন্থের গল্পগুলো পড়ে ধারণা করেছিলাম যে, এ গল্পই হয়তো তাঁর প্রিয় মাধ্যম হবে। আর গল্পকার হিসেবেই তিনি নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করবেন। কিন্তু পরবর্তীকালে তিনি গল্পের ধারা থেকে সরে যান এবং উপন্যাস নিয়ে মনোযোগী হয়ে ওঠেন। তারপরও তিনি এসব গল্পে উত্তরবঙ্গের কৃষক-শ্রমিকদের জীবনযন্ত্রণার চিত্র উপস্থাপনের পাশাপাশি আদিবাসীদের নানামুখী সংকট নিয়ে যে কাজ করেছেন- তা উল্লেখ না করে পারা যায় না। তিনি যথেষ্ঠ সহানুভূতি দিয়ে আদিবাসীদের জীবন সংকটকে উপস্থাপন করেছেন এবং আর্থ-সামাজিক-রাজনৈতিক-সাংস্কৃতিক বিপর্যয়ের প্রেক্ষাপটে তাদের মধ্য থেকেই বীর খুঁজে পাবার যে বার্তা ঘোষণা করেছেন; তা বাংলা সাহিত্যে সত্যিই ব্যতিক্রমী ঘটনা। এ জন্য বোধ করি তিনি স্মরণীয় হয়ে থাকবেন। এখানেই তাঁর সাফল্য ও স্বাতন্ত্র্য।

ড. মহিউদ্দিন জাহাঙ্গীর: শওকত আলীর উপন্যাসে আত্মজৈবনিকতার প্রভাব কেমন?

ড. আনিসুজ্জামান: শওকত আলী তাঁর ‘পিঙ্গল আকাশ’, ‘ওয়ারিশ’, ‘দলিল’ ও ‘বসত’সহ আরো বেশ কয়েকটি উপন্যাসে আত্মজৈবনিকতার ছাপ রেখেছেন। কিন্তু কোথাও তিনি জোর দিয়ে নিজের কথা বলতে চাননি। পশ্চিমবঙ্গ ছেড়ে পূর্ববঙ্গে আগমন, নতুন জায়গায় এসে জীবন-সংগ্রামে লড়াই করে টিকে থাকার সব কথাই আছে। কিন্তু এ উদ্বাস্তু-অভিবাসী জীবনে স্বদেশ-স্বজন ছেড়ে আসার বেদনা না নতুনভাবে জীবন গড়ার সদিচ্ছা- কোনটি মুখ্য হবে, তার নির্দেশনা তিনি দেননি। বরং এ দুটি প্রবণতাই সমানভাবে আছে এবং লেখায় জায়গা করে নিয়েছে। এতে তাঁর মনে এক ধরনের দ্বিধা-দ্বন্দ্ব হয়তো সক্রিয় ছিল।

ড. মহিউদ্দিন জাহাঙ্গীর: এ আত্মজৈবনিকতার ছাপ শওকত আলীর লেখাকে ব্যাহত করেছে কি?

ড. আনিসুজ্জামান: আমার তেমন মনে হয় না। কারণ আত্মজৈবনিকতার ছাপ সব লেখকের ক্ষেত্রেই কমবেশি প্রযোজ্য। কারণ লেখক উপলব্ধি করতে শেখেন নিজের জীবন ও জগৎকে আশ্রয় করেই। নিজস্ব পরিবেশ পরিমণ্ডল থেকেই একজন লেখকের অনুভূতির তীব্রতা ও পর্যবেক্ষণের প্রখরতা জারিত হয়েই লেখায় প্রকাশ পায়। যা শিল্পের ক্ষেত্রে তেমন বাধা হয় না। বাধা হলেও জাত শিল্পীরা তা নিজগুণেই অতিক্রম করে যান। আর সকল মহৎ সাহিত্যশিল্পই তো কমবেশি আত্মজৈবনিক।

ড. মহিউদ্দিন জাহাঙ্গীর: শওকত আলীর লেখায় পূর্ববঙ্গে আসা অভিবাসীদের জীবন যন্ত্রণার চিত্র কতটুকু সাফল্য পেয়েছে?

ড. আনিসুজ্জামান: এ বিষয় নিয়ে তিনি খুব বেশি লিখেছেন তা বলব না। ‘ওয়ারিশ’, ‘উত্তরের  খেপ’, ‘দলিল ও বসত’- এসব উপন্যাসে এর ছাপ পড়েছে। তিনি ১৬-১৭ বছর বয়সে আপন ভিটেমাটি ছেড়ে এ বাংলায় চলে আসেন। এ বেদনাঘন পরিস্থিতি তিনি নিজে প্রত্যক্ষ করেছেন। তারপরও বলব, নারায়ণ গঙ্গোপাধ্যায় ও নরেন্দ্রনাথ মিত্ররা বড় ক্যানভাসে দেশভাগজনিত কলকাতাকেন্দ্রিক মানবিক সংকটের চিত্র যেভাবে তুলে ধরেছেন; শওকত আলীর লেখায় পূর্ববাংলার সংকট অতটা জোরালো হয়ে ওঠেনি। তারপরও এর মূল্য কম নয়।

ড. মহিউদ্দিন জাহাঙ্গীর: শওকত আলী সম্পর্কে বলা হয়, ‘তিনি কাহিনিকে গুরুত্ব দিয়েছেন, আঙ্গিককে অবহেলা করেছেন’- এ মন্তব্য কতটুকু প্রাসঙ্গিক?

ড. আনিসুজ্জামান: এটা আমি মনে করি না। কারণ বিষয় বা কাহিনিকে গুরুত্ব দিলেই যে লেখার শিল্পরীতি ব্যাহত হয়ে পড়ে- এটি একটি ভ্রান্ত ধারণা। শওকত আলীও তা করেননি। আমি তাঁর প্রথম পর্যায়ের ছোটগল্প ও উপন্যাস পড়েছি এবং তাতে ভাষার কাব্যময়তা, উপমা, উৎপ্রেক্ষা, রূপক-প্রতীক, অতীত স্মৃতিমুগ্ধতা বা নস্টালজিয়া এবং প্রকৃতির খুব বস্তুনিষ্ঠ বর্ণনা পাওয়া যায়। তাছাড়া আগুন, ঝড়-বৃষ্টি ও শীতের ব্যবহারও চোখে পড়ার মতো। তাঁর পিঙ্গল আকাশকে পরবর্তীকালের হুমায়ূন আহমেদের ‘নন্দিত নরকে’র সঙ্গে তুলনা করা চলে। তিনি বারবারই বলেছেন: ‘লেখকের বক্তব্যকে শিল্পসম্মত করে উপস্থাপন করাই মূল কাজ।’ তিনি বিশ্বাস করতেন, একজন কথাশিল্পীকে তার লেখার বিষয়ে যথেষ্ঠ স্বাধীন হতে হয়। আর লেখাকে চূড়ান্তরূপে শিল্পসফল করে তোলারও তো কোনো নির্দিষ্ট ফর্ম বা মানদণ্ড নেই। শওকত আলীর মতই মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়েরও এমন কিছুটা বদনাম ছিল। তাঁরা শিল্পকে শ্লোগানধর্মী বা তত্ত্বসর্বস্ব করতে চাননি। তিনি বক্তব্যের ওপর জোর দিয়েছেন বলেই যে শিল্পরীতি ব্যাহত হয়েছে তা আমি মনে করি না।

ড. মহিউদ্দিন জাহাঙ্গীর: শওকত আলীর লেখায় গ্রামীণজীবন না নাগরিকজীবন-কোনটি সহানুভূতি বেশি পেয়েছে?

ড. আনিসুজ্জামান: দুটি জীবনকেই তিনি সমান সহানুভূতির দৃষ্টি দিয়ে পর্যবেক্ষণ করেছেন। শওকত আলী তাঁর অভিজ্ঞতার বাইরে তেমন যাননি। তিনি যে নিন্মবর্গ, মধ্যবিত্ত ও আদিবাসী সমাজের কথা বলেছেন- তা তাঁর চেনাজানা পরিবেশ থেকেই উঠে এসেছে। পরবর্তীকালে ঢাকায় চাকরিসূত্রে অবস্থান করায় নাগরিক জীবনের ক্লেদ-গ্লানি, হতাশা ও বিচ্ছিন্নতার বিষয়গুলো তিনি ছোটগল্প ও উপন্যাসের মাধ্যমে ধরার চেষ্টা করেছেন। কোনো কৃত্রিমতাকে তিনি প্রশ্রয় দেননি। তবে ফেলে আসা শৈশবস্মৃতি, বসতবাড়ি, গ্রাম, ফসলের মাঠ, লোকাচার-ঐতিহ্যকে তিনি কখনোই ভুলতে পারেননি।

ড. মহিউদ্দিন জাহাঙ্গীর: শওকত আলীর সাহিত্যিক হয়ে ওঠার মূলে কোন চেতনা কাজ করেছে?

ড. আনিসুজ্জামান: তাঁর পারিবারিক প্রেক্ষাপট এবং স্বদেশ-স্বজন হারানোর বেদনা। সেই সঙ্গে তাঁর মায়ের অকাল মৃত্যুর ঘটনা। এসবই তাঁকে সারাজীবন তাড়িত পীড়িত করেছে।

ড. মহিউদ্দিন জাহাঙ্গীর: শওকত আলী লেখার প্রস্তুতিস্বরূপ প্রচুর পড়াশোনা ও জীবনকে নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করতেন- এটা কতটুকু জরুরি?

ড. আনিসুজ্জামান: এ গুণ থাকাটা ভালো। তিনি ‘প্রদোষে প্রাকৃতজন’ লিখতে গিয়ে যে এমন পড়াশোনা ও পরামর্শের দ্বারস্থ হয়েছিলেন- তা আমি জানি। তাছাড়া তিনি বাংলা, সংস্কৃত, হিন্দি ও ইংরেজি ভাষা বেশ ভালোভাবে রপ্ত করেছিলেন। যা এ ক্ষেত্রে তাঁর খুব সহায়ক হয়েছিল।

ড. মহিউদ্দিন জাহাঙ্গীর: শওকত আলীর লেখায় নারী চরিত্রের উত্থান বা জাগরণই প্রাধান্য পেয়েছে- এর কারণ কী?

ড. আনিসুজ্জামান: এটি বাংলাসাহিত্যের এক অলিখিত ঐতিহ্য। সমগ্র বাংলাসাহিত্যে বলশালী নায়ক চরিত্র খুব বেশি খুঁজে পাওয়া যাবে না। অধিকাংশ লেখকের মতো শওকত আলীও নারী চরিত্রকে সহানুভূতি ও দরদ দিয়ে নির্মাণ করেছেন। নারীর প্রতি এ সম্মান ও সহানুভূতি দেখানো, নারীর সমাজ শৃঙ্খল ভাঙার প্রবণতা ও নারীর যাপিত জীবন পরিসরকে মহিমান্বিত করে তোলার পেছনে শুধু যুগধর্মই নয় বরং তাঁর মায়ের প্রভাবটাও সমানভাবে ক্রিয়াশীল ছিল। ‘পিঙ্গল আকাশ’র মঞ্জু ব্যতীত ত্রিলোজি ‘দক্ষিণায়নের দিন’র রাখী, ‘ওয়ারিশ’র সালমা, ‘উত্তরের খেপ’র নিশাতবানু ও মরিয়ম, ‘প্রদোষে প্রাকৃতজন’র লীলাবতী, ‘নাঢ়াই’র ফুলমতিসহ আরো অনেকেই শক্তি, সাহস, স্বাতন্ত্র্য ও ব্যক্তিত্ব নিয়ে জেগে ওঠেছে। যা শওকত আলীর প্রাগ্রসর চিন্তার ফসল।

ড. মহিউদ্দিন জাহাঙ্গীর: শওকত আলীর লেখায় বামদলের নেতাকর্মীদের মধ্যে এক ধরনের হতাশা ও জনবিচ্ছিন্নতার ইঙ্গিত পাওয়া যায়- এর কারণ কী?

ড. আনিসুজ্জামান: পাকিস্তান আমলে বামদল যা নিয়ে রাজনীতি করেছে, তাতে জনগণের আশা আকাঙ্ক্ষার প্রতিফলন তেমন ঘটেনি। অথচ বঙ্গবন্ধু ৬৬-তে যে ৬-দফা দিলেন, তা জনগণ সঙ্গে সঙ্গে গ্রহণ করে নেয়। কারণ তিনি জনগণের মুখের ভাষা, বুকের আশা ও চোখের স্বপ্নকে বুঝতে পেরেছিলেন। যা বামদলের  নেতাকর্মীরা পারেননি। তারা মুখে মানুষের কথা বললেও মানুষকে গুরুত্ব না দিয়ে তত্ত্ব-দর্শনকে নিয়ে অতিমাত্রায় মাতামাতি করেছেন। ফলে তাদের আভ্যন্তরীণ কলহ ও বিভাজন বেড়ে যায়। যার প্রভাব পড়েছে তাঁর উপন্যাসের নায়ক চরিত্রের ওপর।

ড. মহিউদ্দিন জাহাঙ্গীর: শওকত আলীর জনপ্রিয়তা ও পরিচিতি আশানুরূপ না হবার কারণ কী?

ড. আনিসুজ্জামান: প্রথমত তিনি প্রচারবিমুখ ও নিভৃতচারী স্বভাবের ছিলেন। খুব বেশি সামনে আসতে চাইতেন না। কিন্তু পাঠকসমাজ তার প্রিয় লেখককে দেখতে চায়, তার সান্নিধ্য ও সংস্পর্শ কামনা করে। কিন্তু শওকত আলী তা তেমন পছন্দ করতেন না এবং প্রশ্রয়ও দিতেন না। দ্বিতীয়ত তাঁর রাজনৈতিক মতাদর্শও এক্ষেত্রে কিছুটা দায়ী থাকতে পারে। তবে আমার মতে, এ ব্যাপারে তাঁর সহজাত নিস্পৃতাই বেশি দায়ী ছিল।

ড. মহিউদ্দিন জাহাঙ্গীর: বাংলা সাহিত্যে শওকত আলীর অবদান কতটুকু?

ড. আনিসুজ্জামান: তাঁর অবদান নিশ্চয় স্বীকার করতে হবে। এখন তাঁর মৃত্যুর পর সামগ্রিক মূল্যায়ন করার সুযোগ এসেছে। তিনি যেভাবে স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করতেন, তেমনিভাবেই নিজের ধারায় প্রচুর লেখা লিখে গিয়েছেন। তাঁর লেখা স্থায়িত্ব পাবে এবং পাঠকসমাজে তা টিকে থাকবে- সবার মতো এটি তিনিও কামনা করতেন। তবে নিজস্ব ধারা সৃষ্টি করতে পারা সহজসাধ্য নয়। কারণ বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়, নারায়ণ গঙ্গোপাধ্যায়, তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায় ও মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের মতো শক্তিশালী লেখকেরাও তো ঐ অর্থে কোনো ধারা সৃষ্টি করতে পারেননি। তারপরও শওকত আলীকে নিয়ে আমরা আশাবাদী। তিনি তাঁর লেখার শক্তি, সুষমা আর স্বাতন্ত্র্য দিয়েই টিকে থাকবেন। আর এ লেখাই তাঁকে বহুকাল স্মরণীয় করে রাখবে। 

ঢাকা/তারা

সর্বশেষ

পাঠকপ্রিয়