ঢাকা     সোমবার   ০৪ জুলাই ২০২২ ||  আষাঢ় ২০ ১৪২৯ ||  ০৪ জিলহজ ১৪৪৩

রবীন্দ্রনাথের ঈশ্বরচেতনা

অনিকেত সুর || রাইজিংবিডি.কম

প্রকাশিত: ১৩:৩৪, ২৩ মে ২০২২  
রবীন্দ্রনাথের ঈশ্বরচেতনা

“আরও প্রেমে, আরও প্রেমে
মোর আমি ডুবে যাক নেমে...” 

আমি চোখ বন্ধ করে শুনি। যেন আমার চারপাশ থেকে বহুদূরে সরে যায় দৃশ্য-বর্ণ-গন্ধের এই পরাক্রান্ত বস্তুজগত; লুপ্ত চরাচরে এক একটি শীতল অলখ জলফোঁটা আমার পদতল ছুঁয়ে খুব ধীরলয়ে দেহ বেয়ে উপরে উঠে আসতে থাকে। তারা একটা কোমল প্রস্রবণে রূপ নেয়। একটু একটু ক’রে নিমজ্জিত করে আমাকে তার ভেতর। আমাকে নিচে ফেলে উপর দিয়ে, চারপাশ থেকে নিঃশব্দ বয়ে যেতে থাকে; অলক্ষ্যে দেহত্বক ফুঁড়ে প্রবেশ করে আমার আত্মায়; সুরেলা এক কম্পনে সমাহিত আমি যেন বহুকাল পর আবার চোখ মেলি; আর স্পষ্ট টের পাই, স্বচ্ছজল এক ঝর্ণার অন্তর থেকে আমি সদ্য উঠে এসেছি; দাঁড়িয়ে আছি তাড়নাতাপরহিত, নবজন্মলব্ধ শৈশবস্বপ্নের প্রত্যাগত আলোয় ফেরা জ্যোৎস্নাফেনিল কোনো অচেনা নদীর পাড়ে...। 

কিংবা যখন শ্রবণ করি এই গান:
“নয়নের দৃষ্টি হতে ঘুঁচবে কালো
যেখানে পড়বে সেথায় দেখবে আলো।”

নিঃসন্দেহে এসব ‘প্রার্থনাগীতি’র বাণী, ভাবনা আর সুর পূর্ণতাপিয়াসী, শিল্পের আগুনধোয়া শুদ্ধ এক আত্মার গহন থেকেই উঠে আসা। তবু সরলমনে এই প্রশ্ন উচ্চকিত হয়, হতে পারে, রবীন্দ্রনাথ কি সত্যি ঈশ্বরে বিশ্বাস করতেন?

যারা ঈশ্বর নামক কোনো এক অলৌকিক সত্তায় বিশ্বাসী কিংবা আধা সংশয় আর আধা বিশ্বাসের মিশ্র এক দুর্বলতার কুহেলির ভেতর এ রকম কোনো সত্তার সন্ধান করেন, তাদেরই মনে এ জিজ্ঞাসা ঘুরেফিরে আসে। কেননা তাঁর এ রকম বেশ কিছু গানে আছে, ‘প্রভু’ শব্দের আর্ত উল্লেখ। পাশাপাশি কিছু কবিতায় আছে ‘ভগবান’ (ভগবান, তুমি যুগে যুগে দূত পাঠায়েছ বারে বারে...)।

প্রতীচ্যে রবীন্দ্রনাথের একটা ভুল, ভাঙাচোরা, খণ্ডিত ও খঞ্জ ইমেজ দাঁড়িয়েছিল ‘মিস্টিক’ মানে ‘অতীন্দ্রিয়’ বোধের কবি হিসেবে। মূলত তাঁর গুটিকয় গীতিকবিতার অনুবাদ ‘গীতাঞ্জলি’র মাধ্যমে। ইয়েটস সঙ্গতভাবেই তাঁকে ঈশ্বরবাদী বলে আখ্যা দেন নি, যদিও ইউরোপীয়দের সম্ভাব্য অস্বস্তি কিংবা ভ্রান্তি নিরসনে (অর্থাৎ, তারা যেন কোনোভাবেই গীতিকবিতাগুলিকে কেবল প্রার্থনাগান বলে ভুল না করে) ‘গীতাঞ্জলি’র ভূমিকায় তাঁকে বারবার ‘গড’ বা ঈশ্বর কথাটার উল্লেখ করতে দেখা যায়:
‘জানি না আমরা খোদাকে ভালবেসেছি কিনা; এমনটা বলাও ঢের বেশী হবে যে আমরা তাঁর অস্তিত্বে বিশ্বাস করেছি- তবু পিছন ফিরে জীবনের দিকে কখনও তাকাই যদি, উইলোর ছায়াঘন বনপথ আর নির্জন পাহাড়ী লোকে আমাদের কোনও এক স্বপ্নাবিষ্ট বিকালের ভ্রমণ, কিংবা পথচলতি কারও পাশাপাশি যেতে যেতে বিহ্বল প্রেমানুভবে কখনও হৃদয় কম্পিত হয়েছিল ব’লে আমাদের কোনও এক প্রায়-ভুলে-যাওয়া বিধুর দিনের অব্যক্ত দাবী, এবং ইত্যাকার আরও অনেক কিছুরই মধ্যে আমরা খুঁজে পাবো সেই আবেগ যা তাঁর কবিতার এই অন্তঃশীলা মাধুর্যকে সৃষ্টি করেছে।’

রবীন্দ্রসৃষ্টির ‘এই অন্তঃশীলা মাধুর্য’ সম্পর্কে ইয়েটস পূর্ণ সচেতন কিন্তু আবার এর নেপথ্য প্রেরণা হিসেবে উল্লেখ করছেন ‘সেই আবেগ’-এর কথা যা আসলে অনুমিত রবীন্দ্র ঈশ্বরবোধের দিকেই অঙ্গুলিনির্দেশ করে।

কেবল কিছু গান আর কবিতা ছাড়া রবীন্দ্রনাথের বিশাল সৃষ্টিভাণ্ডারের অন্য কোথাও কিন্তু এই ‘ঈশ্বর’ উপস্থিত নেই; একেবারেই নেই। না গল্পে, না নাটকে-প্রবন্ধে, না তাঁর স্মৃতিকথায়। এমনকি নেই তাঁর ব্যক্তিজীবনেও। সেসবে শুধু প্রবল-গভীর অনুভব-আন্দোলন আর যুক্তিবুদ্ধিশাসিত এক জীবনবাদীর দেখাই মেলে। দেখি, একের পর এক তিনি আঘাত করে চলেছেন সব জড় সংস্কার, ধর্ম, কথিত দেবতা আর দেবতার বিগ্রহকে। ছিলেন সর্বকৌতূহলী। বিজ্ঞান ভালোবাসতেন। নিয়মিত বিজ্ঞান পাঠ করতেন। ভূমিকম্পকে ‘ভগবানের অভিশাপ’ বলায় স্বয়ং গান্ধীর বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়েছেন। বলেছেন, ‘ওটা স্রেফ প্রাকৃতিক ঘটনা, দুর্যোগ।’
কবিতায় বলছেন:
“যে পূজার বেদী রক্তে গিয়েছে ভেসে
ভাঙো, ভাঙো, আজি ভাঙো তারে নিঃশেষে
ধর্ম কারার প্রাচীরে বজ্র হানো
অভাগা এদেশে জ্ঞানের আলোক আনো”

তবু সংশয় কাটে না। তবু মনে হয়, গানের কথায় এসে তিনি কেন বলেন- 
“দাঁড়িয়ে আছো তুমি আমার গানের ওপারে
আমার সুরগুলি পায় চরণ, আমি পাই নে তোমারে।”?

কেন বলেন –
“মোর হৃদয়ের গোপন বিজন ঘরে
একেলা রয়েছ নীরব শয়ন পরে
প্রিয়তম হে, জাগো জাগো
রুদ্ধ দ্বারের বাহিরে দাঁড়ায়ে আমি
আর কতকাল এমনি কাটিবে, স্বামী!”

এই ‘স্বামী’টা তবে কে? কবিতায় কেন তিনি বলেন, “নিজ হাতে নির্দয় আঘাত করি, পিতঃ...”? কে এই পিতা? সে কি ভগবান নয়? ঈশ্বর বা খোদা নয়?

এ রকম প্রশ্ন ওঠে। মূঢ় প্রশ্ন যদিও, তবু এ রকম প্রশ্ন তোলে কেউ কেউ। যারা আসলে শিল্প বোঝে না, রবীন্দ্রনাথ পড়ে নি। তাঁর বিপুল সৃষ্টিকর্মের কণা ভগ্নাংশের সাথেও যাদের পরিচয় নেই। ‘ঈশ্বর’ নামক অবিকশিত এক খঞ্জ ধারণার এঁদো ডোবায় আটকে পড়া যারা এক প্রাগৈতিহাসিক তালকানা কিম্ভুত মাছ। ঘুরেফিরে তারা শুধু ঈশ্বরকে টেনে আনে। তার কোলে শুয়ে ঘুমাতে ভালোবাসে। তার অলীক আশ্রয় ছাড়া যাদের অসহায় লাগে। তাকে হারাবার চিন্তা করতে গেলে পাগল হয়ে যায়।

কবিসত্তায় লোকবিশ্বাসের সঙ্গে যুক্ত ধারণা ও শব্দগুলি ভিন্নতর অর্থে ধৃত হয়। রবীন্দ্রগানেও তাই ‘প্রভু’ শব্দটি এসেছে ভিন্ন মাত্রা নিয়ে। আমাদের চিরদিনের স্বপ্নে ধৃত পূর্ণতার যে রূপকল্প, বাস্তব জীবনে তার স্থায়ী প্রতিষ্ঠার আর্তি হিসাবে; যে ঈশ্বর বৈচিত্র্যের ভেতর একটা ঐক্যের ছবি আঁকে আর কবির অন্তরলোকে মূর্ত ক’রে তোলে এই গাঢ় অনুভবের ধ্যানচিত্রকল্প: “জগতের মাঝে কত বিচিত্র তুমি হে, তুমি বিচিত্ররূপিনী/ অন্তর মাঝে তুমি শুধু একাকিনী।” কথিত ধর্মের প্রভু সে কোনোভাবেই নয়। শিল্পের মঙ্গলময় ঈশ্বর, আর ধর্মস্থিত ঈশ্বর যে কিনা পুরস্কারের লোভ দেখায় আর শাস্তির হুমকি দেয়, এ দুয়ের ব্যবধান বেশ দুস্তর; শাস্ত্রগত ঈশ্বর বড় বিভেদপ্রিয়; প্রকারবেষ্টিত নানান সংকীর্ণ সীমার ভেতরে তার অবস্থান; পারস্পরিক ঘৃণা-হিংসা আর অবিশ্বাসের প্ররোচনাদাতা। আর যে শিল্পের অন্বিষ্ট অখণ্ড মানুষ, তার ঈশ্বর তো এই ভেদবুদ্ধির সীমাটাকেই ভাঙতে উন্মুখ। জাগতিক জীবনের নানা ক্লেদ ও গ্লানি, বিচ্যুতি ও পরাজয়, সীমার সংকোচ, তাকে অতিক্রমণের অক্ষমতা অভীষ্ট পূর্ণতার দিকে আমাদের আগুয়ানির পথ আগলে দাঁড়িয়ে আছে। এই সীমাটাকে খসিয়ে দেওয়াই কবির আরাধ্য। অন্বিষ্ট পূর্ণতার প্রতীক হিসেবে তাই কবিকণ্ঠে ধ্বনিত হয়েছে ‘প্রভু’ শব্দটি।

গানের ‘তুমি’ও সেই একই স্বপ্নের দ্যোতক। আমাদের অপূর্ণ সত্তায় যে-সুন্দরের সঙ্গে মিলনের স্বপ্ন জাগে, এটা তো তাই। এই সুন্দর যেন চিরদিনের মায়াহরিণী (‘মায়াবনবিহারিনী হরিণী’), সে যেন লুকিয়ে আছে এই চেনা জগতেরই কোথাও, হয়তো বা শুক্লাযামিনীর অলৌকিক জোছনার বুকের ভেতর, বা কোনো বাঁশির সুরলহরীর প্রাণে ধৃত অনুভবে, কাজল বনের গভীর রহস্যে, হয়তো বা নাম-না-জানা কোনো ফুলের অচিন চমক সৌরভে। আমাদের জীর্ণ ঘরে, আমাদের চারপাশে, সমাজজীবনের কোথাও যে-সুন্দরকে আমরা প্রতিষ্ঠিত হতে দেখতে পাই না। আমরা জানি না সুন্দরের-

“সেই  সঙ্গীত কী ছন্দে গাঁথিব; কী করিয়া
শুনাইব, কী সহজ ভাষায় ধরিয়া দিব
তারে উপহার ভালবাসি যারে
রেখে দিব ফুটাইয়া কী হাসি আকারে
নয়নে-অধরে, কী প্রেমে করিব তারে
জীবনে বিকাশ। সহজ আনন্দখানি
কেমনে সহজে তারে তুলে ঘরে আনি
প্রফুল্ল সরস। কঠিন আগ্রহ ভরে
ধরি তারে প্রাণপণে মুঠির ভিতরে ---
টুটি যায়! হেরি তারে তীব্রগতি ধাই!
অন্ধবেগে বহুদূর লঙ্ঘি’ চলি যাই --- (তবু)
আর তার না পাই উদ্দেশ...!” (সুখ/চিত্রা)

কবির এই সুন্দর, এই ঈশ্বর আমাদের খুব চেনা, খুব বেশি লৌকিক। কারণ, সে তো আমাদের, সৌন্দর্যপ্রত্যাশী সব মানুষের মনেই আছে। সে মঙ্গলময়। এই ঈশ্বর রবীন্দ্রনাথের নিজস্ব কাব্যিক ঈশ্বর। কর্মে, প্রেমে, শুদ্ধ আনন্দকল্যাণসাধনায় যে আমাদের পূর্ণ হবার প্রেরণা দেয়। কল্পিত আসমান থেকে সে কোনো কিতাব নাজিল করে না। মানুষে মানুষে কোনো যুদ্ধ, রক্তারক্তির উস্কানিও দেয় না। সহস্র বছর ঘুমিয়ে থেকে হঠাৎ জেগে ওঠে- যে মানুষ বস্ত্র আবিষ্কার করেছে, এতদিন যাকে ন্যাংটা রেখেছিল, তাকে বলে না, দ্যাখো, তোমাদের এইভাবে পোশাক পরতে হবে, নইলে...” ইত্যাদি।

হ্যাঁ, এই ঈশ্বর কোমল, ভালোবাসার কথা বলে। এই ঈশ্বরই রবীন্দ্রনাথের ঈশ্বর, প্রেমের দূত। এই ঈশ্বর স্বয়ং মানুষ, তারই পূর্ণতর স্বপ্নকল্পপ্রতিমা। তারই ভেতরের এখনো না-হয়ে-ওঠা পূর্ণ সত্য ও প্রেমের স্বরূপ, ব্যথা পেলে যে আমাদের বুকে হাত রাখে। আমাদের প্রেমালিঙ্গনে আবদ্ধ করে। আমাদের ঘরের ভেতর চির অভিষেকের আয়োজনে যে দূরে অপেক্ষমান। এই ঈশ্বরে তো আমার কোনো সমস্যা হবার কথা নয়। আমি নিরীশ্বরবাদী হয়েও তাই কবির এই ঈশ্বরে নির্দ্বিধ আনন্দবিশ্বাস রাখি।

/তারা/ 

সর্বশেষ

পাঠকপ্রিয়