ঢাকা     বুধবার   ০১ ফেব্রুয়ারি ২০২৩ ||  মাঘ ১৯ ১৪২৯

নোবেলজয়ী আনি এরনোর উপন্যাস: ১৩ তম পর্ব

মুম রহমান || রাইজিংবিডি.কম

প্রকাশিত: ১৮:৩৭, ৩ জানুয়ারি ২০২৩   আপডেট: ১৮:৪৩, ৩ জানুয়ারি ২০২৩
নোবেলজয়ী আনি এরনোর উপন্যাস: ১৩ তম পর্ব

আমার আত্মীয়-স্বজনেরা খুব বলার চেষ্টা করেছে যে, আমি কোত্থেকে এই মেধাবী মগজ পেলাম, হয়তো আমার দাদীর কাছ থেকে যে এগার বছর বয়সে সার্টিফিকেট পেয়েছে এবং স্কলারশিপের সুযোগও পেয়েছে, তবে শেষ পর্যন্ত আলাপটা দোকানে এসেই ফুরায়, সব আমার বাবা-মায়ের কঠোর পরিশ্রমের ফসল, আর এই যে লিটার লিটার রেড ওয়াইন এসবই আমার খরচ ওঠানোর জন্য খরচ হয়েছে আর আমি যা অর্জন করেছি তার জন্য ধন্যবাদের পর ধন্যবাদ দেয়া উচিত এই সবের জন্য... আমার বাবা তো অকপটে বলে, ‘যদি আমাদের এই দোকানটা না-থাকতো, আমরা এটা করতে পারতাম না, তাকে নিজের পয়সা নিজের উপার্জন করতে হতো!’ আর আমার মা তো রীতিমতো জ্ঞানীর মতো বলে, ‘আচ্ছা বেশ, সুখে থাকো, কেবল তাকে একটা ভালো চাকরি পেতে দাও!’

যখন আমার সব আত্মীয় খেতে আসে কোন দাওয়াতে, আমার মনে হয় আমি কোন স্থানের নই, এইসব দায়বোধ আমাকে ভারে নত করে দেয়, আমি কেবল মাথা ঝুকিয়ে রাখি রোস্ট আর কৌটার বিনগুলোর দিকে। গোপনে আমি আনন্দিত, কারণ আমি আলাদা, আমি ভাবতে পারি সিডনি বেসেটের কথা আর সেই ইংরেজি রেকর্ডের কথা যা কেউ একজন বাজানোর জন্য আমাকে ধার দিয়েছে, যখন এরা সব আমার পাশ হয়ে যাওয়া পরীক্ষার কৃতিত্ব নিয়ে নিজেদের মধ্যে প্রতিযোগিতা করতে থাকে। সবশেষে আমি একা এইসব কিছুর সঙ্গে যাই, সব কিছুই তাদের ধন্যবাদের যোগ্য, আমার সেয়ানা দাদী যে তার সার্টিফিকেট পেয়েছে এগার বছরে, সেই ক্রেতা যে আমাদের কাছ থেকে ধার নিতো, সেই বুড়া হাবড়া যে আসতো বৃদ্ধাশ্রম থেকে, আর আমার মা যে ভোর পাঁচটায় ঘুম থেকে ওঠে টাইলসগুলো ধুতো। যদি এইসব তাদের এগুলো তাদের জন্য না হতো আর তারা যদি তাদের আয়কর থেকে প্রতিটা পয়সা উঠিয়ে না-রাখতো, আমি হয়তো একটা ইংরেজি শব্দ শেখার সুযোগও পেতাম না। আর আমি হয়তো একই বানান ভুল দিনের পর দিন করে যেতাম বাকীদের মতোই।

ওরা আমাকে গুরুত্ব দেয় না। তবে আমি নিজেকে ব্যস্ত রাখি স্কুলের ভাবনায়, মুঠো শক্ত করে বন্ধ যখন ওরা নাম্বারগুলো পড়তে থাকে আর আমি গর্ব করতে পারি আবারও সবার উপরে নাম্বার পাওয়ার জন্য, এমন এক জগত যেখানে তারা ভর্তিও হয়নি, এমনকি তারা সেটা কল্পনাও করতে পারে না, তারা প্রায়শই একটা সম্পূর্ণ ভিন্ন জগত আমার উপরে চাপিয়ে দিতে চায়। কিন্তু শেষপর্যন্ত আমিই জিতি। আমি আমার ঘরে চলে যাই আর নিজেকে ছুঁড়ে ফেলি আমার বিছানায়, আয়নায় তাকাই, বইতে থেকে কিছু অক্ষর পড়ি, আমার রসায়ন ক্লাসের বাড়ির কাজ শুরু করি, তাদেরকে বসে বসে ভাবার সুযোগ দেই যে আমার সম্পর্কে তারাই সঠিক, আমি তেমন অসভ্য বাজে মেয়ে নই যে বাবা-মায়ের টাকা সব নষ্ট করছে। কি ফালতু কল্পনা, যেমন শিক্ষকরাও করে, যেন যে কেউ চাইলে আগ্রহী হতে পারে ‘সিন্না অব চার্লস’ -এর মৌল ঐক্যে, ওগুলো কেবল আমার নিজস্ব কামনার পটভূমি। আমি আমার শোবার ঘরের কথা ভাবি গোলাপী ফুলঅলা ওয়ালেপেপার দেয়া আর ওয়াড্রোবটা হবে এখনও ঠিক রু ক্লোপার্তের শেষের সেই ওয়েটিংরুমটার মতো, শহরের কেন্দ্রে, জীবন আর ছেলেরা আমার জন্যে আছে অপেক্ষায় সেখানে। আমার উপরে নজর রাখার জন্য কোন বাবা-মা নেই, কোমল আর স্পষ্ট, আমি নাচি ‘চা-চা’ , আমি ছেলেদের সঙ্গে কথা বলি, ছাত্ররা বাড়ি এসেছে ছুটিতে, ভালো পরিবারের ঠিকঠাক বেড়ে ওঠা ছেলেরা। আমি এর ডেনিস লেস্যুর নই, তাদের একজন এখন আমাকে নেয়, হাতে ধরে পথ দেখায়। এই স্বপ্ন ছিলো আমার... দিনের পর দিনে, কতোবার, যখন আমি একলা থাকতাম, অঙ্কের ক্লাসে কিংবা স্কুলের বাসে। 

ছেলেরা,  আমি শুধু ছেলেদের কথা ভাবিনি, বরং আমি স্বপ্ন দেখেছি সেই ব্যক্তি হয়ে ওঠার যাকে ওরা নতুন পৃথিবীতে নিয়ে যাবে। নম্বরের খাতায় এক দারুণ উন্নতি, ডেনিস লেস্যু, অভিজাত আর সাচ্ছন্দ... শুয়ে শুয়ে পড়ছি ‘হিস্টোরিয়া’ যা আমি মাকে কিনে দিতে বলেছিলাম এক ‘দারুণ ছেলেকে’ ওটা পড়তে দেখে, আমি সচেতন যে পার্টির দুনিয়া, জিন্স আর কোকাকোলা আমার বাবা-মা’র দুনিয়া থেকে বহুদূরে অবস্থিত আর সেইসব বেচারা লোক থেকেও যারা তাদের অধীনে কাজ করে। অন্য মেয়েরা ভ্রু কুচকায় একোর্ডিয়ানের সাথে নাচতে, দ্রুত একগ্লাস হোয়াইট ওয়াইন নিয়ে নেয়, ফ্রেন্ডেলের  সিনেমা দেখে, কনসার্ট দেখে শহরের ব্যান্ডের, এ সবই অবশ্য আমার মা-বাবা পছন্দ করে। স্কুলে অবশ্য ওরা যেসব কৌতুক বলে সেটা আমার বাবা-মা কিছুতেই ধরতে পারবে না, এমনকি তা ব্যাখ্যা করার সুযোগও নাই, তারা যে কোন ব্যাখ্যা শোনার আগেই পালিয়ে যায়। তারা অবমাননাকর মন্তব্য করে ধ্রুপদী সঙ্গীত, তাদের পুরনো লোকসঙ্গীত নিয়ে, তবে আমার পুরনো লোকেরা তাদের একজন সুরকারের নামও বলতে পারে না... তারা বারে খায় আর গান গায় ‘ লা রোজেস ব্রাঞ্চেস’ । নিজেদের তারা স্তুপ করে ভরে নেয় রবিবারের লাঞ্চে... আমি যদি কেবল লাপোর্টের বালকের সঙ্গে বাইরে যেতে পারতাম, যে কিনা রাজকীয় ক্রিস্টিয়ানের সঙ্গে বন্ধুত্বপূর্ণ কিংবা যদি সয়েলার বা রিয়্যুর ‘সুন্দর’ বালকদের সঙ্গে যেতে পারতাম বাইরে, আমি নিজিকে বিশুদ্ধ মনে করতাম, আমি মুক্তি পেতার নোংরা কাপড় কাচার দিন থেকে, যেই সব দিন কেবল আমাকে ঠেলে পেছনে সরিয়ে দেয়, কী এক ভাগ্য আমার! তাহলে আমি আর কখনো আমার শূন্য হাতদুটো কচলাতাম না, কিংবা আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে আমার বাবা-মা কতোটা নির্বোধ তা নিয়ে চিৎকার করতাম না কখনো, আমি হয়তো আমার নিজের উপন্যাসের জীবন যাপন করতে পারতাম...              

আমার শেষ দুই বছরে আমি নির্লজ্জের মতো ছেলে শিকারে নিজেকে নিয়োজিত করেছিলাম। লজ্জা নামের এই বুর্জোয়া ধারণাই বা আমি কোথা থেকে পেতাম? এটা তবুও একটা গোপন সূত্রের উদাহরণ যা আমি সমাধান করার আশাও করতে পারিনি। প্রথমবারের মতো আমি চিমনে’র ‘লে সিড’  মতো অবস্থার ভেতরে ছিলাম, আর আমি ভাবতাম, আমি অস্পষ্ট হলেও জানি সে কিসের কথা বলছে। আমি বুঝেছিলাম যে বুড়ো হাবড়া আর কামলারা যেন আমাকে স্পর্শ করতে না পারে, আমাকে যেন আমার বাবা তার পটে হিস্যু করার শব্দ না-শোনায়। বরং ছেলেদের পেছনে ঘোরা কোনভাবেই বেহায়াপানা ছিলো না। এটা হলো দক্ষতা কিংবা ভাগ্য কিংবা এমনকি ইচ্ছাশক্তির ব্যাপার। যেটা শব্দটা আমি ভাবতে ভালোবাসতাম সেটা হলো ‘দুঃসাহসী’, একটা কঠিন, সাহসী শব্দ আর আমি আমার মুখের ভেতরে এই শব্দটাকেই ঘুরপাক খাওয়াতাম যখন শহরের কেন্দ্রে রু ক্লোপার্টের দিকে যেতাম।

একবার শেষ বাগানবাড়িটা আমার পেছনে আর আমাদের লেস্যু স্টোরের হলুদ দেয়ালটা দূরে ছোট হয়ে মিলিয়ে গিয়েছে আর তখনই আমার লড়াই শুরু হয়। চলার গতি ধীর, পেছনটা গুজে দেই আরো ভেতর দিকে, চিবুক তখন বাতাসের দিকে, আমি সব ফেলি এসেছি পিছনে যা কিছু আমাকে বিরক্ত করে, সংকুচিত করে, আমার ভেতরে ক্ষত সৃষ্টি করে, স্কুল, আমার বাবা-মা, ছুঁচোর মতো তাদের আসা-যাওয়া, সব ভুলে যাই, কোন রকম অনুশোচনা ছাড়াই ওগুলোকে একপাশে ফেলে দেই : আমি প্রতিটি দানায় দানায় সব কিছুর ঘ্রাণ নেয়ার চেষ্টা করি, এর আর ওর আছে একটা গার্লফ্রেন্ড, এইটা আর ওই ছেলেটা বেশি খারাপ নয়। আমি ওদের উপর পদমর্যাদা নির্ধারণ করি, ওদের শুঁকে বোঝার চেষ্টা করি, কাউকে কাউকে বাদ দেই, যদি কারো রেইনকোট পচা হয় সে কোনো কাজের নয় কিংবা পা ভাঁজ করে, হাত নাড়িয়ে হাঁটে তবে সেটাও কোনো কাজের ছেলে নয়, ওদের দেখলে আমার আঙিনাতে সেসব মাতালদের কথা মনে পড়ে যারা হিস্যু করতে যাচ্ছে টলমল পায়ে। আমি ব্যাপারটাকে আরো বড় করেই আকার দেই, ‘ওইটা একটা দালান নির্মাণে কাজ করে,’ যার মানে হলো আমি যতোদূর ভাবি তা হলো ওর কোন অস্তিত্ব নেই। সেন্ট্রাল বারের কাছেই একটা উচ্চ নিনাদের বাজে জুকবক্স , ওইখানেই আমার স্বপ্নের দলের লোকেরা বাস করে, ডাক্তার লেপোর্টের কন্যা, সন্যার হার্ডওয়্যারের দোকানের ছেলেরা, আর বাকী সব মেয়েরা যারা আভিজাত্যে পরিপূর্ণ। হাঁটতে থাকো লেস্যু, এতো উঁচুতে তুমি লক্ষ্য নির্দেশ করতে পারবে না, সময় এখনও পরিপক্ক হয়নি তোমার জন্য। ওই যে আমার ক্লাসমেটরা, কিন্তু তারা একদম সোজা আমার দিকে তাকিয়ে আছে, খানকিগুলা। 

আমার অন্য শিকার আছে, সে একা কিংবা মাঝেসাঝে হয়তো কোন বন্ধু নিয়ে আছে, একটা হাল্কা-পাতলা ছেলে, তারপরও সে দেখতে যথেষ্ট চিত্তাকর্ষক। একটা বাদামি-লালচে রঙ, তীক্ষ্ম মুখের শিকার, ব্যাগ্র-চাহনি তার সোনালি চশমার আড়ালে... তাকে দেখতে অনেকটা ইংরেজ মনে হয়, একটা বইপোকা লোকা কিংবা একজন বিজ্ঞানী... একটা নিরীহ ঝিনুকের-খোলের মতো মুখ... ধূসর-পশমী রেইনকোটের তলায় হাত ডুবে আছে সদাই। যখন যায় সে, কোমল আলোতে প্লাবিত, একটা কড়া মিষ্টতা, তার নীল চোখের চাহনি সরু আর তীক্ষ্ম হয় তার গোলাকার চশমার লেন্সের ভেতর দিয়ে। আমি কতো কী ভাবতাম, নিজেকে গল্প শুনাতাম, আর হাঁটতাম এবং হাঁটতাম। চারপাশের সব কিছু যেন ওর উপরই আচমকা পড়ে যাচ্ছে, দশটার ভিড়ের মধ্যে।  একটা উপযুক্ত আয় করা পরিবার, ওর বাবা একটা হ্যাট পড়ে। গাই ম্যাগনি, অঙ্ক আর বিজ্ঞানে পড়ে, চার্চে পেছনেই বাসা। আমি অডেটিকে বলেছিলাম ক্রিস্টিয়ানের কাছ থেকে খোঁজ নিতে। আমি নিজেকে দেখি একটা দোকানের আয়নায় আর রান্নাঘরের আয়নায়, শোবার ঘরে নিজের স্কার্ট উঠিয়ে আমার ঊরুগুলোকে দেখি আর সঙ্গে সঙ্গেই দ্রুত তা নামিয়ে ফেলি, এটা আমার পরিকল্পনার অংশ না, নেহাত একটু সতীত্বকে আলিঙ্গন করা। আমি মধ্যদুপুরে আর সন্ধ্যায় ওর পাশ দিয়ে যাই, আমার অবশ্যই সবকিছু দ্রুত করা উচিত, কেবল একটু চোখে চোখে তাকানো ক্রমেই বিরক্তিকর হয়ে উঠছে। আমি অস্থির হয়ে উঠি। আমার শিকার খানিকটা লাজুক আর সিদ্ধান্তহীনতায় ভোগে। দ্রুত কাজ কর্ম করো, হে নির্বোধ নিস্তেজ, এমন ফোঁটায় ফোঁটায় এগুলে হবে না, লালচুলোদের বিশ্বাস করো না।

আমার অপচয় করার মতো সময় নাই, প্রথম টার্ম প্রায় শেষ হওয়ার পথে। তারপর এইসব আকস্মিক সাক্ষাৎ, ধূসর-পশমী রেইনকোটকে নিকট থেকে দেখা, হাত বেরিয়ে আসবে পকেট থেকে, এ সবের সুযোগও যাবে কমে। দ্বিধাকে আড়াল করো। ডেনিস। ছেলেটা। কোথাও সেই উষ্ণতা আর তীব্র কামনা যা আমার স্বপ্নের খামে বন্দী? কিন্তু সে এক কোমল কথা বলা লোক, পড়ুয়া, আমি একটাই তাকে নানা বিশেষণ দেই, অস্বস্তিবোধ করি, আমার মুখে সব সময় একটা হাসি লেগে থাকে তখন, তার হাতেই রয়েছে সব সুবিধা। আমি তাকে আমার ইচ্ছা মতো সাজিয়েছি, কিন্তু ওর সঙ্গে আমি চলতে পারছি না। ‘তুমি কি তবে ধ্রুপদী সঙ্গীত পছন্দ করো?’ আমি যদি জ্যাজ মিউজিক পছন্দ না করি, আমি নিশ্চয়ই... কিছু বলতে পারি না, আমি এ সম্পর্কে কিছু জানি। আমি তীব্র একাগ্রতায় ভাবতে থাকি আর বেরিয়ে আসি একদল নামের তালগোল পাকিয়ে, মোৎজার্ট, ভাগনার। আমার অবশ্যই মনে রাখা উচিত ছিলো তারা কোন কোন সুর সৃষ্টি করেছেন। কিছু লোকের পাশ দিয়ে যাওয়ার সময় ও বললো, ‘হাই’।  ‘মোটর রেসের বন্ধু ওরা’ আমরা দোকানে একে অপরের দিকে তাকালাম, ‘দারূণ টেপরেকর্ডার।’ তার জড়তা মাখঅনো টুকটাক কথাবার্তা আমাকে বিরক্ত করছিলো।

বারবার একই ঘটনা, ওর পরিবার, ওর বন্ধুরা, ওর ট্র্যাভেল, আর আমার কিচ্ছু বলার নেই। আমার বাবা এই করে আর আমার বোন এই করে এইসব কথা থেকে কখনোই মুক্তি পাচ্ছিলাম না। তাহলে তো ওরাও প্রশ্ন করবে, আমি ওদের ইচ্ছা জানি। কেন মুখ বন্ধ রাখো না, আমার শান্ত শীতল, লাল চুলের শিকার, নেহাত কয়েকটা নিরব শব্দ আর কিছু অঙ্গভঙ্গিমা এটুকুই তো যথেষ্ট। এইসব আজাইরা আলাপের চেয়ে। হয়তো আমাকেই পটাতে কিংবা আমার উপর প্রভাব বিস্তার করতেই এসব বলছে। আমি অনড়। কেন সে সরাসরি আমার কাছে আসতে পারে না। পরেরবার, আমি এগিয়ে যাবো, আমিই উদ্যোগী হবো এবং আমিই প্রশ্ন করবো, আমি বাড়িয়ে বলি, ভ্রু কুচকাই, ‘কর্সিকায় যাওয়া কী মনোরম ব্যাপার...’ আমি আমার পরিবারের বিষয়ক প্রশ্ন এড়িয়ে যাই। ‘ওনারা ব্যবসা করেন।’ আমার এখনও মইের নেই কি ফালতু কথা আমি প্রথমেই বলেছিলাম। ও বললো, ‘আমার বাবা একজন একাউনটেন্ট’। এইটা আমাকে প্রভাবিত করলো, আমি ভেবে ছিলাম ও হয়তো আমার উপরে অবস্থান করে, আমি তার মৃদু কথা বলায় প্রভাবিত হয়েছিলাম, যদি সে কোন আলতু ফালতু কথাও বলে থাকে। আমার এখনও এই প্রীতি আছে যেই শব্দ ব্যবহারে সুন্দর, এটা সব সময় রয়ে যাবে আমার মধ্যে, কেবল সেই সঠিক মানুষটি ছাড়া আমার আর কারো সাথে কথা বলার নেই, আমার অন্তত কথা বলার একজন লোক দরকার। আমি শুনেছি আমার বাবা যখন কিছু একটা বলার চেষ্টা করে, সে একদম বাড়তি প্যাঁচালে ডুবে যায়, সে বারবার বলতে থাকে ‘আর আমি তাকে বললাম, আর সে আমাকে বললো’ এমন চলতেই থাকে। শব্দ ব্যবহারের অতো কিছু আমি জানি না, সে নিজেকেই বলে। আমি বড় হতে হতে ভেবেছি যে এটা একটা জন্মগত দুর্ঘটনার মতো, হয়তো তুমি এমনটা পাবে নয়তোবা পাবেই না। যখন বর্নিন তার ফ্যাকাশে মুখে জিদ কিংবা প্রুস্তের কথা বলে বেড়ায় আমার মনে হয় বমি করে দেই, আমি ভাবতাম, ‘এক বিন্দু এলকোহল ওর মুখটাকে থামিয়ে দিবে।’ কিন্তু পুরনো গাজরমুখোকে নিয়ে, আমি একদম প্রশংসায় ভরপুর, সে এতো ভালো বক্তা, আমি বহুবার বলার চেষ্টা করেছি আমাদের শেষ ফরাসী ক্লাস, ভলতেয়ার এবং এনলাইটেনমেন্ট  নিয়ে বলতে, কিন্তু সে আগ্রহী নয়। ও কেবল মোটরসাইকেল, জ্যাজ আর বন্ধুদের দিয়ে কথা বলতে চায়।

আমরা আগামী সপ্তাহের জন্য একটা ডেট ঠিক করি। আমার হাতে পুরো এক সপ্তাহ আছে নিজেকে তৈরি করার। দোকানটা যেন আমাকে চড় মারলো একদম চোখের মধ্যে যখন আমি কোণার দিকে তাকালাম। এটা যাত্রার সমাপ্তি, অচেনা আগুন্তক সূর্যের আলো শেষ প্রান্তে স্নান করছে, তার বদলে এখন এক প্রদর্শন প্রিয় লোক সেখানে, একটা বাচাল লোক তার হাত ভেজা সে জানেও না এরা আমার দীর্ঘ লালিত ক্রোধ আর ঘৃণার অংশ। আমি হয়তো ভেঙে পড়তে পারতাম এবং পথের উপর কান্নায় লুটিয়ে পড়তে পারতাম, এইসব বিষয়ে কোথায় জানা যায়, লেটেস্ট জ্যাজ রেকর্ড কোথায় পাওয়া যায়, উত্তরে কী বলা যায়। আমার কিচ্ছু বলার নেই। আমি এমনকি এর অনেকগুলো শব্দের অর্থও জানি না। পিচ্চি বিন্দু বালিকা, আমি তবু তোমার সঙ্গে লড়বো! কোন উপায় নেই, আমি তাকে যেতে দেবো, যদি আমি নিজেকে বোকাও বাই, আমি যাবো, ওকে ধরে রাখবো যাতে একজন অন্য কেউ হয়ে উঠতে পারি, লোককে দেখাতে পারি আমারও একটা বয়ফ্রেন্ড আছে... আমিও গর্ব দেখাবো। সারা সপ্তাহ আমি আমার মায়ের নোংরা, হোতকা ওভারঅল দেখে কাটাই, আমার বাবার নোংরা সেভিং বাটি ভর্তি ফেনা দেখে কাটাই, অগোছানো মটরশুটির কৌটা দেখে কাটাই, এসব কিছুই আমি আমার মন থেকে তাড়াতে চাই। যদি আমার ছোট্ট লাল মাথা বালক তার তীক্ষ্ম  নীল চোখ দিয়ে এ সব দেখে ফেলে... যতোদূর সে জানে, বোঝে, আমি ডেনিস, সেন্ট-মিকেলে ছাত্রী। আর এটুকুই আমি সব। বাকী সব কিছুই মায়া। কিছু কঠিন মুহূর্তও আছে, খাওয়ার সময়, বারের পাশ দিয়ে যাওয়ার সময়গুলো। আমার মুহূর্ত আসে সন্ধ্যায়, যখন আমি বসি টেবিল ভর্তি ময়লা প্লেটগুলোর ওখানে আর নিজেকে ঠেসে দিতে থাকি আঠালো নানা পদের মিষ্টি আর বিস্কুট দিয়ে। 

আমি জ্যাজ ভালোবাসে এমন লোকদের কথা, গান শুনতে থাকি, কানের মধ্যে রেডিও ঠেসে ধরি, যাতে করে আমার বাবা-মা টের না-পায়। আমি বাতিল কাগজের টুকরায় সুর আর সুরকারদের নাম লিখে রাখতে থাকি। এর চারদিন পর, আমি জ্যাজ মিউজিক নিয়ে রীতিমতো পাগল হয়ে উঠি, আমি আমার গোপন কল্পনার সাথে পুনরুজ্জীবিত আর সমৃদ্ধ হয়ে উঠতে থাকি, ক্লাসের প্যাঁচাল শোনার কোন মানেই হয় না, আমি এগুলো সব পরে বই থেকে পড়ে নিতে পারবো। আমার কল্পনা আরো দূরে এগিয়ে যায়, আমি সাবধানতার সহিত মহিমান্বিত বিজয়ের পরিকল্পনা কৌশল তৈরি করতে থাকি, আমার দিকে তাকিয়ে থেকে কোন লাভ নেই, তোমরা প্রতিবেশিদের বেমানান বাচ্চা-কাচ্চা, দেখো আমি কে, দেখো আমি কার সাথে আছি, এখন তোমরা বুঝবে ডেনিস লেস্যু কখনোই তোমাদের একজন ছিলো না, এই তো সেই প্রমাণ। তবে কেবল মুদি দোকানের উপর বিজয়ের চেয়েও বেশি কিছু প্রত্যাশা আমার আছে, হাতে হাত, মুখ, একসাথে কী করবে, কী ঘটবে...   

শনিবারে আমাদের মিলন হবে, আমি অনিশ্চিত বোধ করছিলাম নিজের ভেতরেই : সে কি আমাকে খুব নির্বোধ ভাববে, সে কি কোনভাবে আমার বাবা-মায়ের কথা জেনে যাবে, সে কি আমার পাশে দাঁড়াবে... কেবল আমাদের বাড়িতে যদি একটু আগুন লাগে কিংবা আমার মায়ের যদি হার্ট এটাক হয়, সে কি আমাকে দৌঁড়ে যাওয়া থামাবে তার শীত হাত, ধূসর পশমি রেইন কোট আর মুখে ঝোলানো হাসি দিয়ে। আমি এখনও সিদ্ধান্ত নিতে পারিনি, সে একটা নির্দিষ্ট শ্রেণীর, নাকি সে নেহাতই এক প্রেমিক লম্পট। যখন আবার ওকে দেখলাম ঠিক এটাই মনে হলো আমার। ও আমাকে পরামর্শ দিলো শহরতলীতে হাঁটতে যাওয়ার, সেখানে আমরা রেকর্ড শপের জানালার কাছে দাঁড়িয়ে দেখবো নতুন কী এসেছে, সে জ্যাজ মিউজিক নিয়ে সব জানে। আমরা খুঁজতে থাকি সে বিকালে কোন সিনেমা দেখানো হচ্ছে। কেন্দ্রের বারের কাছে এসে আমি মুগ্ধ কিন্তু আমি সেটা প্রকাশ করি না, যদি আমার বাবা-মা আমাকে দেখে ফেলে, আধুনিক কফি মেশিন, ফলের জুস। সে জুক বক্সে ‘পিতিতে ফ্লর’  গান ছাড়ে।  ‘এই ছোট্ট ফুলগুলোর কি কিছু ক্লোরফিল দরকার?’ আমি প্রথমে ধরতে পারিনি ও কি বলছে। আমরা বড় এপার্টমেন্ট আর গলি গুলো পার হয়ে সিমেট্রির দিকে যেতে থাকি, আর আমাকে সেখানে চলে আসি যেখানে ঘাসের মাঠগুলো বেড়া দিয়ে আটকানো চারিদিক থেকে। আমরা সব বিষয়েই কথা বলি। শিক্ষকদের গল্প, বন্ধুবান্ধব এবং ইতোমধ্যেই সাড়ে পাঁচটা বেজে যায়। তাতে অসুবিধা কি, ও কি মনে করছে আমি কোন কুৎসিত বোকা ঘন্টা? আমাকে আমার শীতের কোট পরতে হবে, এইটা একমাত্র যা আমার আছে। ওর মনে নিশ্চয়ই অন্য কোন মেয়ে আছে... আমার হৃদয় ডুবে যেতে থাকে। আমি বিশ্বাস করতে পারছি না আমরা একটা গ্রামের মাঠের ধারে একা দুজন, আশেপাশে কেউ নেই আর তারপরও কিছুই ঘটছে না। আমি স্বাভাবিক হতে পারছি না। আমি রু ক্লোপার্টের দোকানে ফেরত যেতে চাই না কলেজের এই বালককে চুমু না-খেয়ে, খেলোয়াড় ধাঁচের এই ছেলেটা দেখতে মন্দ নয়। আমি ধীরে হাঁটি, ওর দিকে তাকাই,আমি সাহসী হয়ে উঠছি না, তবে আমি যুক্তসঙ্গত হতে চাই, সে নিশ্চয়ই খামাখা এখানে ঘুরেতে ফিরতে আসেনি, আমি এখানে কিচ্ছু না শুনে একঘেয়ে সময় কাটাতে আসিনি... 

সব কিছু মুহূর্তে ঘটে গেলো, আমার মাথা তার বাহুর বাঁকে বিশ্রাম নিচ্ছিলো, তার দিকে সে টানলো আমাকে, আমি ভয়ে পক্ষাঘাতগ্রস্থ যেন, আমার মুখ জড়িয়ে ধরলো। আমি ঢোক গিলছি, আমার মাথা সেই সব মাছের মতো দপদপ করছে যে মাছই হোক সেটা। আমি কল্পনা করছি, আমি যদি কখনো তাকে না চাইতাম, কখনোই যদি আমাকে চুমু খেতে না দিতাম। আমি আরো কোমল আর আর্দ্র কিছুর স্বপ্ন দেখেছি সবসময়, একটা নরম, ভালোবাসার যতœ, যে কিনা উপন্যাসের নায়কের মতো সযত্নে সব কিছু করে। এটা অনেকটা যেন একটা কুকুর ছানা ঝাপ দিয়ে এলো আর মুখখানি চাটতে লাগলো। ওর চশমা আমার কপালে চাপ দিতে লাগলো। কয়েক মিনিট পর, আমরা নীরবভাবে হাঁটতে লাগলাম, আমাদের নিঃশ্বাসের শব্দ, এলোমেলো হাঁটা এমনভাবে চলতে লাগলো যেন একে অপরকে জড়িয়ে থাকি, তার হাত আমাকে ঘিরে আছে, আমি ইতোমধ্যেই নির্মম জবুথবুতে অভ্যস্ত হওয়ার চেষ্টা করছি। তাহলে, এই রকমই ব্যাপারটা, একটা বয়ফ্রেন্ড থাকা? আর আমি উষ্ণ, ক্রমাগত নিঃশ্বাসের মাঝখানে একটা খোলা খামের মতো নিজের মুখ উন্মোচিত করে দিয়েছি। একটা জিনিস আরেকটাকে অনুসরণ করে, আবিষ্কার করি দাঁত, পার্শ্বদেশ, রুক্ষ গাল, আমি প্রত্যেকটা আঙুলকে আমার পেছনে আলাদা আলাদা করে অনুভব করি, স্পর্শের একটা উৎসব। একে অপরের দিকে তাকাতে থেমে যাওয়ার আনন্দ উপভোগ করি, কিছু না বলেই আমরা যা বোঝাতে চাই তা বলতে থাকি, শক্ত করে স্পর্শ করার আনন্দ পাই আবার বিনিময়ে নরম স্পর্শ, দাঁত আর ঠোঁট, চারকোণা চোয়াল আর উষ্ণ ঘাড়, ঠিক নিচে শুকনো, ঠান্ডা আঙুলের মাথা একদম নরম ভেজা হাতের তালু।

সবচেয়ে সেরা ছিলো নীরবতা।  যে দেখানেপানা কখনোই কথা না-বলে থাকতে পারতো না সে এখন নীরবতায় পতিত, পাঁচমিনিট আগের আমাদের সব বকবক আর অস্বাভাবিকতায় এখন উধাও, পালিয়ে গেছে আমাদের চামড়ায় একটা বরফধ্বস নামিয়ে, আমাদের মুখে আর জিহ্বাকে একদম অধিগ্রহণ করে ফেলেছে। ঈশ্বর আমার, আমি কতোটা অগ্রগামী ছিলাম। অকৃত্রিম, আমি ভেবেছিলাম এটা হয়তো রচনার লেখার মতো হবে, আমার ক্লাসের খানকি মেয়েগুলোর চেয়ে সন্তোষজনকভাবে করার একটা প্রতিহিংসা আমার ভেতরে ছিলো। কিন্তু আমার অনুভূতির আনন্দধ্বণি এখন একদম আলাদা রকমের, আমি কারো সঙ্গে আমার তুলনা করতে যাবো না, আমি কারো চেয়ে শ্রেষ্ঠ বা নিকৃষ্ট নই। আমি তখন আমার স্টোরের কথা আর ভাবছিলাম না, এমনকি ঝাপসা হয়ে যাওয়া আমার বাবা-মাকেও ভাবছিলাম না। খুব সোজা কথা, আমি ছিলাম সুখী। যথার্থ সুখী, অন্য কাউকে নিয়ে এক অক্ষর চিন্তার করার কথাও ভাবিনি, ডেনিস লেস্যু হওয়ার জন্য লজ্জিতও নই। আর এমনই থাকবে বাকী কয়েকটা বছর। 

আমি সোজা আমার ঘরে যাই, আমার স্যুয়েটার খুলি আর মেঝেতে আয়নার সামনে বসে পড়ি। সন্ধ্যার ধূসর আলোতে একটা আবছায়া, একটা উজ্জ্বল গোলাপী ব্রা, এই তো আমি। বহুদূর ফেলে এসেছি সেই খুকিকে যে চুপেচুপে ললিপপ চুরি করতো, সেই পচা মেয়ে যার বাবা-মায়ের প্রতি কোন শ্রদ্ধাই নাই, বিদ্বেষে পূর্ণ সেই স্কুল বালিকা, সেই ভ্রষ্টা মেয়ে যে নিজেকে স্পর্শ করে আনন্দিত, সবাইকে ফেলে এসেছি বহুদূরে। আমি আমার গোলাপি ব্রার দিকে তাকাই আর আমার পনিটেইল করা চুলগুলোকে ডানেবামে দোলাই। আমার মুখ আর হাত যেন আলাদা করে মুখরিত, আলোকিত। আমার বাকী শরীর তখনো ছায়া, একাকীত্বে, লজ্জানত এক অন্ধকারে। কিন্তু আমার স্তন দেখা যাচ্ছে আয়নায়। আমি ইতোমধ্যেই আকুল হয়ে অপেক্ষা করছিলাম সেই দিনের যখন তার হাত আমার কাঁধের নিচে যাবে। আমার মুখের চারপাশটা শিহরিত হচ্ছিলো, যখন আমার ছোট্ট লালমাথা আমার দিকে চাপ দিচ্ছিলো। আমি দুইদিন ধরে আমার মুখ ধুই নাই, যাতে করে কিছুই ঘষা লেগে হারিয়ে না যায়। আমি পূর্ণ গৌরব বোধ করছিলাম, ক্যাফেটা কেবল আড়ালের একটা বিড়বিড় ধ্বণি ছাড়া আর কিছুই নয়। আমি অবসরে এর ভেতর দিয়ে হেঁটে গেছি, চতুর বুড়োলোকদের আমি আর হুমকি মনে করিনি, ক্রেতাদের শুভেচ্ছা জানানো কোন ব্যাপার না। আমার বাবা ভালো করা ইস্ত্রি করা একটা ওভারঅল পরেছেন, বৃদ্ধাশ্রমের বুড়োগুলো নত হয়ে সানন্দে ঝুকে ছিলো তাদের কফি আর ক্যালভাডোস ব্রান্ডির উপরে। আমি যখন আমার স্টেক আর টমেটো খেথাম অনুভব করতাম অন্য এক দুনিয়া। আমার কিছু যায় আসে না যদি আমার বাবা-মা দুনিয়ার সবচেয়ে জঘন্য ঘৃণ্য লোকও গয়, আমি তবুও সেই লাল চুল, লালা, নরম ত্বক, রুক্ষ ত্বক এই কোমল ত্বকের বিপরীতে এইসব অনুভব করতে থাকতাম আর এখন আমি কোন ঘৃণাই অনুভব করি না। 

আমি বলতে পারতাম আমি প্রেমে পড়েছি। প্রেমে পড়া, এটা অনেকটা ডেলি’র মতো ‘ট্রু কনফেশন’ কিংবা ‘লে গ্রান্স মিলনে’-তে আমি যেমন পড়েছি, এই বইগুলো আমাকে একজন ধার দিয়েছিলো। কিংবা প্রেমে পড়া হলো স্কুলে পড়া লামার্তিন  কিংবা ম্যুসেটের  কবিতা পড়ার মতো... সাহিত্যে প্রবন্ধে চরিত্র বিশ্লেষণ এবং তাদের আবেগ বিশ্লেষণ ছিলো আমার বিশেষ আয়ত্বের কাজ। কেন আমি বিশেষ করে তাকেই ভালোবাসলাম, তার অন্তহীন জ্যাজ মিউজিক আর মোটর রেস নিয়ে বকবকের পরও, তার ধারালো নিচু দাঁত সত্ত্বেও। সে তো আকস্মিক আমার পথে এসেছিলো, এটা তো যে কেউ হতে পারতো, যে কেউ ভালো পরিবারের, তার শার্টের হাতায় কাফ থাকতো আর হাতে একটা ব্রিফকেস। কখনো কখনো আমি টেবিলে বসে ভাবতাম, একবার, একবার হয়েছে সেটাই যথেষ্ট। কিন্তু আমি ঠিকই জানতাম যে ওর সঙ্গে আমি আবার বাইরে যাবো... নিনিস, তুমি তাকে না বলতো পারোনি, এবং ওর পরে যারা এসেছে তাদের কাউকেও, একের পর একজন এসেছে, হাপাচ্ছে, বিশ্রি, ঘামে ভেজা, কিন্তু সেটাই আমার সবচেয়ে ভালো লাগতো, সেই উষ্ণতা, আমার মায়ের সেই নাইটগাউনটার মতো যেটাকে চুলার উপরে শুকাতে দেয়া হতো। আমার শরীর আঠার মতো আটকে থাকতো, তার প্রসারিত হাতে। যখন তুমি ষোল বছরের তখন নিছক পুরুষের শরীরের আনন্দ, কেউ এটা মনে রাখে না, কেউ ফূর্তি নিয়ে কথা বলে না, এটা দুনিয়াকে উলোট পালোট করে দেয়। এমনকি মেয়েরাও নিজেদের মধ্যে এ সব নিয়ে কথা বলে না। আমি জানি আমি সুখি ছিলাম। আমার বন্ধু ছিলো আর আমার শরীর ছিলো আমার নিজের। এই পৃথিবী আবার আমার নিজের করতল গত হয়েছিলো। আমার বাবা-মা’র শিক্ষা হয়েছিলো, কারণ আমার কাছে আমার পড়ালেখার আর কোন গুরুত্ব ছিলো না। 

আমরা টানা পাঁচ মাস একসঙ্গে ছিলাম। শনিবারের বিকালে কিংবা রবিবারে যখন কিনা আমার প্রার্থনায় থাকার কথা। মানুষকে তো বেছে নিতে হয় এবং প্রার্থনা সভা ছিলো বুড়ি মহিলাদের গন্ধে ভরপুর, ফালতু অসুখী মুখ, রবিবার তারা সেই রোস্ট আর মটরশুটিতে অভ্যস্ত। প্রত্যেকবার আমরা সেই পথ ধরে যেতাম, দুটো কাটা ঝোপের মাঝখান দিয়ে, এপার্টমেন্ট আর গলি পেরিয়ে, নতুন দালান হচ্ছে সেখানে। আমরা একটা পথ খুঁজে নিয়েছিলাম। সে খুব স্মার্ট ছিলো, একটা ছোট্ট শয়তান, আগাচ্ছিলো ধীরে ধীরে কিন্তু সবসময়ই প্রত্যাশার চেয়েও ধীরে। প্রত্যেকবার তার নির্দিষ্ট আঙুল আমার শরীরের কোন না কোন অংশে প্রাণ জাগিয়ে দিচ্ছিলো। প্রত্যেকবার সে একই এলাকা দিয়ে যায় আরো দূরে যাওয়ার জন্য এবং বারবার এগোয় যেন খুব শক্ত করে সেলাই করা কিছুর দিকে। আমরা কথা বলি, হাত ধরি, তার বাহু আমার কোমরে, তুমুল চুমু খাই, তার খরখরে গাল, সে তার চশমা খুলে নেয়- হাত আমার আরো নিচের দিকে যায়, আমার জামার চেইন খোঁজে, আটকে যায়, ওটা আমার চামড়ার সাথে খুব শক্ত করে আটকানো, আমি নিঃশ্বাস বন্ধ করে থাকি, যাতে সে সহজে ওটা খুলতে পারে। পাঁচটা শনিবার আর দুইটা রবিবার পার হয়ে যায় আমার ব্রা খুলতে। সবসময়ই উপর থেকে নিচে। আনন্দ জীবন্ত হতে থাকে তার আঙুলের নিচে। কয়েক মুহূর্তের জন্য সব কিছু যেন ঝাপসা। আর এটাই মনে হয়েছিলো এতোদিন আমার স্তন অর্থহীন হয়ে ছিলো। আমার শরীর অকস্মাৎ হাজার দিক থেকে জ্যান্ত হয়ে ওঠে, আর আমি এতোক্ষণে জেনে গেছি যে তারা এখনও সবকিছু আবিষ্কার করছে। 

আমি অপেক্ষারত। প্রত্যেক শনিবার যখন আমরা আলাদা হই, আমি শূন্য অনুভব করি। পুরো আরো একটা সপ্তাহ লেগে যাবে জানতে এরপর সে কী করবে, ক্যালকুলাসের তিনটা অঙ্ক, একটা রচনা আর ইতিহাস ও ভূগোলের দুটো ক্লাস। আমরা ইতোমধ্যেই প্রাগ শহরের প্রতিরক্ষা নিয়ে পড়ে ফেলেছি। স্কুল আর সেই জায়গা নেই যেখানে আমার নিজেকে প্রমাণ করতে হবে, বরং এটা কেবল একটা শূন্যতা পুরণের জায়গা, একগুচ্ছ কাগজ লেখার জন্য, কিছু নোট নেয়া, কিছু সমস্যার সমাধান, ঠিকভাবে অথবা কোনভাবে করে যাওয়া। আমি চিরকুটে অডিটিকে লিখে দেই প্রত্যেক সপ্তাহে কি কি দল ঘটছে আর সে হাসে। অন্য মেয়েরাও জেনে গেছে আমার একটা দারুণ বয়ফ্রেন্ড আছে যে ইঞ্জিনিয়ার হতে চায়, যে অঙ্ক আর বিজ্ঞান নিয়ে পড়বে। এক তরুণ ভদ্রলোক, এক সুদর্শন বালক সে।  

কিন্তু যখন এটা ঘটলো, আমি তাকে অতোটা খেয়াল করিনি, আমার চোখ বন্ধ ছিলো। সে ছিলো স্থিরকৃত ত্বক, নিঃশ্বাস, কিছু সীশারেখা যা আমি ততোদিনে ভালো চিনে গেছি, অন্য যা এখনও এড়িয়ে গিয়েছিলো এখন তা আমাকে মুগ্ধ করে। কতো অঙ্গভঙ্গির সমন্বয় তৈরি হয়। এক ছায়া পুতলার মতো ভদ্রলোক। আমার জন্য সে হাত পিছলে দেয়, আমার স্কার্টের প্রান্তে, চেইন, এবার আরামেই খুলে ফেলে, এই তো আমরা, আমি ভাবিনি সে কখনো সাহস পাবে অতো দূর যেতে আর সে দশ সেন্টিমিটার এগিয়ে গেছে আমার পেট থেকে, মনে হচ্ছে এ এক অনন্ত যাত্রা। প্রতিটি সেকেন্ড যেন একটা বছর, এই হাত নিরবে লতিয়ে ঘুরছে আমার প্যান্টি আর ত্বকের মধ্যে। সে একটা পুরো প্রক্রিয়ার পরিকল্পনা করেছে যেন, হারিয়ে যাচ্ছি আমি... দারুণ আর রক্তিম। আমি নতুন কিছু অনুভব করি, হাল্কা, যেন আমি আমার পূর্বের পাপ সব মুছে ফেলতে পেরেছি। ওই ছোট্ট প্রবেশ দ্বারে অন্যের সাথে কিছু করার মধ্যে কোন অপরাধ নেই। 

একমাস পর, আমি উদ্যোগী হই আর একটি রহস্যময় আকৃতির দিকে আমার যাত্রা অনুভব করি যা মনে হচ্ছে একটা ভাঁজ করা মাশরুম, প্রস্ফুটিত হচ্ছে আমার হাতে, আমার আঙুল আর্দ্র, রক্ত, পানি, কিচ্ছু দেখতে পাই না, এলেমেলো একটা লাল মাথা, অবিন্যস্ত একটা বেচারা ছোট্ট স্কুল বালকের মতো... হ্যাঁ, আমি হয়তো তার সঙ্গে একীভূত ছিলাম, হয়তো আমি আমার সহযোগীর প্রতি কোমলতা অনুভব করেছিলাম। এই নতুন আনন্দের সন্ধান পেয়ে আমার স্কার্টের দাগ মুছে যাচ্ছে, একটা আদুরে লাল মাথা আমার ঘাড়ে নুয়ে বলছে, ‘আমি তোমাকে ভালোবাসি।’  (চলবে)   

 পড়ুন: নোবেলজয়ী আনি এরনোর উপন্যাস: ১২ তম পর্ব  

 

তারা//

সর্বশেষ

পাঠকপ্রিয়