মানিকগঞ্জের দুর্গম চরগুলোতে নেই নির্বাচনের উত্তাপ
জাহিদুল হক চন্দন, মানিকগঞ্জ || রাইজিংবিডি.কম
মানিকগঞ্জের হরিরামপুর উপজেলার হরিণাঘাট এলাকা।
আর মাত্র এক সপ্তাহ পর ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন। মানিকগঞ্জ জেলার অন্যান্য অঞ্চলে প্রচারের তোড়জোড় থাকলেও দুর্গম চরাঞ্চলে এখনো তৈরি হয়নি ভোটের উত্তাপ। পদ্মা ও যমুনা নদীবেষ্টিত এসব চর এলাকায় নির্বাচনি তৎপরতা সীমিত থাকায় ভোটারদের মধ্যেও দেখা যাচ্ছে নির্লিপ্ত ভাব।
মানিকগঞ্জ জেলার তিনটি সংসদীয় আসনের মধ্যে দুটি আসনের মোট ১০৩টি ভোটকেন্দ্র দুর্গম চরাঞ্চলে অবস্থিত। চরগুলোতে যাতায়াতের একমাত্র ভরসা ট্রলার ও নৌযান। সময়সাপেক্ষ ও ঝুঁকিপূর্ণ এই যোগাযোগ ব্যবস্থার কারণে অনেক প্রার্থী নিয়মিতভাবে চরগুলোতে পৌঁছাতে পারছেন না বলে জানান স্থানীয়রা।
হরিরামপুর, শিবালয় ও দৌলতপুর উপজেলার চর এলাকায় যেতে দীর্ঘ সময় লাগে। ফলে সংশ্লিষ্ট দুই আসনে ১১ জন প্রার্থী প্রতিদ্বন্দ্বিতা করলেও চর এলাকার অনেক গ্রামে তাদের উপস্থিতি চোখে পড়েনি। হাতে গোনা কয়েকজন প্রার্থী ও তাদের নেতাকর্মীরা মাঝে মধ্যে উঠান বৈঠক ও লিফলেট বিতরণ করলেও বেশির ভাগ চরেই এখনো ভোটের হাওয়া বইছে না।
আসনভিত্তিক তথ্য অনুযায়ী, মানিকগঞ্জ-১ আসনটি শিবালয়, ঘিওর ও দৌলতপুর উপজেলা নিয়ে গঠিত। এর মধ্যে শিবালয় উপজেলার চারটি এবং দৌলতপুর উপজেলার ৩৪টি ভোটকেন্দ্র দুর্গম চরাঞ্চলে অবস্থিত। অন্যদিকে মানিকগঞ্জ–২ আসনটি সিংগাইর, হরিরামপুর ও মানিকগঞ্জ সদর উপজেলার দুটি ইউনিয়ন নিয়ে গঠিত। এ আসনের হরিরামপুর উপজেলার ৬৫টি ভোটকেন্দ্রকেই দুর্গম চরাঞ্চল হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে।
হরিরামপুর উপজেলার সেলিমপুর এলাকার বাসিন্দা আলামীন হোসেন বলেন, “নির্বাচন সামনে থাকলেও চরাঞ্চলে এখনো উৎসবমুখর পরিবেশ তৈরি হয়নি।”
তার ভাষ্য, দুই-একজন প্রার্থী এলেও নিয়মিত নির্বাচনি প্রচার কিংবা ভোটারদের সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগ দেখা যাচ্ছে না। অনেক প্রার্থী এখনো এলাকায় পা রাখেননি, ফলে ভোটারদের আগ্রহও কম।
দৌলতপুর উপজেলার বাঘুটিয়া এলাকার বাসিন্দা নান্নু মিয়া বলেন, “সাধারণত নির্বাচন এলেই চরজুড়ে আলাদা একটা আবহ তৈরি হয়। এবার তা চোখে পড়ছে না।” যাতায়াতের কষ্টের কারণে অনেক প্রার্থী চর এলাকায় আসছেন না, যার প্রভাব ভোটারদের মনোভাবেও পড়ছে মনে করেন তিনি।
মানিকগঞ্জ-১ আসনে ধানের শীষ প্রতীকের প্রার্থী এস এ জিন্নাহ কবির জানান, চরাঞ্চলের মানুষের সঙ্গে তাঁর দীর্ঘদিনের সম্পর্ক। শুধু নির্বাচনের সময় নয়, বছরজুড়েই তিনি দলীয় ও মানবিক কর্মকাণ্ডের অংশ হিসেবে চর এলাকায় যাতায়াত করেছেন। নির্বাচনি প্রচারের অংশ হিসেবে উঠান বৈঠক, লিফলেট বিতরণ এবং সরাসরি ভোটারদের কাছে গিয়ে ভোট প্রার্থনার কথা জানান তিনি। তার দাবি, “নেতাকর্মীরাও নিয়মিতভাবে বিভিন্ন চর এলাকায় যোগাযোগ রাখছেন।”
জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থী ডা. আবু বক্কর সিদ্দিক বলেন, “চরাঞ্চলের মানুষ দীর্ঘদিন ধরে অবহেলিত। যাতায়াতের কষ্ট থাকলেও আমরা শুরু থেকেই চর এলাকায় যাওয়ার চেষ্টা করেছি। সরাসরি ভোটারদের সঙ্গে কথা বলা, তাদের সমস্যার কথা শোনা এটাই আমাদের রাজনীতির মূল শক্তি। সীমাবদ্ধতা থাকলেও নির্বাচনের শেষ দিন পর্যন্ত চরাঞ্চলের ভোটারদের কাছে পৌঁছানোর চেষ্টা অব্যাহত থাকবে।”
শিবালয় উপজেলার তেওতা এলাকা
সুশাসনের জন্য নাগরিক মানিকগঞ্জ জেলা কমিটির সভাপতি অধ্যাপক ইন্তাজ উদ্দিন বলেন, “দুর্গম চরাঞ্চলে নির্বাচরি প্রচার কম হওয়া উদ্বেগজনক। এসব এলাকার ভোটারদের ভোটের গুরুত্ব অন্য এলাকার মতোই সমান। প্রার্থীরা যদি সরাসরি গিয়ে ভোটারদের সঙ্গে কথা না বলেন, তাহলে অংশগ্রহণমূলক ও অর্থবহ নির্বাচন নিশ্চিত করা কঠিন হয়ে পড়বে।” ফলে ভোটার উপস্থিতি কমে যাওয়ার আশঙ্কাও রয়েছে বলে মন্তব্য করেন তিনি।
শিবালয় উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ও সহকারী রিটার্নিং কর্মকর্তা মনিষা রানী কর্মকার বলেন, “চরাঞ্চলের ভোটকেন্দ্রগুলোতে সুষ্ঠু ও শান্তিপূর্ণ ভোটগ্রহণ নিশ্চিত করতে যাতায়াত, নিরাপত্তা ও ব্যবস্থাপনা সংক্রান্ত বিষয়গুলো গুরুত্ব দিয়ে দেখা হচ্ছে।”
দৌলতপুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ও সহকারী রিটার্নিং কর্মকর্তা নাহিয়ান নুরেন জানান, চর এলাকার ভৌগোলিক বাস্তবতা মাথায় রেখে নৌযান ব্যবস্থাপনা ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর দায়িত্ব বণ্টন করা হয়েছে। ভোটকেন্দ্রের নিরাপত্তা নিশ্চিতে সংশ্লিষ্ট সবাই সমন্বিতভাবে কাজ করছে।
হরিরামপুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ও সহকারী রিটার্নিং কর্মকর্তা নাহিদা আক্তার বলেন, উপজেলার সব ভোটকেন্দ্রই দুর্গম চরাঞ্চলে হওয়ায় আগাম পরিকল্পনা গ্রহণ করা হয়েছে। ভোটের দিন আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখতে সর্বোচ্চ সতর্কতা অবলম্বন করা হবে।
ঢাকা/মাসুদ