ঢাকা, বৃহস্পতিবার, ২৫ আষাঢ় ১৪২৭, ০৯ জুলাই ২০২০
Risingbd
সর্বশেষ:

যশোরে আতঙ্কের নাম পল্লী বিদ্যুতের ‘গড় বিল’

সাকিরুল কবীর রিটন : রাইজিংবিডি ডট কম
     
প্রকাশ: ২০২০-০৬-০৭ ৮:৩৬:২৯ এএম     ||     আপডেট: ২০২০-০৬-০৭ ১২:৪৩:২৯ পিএম

যশোরে করোনা সংক্রমণের মধ্যেও পল্লী বিদ্যুৎ সমিতির প্রায় নয় লাখ গ্রাহক ‘গড় বিলের’ নামে ভুতুড়ে বিলের শিকার হয়েছেন। ‘গড় বিলের’ নামে যশোর পল্লী বিদ্যুৎ সমিতি-১ ও ২ এর মিটার রিডাররা অফিসে বসে মনগড়া অতিরিক্ত বিল করেছেন বলে অভিযোগ উঠেছে। যা গ্রাহকদের আতঙ্কে পরিণত হয়েছে।
গ্রাহকদের অভিযোগ, করোনার কারণে তাদের মিটারের রিডিং না দেখেই গত বছরের এই সময়ে আসা বিলের দেড় থেকে দ্বিগুণ বেশি করে বিল প্রস্তুত করেছে পল্লী বিদ্যুৎ কর্তৃপক্ষ। করোনার দোহাই দিয়ে তারা সরেজমিনে মিটার রিডিং নেননি। অথচ বাড়ি বাড়ি ঘুরে ঠিকই বিল পৌঁছে দেওয়া হয়েছে। আবার নির্ধারিত সময়ের মধ্যে বিল জমাদানে ব্যর্থ হলে জরিমানা নেওয়া হবে না বলা হলেও ব্যাংক ঠিকই জরিমানাসহ বিল আদায় করছে।

পল্লী বিদ্যুতের পক্ষ থেকে প্রতিটি বিদ্যুৎ বিলের কপিতে লিখে দিয়েছেন, ‘আপনার অসুবিধার জন্য আমরা আন্তরিকভাবে দুঃখিত। আপনার গত বছরের একই সময়/একই মাসের বিদ্যুৎ ব্যবহারের ভিত্তিতে গড় বিল প্রণয়ন করা হলো। কোনো অসঙ্গতি থাকলে পরবর্তীতে তা সংশোধন/সমন্বয় করা হবে।’

বিলের কপিতে সমন্বয়ের কথা বলা হলেও আসলে তা করা হয়নি কোথাও। কবে সমন্বয় হবে তাও জানেন না কোনো গ্রাহক। গড় বিলের নামে গ্রাহকের বিল কেবল বেশিই হয়েছে, কোথাও কম হয়নি বলেও জানিয়েছেন ভুক্তভোগী গ্রাহকরা।

যশোর পল্লী বিদ্যুৎ সমিতি-১ এর আওতায় প্রায় সাড়ে চার লাখ গ্রাহক। যশোর সদরের কিছু এলাকা, শার্শা, চৌগাছা এবং ঝিকরগাছা উপজেলা নিয়ে পল্লী বিদ্যুৎ সমিতি-১ এর কর্মযজ্ঞ।

চৌগাছা বাজারে রফিকুল ইসলামের ওয়েল্ডিংয়ের ব্যবসা। তিনি বলেন, ‘প্রতিমাসে আমার বিল আসতো এক হাজার থেকে পনেরশ’ টাকার মতো। এবার তিন মাসের গড় বিল দেওয়া হয়েছে ১০ হাজার ৮২৪ টাকা। এক মাসে যদি পনেরশ’ টাকা হয়, সেক্ষেত্রে তিন মাসে বড়জোর সাড়ে চার হাজার টাকা বিল হওয়ার কথা। গড় বিলের নামে যা দেওয়া হয়েছে, তা একেবারেই অযৌক্তিক। এরকম ভুতুড়ে বিল জীবনেও দেখিনি।’ 

গড় বিল নিয়ে নাভারণ ফজিলাতুন নেছা মহিলা কলেজের হিসাব বিজ্ঞানের অধ্যাপক বখতিয়ার খলজি বলেন, ‘গড় বিলের নামে পল্লী বিদ্যুৎ সমিতি মানুষকে ধোঁকা দিচ্ছে। প্রতিটি বিলে গেল বছরের চেয়ে দেড় থেকে দ্বিগুণ বেশি করে দেওয়া হচ্ছে। এখানে বেশি ইউনিট দেখানোর কারণে বিলের ধাপও পরিবর্তন হচ্ছে। টাকার অংকও বাড়ছে। পল্লী বিদ্যুৎ থেকে সমন্বয়ের কথা বলছে কিন্তু সেটা কীভাবে বা কবে করবে তা কিছুই বলছে না।’

অনুসন্ধানে জানা যায়, পল্লী বিদ্যুতের বিলের ইউনিট সাতটি ধাপে আদায় করা হয়। লাইফ লাইনের রেট (০-৫০) প্রতি ইউনিট সাড়ে তিন টাকা, ০-৭৫ প্রতি ইউনিট ৪ দশমিক ১৯ টাকা, ৭৬-২০০ প্রতি ইউনিট ৫ দশমিক ৭২ টাকা, চার নম্বর ধাপে (২০১-৩০০) প্রতি ইউনিট নেওয়া হয় ছয় টাকা।

এমন অনেক গ্রাহক আছেন যাদের ইউনিটের সংখ্যা কম থাকার পরও গড় বিলে তৃতীয় কিংবা চতুর্থ ধাপে বিল আদায় করা হচ্ছে। পরে তিন মাস পর সমন্বয় করা হবে কীভাবে?

তৃতীয় কিংবা চতুর্থ ধাপের টাকা তো সমন্বয় করা যাবে না, যাবে কেবল ইউনিটের সমন্বয় করা। এখানে বড় একটা শুভঙ্করের ফাঁকি রয়েছে বলে মনে করছেন গ্রাহকরা।

বেনাপোল বাজারের স্টেশনারি ব্যবসায়ী মফিকুর হাসান জানান, তার দোকানে ২০১৯ সালের এপ্রিলে বিল আসে ৬৯০ টাকা। এ বছর লকডাউনের কারণে গোটা এপ্রিল মাসই দোকান বন্ধ ছিল। তারপরও এপ্রিল মাসে তার বিল দেওয়া হয়েছে ৯৯০ টাকা। কোন হিসাব মতে তার এই বিল এসেছে তা জানতে চান তিনি। একই অভিযোগ করেন বেনাপোলের সিএন্ডএফ ব্যবসায়ী নাসির উদ্দিনও।

তিনি জানান, লকডাউনের কারণে তার অফিসও বন্ধ ছিল। এরপরও তার বিল এসেছে এক হাজার ৫৬০ টাকা। অথচ ২০১৯ সালের এপ্রিল মাসে অফিস খোলা ছিল এবং তার বিল এসেছিল ৭৭০ টাকা।

একই অবস্থা বিরাজ করছে সমিতির-২ (বাঘারপাড়া, মনিরামপুর, কেশবপুর, অভয়নগর এবং নড়াইলের কিছু এলাকা) সাড়ে চার লাখ গ্রাহকদের মাঝেও।
এদিকে করোনার কারণে গ্রাহকের বকেয়া মাশুল দিতে হবে না বলে জানানো হলেও সে কথা মানা হচ্ছে না বলেও অভিযোগ উঠেছে। বিদ্যুৎ বিল দিতে গিয়ে তাই বিলম্ব মাশুলও গুণতে হচ্ছে গ্রাহকদের। ব্যাংকে বিল নেওয়ার সময় ব্যাংক কর্তৃপক্ষ কোনো ছাড় দিচ্ছেন না।

এ ব্যাপারে বেনাপোলের শিকড়ি গ্রামের ছাবদার আলি বলেন, ‘এপ্রিল মাসের বিল পেয়েছি ৫ মে তারিখে। ৬ মে ছিল বিলম্বমাশুলসহ বিল জমা দেওয়ার শেষ তারিখ। বিলম্বে পাওয়া এপ্রিল মাসের বিদ্যুৎ বিলটি বেনাপোল স্টান্ডার্ড ব্যাংকে জমা দিতে গিয়েছিলাম। গেলে তারা জরিমানাসহ বিলের টাকা নিয়েছে।’
এ বিষয়ে বেনাপোল স্টান্ডার্ড ব্যাংকে যোগাযোগ করা হলে জরিমানা নেওয়া হবে না এমন কোনো নির্দেশনা তাদের কাছে নেই বলে সাফ জানিয়ে দেয় ব্যাংক কর্তৃপক্ষ।

যশোর পল্লী বিদ্যুৎ সমিতি-১ এর জেনারেল ম্যানেজার আব্দুল মান্নান বলেন, ‘বিল ডবল হওয়ার হওয়ার কথা নয়। গত বছরের এপ্রিলে কোনো গ্রাহকের ১০০ ইউনিটের বিল হলে, এবার তার ৯০ ইউনিটের বিল করা হচ্ছে। কারণ, গত বছরের ইউনিটের দাম আর এ বছর ইউনিটের দাম এক নয়। এবার একটু বেড়েছে। আমি চ্যালেঞ্জ করে বলছি কোনো গ্রাহকের ডবল বিল হয়নি।’

করোনার কারণে স্টাফরা গ্রাহকদের মিটার রিডিং নিতে পারেননি জানিয়ে তিনি বলেন, ‘কোনো গ্রাহকের বিল নিয়ে যদি অভিযোগ থাকে, তাহলে তিনি যেনো সরাসরি আমার সাথে কথা বলেন। আমি নিজেই সমাধান করে দেবো।’

যদিও প্রতিবেদনটি তৈরি করতে গিয়ে জেনারেল ম্যানেজার আব্দুল মান্নানের বক্তব্য নিতে এ প্রতিবেদককে প্রায় এক মাস যশোরের পুলেরহাট অফিসে ধর্না দিতে হয়েছে। তবুও তার বক্তব্য নেওয়া সম্ভব হয়নি।

অবশেষে যশোর সদরের হাশিমপুর বাজারে পল্লী বিদ্যুতের এক সাব স্টেশন মেরামতের কাজ তদারকির সময় স্পট থেকে তার বক্তব্য সংগ্রহ করা হয়। সেক্ষেত্রে একজন গ্রাহক বিলের অসঙ্গতি নিয়ে কথা বলতে জেনারেল ম্যানেজার মহোদয়ের দেখা পাবেন কী করে তা নিয়ে স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন ওঠে।

এদিকে যশোর পল্লী বিদ্যুৎ সমিতি-২ এর জিএম প্রকৌশলী অরুন কুমার কুন্ড গড় বিল করতে গিয়ে কোথাও কোথাও বেশি বিল হয়েছে বিষয়টি স্বীকার করে বলেন, ‘করোনার কারণে সরকারি নির্দেশনায় গড় বিল করা হয়েছিল। সেক্ষেত্রে কিছু কিছু বিল বেশি হয়েছে। সমস্যাটির সমাধানে আমরা মাইকিং করছি। যাদের বিল নিয়ে অভিযোগ রয়েছে, তারা যেনো অফিসে যোগাযোগ করেন। অফিসে বিল সমন্বয় করতে একটি বিভাগ খোলা হয়েছে। সেখান থেকে অভিযোগকারীদের বিল সমন্বয় করে দেওয়া হচ্ছে।’

তিনি দাবি করেন, ‘শুধু এপ্রিল মাসের বিলের ক্ষেত্রে এই সমস্যা হয়েছে। এখন গরম পড়েছে। ফ্রিজ, এসি, ফ্যান চালানো হচ্ছে বেশি। তাই বিলও বেশি আসবে। এটি গ্রাহকদের মেনে নিতে হবে।’

তিনি বলেন, ‘এখন থেকে গ্রাহক যতটুকু বিদ্যুৎ ব্যবহার করবেন, ততটুকুই বিল আসবে। এরপরও কোনো বিলের ক্ষেত্রে বড় ধরনের গরমিল হলে গ্রাহক বিদ্যুৎ বিভাগের অভিযোগ কেন্দ্রে যোগাযোগ করলে সমাধান দেওয়া হবে।’

 

যশোর/সনি

       
 

আরো খবর জানতে ক্লিক করুন : যশোর, খুলনা বিভাগ