ঢাকা     রোববার   ০৩ মার্চ ২০২৪ ||  ফাল্গুন ১৯ ১৪৩০

পঞ্চগড়ে নৌকাডুবি: ‘৩ বার বন্ধ হয়ে যায় শ্যালো ইঞ্জিন’ 

পঞ্চগড় প্রতিনিধি || রাইজিংবিডি.কম

প্রকাশিত: ২০:৩৩, ২৭ সেপ্টেম্বর ২০২২   আপডেট: ২১:০৪, ২৭ সেপ্টেম্বর ২০২২
পঞ্চগড়ে নৌকাডুবি: ‘৩ বার বন্ধ হয়ে যায় শ্যালো ইঞ্জিন’ 

সেই ভাতিজির সঙ্গে মানিক চন্দ্র

মানিক চন্দ্র রায় (২৮)। তিন বছর বয়সি ভাতিজি অঙ্কিতা রাণীকে নিয়ে যাচ্ছিলেন মহালয়া ধর্মসভায়। করতোয়া নদীর ওপারে বদেশ্বরী মন্দিরে ওই অনুষ্ঠানে যেতে চড়ে বসেন নৌকায়। কিন্তু নৌকা অপরপ্রান্তে পৌঁছানোর আগেই তলিয়ে যায় মাঝ নদীতে। এ ঘটনায় করতোয়ার পাড় মৃত্যুপুরী হলেও ভাতিজিকে নিয়ে অলৌকিকভাবে বেঁচে ফেরেন মানিক।

এখনো আতঙ্ক কাটেনি মানিক চন্দ্রের। সেদিনের অভিজ্ঞতা মনে পড়লে গা শিউরে ওঠে তার। সেই অভিজ্ঞতা শেয়ার করেছেন রাইজিংবিডির সঙ্গে। ধারণ ক্ষমতার চেয়ে অতিরিক্ত যাত্রী বহনের পাশাপাশি নৌকার শ্যালো ইঞ্জিনে ত্রুটি ছিল— বলেছেন মানিক চন্দ্র।

মানিক চন্দ্রের বাড়ি পঞ্চগড়ের বোদা উপজেলার মাড়েয়া ইউনিয়নের বটতলী এলাকায়। তিনি সেখানকার গুরুদাস চন্দ্র রায়ের ছেলে।

মানিক চন্দ্র বলেন, ‘বড় ভাই সন্তোষ রায়ের মেয়ে অঙ্কিতাকে নিয়ে ধর্মসভায় যাচ্ছিলাম। ঘাটে গিয়ে দেখি আমার মতো শতাধিক মানুষ নদী পারের জন্য নৌকার অপেক্ষায়। শ্যালো ইঞ্জিনচালিত ওই নৌকা ঘাটে ভিড়লে আমি অঙ্কিতাকে নিয়ে নৌকার সামনে চলে যাই। আমার পিছনে হুড়হুড় করে সবাই ওঠে বসে নৌকায়। শ্যালো ইঞ্জিন চালু করে ঘাট ত্যাগ করে নৌকাটি। কিন্তু প্রায় ১০০ মিটার যাওয়ার পর বন্ধ হয়ে যায় শ্যালো ইঞ্জিন। এতে যাত্রীরা একধরণের ঝাকি পায়। পূনরায় ইঞ্জিন চালু করলে মাঝ নদীতে গিয়ে আবারও বন্ধ হয়। এভাবে একে একে তিনবার ইঞ্জিন বন্ধ হয়ে থেমে যায় নৌকাটি।’ 

মানিক চন্দ্র বলেন, ‘এক পর্যায়ে নৌকাটি দুলতে থাকে। আমি কালক্ষেপণ না করে ভাতিজিকে নিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়ি পানিতে। সাঁতরে পাড়ে আসার চেষ্টা করি। পরে স্থানীয়রা ডিঙ্গি নৌকায় করে আমাদের উদ্ধার করেন।’ 

তিনি বলেন, প্রাণে বেঁচে ফিরলেও সেদিনের ঘটনা ভোলার মতো না। বারবার কানে ভাসছে মানুষের আহাজারি। তবে মাঝ নদীতে নৌকার ইঞ্জিন বারবার বন্ধ না হলে না-ও ঘটতে পারত এমন দুর্ঘটনা। 

গত রোববার (২৫ সেপ্টেম্বর) শারদীয় দুর্গোৎসবের মহালয়া উপলক্ষে পঞ্চগড়ের বোদা উপজেলার মাড়েয়া আউলিয়া ঘাট থেকে শতাধিক মানুষ শ্যালো ইঞ্জিনচালিত একটি নৌকায় করে বদেশ্বরী মন্দিরের দিকে যাচ্ছিলেন। ঘাট থেকে নৌকা কিছু দূর যাওয়ার পর দুলতে শুরু করে। এক পর্যায়ে নৌকাটি ডুবে যায়। পরে উদ্ধার অভিযান শুরু করে প্রশাসন। 

বোদা উপজেলার মাড়েয়া ইউনিয়নের করতোয়া নদীর অপরপাড়ে বদেশ্বরী মন্দিরে মহালয়া পূজা উপলক্ষে প্রতিবছরের ন্যায় এবারও ধর্মসভার আয়োজন করা হয়। রোববার (২৫ সেপ্টেম্বর) দুপুরের দিকে মূলত ওই ধর্মসভায় যোগ দিতে সনাতন ধর্মালম্বীরা নৌকাযোগে নদী পার হচ্ছিলেন। তবে ৫০ থেকে ৬০ জনের ধারণ ক্ষমতার নৌকায় দেড় শতাধিক যাত্রী ছিল। এই নৌকাডুবিতে সর্বশেষ ৬৭ জনের লাশ উদ্ধার করা হয়েছে। 

একদিকে অতিরিক্ত যাত্রী, অপরদিকে ইঞ্জিনের ত্রুটি- এই দুই কারণে নদীর মাঝে গিয়ে নৌকাটি ডুবে যায়। সে সময় অনেকে সাঁতরে তীরে উঠতে পারলেও নারী ও শিশুরা পানিতে ডুবে যায়। এ ঘটনায় অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেট দীপঙ্কর রায়কে প্রধান করে ৫ সদস্য বিশিষ্ট তদন্ত কমিটি গঠন করেছে জেলা প্রশাসন।

মাড়েয়া বামনহাট ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান আবু আনসার মো. রেজাউল করিম বলেন, ‘আমিও নদী পারের জন্য নৌকার অপেক্ষায় ছিলাম। কিন্তু অতিরিক্ত যাত্রী ওঠায় আমি পরের নৌকার জন্য অপেক্ষায় থাকি। তবে নৌকাটি ঘাট ছেড়ে কিছু দুর যাওয়ার পর এর শ্যালো ইঞ্জিন বন্ধ হয় এবং পূনরায় চালু করার সময় ঘাট থেকে কিছু একটা ভাঙার শব্দ শুনেছি।’ 

তদন্ত কমিটির প্রধান অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেট দীপঙ্কর রায় বলেন, ‘আমরা নৌকাডুবির ভিডিও সংগ্রহ করেছি। প্রত্যক্ষদর্শী এবং বেঁচে ফেরাদের সঙ্গে কথা বলেছি। সব ধরনের তথ্য সংগ্রহ করা হয়েছে, সেগুলো পর্যালোচনা করা হচ্ছে। তাই এ বিষয়ে তদন্ত প্রতিবেদন জমা দেওয়ার আগে কিছু বলতে চাচ্ছি না। এ বিষয়ে জেলা প্রশাসক মহোদয় ব্রিফ করবেন।’ তবে গণমাধ্যমকর্মীদের সঙ্গে কথার ফাঁকে তিনি নৌকায় অতিরিক্ত যাত্রী বহনকেই দায়ী করেন।
 

/বকুল/

সম্পর্কিত বিষয়:

আরো পড়ুন  



সর্বশেষ

পাঠকপ্রিয়