সাভারে ৬ খুনে জড়িত থাকার কথা স্বীকার করেছে গ্রেপ্তার সম্রাট: পুলিশ
সাভার (ঢাকা) প্রতিনিধি || রাইজিংবিডি.কম
মশিউর রহমান খান সম্রাট
ঢাকার সাভারে পরিত্যক্ত পৌরসভা কমিউনিটি সেন্টারে জোড়া মরদেহ উদ্ধারের ঘটনায় মশিউর রহমান খান সম্রাট (৪০) নামে এক ব্যক্তিকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে তিনি সাভারে গত কয়েক মাসে ধারাবাহিকভাবে সংঘটিত ছয়টি হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে নিজের সম্পৃক্ততার কথা স্বীকার করেছেন বলে পুলিশ জানিয়েছে।
পুলিশের দাবি, রবিবার (১৮ জানুয়ারি) কমিউনিটি সেন্টার থেকে দুটি মরদেহ উদ্ধারের ঘটনায় তদন্তে পাওয়া সিসিটিভি ক্যামেরার ফুটেজে, এক ব্যক্তির চলাফেরা, সময় ও অবস্থান মিলিয়ে সম্রাটকে গ্রেপ্তার করা হয়। প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে তিনি মোট ছয়টি হত্যায় জড়িত থাকার বিষয়টি স্বীকার করেন।
আরো পড়ুন: সাভারে পরিত্যক্ত কমিউনিটি সেন্টারে ফের ২ লাশ
সোমবার (১৯ জানুয়ারি) বেলা ১১টার দিকে সাভার মডেল থানায় আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে এসব কথা জানান ঢাকা জেলা পুলিশের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (ক্রাইম, অপস্ ও ট্রাফিক উত্তর) আরাফাতুল ইসলাম।
তিনি জানান, গত পাঁচ মাসে সাভার এলাকায় ধারাবাহিকভাবে ছয়টি মৃতদেহ উদ্ধার করেছে পুলিশ। এর মধ্যে একটি মৃতদেহ উদ্ধার করা হয় সাভার মডেল মসজিদের সামনে থেকে। এসব ঘটনার সঙ্গে জড়িত থাকার অভিযোগে একজনকে ইতোমধ্যে আইনের আওতায় আনা হয়েছে। গ্রেপ্তার ব্যক্তি প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে ছয়টি হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে নিজের সম্পৃক্ততার কথা স্বীকার করেছেন।
গ্রেপ্তার মশিউর রহমান খান সম্রাট সাভারের ব্যাংক কলোনী এলাকার মৃত সালামের ছেলে।
একই ভবনে পাঁচ মরদেহ
২০২৫ সালের ২৯ আগস্ট পরিত্যক্ত সাভার পৌর কমিউনিটি সেন্টারের দ্বিতীয় তলার একটি কক্ষের ভেতরে সাদা রংয়ের পাঞ্জাবি ও কালো রঙের ট্রাউজার পরিহিত এক অজ্ঞাত (৩০) ব্যক্তির মরদেহ উদ্ধার করে পুলিশ। মরদেহটি দুই হাত গামছা দিয়ে বাঁধা ছিল। নিহতের মুখ মণ্ডল, নাক, কান, গলাসহ শরীরের বিভিন্ন অংশে পঁচন ধরায় আঘাত বা ক্ষতের দাগ নির্ণয় করতে পারেনি তারা। ওই ঘটনায় সেদিনই সাভার মডেল থানায় একটি মামলা (নম্বর- ৬) করা হয়।
এরপর ১১ অক্টোবর ওই একই ভবনের দ্বিতীয় তলার একটি কক্ষের বাথরুমের পাশে অজ্ঞাত এক নারীর (৩০) মরদেহ উদ্ধার হয়। তার মাথা ও গলায় কাটা জখমের চিহ্ন ছিল। প্রাথমিকভাবে পুলিশের ধারণা, তাকে হত্যা করে মরদেহ ফেলে যাওয়া হয়। ওই ঘটনায় ১৩ অক্টোবর সাভার মডেল থানায় একটি মামলা (নম্বর- ৪৪) করা হয়।
এর দুই মাস পর, গত ১৯ ডিসেম্বর একই ভবনের দ্বিতীয় তলার একটি কক্ষের বাথরুমের ভেতর থেকে অজ্ঞাত এক ব্যক্তির (৩৫) মরদেহ উদ্ধার করে পুলিশ। ওই মরদেহ আগুনে পোড়া এবং গলিত অবস্থায় ছিল। ওই ঘটনায় সেদিনই সাভার মডেল থানায় একটি মামলা (নম্বর- ৫৫) করা হয়।
সবশেষ গত ১৮ জানুয়ারি কমিউনিটি সেন্টারের দ্বিতীয় তলার একটি কক্ষের বাথরুমের ভেতরে এক ব্যক্তি (২৫) ও এক মেয়ে শিশুর (১৩) আগুনে পোড়া মরদেহ উদ্ধার করে পুলিশ। তাৎক্ষণিকভাবে লাশের পরিচয় জানাতে পারেনি দায়িত্বরত পুলিশের কর্মকর্তারা।
এর আগে, গত বছরের ৪ জুলাই সাভার মডেল মসজিদ সংলগ্ন একটি চায়ের দোকানের পাশ থেকে অজ্ঞাত নারীর (৭৫) মরদেহ উদ্ধার করে পুলিশ। ওই ঘটনায় অজ্ঞাত আসামির বিরুদ্ধে সাভার মডেল থানায় একটি মামলা (নম্বর- ৪১) করা হয়।
সিসিটিভি ফুটেজে ধরা হত্যাকারী
পুলিশ সূত্র জানায়, প্রতিটি ঘটনার পরপরই তদন্ত শুরু করা হয়। সাভার মডেল থানার পাশাপাশি ডিটেকটিভ (গোয়েন্দা) ব্রাঞ্চ যৌথভাবে তদন্তে যুক্ত হয়। একটি বিশেষ টিম নিয়মিতভাবে পৌর কমিউনিটি সেন্টার এলাকায় নজরদারি জোরদার করে।
পৌরসভার সহায়তায় এলাকাটি পরিষ্কার করা হয়, পর্যাপ্ত আলোর ব্যবস্থা করা হয় এবং একাধিক সিসিটিভি ক্যামেরা স্থাপন করা হয়। জোড়া মরদেহ উদ্ধারের আগের দিনও ওই এলাকায় সন্দেহভাজনদের জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়। তবে তখন কোনো সন্দেহজনক কিছু নজরে আসেনি। এরমধ্যেই পরের দিন মরদেহ উদ্ধার করা হয়।
ঢাকা জেলা পুলিশের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (ক্রাইম, অপস্ ও ট্রাফিক উত্তর) আরাফাতুল ইসলাম জানান, জোড়া পোড়া মরদেহ উদ্ধারের ঘটনায় তদন্ত শুরু করে পুলিশ। সিসিফুটেজ পর্যালোচনা করে এক ব্যক্তিকে শনাক্ত করা হয়। সিসিটিভি ক্যামেরার ফুটেজে সন্দেহজনকভাবে ওই ব্যক্তিকে ঘোরাফেরা করতে দেখা যায়। তার চলাফেরা, সময় ও অবস্থান মিলিয়ে প্রাথমিকভাবে তাকে নজরদারির আওতায় আনা হয়। একপর্যায়ে অভিযান চালিয়ে মশিউর রহমান খান সম্রাট নামে ওই ব্যক্তিকে আটক করা হয়।
প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে, আটক ব্যক্তি একই জায়গায় পাওয়া দুই মরদেহ ও আগের পৃথক ঘটনায় চারটিসহ মোট ছয়টি হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় জড়িত থাকার কথা স্বীকার করেন।
পুলিশ কর্মকর্তা আরাফাতুল ইসলাম বলেন, “অভিযুক্তকে আদালতে পাঠানো হয়েছে। তার ১০ দিনের রিমান্ড চাওয়া হয়েছে। রিমান্ড মঞ্জুর হলে এসব হত্যাকাণ্ডের পেছনের উদ্দেশ্য, অন্য কেউ জড়িত আছে কি না এবং অন্য কোথাও সে একই ধরনের অপরাধ করেছে কি না—এসব বিষয়ে বিস্তারিত জানা যাবে।”
তিনি বলেন, “অভিযুক্ত যে ঠিকানা দিয়েছে ব্যাংক কলোনি; সেখানে পুলিশ অভিযান চালালেও এখনো তার সঠিক ঠিকানা শনাক্ত করা যায়নি। এ ছাড়া, হত্যাকাণ্ডে ব্যবহৃত একটি মাফলার ও আগুন লাগানোর কাজে ব্যবহৃত দেশলাই উদ্ধার করা হয়েছে, যা আলামত হিসেবে জব্দ করা হয়েছে।”
অতিরিক্ত পুলিশ সুপার বলেন, “অভিযুক্তকে অল্প সময়ের মধ্যে গ্রেপ্তার করা সম্ভব হয়েছে। আদালত রিমান্ড মঞ্জুর করলে জিজ্ঞাসাবাদের মাধ্যমে ঘটনার আরো গুরুত্বপূর্ণ তথ্য উদঘাটন হবে এমনটি আশা করা হচ্ছে।”
ঢাকা/সাব্বির/মাসুদ