ঢাকা     রোববার   ০১ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ ||  মাঘ ১৯ ১৪৩২

Risingbd Online Bangla News Portal

পাহাড়ে ভোটের আমেজ, প্রচারে এগিয়ে বিএনপি-এনসিপি

চাইমং মারমা, বান্দরবান || রাইজিংবিডি.কম

প্রকাশিত: ১৫:০৮, ১ ফেব্রুয়ারি ২০২৬   আপডেট: ১৫:২৯, ১ ফেব্রুয়ারি ২০২৬
পাহাড়ে ভোটের আমেজ, প্রচারে এগিয়ে বিএনপি-এনসিপি

ভোটারদের কাছে গিয়ে নিজের নির্বাচনি প্রতিশ্রুতি জানাচ্ছেন এনসিপির আবু সাঈদ মো. সুজাউদ্দিন (পাঞ্জাবি ও কোটি পরিহিত)।

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে সারা দেশের মতো পার্বত্য জেলা বান্দরবানেও ছড়িয়ে পড়েছে নির্বাচনি আমেজ। পাহাড়, বন ও নদীবেষ্টিত পর্যটনের এই জেলায় এবারের নির্বাচন ঘিরে ভোটারদের মধ্যে দেখা যাচ্ছে বাড়তি আগ্রহ। মারমা, চাকমা, ম্রো, ত্রিপুরা, তঞ্চঙ্গ্যা, বম, খুমি, লুসাই, খেয়াং, পাংখোয়া, চাক ও বাঙালি জাতিগোষ্ঠীর মানুষের প্রত্যাশা, নির্বাচিত হয়ে যিনি সংসদে যাবেন, তার লক্ষ্য হওয়া উচিত হবে পিছিয়ে পড়া জাতিগোষ্ঠীর উন্নয়ন কাজ করা। পাশাপাশি শিক্ষা, স্বাস্থ্য, সমঅধিকার, যোগাযোগ ও পর্যটন শিল্পের উন্নয়ন ঘটানো। 

সাতটি উপজেলা, দুটি পৌরসভা ও ৩৪টি ইউনিয়ন নিয়ে গঠিত বান্দরবান সংসদীয় আসন। এবারের নির্বাচনে এই আসনে চারজন প্রার্থী প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন। তারা হলেন- বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল বিএনপির সাচিং প্রু জেরী, জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) আবু সাঈদ মো. সুজাউদ্দিন, জাতীয় পার্টির কেন্দ্রীয় সাংগঠনিক সম্পাদক আবু জাফর মোহাম্মদ ওয়ালীউল্লাহ ও ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের মাওলানা মো. আবুল কালাম আজাদ। প্রার্থীদের মধ্যে বিএনপির সাচিং প্রু জেরী ছাড়া সবাই প্রথমবারের মতো নির্বাচন করছেন। 

আরো পড়ুন:

স্থানীয় ভোটার বলেছেন- নির্বাচনি প্রচারে বিএনপির সাচিং প্রু জেরী ও এনসিপির আবু সাঈদ মো. সুজাউদ্দিন তুলনামূলকভাবে এগিয়ে রয়েছেন। জাতীয় পার্টি ও ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের প্রার্থীদের প্রচার সাধারণ ভোটারদের চোখে তেমন দৃশ্যমান নয়। 

বান্দরবানের তরুণ ভোটার মং এ প্রু মারমা বলেন, “বান্দরবান জেলা দেশের অন্যান্য জেলার মতো নয়। এখানে বাঙালিসহ বিভিন্ন ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠী ও সম্প্রদায়ের মানুষ দীর্ঘদিন ধরে সম্প্রীতির সঙ্গে বসবাস করছেন। এ কারণে, যিনি নির্বাচিত হয়ে আসুক না কেন, তাকে জেলার বহুজাতিক বাস্তবতা বিবেচনায় নিয়েই উন্নয়ন পরিকল্পনা সাজাতে হবে।”

স্থানীয় বাসিন্দা সুই মং চিং মারমা বলেন, “বান্দরবানের প্রধান সমস্যা হলো মানসম্মত শিক্ষা ও স্বাস্থ্যসেবার অভাব। দুর্গম পাহাড়ি এলাকায় এখনো প্রয়োজন অনুযায়ী শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ও চিকিৎসা সুবিধা গড়ে ওঠেনি। যোগাযোগ ব্যবস্থার দুর্বলতাও উন্নয়নের বড় বাঁধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। এই সমস্যাগুলো সমাধানে যোগ্য প্রার্থীকে নির্বাচিত করতে চাই।”

বিএনপির সাচিং প্রু জেরী ও  এনসিপির আবু সাঈদ মো. সুজাউদ্দিন (ডানে)


মামুনুর রশীদ নামে এক ভোটার বলেন, “পর্যটন শিল্পে বান্দরবানের রয়েছে অপার সম্ভাবনা। এই সম্ভাবনাকে কাজে লাগাতে হলে স্থানীয় জনগণের অংশগ্রহণ ও সমন্বয়ের মাধ্যমে পরিকল্পিত পর্যটন শিল্প গড়ে তুলতে হবে। ফলে একদিকে যেমন কর্মসংস্থান সৃষ্টি হবে, অন্যদিকে জেলার টেকসই উন্নয়ন নিশ্চিত করা সম্ভব হবে। এসব বিষয় যে প্রার্থী বিবেচনায় আনবেন তাকেই আমরা সংসদ সদস্য হিসেবে দেখতে চাই।” 

বিএনপি প্রার্থী সাচিং প্রু জেরী ও তার নেতাকর্মীরা রোয়াংছড়ি, রুমা, থানচি, আলীকদম ও লামাসহ জেলার প্রায় সব উপজেলায় নির্বাচনি প্রচার চালাচ্ছেন। বিভিন্ন এলাকায় আয়োজিত জনসভা ও পথসভায় তিনি ধানের শীষ প্রতীকে ভোট চেয়ে ভোটারদের সমর্থন কামনা করছেন।

তিনি জানান, সাধারণ মানুষের কাছাকাছি পৌঁছানোর লক্ষ্যেই তিনি মাঠপর্যায়ে গণসংযোগ চালিয়ে যাচ্ছেন এবং বিভিন্ন এলাকার মানুষের সঙ্গে সরাসরি কথা বলে তাদের আশা-আকাঙ্ক্ষা ও প্রত্যাশার কথা শুনছেন।

বিএনপির এই প্রার্থী বলেন, “বিএনপি সবসময় পাহাড়ি অঞ্চলের মানুষের পাশে ছিল এবং আগামীতেও থাকবে। আসন্ন নির্বাচনে বিএনপি বিজয়ী হয়ে সরকার গঠন করলে বান্দরবানের মতো পিছিয়ে পড়া পাহাড়ি অঞ্চলের শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও আর্থ-সামাজিক খাতকে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হবে। পাশাপাশি এই অঞ্চলের ভৌগোলিক ও পরিবেশগত বৈশিষ্ট্য বিবেচনায় নিয়ে পরিকল্পিত ও পরিবেশবান্ধব উন্নয়নের মাধ্যমে পাহাড়ের মানুষের জীবনমান উন্নয়নে দলীয়ভাবে সুসমন্বিত সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হবে।”

এনসিপির প্রার্থীও প্রচারে পিছিয়ে নেই। তিনি বান্দরবান সদর, লামা, নাইক্ষ্যংছড়ি, আলীকদম ও থানচির বিভিন্ন পাড়ায় ভোটারদের দুয়ারে দুয়ারে গিয়ে সরাসরি কথা বলছেন। তিনি শাপলার কলি প্রতীকে ভোট দেওয়ার পাশাপাশি গণভোটে ‘হ্যাঁ’ ভোটের পক্ষে ভোট দিতে ভোটারদের আহ্বান জানাচ্ছেন।

আবু সাঈদ মো. সুজাউদ্দিন বলেন, “ভোটারদের কাছ থেকে ইতিবাচক সাড়া পাচ্ছি। মানুষ এখন বিকল্প নেতৃত্ব ও বাস্তবসম্মত পরিবর্তনের দিকে নজর দিচ্ছে। এই সাড়া যদি শেষ পর্যন্ত ভোটে প্রতিফলিত হয়, তাহলে এনসিপির জন্য এটি হবে একটি বড় অগ্রগতি এবং জাতীয় নির্বাচনে বিজয়ের সম্ভাবনাও তৈরি হবে।” 

তিনি আরো বলেন, “তরুণদের নিয়ে বান্দরবানে অনেককিছু করার আছে, যেটা বিগত সরকার করতে পারেনি। তরুণরা আগামী বাংলাদেশের চালিকা শক্তি। তারা দেশের নেতৃত্ব গ্রহণ করবেন। তাই আর্থসামাজিক উন্নয়নে প্রথম অগ্রাধিকার তরুণরা পাবেন। ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোগে কর্মসংস্থান সৃষ্টি, খেলাধুলার আয়োজন ও নানা সৃজনশীল কাজে তরুণদের নিয়োজিত করা সম্ভব হলে পরিবার এবং দেশের অগ্রগতি এমনিতে এসে যাবে।”

ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের ‘হাতপাখা’ প্রতীকের প্রার্থী মাওলানা মো. আবুল কালাম আজাদ বলেন, “তরুণ ভোটাররা এমনিতেই পরিবর্তন চায়। আমরা তাদের বলছি, কর্মসংস্থান সৃষ্টি ও চাকরির ক্ষেত্রে সমঅধিকার নিশ্চিত করা হবে। রুমা, রোয়াংছড়ি ও থানচি এলাকায় শিক্ষা ও অর্থনীতিতে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হবে। বিশ্বমানের পর্যটন ব্যবস্থা গড়ে তোলা এবং দুর্নীতিমুক্ত প্রশাসন প্রতিষ্ঠাই আমাদের লক্ষ্য। দুর্গম এলাকায় প্রচার চালাতে কিছুটা বেগ পেতে হচ্ছে। আশা করছি, বাকি সময়ের মধ্যে সব এলাকার ভোটারদের কাছে পৌঁছানো যাবে।”

জাতীয় পার্টির ‘লাঙ্গল’ প্রতীকের প্রার্থী আবু জাফর মোহাম্মদ ওয়ালীউল্লাহ বলেন, “আমি সংসদ সদস্য নির্বাচিত হলে প্রত্যেক তরুণই হবেন আমার প্রতিনিধি। বান্দরবানের সবচেয়ে বড় সমস্যা যোগাযোগ ব্যবস্থা। বান্দরবানকে একটি পূর্ণাঙ্গ বিশ্বমানের পর্যটন নগরী হিসেবে গড়ে তুলতে যোগাযোগ ব্যবস্থার আমূল পরিবর্তন আনা হবে।”

বান্দরবান পার্বত্য জেলায় একটি আসনে ভোটার রয়েছেন ৩ লাখ ১৫ হাজার ৪২২ জন। এর মধ্যে পুরুষ ১ লাখ ৬১ হাজার ৭৭৫ জন ও নারী ভোটার ১ লাখ ৫৩ হাজার ৬৪৭ জন। এবারের নির্বাচনে নতুন ভোটার যুক্ত হয়েছেন ৭ হাজার ৪৬৯ জন। জেলার সাতটি উপজেলা, দুটি পৌরসভা ও ৩৪টি ইউনিয়ন নিয়ে গঠিত বান্দরবান-৩০০ নং সংসদীয় আসনে মোট ভোটকেন্দ্র রয়েছে ১৮৬টি। এর মধ্যে ৩৪টি ভোটকেন্দ্র ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে চিহ্নিত করেছে নির্বাচন সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ।

ঢাকা/মাসুদ

সর্বশেষ

পাঠকপ্রিয়