ঢাকা     শনিবার   ১৪ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ ||  ফাল্গুন ২ ১৪৩২

Risingbd Online Bangla News Portal

কাঁচির শব্দে কবিতার ছন্দ: প্রদীপ প্রোজ্জ্বলের অনন্য জীবনকাব্য

রেজাউল করিম, চট্টগ্রাম || রাইজিংবিডি.কম

প্রকাশিত: ২২:০০, ১৪ ফেব্রুয়ারি ২০২৬   আপডেট: ২২:৪০, ১৪ ফেব্রুয়ারি ২০২৬
কাঁচির শব্দে কবিতার ছন্দ: প্রদীপ প্রোজ্জ্বলের অনন্য জীবনকাব্য

জীবনের রুক্ষ বাস্তবতায় অনেক সময় মানুষের স্বপ্নগুলো ফিকে হয়ে যায়। কিন্তু, কিছু মানুষ প্রতিকূলতার বুক চিরে গড়ে তোলেন নিজের স্বর্গ। ১৯৮৫ সালে কক্সবাজারের চকরিয়ায় জন্ম নেওয়া প্রদীপ প্রোজ্জ্বল তেমনই এক লড়াকু নাম। অভাব আর পারিবারিক জটিলতার যাঁতাকলে পিষ্ট হয়ে তার শৈশব কেটেছে মামা আর দিদিমার আশ্রয়ে। মাত্র তিন বছর বয়সে আপনজনদের থেকে বিচ্ছিন্ন হওয়া প্রদীপ ছোটবেলা থেকেই খুঁজছিলেন এমন কিছু, যা তাকে কখনো ছেড়ে যাবে না। সেই তাগিদ থেকেই মামার কাছে শিখেন ক্ষৌরকর্ম। 

শৈশব হারানো এক কবির উত্থান
স্কুলছুট হওয়ার গ্লানি প্রদীপকে দমাতে পারেনি। প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা নবম শ্রেণিতে থমকে গেলেও তার শেখার আগ্রহ কমেনি। বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর যেমন প্রথাগত স্কুল থেকে পালিয়ে বিশ্ব জয় করেছিলেন, প্রদীপও অভাবের তাড়নায় স্কুল হারিয়ে হয়ে উঠেছেন এক সম্ভাবনাময় সাহিত্যিক। ২০১৪ সালে প্রকাশিত হয় তার প্রথম কাব্যগ্রন্থ। আজ পর্যন্ত তার প্রকাশিত বইয়ের সংখ্যা ৯টি। এর মধ্যে মধ্যে আছে কবিতা, উপন্যাস, গল্প এবং শিশু সাহিত্য।

অদ্বৈত হেয়ার ড্রেসার: যেখানে আয়নার সামনে বই হাসে
২০১০ সালে চট্টগ্রামের চকবাজার আতুরার দোকান এলাকায় প্রদীপ গড়ে তোলেন তার স্বপ্নের সেলুন ‘অদ্বৈত হেয়ার ড্রেসার’। জীবিকার তাগিদে শুরু করা এই সেলুনটিই আজ প্রদীপের মূল পরিচয়। তবে, এটি আর দশটা সাধারণ সেলুনের মতো নয়। এখানে কাঁচির শব্দের সঙ্গে মিশে থাকে কবিতার ছন্দ। সেলুনজুড়ে ছড়িয়ে থাকে বইয়ের ঘ্রাণ।

গ্রাহকদের অপেক্ষার প্রহরকে আনন্দময় করতে প্রদীপ নিজের সংগ্রহ থেকে বই পড়তে দিতেন। সেই ক্ষুদ্র প্রয়াস আজ এক বিশাল মহীরুহ। তার সেলুনে এখন শোভা পাচ্ছে ইতিহাস, রাজনীতি, কবিতাসহ বিশ্বসাহিত্যের এক হাজারেরও বেশি বই। সেলুনটি এখন এলাকার তরুণ ও শিক্ষার্থীদের জন্য এক অঘোষিত লাইব্রেরি।

শামসুর রাহমান বা জীবনানন্দের প্রতি গভীর অনুরাগ থাকলেও প্রদীপ প্রোজ্জ্বল খুঁজছেন নিজস্ব এক ঘরানা। তিনি চান না কারো ছায়ায় বেড়ে উঠতে।  ক্ষুর হাতে কাজ করতে করতেই মোবাইলে টুকে রাখেন তার মৌলিক সব পঙ্‌ক্তি।

স্বপ্নের বিস্তার ও স্বীকৃতি
প্রদীপ কেবল একজন লেখক বা পাঠক নন, তিনি সাহিত্যের একজন নিবেদিত পৃষ্ঠপোষক। ২০২৩ সালে তিনি প্রবর্তন করেছেন ‘প্রোজ্জ্বল পাঠাগার সাহিত্য পুরস্কার‘, যেখানে সম্মাননা জানানো হয়েছে চট্টগ্রামের প্রথিতযশা লেখকদের। তার সম্পাদনায় প্রকাশিত হয়েছে নান্দনিক ম্যাগাজিন।

বর্তমানে তিনি তার এই ‘প্রোজ্জ্বল পাঠাগার’কে আরো ছড়িয়ে দিতে কাজ করছেন। নাসিরাবাদে তার দ্বিতীয় সেলুনেও গড়ে উঠছে পাঠাগার। এমনকি নিজের গ্রামেও পাঠিয়েছেন অনেক বই। 

প্রদীপের ভাষায়, তার সেলুনটি কেবল ব্যবসার জায়গা নয়, বরং প্রগতিশীল ও মার্জিত মানুষের এক মিলনমেলা।

জীবনের নিষ্ঠুরতা যাকে আপনজন থেকে দূরে ঠেলে দিয়েছিল, বই আর সাহিত্যকে আপন করে তিনি আজ শত শত মানুষের অনুপ্রেরণা। প্রদীপ প্রোজ্জ্বল প্রমাণ করেছেন, ইচ্ছা থাকলে একটি সাধারণ সেলুনও হয়ে উঠতে পারে জ্ঞানের বাতিঘর। তিনি আমাদের শেখান- পেশা যা-ই হোক, হৃদয়ে যদি শিল্পের বাস থাকে, তবে প্রতিকূলতার বালুচরেও স্বপ্নের ফুল ফোটানো সম্ভব।

ঢাকা/রফিক

সর্বশেষ

পাঠকপ্রিয়