মন্ত্রীর ‘জিরো টলারেন্স’ ঘোষণার পরও থামেনি গোমতীতে মাটি কাটা
রুবেল মজুমদার, কুমিল্লা || রাইজিংবিডি.কম
গোমতীর তীর থেকে কেটে নেওয়া মাটি
কৃষি, খাদ্য, মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রী হাজী আমিনুর রশীদ ইয়াছিন সম্প্রতি এক মতবিনিময় সভায় দৃঢ় কণ্ঠে ঘোষণা দিয়েছিলেন, গোমতীর এক ইঞ্চি মাটিও কাউকে কাটতে দেওয়া হবে না। নদীর প্রতিরক্ষা বাঁধ ও চরাঞ্চলের উর্বর মাটি দীর্ঘদিন ধরে প্রভাবশালী চক্রের দখলে চলে যাওয়ায় পরিবেশ ও কৃষি মারাত্মক হুমকির মুখে পড়েছে বলেও তিনি সতর্ক করেছিলেন। সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের রাত-দিন তদারকি জোরদার এবং রাজনৈতিক প্রভাব বা তদবির সহ্য না করতে কঠোর নির্দেশ দেন তিনি।
স্থানীয় বাসিন্দাদের অভিযোগ, মন্ত্রীর হুঁশিয়ারি কার্যত মাঠপর্যায়ে কোনো প্রভাব ফেলেনি। কুমিল্লার প্রাণপ্রবাহ গোমতী নদী ঘিরে আবারো শুরু হয়েছে অবৈধ মাটি কাটার মহোৎসব। প্রশাসন থেকে বলা হচ্ছে, প্রতিনিয়ত অভিযান চালিয়ে জরিমানা করা হচ্ছে। ইতোমধ্যে কয়েকটি ট্রাক ও ভেকু জব্দ করা হয়েছে।
আরো পড়ুন: থানা-পুলিশ ম্যানেজ করে গোমতীর মাটি কাটা হচ্ছে: হাসনাত
সরেজমিনে দেখা গেছে, গোমতী নদীর দুই পাড়ে সক্রিয় হয়ে উঠেছে একাধিক মাটিখেকো চক্র। জেলার আদর্শ সদর উপজেলার পালপাড়া থেকে গোলাবাড়ি পর্যন্ত বিস্তীর্ণ এলাকায় সারিবদ্ধ ট্রাক্টর ও ভেকু মেশিন দিয়ে দিনরাত মাটি কাটা হচ্ছে। সূর্যাস্তের পর নদীর চর যেন আলোকিত কর্মযজ্ঞে রূপ নেয়। শত শত ড্রাম ট্রাক ও ভেকু হেডলাইট জ্বালিয়ে মাটি কেটে শহরসংলগ্ন বিভিন্ন ইটভাটায় বহন করে।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক স্থানীয়রা জানান, গোমতীর উত্তর তীরে প্রায় পাঁচ কিলোমিটার এবং দক্ষিণ তীরে প্রায় পঁচিশ কিলোমিটার এলাকা জুড়ে মাটি তোলা হচ্ছে। কটকবাজার ও গোলাবাড়ি থেকে পালপাড়া পীরবাড়ি পর্যন্ত উভয় তীরেই প্রকাশ্যে চলছে এই কার্যক্রম। দক্ষিণ তীরের দুর্গাপুর, ভাটপাড়া, কাপ্তানবাজার, চানপুর মাস্টারবাড়ি, শালধর ও সামারচর এলাকায় অন্তত ১০টি ভেকু ও পঞ্চাশটি ট্রাক্টর দিয়ে মাটি পরিবহন করা হচ্ছে। কোথাও কোথাও বাঁধের ভেতর দিয়ে বিকল্প সড়ক কেটে ট্রাক চলাচলের ব্যবস্থাও করা হয়েছে। ফলে চরাঞ্চলের প্রাকৃতিক ভারসাম্য নষ্ট হচ্ছে এবং নদীর প্রতিরক্ষা বাঁধ হুমকির মুখে পড়ছে বলেও জানান তারা।
স্থানীয় কৃষকদের অভিযোগ, ধুলাবালির কারণে শাকসবজি ও অন্যান্য ফসল নষ্ট হওয়ার উপক্রম হয়েছে। অনেকে আশঙ্কা করছেন, এভাবে অবৈধ মাটি কাটার প্রবণতা অব্যাহত থাকলে আগামী বছরগুলোতে ২০২৪ সালের মতো ভয়াবহ বন্যার পুনরাবৃত্তি ঘটতে পারে।
আরো পড়ুন: গোমতী নদীর এক ইঞ্চি মাটিও কাটতে দেওয়া হবে না: কৃষিমন্ত্রী
এদিকে, মাটি কাটার জন্য মো. জহিরুল ইসলাম নামে এক ব্যক্তির নাম সামনে এসেছে। আদর্শ সদর উপজেলার উত্তর দুর্গাপুর ইউনিয়নের চরাঞ্চলে তার নেতৃত্বে মাটি উত্তোলন চলছে বলে অভিযোগ উঠেছে। এলাকাবাসীর দাবি, রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর কিছুদিন আত্মগোপনে থাকলেও বর্তমানে প্রভাবশালী মহলের সঙ্গে সমঝোতার মাধ্যমে জহিরুল ইসলাম পুনরায় সক্রিয় হয়েছেন। সন্ধ্যার পর থেকে গভীর রাত পর্যন্ত ভেকু মেশিন দিয়ে হাজার হাজার ঘনফুট মাটি কেটে ট্রাকে করে সরিয়ে নেওয়া হচ্ছে বিভিন্ন ইটভাটায়। প্রতিবাদ করলে হামলা, মামলা ও হয়রানির শিকার হতে হয়।
কুমিল্লা শহরের গোমতী চর এলাকার হান্নান মিয়া বলেন, “রাত হলেই মাটি কাটা শুরু হয়। ২৪-এর বন্যায় আমাদের জীবনে অনেক ক্ষতি হয়েছে, তারপরও মাটি কাটা কোনভাবে থামছে না। এই বিষয়গুলো প্রশাসন জানে, অথচ তারা কোনো ব্যবস্থা নিচ্ছে না।”
অভিযুক্ত জহিরুল ইসলাম জানান, মাটি কাটার বিষয়ে তিনি জানেন না। তাকে মিথ্যা ও ভুয়া তথ্য দিয়ে হ্যারেজমেন্ট করা হচ্ছে।
আদর্শ সদর উপজেলা সহকারী ভূমি কর্মকর্তা মাশিয়াত আকতার বলেন, “প্রশাসন জিরো টলারেন্স নীতিতে রয়েছে। নিয়মিত অভিযান চলছে। ইতোমধ্যে কয়েকটি ট্রাক ও ভেকু জব্দ করা হয়েছে।”
উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) ফাতেমাতুজ জোহরা জানান, “মোবাইল টিমের মাধ্যমে অভিযান ও জরিমানা কার্যক্রম চলমান রয়েছে। অভিযোগ খতিয়ে দেখে প্রয়োজনীয় আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”
কুমিল্লা জেলা প্রশাসক মু. রেজা হাসান বলেন, “আমরা গোমতীর চরে মাটি কাটা নিয়ে জিরো টলারেন্স নীতি অনুসরণ করছি। প্রতিনিয়ত অভিযান পরিচালনা করা হচ্ছে। জরিমানাও করা হচ্ছে। কেউ যদি মাটি কাটে, তাহলে আমরা তাকে আইনের আওতায় আনছি। গোমতীতে আর কেউ মাটি কাটতে পারবে না।”
ঢাকা/মাসুদ