বৈশাখে পান্তা-ইলিশের বদলে রুই-কাতলা
ছবি: সংগৃহীত
পয়লা বৈশাখ বাঙালির প্রাণের উৎসব। এই দিনে পান্তা-ইলিশ শুধু খাবার নয়, এটি একটি সাংস্কৃতিক প্রতীক। তবে এবার পহেলা বৈশাখে সেই পরিচিত চিত্রে এসেছে পরিবর্তন। ইলিশের উচ্চমূল্যের কারণে রাজধানীর ক্লাব, হোটেল ও রেস্তোরাঁগুলোতে পান্তার সঙ্গে ইলিশের বদলে পরিবেশন করা হচ্ছে রুই, কাতলা ও অন্যান্য মাছ। ঐতিহ্য থাকলেও বাস্তবতার চাপে বদলে যাচ্ছে বৈশাখের খাবারের রূপ।
মঙ্গলবার (১৪ এপ্রিল) ঢাকার পল্টন, যাত্রাবাড়ী, পুরান ঢাকার বিভিন্ন , হোটেল ও রেস্তোরাঁ ঘুরে দেখা গেছে, পান্তা ভাত থাকলেও ইলিশ নেই, তার জায়গা দখল করেছে রুই, কাতলা ও অন্যান্য মাছ।
রাজধানীর জাতীয় প্রেসক্লাব ও ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটির বৈশাখী আয়োজনে অংশ নিতে আসা অতিথিদের জন্য পান্তা ভাত, ভর্তা, ডালসহ নানা পদ থাকলেও ইলিশের উপস্থিতি ছিল না। আয়োজকরা জানিয়েছেন, উচ্চমূল্যের কারণে এবার ইলিশ রাখা সম্ভব হয়নি।
ডিআরইউর এক কর্মকর্তা বলেন, “ইলিশের দাম অস্বাভাবিক বেশি। সবার জন্য পরিবেশন করা সম্ভব না। তাই রুই ও কাতলা দিয়েই মেন্যু সাজানো হয়েছে।”
প্রেসক্লাবে দেখা যায়, অনেকেই পান্তা-ভর্তা খাচ্ছেন আনন্দ নিয়ে, তবে ইলিশ না থাকায় একধরনের আক্ষেপও রয়েছে। প্রবীণ সাংবাদিক আবদুল হালিম বলেন, “পান্তা-ইলিশ শুধু খাবার না, এটা একটা সংস্কৃতি। কিন্তু বাস্তবতা এখন সেটাকে বদলে দিচ্ছে।”
রাজধানীর বিভিন্ন হোটেল ও খাবারের দোকান ঘুরে দেখা গেছে, অধিকাংশ জায়গায় পান্তা সেট মেন্যুতে ইলিশ নেই। কোথাও রুই ভাজা, কোথাও কাতলা কারি, আবার কোথাও ডিম বা শুঁটকি দিয়ে পরিবেশন করা হচ্ছে বৈশাখী খাবার।
পল্টনের বৈশাখী হোটেলের মালিক সোহেল হাসান বলেন, “ইলিশ রাখলে প্লেটপ্রতি দাম অনেক বেড়ে যাবে। তখন ক্রেতা কমে যাবে। তাই আমরা বিকল্প হিসেবে রুই-কাতলা রেখেছি।”
বংশালের আল রাজ্জাক হোটেলর ম্যানেজার সালাম হোসেন জানান, “গ্রাহকরা এখন বাজেট দেখেই খাচ্ছেন। তাই সাশ্রয়ী মাছ রাখতেই হচ্ছে।”
খেতে আসা অনেকেই বলছেন, ইলিশ ছাড়া বৈশাখ যেন অসম্পূর্ণ লাগে। তবে দামের কারণে তারা বাস্তবতাকে মেনে নিচ্ছেন।
আল রাজ্জাক হোটেলে খেতে এসেছেন রায়েরবাগের বাসিন্দা রফিকুল ইসলাম বলেন, “ইলিশ খেতে ইচ্ছে করে, কিন্তু এই দামে সম্ভব না। তাই রুই দিয়েই পান্তা খাচ্ছি। আনন্দটা আসল।”
সংস্কৃতি বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তা মাহবুবুর রহমান বলেন, “পান্তা-ইলিশ মূলত একটি প্রতীকী ঐতিহ্য। এটি সব সময় সবার নাগালের মধ্যে ছিল না। এখন বাজার অর্থনীতি ও সরবরাহ সংকটের কারণে সেই প্রতীক আরো পরিবর্তিত হচ্ছে।”
তিনি বলেন, “খাদ্যপণ্যের মূল্যবৃদ্ধি সরাসরি উৎসবের ওপর প্রভাব ফেলে। ইলিশের দাম নিয়ন্ত্রণে না থাকলে এই পরিবর্তন ভবিষ্যতেও স্থায়ী হতে পারে।”
সাংস্কৃতিক কর্মী জাকারিয়া বলেন, “ঐতিহ্য মানে স্থির কিছু নয়। সময়ের সঙ্গে তার রূপ বদলাবে এটাই স্বাভাবিক।”
রেস্তোরাঁ ব্যবসায়ী সমিতির নেতা কামরুল হাসান বলেন, “ক্রেতার ক্রয়ক্ষমতার সঙ্গে মিল রেখে মেন্যু করতে হয়। না হলে ব্যবসা টিকবে না।”
তিনি বলোন, “আমার বাড়িতেও এবার ইলিশ করিনি। বাজেটের কারণে অন্য মাছ দিয়েই বৈশাখ করেছি।
জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থী নাফিস রহমান বলেন, “আমাদের জন্য বৈশাখ মানে বন্ধুবান্ধবের সঙ্গে সময় কাটানো। ইলিশ থাকলে ভালো, না থাকলেও সমস্যা নেই।”
খুচরা মাছ বিক্রেতা জাহিদুল ইসলাম জানান, ইলিশের দাম এত বেশি যে সাধারণ মানুষ কিনতেই ভয় পাচ্ছে। রুই-কাতলার চাহিদাই এখন বেশি।
তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তা মো. আতাউর রহমান বলেন, “পান্তা-ইলিশ বাঙালির সংস্কৃতির প্রতীক হলেও সময়ের সঙ্গে তার রূপ বদলাচ্ছে। অর্থনৈতিক চাপ, বাজারের বাস্তবতা ও সরবরাহ সংকট। সব মিলিয়ে এই পরিবর্তন এখন দৃশ্যমান।”
ঢাকা/এএএম/ইভা
২৪ ঘণ্টায় হামে মৃত্যু ৯, আক্রান্ত ১১০৫