সাগরপাড়ে প্রশান্তির ইফতার
তারেকুর রহমান, কক্সবাজার || রাইজিংবিডি.কম
কক্সবাজার সমুদ্রসৈকতে শতরঞ্জি বিছিয়ে ইফতারের প্রস্তুতি নিচ্ছেন কয়েকজন বন্ধু।
আছরের নামাজ শেষ হতেই পরিবার-পরিজন, বন্ধু কিংবা সহকর্মীদের নিয়ে মানুষ ছুটে আসেন কক্সবাজার সমুদ্র সৈকতে। কেউ ছাতা-চেয়ারে কেউবা বালুচরে মাদুর পেতে বসছেন। খেজুর, ছোলা, পিয়াজু, বেগুনি, আলুর চপ, জিলাপি থেকে শুরু করে তরমুজ, আনারস, আঙুর, পেঁপে, কমলাসহ হরেক রকম ফলমূল আর শরবত সাজিয়ে রাখছেন নিজেদের সামনে। পশ্চিম আকাশে ঢলে পড়া সূর্যের রক্তিম আভা আর নোনা বাতাসে ভেসে আসা সমুদ্রের গর্জন তৈরি করে অন্য রকম আবহ। মাইকে মাগরিবের আজানের ধ্বনি ভেসে আসতেই খেজুর মুখে তুলে রোজা ভাঙেন তারা। গত কয়েক বছরে ধরে এভাবেই সৈকতে ইফতার আয়োজন জনপ্রিয় হয়ে উঠছে।
শনিবার (২৮ ফেব্রুয়ারি) ইফতারের আগ মুহূর্তে কথা হলে কক্সবাজার শহরের বাহারছড়া এলাকার রাকিবুল আলম বলেন, “সারাদিন কর্মব্যস্ততার মধ্যে রোজা রাখতে হয়। সৈকতে এসে বসলে ক্লান্তি দূর হয়ে যায়। সমুদ্রের ঢেউয়ের
শব্দ আর মৃদু বাতাসে ইফতার করলে মনে হয়, মনটা একেবারে হালকা হয়ে গেল। পরিবারকে সময় দেওয়ার এমন সুযোগ শহরের ভেতরে পাওয়া যায় না।”
শ্বশুরবাড়ির স্বজনদের নিয়ে সমুদ্রসৈকতে ইফতার করতে আসেন কক্সবাজার শহরের বৈদ্যঘোনা খাজা মঞ্জিল রোড এলাকার মোহাম্মদ ইমরুল আজীম।
তিনি বলেন, “পরিবার ও আত্মীয়স্বজনদের নিয়ে সমুদ্রের পাড়ে বসে ইফতার করা সত্যিই আনন্দদায়ক ও উৎসবমুখর একটি অভিজ্ঞতা। খোলা আকাশ, ঢেউয়ের শব্দ আর প্রিয়জনদের উপস্থিতি সব মিলিয়ে মুহূর্তটা বিশেষ হয়ে ওঠে। তবে, আনন্দের পাশাপাশি আমাদের দায়িত্ববোধও থাকা দরকার। সৈকত আমাদের সবার, তাই পলিথিন যেখানে-সেখানে ফেলে পরিবেশ নোংরা করা উচিত নয়। ইফতার শেষে ময়লা ডাস্টবিনে ফেললে সৈকতের সৌন্দর্য যেমন রক্ষা পাবে, তেমনি পরিচ্ছন্ন পরিবেশ বজায় থাকবে।”
টেকনাফের শামলাপুর এলাকার জসিম উদ্দিন বন্ধুদের নিয়ে ইনানী সৈকতে ইফতার করতে এসে বলেন, “আমরা ইফতারের সুস্বাদু আইটেমগুলো গরম গরম রান্না করে পাতিলসহ সৈকতে চলে এসেছি। শৈশবের বন্ধুদের সঙ্গে সাগরপারে বসে ইফতার করার আনন্দই আলাদা। নীরব পরিবেশে ঢেউয়ের শব্দে গল্প করতে করতে কখন সময় চলে যায় টেরই পাওয়া যায় না।”
সৈকতে ইফতারের প্রস্তুতি নিচ্ছেন এক দম্পতি
সদরের বাংলাবাজার এলাকার রাশেদুল করিম পরিবারসহ সৈকতপারে ইফতার করতে এসে বলেন, “বাচ্চারা সারাদিন অপেক্ষা করে কখন তারা সৈকতে যাবে। খোলা পরিবেশে সবাই মিলে বসে ইফতার করলে পারিবারিক বন্ধনটা আরো দৃঢ় হয়। রমজানের অন্তত কয়েকদিন এখানে ইফতার করার চেষ্টা করি।”
একই অভিজ্ঞতার কথা জানালেন কক্সবাজার শহরের বাসিন্দা গৃহিনী তমা রহমান। তিনি বলেন, “প্রতি রমজানে অন্তত একদিন পরিবার নিয়ে সৈকতে ইফতার করি। বাচ্চারা খুব পছন্দ করে। খোলা পরিবেশে ইফতার করলে ক্লান্তি কেটে যায়।”
স্থানীয়দের পাশাপাশি দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে আসা পর্যটকরাও সৈকতে ইফতার করতে পছন্দ করছেন।
চট্টগ্রামের ফটিকছড়ি থেকে আসা আনিসুল ইসলাম বলেন, “নীল সমুদ্রের পাশে বসে ইফতার করার অনুভূতি আলাদা। ঢেউয়ের শব্দে মনটা শান্ত হয়ে যায়। মনে হয়, প্রকৃতির আরো কাছাকাছি এসে স্রষ্টার প্রতি কৃতজ্ঞতা জানাতে পারছি।”
চাঁপাইনবাবগঞ্জ থেকে বেড়াতে আসা পর্যটক দম্পতি সাকিব হাসান ও বৃষ্টি হক বলেন, রমজানে পরিবেশ একটু শান্ত থাকে। তাই এবার ইচ্ছা করেই এই সময়ে এসেছি। সমুদ্রের পাড়ে ইফতার করা সত্যিই অন্যরকম অভিজ্ঞতা।
পরিবার নিয়ে সৈকতপাড়ে ইফতারের আগ মুহূর্তে সেলফি তুলছেন এক যুবক
সৈকতে ইফতার করতে আসা মানুষের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে তৎপর রয়েছে বিচকর্মী ও ট্যুরিস্ট পুলিশ। ইনানীর পাটোয়ারটেক পয়েন্টের বিচকর্মীদের সহকারী সুপারভাইজার মো. বেলাল হোসেন বলেন, “রমজানে বিকেল হলেই এখানে মানুষের ভিড় বেড়ে যায়। আমরা বিভিন্ন পর্যটন স্পট ও সৈকত এলাকায় নিয়মিত টহল দিচ্ছি, যাতে সবাই নিরাপদে ও নির্বিঘ্নে ইফতার করতে পারেন, সে বিষয়টি সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।”
ট্যুরিস্ট পুলিশ কক্সবাজার রিজিয়নের প্রধান অতিরিক্ত ডিআইজি আপেল মাহমুদ বলেন, “মানুষ একটু প্রশান্তির জন্য সৈকতপারে ইফতার করতে আসেন। দৃশ্যটা দেখে মন ভরে যায়। তারা যাতে হয়রানি না হন সেদিকে ট্যুরিস্ট পুলিশের নজর রয়েছে। রমজানে বিকেল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত সৈকতের বিভিন্ন পয়েন্টে অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন করা হয়েছে। পর্যটক ও স্থানীয়দের নিরাপত্তা নিশ্চিতে আমরা সার্বক্ষণিক সজাগ আছি।”
ঢাকা/মাসুদ