কৃষি নির্ভর গাইবান্ধায় কাজ নেই, দিনমজুররা ছুটছেন বিভিন্ন জেলায়
মাসুম লুমেন, গাইবান্ধা || রাইজিংবিডি.কম
গন্তব্যে যেতে গাইবান্ধা কেন্দ্রীয় টার্মিনাল থেকে বাসে উঠছেন দিনমজুররা।
গাইবান্ধা জেলায় তেমন কোনো কলকারখানা নেই। কৃষি নির্ভর এই জেলায় ধান রোপণের পর কর্মহীন হয়ে পড়া দিনমজুররা জীবন বাঁচানোর তাগিদে দেশের বিভিন্ন স্থানে ছুটে যান। তাদের ভাষ্য, বোরো ধান মৌসুমে ধানের চারা রোপণ শেষ হওয়ায় বর্তমানে হাতে আর কাজ নেই। হতদরিদ্র প্রায় প্রতিটি মানুষের এনজিও থেকে লোন নেওয়া আছে। ঋণের কিস্তি, রমজানে পরিবারের জন্য একটু ভালো-মন্দ খাবারের যোগান, ঈদের বাড়তি খরচও আছে। সবমিলিয়ে জীবন বাঁচানোর তাগিদে তাদের কাজের সন্ধানে যেতে হয় বিভিন্ন জেলায়।
গাইবান্ধা সদর উপজেলার মালিবাড়ি ইউনিয়নের কচুয়ার খামার গ্রামের যুবক জাহিদুল ইসলাম বলেন, “অর্থের অভাবে লেখাপড়া বন্ধ। একটি বিল্ডিংয়ের কাজে ঢাকায় যাচ্ছি। যে বাড়ির কাজ করি সেখানেই রাতে থাকি, রান্না করে খাই। দিন ৬০০ টাকা মজুরি পাই। হাত খরচ আর খেতে ২০০ টাকা শ্যাষ হয়। বাকি যেটা থাকে সেইটা বাড়িত পাঠায়ে দেই। ঈদের আগের দিন ফিরব।”
জাহিদুল ইসলামের পাশেই ব্যাগ হাতে গাইবান্ধা কেন্দ্রীয় বাস টার্মিনালে বাসের জন্য অপেক্ষা করছিলেন জিয়ারু, মোনারুল মিয়া, নালো মিয়া, মাসুদ মিয়াসহ অনেক দিনমজুর। তাদের সবার বাড়ি জেলার বিভিন্ন উপজেলায়। রাইজিংবিডি ডটকমের সঙ্গে তারা কথা বলেছেন।
সুন্দরগঞ্জ উপজেলার শ্রীপুর থেকে এসেছেন মাসুদ মিয়া। পেশায় রড মিস্ত্রি। তিনি বলেন, “দুই-তিন মাস পরপর বাসায় আসি। কাজ করি ময়মনসিংহের ভালুকায়। সেখানে ঠিকাদারের সঙ্গে কাজ করি। এলাকায় কাজ থাকলে তো হামাক (আমাকে) ঘর-বাড়ি ছাড়ি বিদেশ খাটা লাগতো না।”
সদর উপজেলার খোলাহাটি ইউনিয়নের রতবাজার গ্রামের নুর আলম। তিনি জানান, যেকনা গাড়াগাড়ির (জমিতে চারা রোপণ) কাজ ছিল, সইগ (সবই) শ্যাষ। এখন যাচ্ছি টাঙ্গাইল। সেটি গাড়াগাড়ির কাজ করমো (করব)। কয়েকদিন কাজ করলে ঈদের আগে বউ, ছোলের জন্য কাপড় কেনা যাবে।”
গাইবান্ধা কেন্দ্রীয় বাস টার্মিনালে সরেজমিনে দেখা যায়, দলবেধে শ্রমিকরা জড়ো হয়েছে। বিভিন্ন বাসে কম ভাড়ায় তারা গাদা গাদি করে যাচ্ছেন। কেউ কেউ সিট না পেয়ে দাঁড়িয়ে গন্তব্যে যাচ্ছিলেন। তারা ঢাকা, চট্টগ্রাম, বগুড়াসহ দেশের বিভিন্ন এলাকায় যান। তাদের প্রত্যেকের হাতেই প্রয়োজনীয় কাপড়ের ব্যাগ ছিল।
বাস টার্মিনালে কথা হয় সদর উপজেলার মালিবাড়ি ইউনিয়ন থেকে আসা নালো মিয়ার সঙ্গে। তিনি বলেন, “বগুড়ার কারখানায় কাজ করতে যাচ্ছি। আমাদের জেলায় কলকারখানা থাকলে তো বউ, ছোল-ছাড়ি (মেয়ে) বগুড়াত যাওন লাগতো না। এখন নতুন সরকার আসছে। এবার অন্তত কলকারখানা হওয়া উচিৎ।”
গাইবান্ধা কেন্দ্রীয় বাস টার্মিনাল সূত্রে জানা যায়, প্রতিদিন অসংখ্য শ্রমিক কাজের সন্ধানে দেশের বিভিন্ন জেলায় যাওয়ার জন্য কেন্দ্রীয় বাস টার্মিনালে আসেন। তাদের অনেকের কাছেই গন্তব্যে যাওয়ার ভাড়ার পর্যপ্ত টাকা পর্যন্ত থাকে না। ধার দেনা করে আনা অল্প টাকায় যেতে কাউন্টার গুলোতে ধর্ণা দেন এসব মানুষ।
গাইবান্ধা মোটর শ্রমিক ইউনিয়নের সভাপতি বাদশা মিয়া জানান, “বগুড়া, ঢাকার সায়দাবাদ ও চট্টগ্রামের বাসে প্রতিদিন কাজের সন্ধানে হাজারো শ্রমিক যাচ্ছেন। তারা সেখানে কেউ দিনমজুর, ভাড়ায় রিকশা চালক, কেউ রাজ মিস্ত্রি আবার কেউ গার্মেন্টসে কাজে যান। নিজ জেলায় কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা থাকলে এসব শ্রমিক শ্রেণির মানুষ হয়তো এলাকাতেই কাজের সুযোগ পেতেন।”
ব্যাগ নিয়ে বাসের অপেক্ষা দিনমজুরদের
কৃষি নির্ভর এই অঞ্চলে কৃষিভিত্তিক শিল্প কলকারখানা গড়ে তোলা হাজারো শ্রমিককে অন্য কোথাও যেতে হতো না বলে মনে করেন গাইবান্ধা জেলা শ্রমিক দলের সভাপতি অ্যাডভোকেট কাজী আমিরুল ইসলাম ফকু। তিনি বলেন, “স্বাধীনতা পরবর্তী সময়ে গাইবান্ধায় একটা শিল্প কলকারখানা গড়ে তোলা হয়নি। গ্যাস সংযোগ নেই। আশাকরি, আমাদের সরকার এ ব্যাপারে পদক্ষেপ নেবে।”
গাইবান্ধা-২ (সদর) আসনের নবনির্বাচিত সংসদ সদস্য আব্দুল করিম রাইজিংবিডি ডটকমকে বলেন, “এখানকার ৮০ শতাংশ মানুষ কৃষি পেশায় জড়িত। বছরের অধিকাংশ সময়ই তাদের হাতে কাজ থাকে না। অর্থনৈতিক অঞ্চল গড়ে তুলে শিল্প কলকারখানা স্থাপনের মাধ্যমে নিজ এলাকায় কর্মহীন এসব মানুষদের কাজের ব্যবস্থা করা হবে। বিশেষ করে গ্যাস সংযোগ স্থাপন করা গেলে দ্রুত কলকারখানা গড়ে তোলা সম্ভব। আমি যথাসাধ্য সে চেষ্টাই করব।”
ঢাকা/মাসুদ