ঢাকা     বৃহস্পতিবার   ১৯ মার্চ ২০২৬ ||  চৈত্র ৬ ১৪৩২ || ২৯ রমজান ১৪৪৭ হিজরি

Risingbd Online Bangla News Portal

ঈদ মৌসুমেও ফাঁকা দর্জির দোকান, ঝোঁক রেডিমেড পোশাকে

কুমিল্লা প্রতিনিধি || রাইজিংবিডি.কম

প্রকাশিত: ১২:১৬, ১৯ মার্চ ২০২৬  
ঈদ মৌসুমেও ফাঁকা দর্জির দোকান, ঝোঁক রেডিমেড পোশাকে

খুব বেশিকাল আগের কথা নয়। ঈদ এলেই দর্জিপাড়ায় ব্যস্ততা বেড়ে যেত। নতুন জামা বানিয়ে নিতে দর্জির দোকানে ভিড় জমাতেন গ্রাহক। বিশেষ করে এলাকায় বা বাজারে যার জামার নকশা কাটিং সেলাই ভালো হতো সেসব দোকানে ভিড় লেগেই থাকত। দিন তো বটেই রাতেও শোনা যেত দর্জির সেলাই মেশিনের একটানা শব্দ। কিন্তু সময় বদলেছে। এখন ঈদের মৌসুমেও অনেক দর্জি দোকানে অলস বসে থাকেন। রেডিমেড পোশাকের সহজলভ্যতা ও ক্রেতাদের বদলে যাওয়া অভ্যাসে ধীরে ধীরে ফিঁকে হয়ে যাচ্ছে দর্জিদের পুরোনো সেই ঈদের ব্যস্ততা।

কুমিল্লা নগরীর কান্দিরপাড়ের একটি বহুতল মার্কেটের ছোট্ট সেলাইয়ের দোকানে বসে আনমনে সুঁইয়ে সুতো পরাচ্ছিলেন কাটিং মাস্টার এনামুল হক। একসময় তার দোকানে এত অর্ডার আসত যে কাজের চাপ সামলানোই ছিল কঠিন। এখন দিন পার করাই যেন কঠিন হয়ে পড়েছে। নরম গলায় তিনি বললেন, কয়েক বছর আগেও ঈদের আগে তার দোকানের সামনে ক্রেতাদের ভিড় থাকত। রোজা শুরু হওয়ার আগেই সেলাইয়ের সিরিয়াল লেগে যেত। কিন্তু এবার রোজার দশ দিন পার হয়ে গেলেও তেমন কোনো সাড়া মিলছে না।

এদিকে পোশাক সেলাইয়ের মজুরি বেড়েছে আগের তুলনায়। নারীদের সুতি থ্রি-পিস আগে যেখানে ৩০০ থেকে ৪৫০ টাকায় সেলাই করা হতো, এখন সেখানে দিতে হচ্ছে প্রায় ৬০০ টাকা। জর্জেটের থ্রি-পিসের ক্ষেত্রেও একই চিত্র। আগে ৬০০ থেকে ৬৫০ টাকায় তৈরি হলেও এখন সেই মজুরি দাঁড়িয়েছে প্রায় ১ হাজার ২০০ থেকে ৩০০ টাকায়।

একই হতাশার কথা জানালেন দর্জি কাউসার আহমেদ। তিনি বলেন, আগে ঈদের সময় এত কাজ থাকত যে ঠিকমতো ঘুমানোর সুযোগও মিলত না। এখন সকাল থেকে রাত পর্যন্ত দোকানে বসে থাকলেও হাতে গোনা দুই একটি অর্ডার পাওয়া যায়। তার ভাষায়, মানুষের আগ্রহ এখন সেলাই করা পোশাকের দিকে কমে গেছে। অধিকাংশ ক্রেতা এখন রেডিমেড পোশাক কিনতে আগ্রহী।

দর্জিদের এই মন্দার বিপরীতে কান্দিরপাড়ের রেডিমেড পোশাকের দোকানগুলোতে দেখা যাচ্ছে উল্টো চিত্র। ক্রেতাদের ভিড়ে ব্যস্ত সময় কাটাচ্ছেন বিক্রেতারা। কেউ পছন্দের পোশাক বেছে নিচ্ছেন, কেউ ট্রায়াল দিয়ে দেখে নিচ্ছেন আর মুহূর্তেই কিনে নিচ্ছেন পছন্দের জামা।
কান্দিরপাড়ের খন্দকার হক শপিং কমপ্লেক্সে পরিবারের জন্য ঈদের কেনাকাটা করতে আসা সানজিদা আকতার জানান, দর্জির কাছে কাপড় দিলে জামা তৈরি হতে এক থেকে দুই সপ্তাহ সময় লাগে। অনেক সময় ফিটিং ঠিক হয় না বা ডিজাইন ঠিকমতো পাওয়া যায় না। তার মতে, রেডিমেড পোশাকে এসব ঝামেলা নেই। ট্রায়াল দিয়ে ভালো লাগলে সঙ্গে সঙ্গেই কিনে নেওয়া যায়।

লাকসাম থেকে ঈদের কেনাকাটা করতে আসা ইয়াসমিন আরা বলেন, আগে পরিবারের সবার জন্য প্রায় এক মাস আগে কাপড় কিনে দর্জির কাছে দিতে হতো। এখন একদিনেই মার্কেট থেকে সবার জামা কেনা হয়ে যায়। এতে সময়ও বাঁচে, ঝামেলাও কম হয়। তার মতে, এখন সেলাইয়ের যে খরচ, তা দিয়ে অনেক সময় আরেকটি নতুন পোশাকও কিনে ফেলা সম্ভব।

এমন পরিস্থিতিতে দর্জিদের দোকানের চিরচেনা ব্যস্ত দৃশ্যও বদলে যাচ্ছে। অনেকেই এখন শুধু ব্লাউজ বা পাঞ্জাবির মতো নির্দিষ্ট পোশাকের অর্ডার নিচ্ছেন। কেউ কেউ আবার বড় পরিসরে কাজ করা ছেড়ে দিয়েছেন। তবু পুরোনো দিনের স্মৃতি ভুলতে পারেন না অনেকেই। 
কান্দিরপাড়ের প্রেমা লেডিস টেইলার্সের স্বত্বাধিকারী এনামুল বলেন, হাতে বানানো জামার ফিটিং ও কারুকাজের মতো নিখুঁত কাজ রেডিমেড পোশাকে পাওয়া যায় না। কিন্তু এখন মানুষ সেই মূল্যটা বুঝতে চায় না। তার আশঙ্কা, এভাবে চলতে থাকলে হয়তো একদিন দর্জি পেশার সেই ঐতিহ্য হারিয়ে যাবে।

তবে সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, সময়ের সঙ্গে মানুষের রুচি ও জীবনযাত্রা দ্রুত বদলাচ্ছে। সহজলভ্যতা, সময় বাঁচানো এবং আধুনিক ডিজাইনের কারণে রেডিমেড পোশাকের প্রতি মানুষের ঝোঁক বাড়ছে। তবু হাতে তৈরি পোশাকের নিখুঁত ফিটিং ও ব্যক্তিগত ছোঁয়ার যে আলাদা মূল্য রয়েছে, তা পুরোপুরি হারিয়ে যাওয়ার আশঙ্কা কম। পরিবর্তিত সময়ের সঙ্গে তাল মিলিয়ে নতুন কৌশল ও আধুনিক ফ্যাশনের সঙ্গে খাপ খাইয়ে নিতে পারলেই হয়তো আবারও দর্জি পাড়ায় ফিরে আসতে পারে সেই পুরোনো ব্যস্ততা।

ঢাকা/তারা//

সর্বশেষ

পাঠকপ্রিয়