ঢাকা     রোববার   ০৩ মে ২০২৬ ||  বৈশাখ ২০ ১৪৩৩ || ১৫ জিলকদ ১৪৪৭ হিজরি

Risingbd Online Bangla News Portal

ডিজেল সংকটে বিকল্প জ্বালানিতে সেচ দিচ্ছেন কৃষকরা

কুষ্টিয়া প্রতিনিধি || রাইজিংবিডি.কম

প্রকাশিত: ১২:৩১, ৩ মে ২০২৬  
ডিজেল সংকটে বিকল্প জ্বালানিতে সেচ দিচ্ছেন কৃষকরা

কুষ্টিয়ার দৌলতপুরে নিজস্ব ফর্মুলায় তৈরি জ্বালানি দিয়ে কৃষকদের শ্যালো ইঞ্জিন চালানো দেখছেন উদ্ভাবক মনির হোসেন। ছবি: রাইজিংবিডি

জ্বালানি সংকটের কারণে কৃষকদের সেচ কার্যক্রম যখন ব্যাহত হচ্ছে, ঠিক তখনই কুষ্টিয়ার দৌলতপুরের একজন স্কুল শিক্ষক ও কৃষি উদ্যোক্তা ডিজেলের বিকল্প জ্বালানি হিসেবে ব্যবহার করছেন পোড়া মবিল। সঙ্গে তার নিজস্ব ফর্মুলয়া তৈরি বুস্টার নামক একটি কেমিক্যাল। যা ৫ লিটার পোড়া মবিলের সঙ্গে ১০০ মিলিলিটার মিশিয়ে ডিজেলের চেয়ে বেশিক্ষণ সেচ পাম্প চালাচ্ছেন বলে দাবি করেন তিনি।

তার এ বুস্টার হলো ম্যাথড অব অল্টানেটিভ ডিজেল (এমএডি)। যা তিনি ডিজেলের বিকল্প বলে দাবি করছেন। দীর্ঘদিন পরীক্ষার পরে মাঠ পর্যায়ে কৃষকদের মাঝে তিনি বিক্রি করছেন এই বুস্টার। ডিজেলের চেয়ে খরচ কম এবং ডিজেল সংকটে এটি বেশ জনপ্রিয় হচ্ছে বলে জানান কৃষকরা।

আরো পড়ুন:

শনিবার (২ মে) সকালে কুষ্টিয়ার দৌলতপুর উপজেলার ফিলিপনগর চর এলাকায় গিয়ে দেখা যায়, ডিজেলচালিত শ্যালো ইঞ্জিনে জ্বালানি হিসেবে ডিজেলের পরিবর্তে পোড়া মবিল ও বুস্টার দিয়ে মেশিন চালু করে সেচ দেওয়া হচ্ছে। ওই চরের প্রায় ৩০-৪০টি শ্যালো ইঞ্জিনে এই জ্বালানি ব্যবহার করা হচ্ছে। এতে স্থানীয় কৃষকরাও বেশ খুশি।

পরে দুপুরে দৌলতপুর উপজেলার বিভিন্ন এলাকায় ঘুরে একই চিত্র দেখা যায়। বেশিরভাগ কৃষকরা এ বিকল্প জ্বালানিতে সেচ পাম্প চালু করার জন্য মনির হোসেনের সঙ্গে যোগাযোগ করছেন। মনির হোসেনও তাদের সহযোগিতা করছেন।

বুস্টারের উদ্ভাবক হিসেবে দাবি করা কৃষি উদ্যোক্তা মনির হোসেন বলেন, “আমি মূলত কৃষি পরিবারের সন্তান। ছোটবেলা থেকেই মনে হতো, কৃষকদের জন্য কিছু করার। রাষ্ট্র বিজ্ঞানে অনার্স-মাস্টার্স শেষ করে শিক্ষকতা পেশা শুরু করি। ২০০৭ সাল থেকে আমি শিক্ষকতার পাশাপাশি কৃষকদের কথা চিন্তা করে ডিজেল ইঞ্জিনের বিকল্প জ্বালানি ইঞ্জিন নিয়ে কাজ শুরু করি। শিক্ষকতার পাশাপাশি ডিজেল ইঞ্জিন নিয়ে দীর্ঘদিন গবেষণা চালিয়ে যাই। পরবর্তীতে শিক্ষকতা পেশা ছেড়ে দিয়ে এই গবেষণায় সম্পূর্ণ মনোনিবেশ করি।” 

তিনি আরো বলেন, “আমার কাছে মনে হয়, এই পৃথিবীতে আমরা এসেছি কেবল পেশাদারিত্বের জন্য নয়। এমন কিছু আমাদের করা উচিৎ, যা মানবকল্যাণের জন্য কাজে লাগে। আমি ২০১৯ সালে করোনাকালীন সময় শুরু হওয়ার কয়েকদিন আগে চীনে গিয়েছিলাম। সেখানে ডিজেল ইঞ্জিনের বিভিন্ন ফাংশন, ফুয়েল সিস্টেম এবং সাকসন ও কম্প্রেসার বিষয়ক কর্মশালা যোগদান করি। চীনের ডিজেল ইঞ্জিন বিষয়ক বিভিন্ন গবেষণা প্রতিষ্ঠানে যাই। সেখানে ডিজেল ইঞ্জিন নিয়ে কাজ করি তাদের সঙ্গে। সেখান থেকেই আমার মাথায় আসে এই সূত্রটি।”

মনির হোসেন জানান, “পরে দেশে এসে আমি ডিজেলের বিকল্প জ্বালানি ব্যবহার করে কিভাবে ডিজেল ইঞ্জিন চালানো যায়, এই নিয়ে বিস্তর গবেষণা শুরু করি। প্রাথমিকভাবে ৪-৫টা মৌলিক উপাদান দিয়ে একটা যৌগ তৈরি করি। যখন সেটা ব্যবহার করি তখন ইঞ্জিনে বিভিন্ন সমস্যা দেখা দেয়। তারপরেও আমি হাল ছেড়ে দেইনি। গবেষণা চালিয়ে যাচ্ছিলাম নিজের মতো করেই। সম্প্রতি যখন সারাদেশে ডিজেলের সংকট দেখা দিলো, দেখলাম ডিজেলের জন্য কৃষকরা কতটা কষ্ট করছে। লাইন ধরে পাম্পে গিয়েও তেল পাচ্ছে না। তখন মনে হলো যে, ডিজেলের বিকল্প কিছু করতেই হবে। পরবর্তীতে আরো কিছু উপাদান যোগ করে ৮০ ভাগ সফলতা পাই। সর্বশেষ এক মাস আগে আমি মোট ১২টি উপাদান যোগ করে শতভাগ সফলতা পাই।”

তিনি আরো জানান, “এরপর আমি বিভিন্ন কৃষকদের কাছে গিয়ে তাদের বোঝাতে শুরু করলাম যে, আমার উদ্ভাবিত জ্বালানি ডিজেলের বিকল্প হিসেবে ব্যবহার করা সম্ভব। প্রথমে তারা বিশ্বাস করেনি। কিন্তু পরে যখন বাস্তবে ঘণ্টার পর ঘণ্টা ইঞ্জিন চালিয়ে দেখিয়েছি তখন সবাই বিশ্বাস করেছে। বর্তমানে প্রায় ৫০-৬০ জন কৃষক সেচ, মাড়াই, শ্যালো ইঞ্জিন চালাতে আমার এই বিকল্প জ্বালানি ব্যবহার করছে। এর মাধ্যমে ডিজেল ছাড়াই ডিজেল ইঞ্জিন চলছে। কৃষকদের খরচ কম হচ্ছে এবং এটি সহজলভ্য।”

মনির হোসেন দাবি করেন, “যেখানে ৫ লিটার ডিজেল কিনতে হলে ৫৭৫ টাকার প্রয়োজন। সেখানে এই ম্যাটেরিয়াল ও পোড়া মবিলে খরচ ৩০০ টাকা। ৫ লিটার এই জ্বালানিতে ৭ লিটার ডিজেলের সমপরিমাণ কার্যকরী। এটি ব্যবহারে শব্দ ও ধোঁয়া খুবই সামান্য হয়। বর্তমানে এটি ব্যবহারের ফলে এই উপজেলায় প্রতিদিন ৫-৭ হাজার টাকার ডিজেল সাশ্রয় হচ্ছে কৃষকদের। সেই সঙ্গে কৃষকরাও বেশ খুশি।”

এই কৃষি উদ্যোক্তা বলেন, “আমি চাই ডিজেলের বিকল্প হিসেবে এই জ্বালানি সারা দেশে, এমনকি সারা বিশ্বে ছড়িয়ে যাক। এজন্য সরকারের সহযোগিতা চাই।”

দৌলতপুর উপজেলার মানিকদিয়াড় এলাকার কৃষক আবু বক্কর জানান, বর্তমানে আমাদের এলাকায় ডিজেলের প্রকট সংকট। ১০০ টাকা দামের ডিজেল কিনতে হচ্ছে ২০০-৩০০ টাকায়। এই চড়া দামের কারণে গতকাল জমিতে সেচ দিতে পারিনি। 

একই এলাকার কৃষক আমিনুল ইসলাম জানান, আমাদের এলাকায় ডিজেলচালিত শ্যালো সেচ পাম্প এবং বিদ্যুৎচালিত সেচ পাম্পই কৃষিকাজের জন্য প্রধান সেচের উৎস। বর্তমানে ঠিকমতো বিদ্যুৎ থাকছে না, তার উপরে চাষিরা ডিজেলও পাচ্ছে না। যার ফলে কৃষি কাজ ঠিকমতো করতে পারছে না। এই পরিস্থিতিতে এখন ডিজেলের বিকল্প জ্বালানি পেলে চাষিদের জন্য সুবিধা হবে। মনির হোসেনের এই বুস্টার দিয়ে মেশিন চালালে সেচ খরচও কম হবে।

স্থানীয় কৃষক ফিরোজ সরদার বলেন, দীর্ঘ লাইনে দাঁড়িয়ে থেকেও ডিজেল পাওয়া যাচ্ছে না। খোলা বাজারে চোরাই ডিজেল পাওয়া যাচ্ছে। এক্ষেত্রে ডিজেলের বিকল্প কিছু হলে আমাদের খরচ ও ভোগান্তি অনেকটা কমবে।

বীর মুক্তিযোদ্ধা ও স্যালো সেচ পাম্পের মালিক ওমর আলী জানান, ডিজেলের অভাবে কয়েকদিন মেশিন বন্ধ ছিল। মাঠের কৃষিকাজ অনেকটাই বন্ধ ছিল। আজকে এই বুস্টার ও পোড়া মবিল দিয়ে আমি মেশিন চালাচ্ছি। আজকেই এটি প্রথম চালাচ্ছি আমি। এর আগে আমি ডিজেল দিয়ে চালাতাম। ডিজেল না পাওয়ায় এবার পাট করতে পারিনি। পোড়া মবিল দিয়ে যে ডিজেল ইঞ্জিন চলে এটা আমার ধারণা ছিল না। মনে হচ্ছে যে, ডিজেলের চেয়ে মেশিন ভালো চলছে।

দৌলতপুর উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা কৃষিবিদ রেহেনা পারভীন জানান, আমরা কৃষকদের সেচ কাজে পানি সাশ্রয়ী ব্যবস্থাপনার উপরে জোর দিয়েছি। কৃষকদের পরামর্শ ও প্রশিক্ষণ প্রদান করছি। কিছু কৃষকরা ডিজেলের পরিবর্তে পোড়া মবিল দিয়ে শ্যালো ইঞ্জিনে সেচ দিচ্ছে সে সম্পর্কে শুনেছি। বিষয়টি খতিয়ে দেখা হচ্ছে।

তবে কৃষিজমিতে সেচ এবং ডিজেল ইঞ্জিনে কৃষকদের বিকল্প জ্বালানি ব্যবহার সম্পর্কে কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি কুষ্টিয়া কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক ড. শওকত হোসেন ভুইঁয়া।

এ ব্যপারে জানতে চাইলে বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা কেন্দ্র গাজীপুরের ফার্ম মেশিনারি বিভাগের প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ড. মো. নুরুল আমিন জানান, ডিজেলচালিত শ্যালো ইঞ্জিন অন্য কোনো জ্বালানি দিয়ে চলার কথা না। কিন্তু দৌলতপুর এলাকার ওইসব কৃষকরা কিভাবে চালাচ্ছেন পোড়া মবিল দিয়ে সেটা খতিয়ে দেখতে হবে। পোড়া মবিলের সঙ্গে কী ধরনের কেমিক্যাল তারা ব্যবহার করছে এবং এটা কোনো বিপজ্জনক কিনা তা পরীক্ষা করে বলা যাবে। আমরা ওই কৃষি উদ্যোক্তার সঙ্গে যোগাযোগ করেছি। তিনি চীন থেকে ডিজেল ইঞ্জিনের উপরে প্রশিক্ষণ ও গবেষণা করেছেন। যদি ডিজেলের বিকল্প জ্বালানি পাওয়া যায় তাহলে এটি খুবই ভালো।

ঢাকা/কাঞ্চন/ফিরোজ 

সম্পর্কিত বিষয়:

সর্বশেষ

পাঠকপ্রিয়