সেই জুনায়েদের পরিবারের পাশে প্রশাসন
কুষ্টিয়া প্রতিনিধি || রাইজিংবিডি.কম
শিশু জুনায়েদের বাড়ি পরিদর্শন করেছেন দৌলতপুর উপজেলার ইউএনও অনিন্দ্য গুহ।
কুষ্টিয়ার দৌলতপুর উপজেলার আদাবাড়ীয়া ইউনিয়নের গরুড়া মিস্ত্রিপাড়া গ্রামে বসবাসরত অসহায় শিশু জুনায়েদের পরিবারের পাশে দাঁড়িয়েছে স্থানীয় প্রশাসন ও বিত্তবানরা।
সোমবার (৪ মে) পাঠকপ্রিয় রাইজিংবিডি ডটকমে ‘১০ বছরের জুনায়েদের কাঁধে সংসারের ভার’ শিরোনামে প্রতিবেদন প্রকাশের পর তার বাড়ি পরিদর্শনে যান উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও)। পাশাপাশি সাগর ফিলিং স্টেশনের মালিক নজরুল ইসলামের ছেলে শাওন বিশ্বাসসহ আরো কয়েকজন পরিবারটির পাশে দাঁড়িয়েছেন।
জুনায়েদ উপজেলার আদাবাড়ীয়া ইউনিয়নের গরুড়া মিস্ত্রিপাড়া গ্রামের মৃত হাবিবুর রহমানের ছেলে।
স্থানীয় সূত্র জানায়, জুনায়েদের বাবা হাবিবুর রহমান গত মার্চ মাসে গুরুতর অসুস্থ হয়ে পড়েন। চিকিৎসার জন্য কিছু টাকা জমিয়েছিলেন তিনি। সেই জমানো টাকা নিয়ে তিন শিশু সন্তানকে ফেলে এক যুবকের সঙ্গে পালিয়ে যান মা রোজিনা খাতুন। স্ত্রীর বিশ্বাসঘাতকতার শোক আর চিকিৎসার অভাবে ধুঁকে ধুঁকে গত পবিত্র ঈদুল ফিতরের দিন না ফেরার দেশে চলে যান হাবিবুর।
হাবিবুরের মৃত্যুর পর ভেঙে পড়া সংসারের দায়িত্ব এসে পড়ে ১০ বছরের জুনায়েদের কাঁধে। পরিবারে আছে অসুস্থ দাদা-দাদি এবং ১২ বছর বয়সি বড় ভাই ও ছোট এক বোন। তার বড় ভাই শারীরিকভাবে কিছুটা অসুস্থ। জুনায়েদ তার বাবার রেখে যাওয়া ভ্যান চালিয়ে সংসারের হাল ধরেন।
সংসারের হাল ধরতে বাবার রেখে যাওয়া ভ্যান চালায় জুনায়েদ
রোদ-বৃষ্টি উপেক্ষা করে সারাদিন ভ্যান চালিয়ে জুনায়েদ ৪০ থেকে ৫০ টাকা আয় করে। কখনো কখনো সর্বোচ্চ ১০০ টাকা আয় করে। যা আয় হয়, তা দিয়েই চলে পরিবারের খাবার খরচ এবং অসুস্থ দাদা-দাদির চিকিৎসা। ফলে, পড়ালেখা কার্যত বন্ধ হয়ে গেছে জুনায়েদের। সে স্থানীয় প্রাগপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের তৃতীয় শ্রেণির ছাত্র।
স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, এত অল্প বয়সে একটি শিশুকে এভাবে সংগ্রাম করতে দেখা অত্যন্ত কষ্টকর। এটি শুধু একটি পরিবারের গল্প নয়, বরং সমাজের জন্য একটি বড় সতর্কবার্তা। তারা মনে করেন, সমাজের সচেতন ও বিত্তবানদের এগিয়ে আসা জরুরি, নইলে এসব শিশুর ভবিষ্যৎ অন্ধকারে হারিয়ে যাবে।
জুনায়েদের পাশে দাঁড়ানো শাওন বিশ্বাস বলেন, “সংবাদটি প্রকাশের মাধ্যমে একটি অসহায় পরিবারের করুণ বাস্তবতা সবার সামনে উঠে এসেছে, যা আমাদের গভীরভাবে নাড়া দিয়েছে। বিশেষ করে জুনায়েদের সংগ্রামের কথা জানার পর আমরা মানবিক দায়িত্ববোধ থেকেই তাদের পাশে দাঁড়ানোর চেষ্টা করেছি।”
তিনি বলেন, “সমাজে এমন অনেক পরিবার নীরবে কষ্ট সহ্য করে যাচ্ছে, যাদের কথা আমরা অনেক সময় জানতে পারি না। গণমাধ্যমের এমন দায়িত্বশীল ভূমিকার কারণেই আজ আমরা তাদের পাশে দাঁড়ানোর সুযোগ পেয়েছি। আমি সমাজের সব বিত্তবান ও মানবিক মানুষদের প্রতি আহ্বান জানাচ্ছি, নিজ নিজ অবস্থান থেকে যদি আমরা একটু এগিয়ে আসি, তাহলে এই শিশুদের ভবিষ্যৎ আলোকিত করা সম্ভব।”
তিনি জানান, পরিবারটিকে কিছু নগদ অর্থ সহায়তা দেওয়া হয়েছে। ভবিষ্যতেও পরিবারটির পাশে থাকা হবে।
দৌলতপুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) অনিন্দ্য গুহ বলেন, “প্রশাসন ইতোমধ্যে পরিবারটিকে খাদ্য সহায়তা প্রদান শুরু করেছে। পাশাপাশি দীর্ঘমেয়াদী সমাধানের জন্য বিভিন্ন উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।”
তিনি বলেন, “পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে আলোচনা করে শিশুদের সরকারি শিশু পরিবারে স্থানান্তর করা হবে, অথবা দাদা দায়িত্ব নিতে সক্ষম হলে, তাকে সরকারি সহায়তায় একটি ছোট ব্যবসা প্রতিষ্ঠান করে দেওয়া হবে।”
ঢাকা/কাঞ্চন/মাসুদ