ঢাকা     বুধবার   ০৬ মে ২০২৬ ||  বৈশাখ ২৩ ১৪৩৩ || ১৮ জিলকদ ১৪৪৭ হিজরি

Risingbd Online Bangla News Portal

আলুর দামে ধস, রংপুরে হাজার কোটি টাকা ক্ষতির মুখে কৃষক

রংপুর প্রতিনিধি || রাইজিংবিডি.কম

প্রকাশিত: ১৭:৪৯, ৬ মে ২০২৬   আপডেট: ১৮:০০, ৬ মে ২০২৬
আলুর দামে ধস, রংপুরে হাজার কোটি টাকা ক্ষতির মুখে কৃষক

পচে যাওয়া আলু দেখাচ্ছেন কৃষক।

দেশে আলু উৎপাদনের প্রধান ভাণ্ডার হিসেবে পরিচিত রংপুরে চলতি মৌসুমে আলুর উৎপাদন ভালো হলেও মূল্যধসে চরম লোকসানের মুখে পড়েছেন আলুচাষীরা। তারা বলছেন, উৎপাদন খরচ কেজিপ্রতি ১৩ থেকে ১৫ টাকা হলেও বর্তমানে আলু বিক্রি হচ্ছে মাত্র ৬ থেকে ৭ টাকায়। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে হিমাগার ভাড়া বৃদ্ধির চাপ। ফলে অনেক কৃষক আলু সংরক্ষণ না করে বাড়িতে রেখে দিলেও যার বড় অংশ পচে নষ্ট হচ্ছে।

কৃষি বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, চলতি মৌসুমে রংপুরে লক্ষ্যমাত্রা অনুযায়ী আলুর উৎপাদন হয়েছে ১৬ লাখ ৫ হাজার ২৫ মেট্রিক টন। যার গড় উৎপাদন খরচ কেজি প্রতি ১৩ থেকে ১৫ টাকা। অথচ বর্তমান বাজার মূল্য ৭ টাকা। অর্থাৎ প্রতি কেজিতে কৃষকের লোকসান ৬ থেকে ৮ টাকা। এমন বাস্তবতায় কৃষকের ন্যূনতম কেজিতে ৬ টাকা লোকসান হলে উৎপাদন খরচ অনুযায়ী মোট লোকসান হয় প্রায় ৯৬৩ কোটি টাকা। অর্থাৎ শুধু মূল্যধসেই রংপুর অঞ্চলে আলুতে ক্ষতির পরিমাণ প্রায় ১ হাজার থেকে ১ হাজার ৩০০ কোটি টাকা। এই ক্ষতির চিত্র আরও গভীর করে তুলেছে হিমাগার ভাড়া বৃদ্ধির কারণে। এছাড়াও হারভেস্ট মৌসুমে বৈরী আবহাওয়ার কারণে ঘরে মজুদ করা আলুতেও ধরেছে পচন। ফলে মরার উপর খারার ঘা হয়ে অনেক কৃষকের লোকসানের মাত্রা গিয়ে দাঁড়িয়েছে উৎপাদন খরচের সমান। 

কৃষকেরা বলছেন, প্রতি কেজিতে অতিরিক্ত ভাড়া গুনে আলু সংরক্ষণ করা তাদের পক্ষে সম্ভব হয় না। এর ওপর হিমাগার উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে অনেক কম। ফলে বাধ্য হয়ে কম দামে কৃষক আলু বিক্রি করছেন। 

রংপুর পীরগাছা উপজেলার সেচাকান্দি এলাকার আলু চাষী ইসমাইল হোসেন বলেন, ‘‘এক দোন (২৪ শতক) জমিতে আলু চাষে খরচ হয়েছে ৩০ থেকে ৪০ হাজার টাকা। কিন্তু বর্তমান বাজার দরে বিক্রি করে সেই খরচ উঠছে না। উল্টো উৎপাদন খরচের চেয়ে অর্ধেকেরও কম এখন আলুর বাজার মূল্য।’’ ফলে লোকসানের বোঝা মাথায় নিয়ে দুশ্চিন্তায় দিন পার করছেন বলে জানান তিনি।

একই এলাকার আলু চাষী আতোয়ার রহমান বলেন, ‘‘গেল বছর দুই একর জমিতে আলু আবাদ করে আড়াই লাখ টাকা ঋণের বোঝা ঘাড়ে চেপে বসে আছে। এবার এনজিওর ঋণ নিয়ে গেল বছরের ঘাটতি পূরণ করতে দেড় একর জমিতে আলু চাষ করেছিলাম। বৈরী আবহাওয়া, সার কীটনাশকের অপ্রাপ্যতার মাঝেও চড়া দামে কৃষি উপকরণ কিনে জমিতে  প্রায় ১৫ হাজার কেজি আলু হয়েছে। কিন্তু ভরা মৌসুমে দাম কম থাকায় উৎপাদিত আলু ঘরে মজুদ করে এখন বিপাকে পড়েছি।’’

‘‘বর্তমান বাজার মূল্য ৬ থেকে ৭ টাকা কেজি। অথচ উৎপাদন খরচ হয়েছে ২ লাখ টাকার উপরে। বর্তমান বাজার মূল্যে আলু বিক্রি হওয়ার সম্ভাবনা ৮০ থেকে ৯০ হাজার টাকা। অর্থাৎ এবারও লক্ষাধিক টাকা লোকসান হবে,’’ যোগ করেন  আতোয়ার।

আলু চাষীরা বলছেন, ৭০ শতাংশ আলু সংরক্ষণের জন্য হিমাগার না থাকায় আলু উৎপাদনের মৌসুমে বিক্রি করতে অনেকটা বাধ্য হন তারা। অথচ আলু রপ্তানি বাড়ালে তারা লাভবান হতেন।

জেলা কৃষি বিভাগের তথ্যমতে রংপুর জেলা থেকে ২০২১-২২ মৌসুমে সর্বোচ্চ ১৯ হাজার ৩৭১ মেট্রিক টন আলু রপ্তানি হয়েছিল। কিন্তু ২০২৩-২৪ ও ২০২৪-২৫ অর্থবছরে এই হার খুবই কম, মাত্র ৩৭৪ ও ৩৫৩ মেট্রিক টন। এ বছর এখন পর্যন্ত ১২৬ মেট্রিক টন আলু রপ্তানি হয়েছে। রংপুরের পীরগাছা উপজেলার দেউতি এলাকার কৃষক আবদুল কাদের বলেন, ‘‘আলু রপ্তানি হয়, লোকমুখে শুনি। কেউ কোনো দিন বলেনি। লোক না আসলে আমি কীভাবে আবাদ করব, আর কার কাছে দেব জানি না। হয়তোবা রপ্তানি যোগ্য আলু আবাদ করলে আমাদের লোকসান এত হতো না। তবে গেল দুবার আলু আবাদ করে আমাদের সহায় সম্বল সবই শেষ।’’

আলুর ন্যায্য বাজার ব্যবস্থাপনায় সরকারের হস্তক্ষেপ কামনা করেন এই চাষী।

সিদাম বাজারের আলু ব্যবসায়ী মমতাজ উদ্দিন জিল্লাল বলেন, ‘‘গত বছর আলুর বাজারে ধস নেমেছিল। এবারও আলুর বাজার ধসে রয়েছে। ‌আমরা ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীরা গেল বছর বড় ধরনের ক্ষতির বোঝা মাথায় নিয়ে আছি। এবার পুঁজি না থাকায় ব্যবসায় খাটাতে পারিনি। তবে শুনছি, যারা উচ্চ দামের আশায় বাসা বাড়িতে আলু মজুদ করেছে তাদের অনেকের আলু পচে যাচ্ছে।’’

এদিকে, কৃষক সংগ্রাম পরিষদের আহ্বায়ক অ্যাডভোকেট পলাশ কান্তি নাগ বলেন, ‘‘বর্তমান পরিস্থিতিতে কৃষকেরা লাভ তো দূরের কথা, উৎপাদন খরচও তুলতে পারছেন না। ঋণ করে চাষাবাদ করতে গিয়ে অনেক উৎপাদকই সর্বস্বান্ত হওয়ার পথে রয়েছেন।’’

এ অবস্থায় তিনি অবিলম্বে সরকারকে উৎপাদন খরচের সঙ্গে অন্তত ৩৩ শতাংশ মূল্য সহায়তা যুক্ত করে আলুর ন্যায্যমূল্য নির্ধারণের আহ্বান জানান। পাশাপাশি ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের সুনির্দিষ্ট তালিকা প্রণয়ন করে ক্ষতিপূরণের ব্যবস্থা গ্রহণের দাবি জানান তিনি।

রংপুরের ব্যবসায়ী ও হিমাগার মালিক সমিতির সভাপতি মোস্তফা আজাদ চৌধুরী বলেন, ‘‘ভারত ও পাকিস্তানে আলু চাষে উৎপাদন খরচ বাংলাদেশি টাকায় ১০ টাকা। অথচ উত্তরবঙ্গে আলুর উৎপাদন খরচ হয় ১৫ থেকে ১৬ টাকা। উৎপাদন খরচ ১০ টাকায় কমিয়ে না আনলে আলু রপ্তানি হবে না। এ ক্ষেত্রে সার, কীটনাশক ও আলুবীজের বাজার যাতে না বাড়ে এবং কৃষক যাতে প্রতারিত না হন, সে জন্য সরকারের কঠোর তদারকি করতে হবে।’’ 

কৃষকের ন্যায্য মূল্য নিশ্চিত করতে হবে। ‌তা না হলে এভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে কৃষক আলু চাষ থেকে বিমুখ হতে পারে বলেও তিনি আশঙ্কা প্রকাশ করেন। 

রংপুর আঞ্চলিক কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের অতিরিক্ত পরিচালক সিরাজুল ইসলাম বলেন, ‘‘রংপুরে এবার ৫৪ হাজার ৫০০ হেক্টর জমিতে প্রায় ১৬ লাখ ৫ হাজার ২৫ মেট্রিক টন আলু উৎপাদন হয়েছে। আবহাওয়া অনুকূলে থাকায় এ বছর ভালো ফলন হয়েছে। কিন্তু বাজারদর কম থাকায় লোকসানে পড়েছেন কৃষক।’’ 

এদিকে বিএডিসি রংপুর অঞ্চলের উপপরিচালক মো. মাসুদ সুলতান বলেন, ‘‘কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর প্রতি বছর আলু আবাদের যে লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করে, এর বেশি আলুর আবাদ করা কৃষকের উচিত নয়। কিন্তু কৃষক প্রতিযোগিতা করে একই ফসল আবাদের মাধ্যমে আর্থিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন।’’

বাম্পার উৎপাদনই এবার রংপুরের কৃষকদের জন্য আশীর্বাদ না হয়ে অভিশাপ হয়ে দাঁড়িয়েছে বলে মনে করেন এই কৃষি কর্মকর্তা। মূল্যধস, সংরক্ষণ সংকট ও বাজার ব্যবস্থাপনার দুর্বলতায় হাজার কোটি টাকার ক্ষতির মুখে পড়ে দিশেহারা কৃষক সরকারের কার্যকর হস্তক্ষেপের অপেক্ষা করছেন। 

ঢাকা/আমিরুল//

সর্বশেষ

পাঠকপ্রিয়