কে হচ্ছেন পশ্চিমবঙ্গে বিজেপির মুখ্যমন্ত্রী
কলকাতা ব্যুরো || রাইজিংবিডি.কম
২০৭টি আসনে জিতে বাংলার মসনদ দখল করেছে বিজেপি। এরপর থেকেই প্রশ্ন উঠছে কে হবেন বাংলায় বিজেপির মুখ্যমন্ত্রী ? বিজেপির কেন্দ্রীয় নেতৃত্ব বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করে ইতিমধ্যেই জানিয়ে দিয়েছে, পশ্চিমবঙ্গের বিধানসভায় দলের পরিষদীয় দলনেতা বাছার প্রক্রিয়ায় পর্যবেক্ষক করা হয়েছে অমিত শাহকে। সহকারী পর্যবেক্ষক করা হয়েছে ওড়িশার মুখ্যমন্ত্রী মোহনচরণ মাঝিকে। তবে কবে তারা কলকাতায় আসবেন সেই বিষয়ে রাজ্য বিজেপির তরফে নিশ্চিত করে কিছু জানানো হয়নি।
বিজেপির একটি সূত্রের দাবি, বুধবার (৬ এপ্রিল) অথবা আগামীকাল, বৃহস্পতিবার কলকাতার কোনো হোটেলে এই বৈঠকটি হতে পারে। যেকোনো রাজ্যেই বিধানসভা ভোটের পরে পরিষদীয় দলনেতা বাছতে সংশ্লিষ্ট রাজ্যে কেন্দ্রীয় পর্যবেক্ষকদের পাঠান বিজেপির শীর্ষ নেতৃত্ব। তারা দলের জয়ী প্রার্থীদের সঙ্গে বৈঠক করেন। সেই হিসাবে পশ্চিমবঙ্গেও বিজেপির ২০৭ জন জয়ী প্রার্থীর সঙ্গে আলোচনা করেই শাহ - মাঝি ঠিক করবেন, কাকে বসানো হবে পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রীর চেয়ারে।
পশ্চিমবঙ্গের সম্ভাব্য মুখ্যমন্ত্রী হিসেবে একাধিক নাম চর্চায় থাকলেও পাল্লা কার ভারী, তা নিয়ে প্রকাশ্যে মুখ খুলতে চাইছেন না বিজেপির কোনো শীর্ষ নেতা। তবে মুখ্যমন্ত্রীর হওয়ার দৌঁড়ে সবার থেকে এগিয়ে আছেন শুভেন্দু অধিকারী। এছাড়া বিজেপির রাজ্য সভাপতি শমীক ভট্টাচার্য, সাবেক রাজ্য সভাপতি সুকান্ত মজুমদার, সংসদ সদস্য স্বপন দাশগুপ্ত এবং আরেক সাবেক রাজ্য সভাপতি ও বিধায়ক দিলীপ ঘোষ, বিধায়ক সৌরভ শিকদারও রয়েছেন।
শুভেন্দু অধিকারী কে মুখ্যমন্ত্রী পদে এগিয়ে রাখার বিষয়ে একাধিক ব্যাখ্যা রয়েছে রাজ্য বিজেপির কাছে।
প্রথমত- পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভার অন্দরে বিজেপির ভূমিকা বদলাতে চলেছে। বিধানসভায় বিজেপি বিধায়করা এবার বিরোধী বেঞ্চের বদলে ট্রেজ়ারি বেঞ্চে বসবেন। নতুন মুখ্যমন্ত্রীই হবেন বিধানসভায় বিজেপির পরিষদীয় দলনেতা। সেই হিসেবে বিধানসভায় বিরোধী দলনেতা থাকা শুভেন্দু অধিকারী পরিষদীয় দলনেতার দায়িত্ব নেওয়ার ক্ষেত্রে অন্যদের থেকে এগিয়ে থাকবে।
দ্বিতীয়ত- ২০২১ সালে নন্দীগ্রামের পর ২০২৬ সালে ভবানীপুরে মুখ্যমন্ত্রী পদে থাকা অবস্থায় মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে পরাজিত করেছেন শুভেন্দু অধিকারী। পরপর দুটি বিধানসভা নির্বাচনে মুখ্যমন্ত্রীকে হারানোর নজির বঙ্গরাজনীতির ইতিহাসে এই প্রথম। সবমিলিয়ে রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে মুখ্যমন্ত্রী পদের দাবিদার হিসেবে এগিয়ে রয়েছেন শুভেন্দু।
অন্যদিকে শমীক পার্টির রাজ্য সভাপতি। ফলে খাতাকলমে তার নেতৃত্বেই বাংলার মসনদ দখল করেছে বিজেপি। তাছাড়া, পার্টির সর্বস্তরের নেতাকর্মী এবং সাংস্কৃতিক মহলেও শমীকের গ্রহণযোগ্যতা প্রশ্নাতীত। তবে শমীক ২৬ এর ভোটের লড়েননি। সেক্ষেত্রে মুখ্যমন্ত্রীর কুরসি শমিকের হাতে তুলে দিলে আগামী ছয় মাসের মধ্যে বিধানসভা নির্বাচনে জয় লাভ করে মুখ্যমন্ত্রীত্ব রক্ষা করতে হবে তাকে। সে ক্ষেত্রে শমিকের হাতে থাকবে শুভেন্দুর ছেড়ে দেওয়া নন্দীগ্রাম অথবা ভবানীপুর, যে কোন একটি আসন।
দলের উত্তরবঙ্গের নেতৃত্ব শীর্ষ নেতৃত্বের সিদ্ধান্ত চূড়ান্ত হিসাবে মনে করলেও উত্তরবঙ্গ মুখ্যমন্ত্রী পদের দাবি রয়েছে তাদের। তৃণমূল এবার উত্তরবঙ্গ থেকে কার্যত ধুয়েমুছে সাফ হয়ে গিয়েছে। উত্তরের ৫৪টি আসনের মধ্যে ৪০টিই বিজেপির দখলে এসেছে। সেক্ষেত্রে উত্তরবঙ্গে বিজেপির জয়ের কান্ডারি সাবেক বিজেপির রাজ্য সভাপতি ও কেন্দ্রীয় মন্ত্রী সুকান্ত মজুমদারের নাম উঠে আসছে।
এছাড়া বিজেপির তাত্ত্বিক নেতা হিসেবে স্বপন দাশগুপ্ত মুখ্যমন্ত্রীত্বের দৌঁড়ে রয়েছেন। আরএসএস-এর সঙ্গে তার ঘনিষ্ঠতা এবং তার অগাধ পাণ্ডিত্যই তাকে মুখ্যমন্ত্রীত্বের দৌঁড়ে এগিয়ে রেখেছে।
মুখ্যমন্ত্রীত্বের রেসো আরো রয়েছেন প্রয়াত সাবেক বিজেপির কেন্দ্রীয় মন্ত্রী তপন শিকদারের ভাইপো সৌরভ শিকদার। উত্তর দমদম বিধানসভা কেন্দ্র থেকে জয়ী হয়েছেন তিনি। পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতিতে তার খুব বড়সড় ছাপ না থাকলেও দিল্লির জাতীয় রাজনীতিতে বেশ কম বয়স থেকেই তার আনাগোনা। আরএসএসের সঙ্গেও রয়েছে দীর্ঘ ঘনিষ্ঠতা। বিজেপির বর্তমান জাতীয় সভাপতি নীতিন নবিনের অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ হিসেবেও পরিচিত সৌরভ। অনেকেই মনে করছেন জাতীয় রাজনীতিতে ও শীর্ষ নেতৃত্বের মধ্যে প্রভাব থাকায় সৌরভ শিকদারের কপালে শিকে ছিঁড়লেও ছিঁড়তে পারে।
যদিও যাবতীয় হিসেবের বাইরে থাকা কাউকে মুখ্যমন্ত্রীর চেয়ারে বসিয়ে দেওয়ার প্রবণতা বিজেপিতে নতুন কিছু নয়। অতীতে মধ্যপ্রদেশে এবং দিল্লিতে অপরিচিত মুখকে মুখ্যমন্ত্রীর চেয়ারে বসিয়েছেন অমিত শাহরা। বাংলাতেও যে তার পুনরাবৃত্তি হবে না, তা হলফ করে বলতে পারছেন না গেরুয়া ব্রিগেডের কেউই।
তবে বিজেপির মন্ত্রিসভায় মুখ্যমন্ত্রী ছাড়াও থাকবেন একাধিক উপমুখ্যমন্ত্রী এমন ইঙ্গিত মিলেছে। তৃণমূল জমানায় গত ১৫ বছরে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের মন্ত্রিসভায় কোনো উপমুখ্যমন্ত্রীর পদ ছিল না। এমনকী স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ও নিজের হাতে রেখেছিলেন বিদায়ী মুখ্যমন্ত্রী মমতা। নতুন মন্ত্রিসভায় সেই প্রথা বন্ধ করা হবে।
মঙ্গলবার রাজ্য বিজেপি দপ্তরে রুদ্ধদ্বার বৈঠক করেছেন শমীক, সুকান্ত, শুভেন্দু এবং দিলীপ। সঙ্গে ছিলেন সুনীল বনসল এবং মঙ্গল পাণ্ডে। মিটিং এর বিষয়বস্তু সম্পূর্ণ জানা না গেলেও সূত্রের খবর, মুখ্যমন্ত্রী এবং উপমুখ্যমন্ত্রী পদের বিষয়ের কেন্দ্রীয় নেতৃত্বের সামনে রাজ্যের সব নেতৃত্বের একই অবস্থান ছিল মূল বিষয়। এছাড়া মন্ত্রিসভা নিয়ে রাজ্যের প্রস্তাব ও শপথের দিনক্ষণ নিয়ে সিদ্ধান্ত চূড়ান্ত করা হয়েছে।
রাজ্য নেতৃত্বের ওই রুদ্ধদ্বার বৈঠকের পরেই এখন প্রশ্ন, কারা হতে চলেছেন বাংলায় প্রথমবার বিজেপি সরকারের মন্ত্রী? তালিকায় ভাসছে অনেক নাম। বিজেপি রাজ্য নেতৃত্বের তরফ থেকে যে নামগুলো এখনো পর্যন্ত ভেসে আসছে সেগুলো হলো, শুভেন্দু অধিকারী (সম্ভাব্য মুখ্যমন্ত্রী), দিলীপ ঘোষ, জগন্নাথ সরকার, স্বপন দাশগুপ্ত, সুকান্ত মজুমদার,তরুণজ্যোতি তিওয়ারি,জিতেন্দ্র তিওয়ারি,রূপা গাঙ্গুলি,অগ্নিমিত্রা পাল,রুদ্রনীল ঘোষ, শঙ্কর ঘোষ, ইন্দ্রনীল খাঁ, শান্তনু ঠাকুর, নিশীথ প্রামাণিক, অশোক লাহিড়ী,
মনোজ টিগ্গা প্রমুখ।
তবে সব জল্পনার মাঝেই বিজেপির রাজ্য সভাপতি শমিক ভট্টাচার্য ঘোষণা করেছেন ২০২৬ সালের বিধানসভা নির্বাচনে জয়ী বিজেপি সরকারের শপথগ্রহণ অনুষ্ঠান ৯ মে সকাল ১০টায় কলকাতার ব্রিগেড প্যারেড গ্রাউন্ডে অনুষ্ঠিত হবে।
ঢাকা/সুচরিতা/শাহেদ
১৬ মে চাঁদপুর ও ২৫ মে ফেনী সফর করবেন প্রধানমন্ত্রী