ঢাকা     বুধবার   ০৬ মে ২০২৬ ||  বৈশাখ ২৩ ১৪৩৩ || ১৯ জিলকদ ১৪৪৭ হিজরি

Risingbd Online Bangla News Portal

গাইবান্ধায় আবারো অর্থ আত্মসাতের ঘটনা, টনক নড়ছে না প্রশাসনের 

গাইবান্ধা প্রতিনিধি || রাইজিংবিডি.কম

প্রকাশিত: ১৭:৫৫, ৬ মে ২০২৬   আপডেট: ১৭:৫৮, ৬ মে ২০২৬
গাইবান্ধায় আবারো অর্থ আত্মসাতের ঘটনা, টনক নড়ছে না প্রশাসনের 

ভুক্তভোগীদের অর্থের বিনিময়ে এমন টোকেন দিয়ে পালিয়েছে প্রতারক চক্র

প্রতারণার অভিনব কায়দা ব্যবহার করে গাইবান্ধায় একের পর এক বড় ধরনের অর্থ আত্মসাতের ঘটনা ঘটছে। গত এক সপ্তাহে একই ধরনের ঘটনার পুনরাবৃত্তিতে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন জেলার সাধারণ মানুষ। 

এবার বিনামূল্যে পাকা ঘর, নলকূপ ও গবাদিপশু দেওয়ার প্রলোভন দেখিয়ে সহস্রাধিক পরিবারের কাছ থেকে অন্তত দেড় কোটি টাকা হাতিয়ে নেওয়ার অভিযোগ উঠেছে ‘আল আনসার ওয়েলফেয়ার ফাউন্ডেশন বাংলাদেশ’ নামের একটি সামাজিক সংগঠনের বিরুদ্ধে। 

প্রতিষ্ঠানটির পরিচালক মাওলানা শহিদুল ইসলাম এই বিপুল অর্থ আত্মসাৎ করে গা-ঢাকা দিয়েছেন বলে অভিযোগ রয়েছে। অর্থ খুইয়ে চরম বিপদে পড়েছেন গ্রামের সহজ-সরল হতদরিদ্র মানুষ। তারা অর্থ ফেরতসহ ঘটনার বিচার দাবি করেছেন। 

সরেজমিনে ভুক্তভোগী ও স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, অভিযুক্ত শহিদুল ইসলাম বগুড়া সদর বৃন্দাবন পাড়ার আকবর আলীর ছেলে। তিনি গাইবান্ধা সদর উপজেলার মধ্য নারায়ণপুর এলাকার মহিলা মাদ্রাসার অধ্যক্ষ মাওলানা আল আমিনের সঙ্গে সখ্য গড়ে তুলে এলাকায় যাতায়াত শুরু করেন। নিজেকে একটি বড় সংগঠনের কর্মকর্তা পরিচয় দিয়ে তিনি সাধারণ মানুষের আস্থা অর্জন করেন।

প্রতারণার শুরুতে শহিদুল ইসলাম মাত্র ২০০ টাকার বিনিময়ে দুটি পরিবারকে নলকূপ বসিয়ে দেন। এতে স্থানীয়দের মধ্যে বিশ্বাসযোগ্যতা তৈরি হয়। পরে আরও শতাধিক পরিবারের কাছ থেকে টাকা নিয়ে ১৫টি নলকূপ স্থাপন করেন। এরপরই মূলত তিনি বড় ধরনের প্রতারণার ফাঁদ পাতেন বলে স্থানীয়রা অভিযোগ করেন।  

নতুন প্যাকেজ হিসেবে তিনি ঘোষণা দেন, একটি আধা পাকা ঘর, একটি নলকূপ, একটি গাভি ও একটি ছাগল দেওয়া হবে। এর বিনিময়ে পরিবারপ্রতি ২০ থেকে ২৫ হাজার টাকা দাবি করেন তিনি। ঘর পাওয়ার আশায় দরিদ্র মানুষ কেউ গবাদিপশু বিক্রি করে, আবার কেউ চড়া সুদে ঋণ নিয়ে তার হাতে টাকা তুলে দেন। প্রমাণ হিসেবে দেওয়া হয় সংগঠনের সিলযুক্ত টোকেন।

সরেজমিনে গিয়ে জানা যায়, মধ্য নারায়ণপুর এলাকায় আটটি ঘরের শুধু চালা বসিয়েই কাজ বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। খোলাবাড়ি গ্রামের ভুক্তভোগী বজলার রহমান বলেন, ‘‘ঘর পাওয়ার আশায় ধারদেনা করে হুজুরকে টাকা দিয়েছিলাম। এখন তিনি পলাতক। আমরা কিভাবে এই ক্ষতি সামাল দেব জানি না।’’

মাত্র ৮টি ঘরের চাল তৈরি করে দিয়ে প্রতারক চক্র মানুষের আস্থা অর্জন করে।

আরেক ভুক্তভোগী জামেরতল গ্রামের সোহেল মিয়া বলেন, ‘‘হুজুরকে বিশ্বাস করে বিরাট ভুল করেছি। তিনি যে এভাবে টাকা নিয়ে পালিয়ে যাবেন, কল্পনাও করিনি। কীভাবে টাকা ফেরত পাওয়া যাবে, তাও জানি না।’’

‘‘স্থানীয় আল আমিন হুজুরের মাধ্যমে আমরা শহিদুল হুজুরকে টাকা দিয়েছি,’’ বলেন সোহেল মিয়া। 

এ ঘটনায় মধ্যস্থতাকারী হিসেবে প্রতারিত হয়েছেন মাদ্রাসার অধ্যক্ষ হাফেজ আল আমীনও। তিনি জানান, তার মাধ্যমে ৩৬৬ জন ব্যক্তির টাকা শহিদুল ইসলামের হাতে গেছে। ২০ হাজার করে হলেও টাকার অঙ্কে যার পরিমাণ দাঁড়ায় ৭৩ লাখ ২০ হাজার টাকা। বিপুল পরিমাণ টাকার পাওনাদারদের চাপে এবং টাকা উদ্ধারের আশায় তিনি আদালতে মামলা করেছেন।

এ ব্যাপারে অভিযুক্ত মাওলানা শহিদুল ইসলামের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও মুঠোফোন বন্ধ থাকায় তার বক্তব্য পাওয়া যায়নি।

এর আগে গত ১ মে উচ্চ মুনাফা ও সহজ শর্তে ঋণ দেওয়ার প্রলোভন দেখিয়ে গ্রাহকদের কাছ থেকে কোটি টাকা হাতিয়ে নিয়ে রাতারাতি উধাও হয়ে যায় ‘তিশা ফাউন্ডেশন’ নামে একটি কথিত বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থা। এতে শতাধিক গ্রাহক চরম বিপাকে পড়েন। এই কথিত এনজিওর পরিচালক জসিম মিয়া মাত্র সাত দিনের মধ্যেই কোটি টাকা প্রতারণা করে কর্মকর্তাসহ রাতারাতি পালিয়ে যান। এরপর ভুক্তভোগীদের পক্ষে গাইবান্ধা সদর থানায় প্রতিকার চেয়ে লিখিত অভিযোগ করেন গাইবান্ধা শহরের সবুজপাড়ার সেনেটারী ব্যবসায়ী রতন মিয়া। 

মামলার অগ্রগতি সম্পর্কে জানতে চাইলে গাইবান্ধা সদর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা আব্দুল্লাহ আল মামুন বলেন, ‘‘প্রতারক চক্রটিকে শনাক্ত ও গ্রেপ্তারে কাজ চলছে। দ্রুত তাদের আইনের আওতায় আনা হবে।’’ 

গাইবান্ধা সামাজিক সংগ্রাম পরিষদের আহ্বায়ক সিরাজুল ইসলাম বাবু বলেন, ‘‘এ ধরনের প্রতারণা ঠেকাতে পুলিশের পাশাপাশি সামাজিক সচেতনতা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এক্ষেত্রে সমাজের সব শ্রেণী পেশার মানুষের মাঝে সচেতনতা বৃদ্ধি করা প্রয়োজন।’’ 

গাইবান্ধার অতিরিক্ত পুলিশ সুপার শরীফ আল রাজিব বলেন, ‘‘প্রলোভনের এমন ফাঁদ অত্যন্ত ভয়ংকর ঘটনা। এসব থেকে সবাইকে সচেতন থাকতে হবে। এর আগে তিশা ফাউন্ডেশনের প্রতারণার ঘটনায় সদর থানায় অভিযোগ এসেছে। আমরা ঘটনা তদন্ত করে আসামিদের আইনের আওতায় আনার কাজ করছি। আল আনসার ওয়েলফেয়ার ফাউন্ডেশন বাংলাদেশ নামের প্রতিষ্ঠানের প্রতারণার বিষয়টি জানা নেই। তবে ভুক্তভোগীদের পক্ষ থেকে লিখিত অভিযোগ পেলে প্রয়োজনীয় আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।’’  

ঢাকা/মাসুম//

সর্বশেষ

পাঠকপ্রিয়