অফিস সংসার সন্তান- তিনে মিলে কর্মজীবী মায়েদের সংগ্রাম
সিলেট প্রতিনিধি || রাইজিংবিডি.কম
সকাল আটটা। সিলেট নগরের একটি বাসায় তখন তীব্র ব্যস্ততা। রান্নাঘরে চুলা জ্বলছে, অন্যদিকে ছোট শিশুকে স্কুলের জন্য প্রস্তুত করা হচ্ছে। এর মধ্যেই অফিসে যাওয়ার তাড়া। থামার উপায় নেই, ভাবার সময় নেই। এই বাস্তবতা এখন নগরের বহু কর্মজীবী মায়ের প্রতিদিনের গল্প।
মা দিবসে তাদের অনেকেই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ফুলের শুভেচ্ছা পান, আবেগঘন পোস্ট দেন। কিন্তু বাস্তব জীবনে তারা প্রতিনিয়ত লড়াই করেন সময়, দায়িত্ব আর সামাজিক প্রত্যাশা নিয়ে।
সিলেট নগরের একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে চাকরি করেন শারমিন আক্তার। তিনি বলেন, ‘‘অফিস থেকে ফিরে আবার সংসার সামলাতে হয়। অনেক সময় নিজের জন্য আলাদা সময়ই থাকে না।’’
কর্মজীবী নারীদের সংখ্যা বাড়লেও তাদের জন্য প্রয়োজনীয় সহায়তা এখনো সীমিত। বিশেষ করে শিশুদের দেখাশোনার জন্য নিরাপদ ডে-কেয়ারের অভাব এখন সবচেয়ে বড় সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়েছে। অনেক মা বাধ্য হয়ে সন্তানকে আত্মীয়ের কাছে রেখে অফিস করেন। কেউ কেউ শেষ পর্যন্ত সন্তানের কথা ভেবে চাকরি ছেড়ে দিতে বাধ্য হন।
সিলেট উইমেনস জার্নালিস্ট ক্লাবের সাধারণ সম্পাদক সাংবাদিক শাকিলা ববি বলেন, ‘‘আমার মেয়ের ৯ মাস বয়স থেকে ওকে সাথে নিয়ে কাজ করছি। হরতাল অবরোধ, জনসভা, আন্দোলনসহ আমি সব কাভার করেছি আমার মেয়েকে নিয়ে। এটা আমি আমার দায়িত্ববোধের পাশাপাশি অনেকটা বাধ্য হয়েও করছি। কারণ মেয়েকে বাসায় একা রেখে যেতে আমি পারবো না। কিন্তু যেহেতু আমার পেশা ঝুঁকিপূর্ণ তাই অনেক সাবধানতাও অবলম্বন করতে হয়। এখন সে স্কুলে যাওয়া শুরু করেছে। তাই দায়িত্ব আরও বেড়েছে।’’
একজন কর্মজীবী নারীর জন্য কর্মস্থল, সন্তান, সংসার- তিনটা মিলে কাজ করাটা রীতিমতো যুদ্ধ। তবে এত কিছুর পরও খারাপ লাগে তখন, যখন আশপাশের কিছু মানুষ বাচ্চা লালন পালনের অযৌক্তিক জ্ঞান দিতে আসে। কিন্তু আর দশটা বাচ্চার চেয়ে আমার মেয়ে বেশি সুস্থ আছে। তাছাড়া মায়েরা সব পারে, মায়েরা সব কিছু হাসি মুখে মেনে নেয়।’’
এ ধরনের উক্তি কর্মজীবী মায়েদের উপর বেশি চাপ সৃষ্টি করে উল্লেখ করে শাকিলা ববি বলেন, ‘‘আমার মেয়ের হাসি আমার সারাদিনের ক্লান্তি ভুলিয়ে দিতে পারলেও আমার উপর অর্পিত সব দায়িত্ব পালন করতে আমাকে হাঁপিয়ে উঠতে হয়। সব দায়িত্ব পালনের জন্য সবাই মুখে বাহবা দিলেও দায়িত্ব বা কাজ কেউ করে দেয় না। দিনশেষে আমার সব কাজ আমাকেই করতে হয়।’’
সিলেট নগরের কয়েকটি প্রতিষ্ঠানে মাতৃত্বকালীন সুবিধা থাকলেও সবখানে পরিস্থিতি এক নয়। বেসরকারি অনেক প্রতিষ্ঠানে এখনো নারীবান্ধব পরিবেশ গড়ে ওঠেনি বলে অভিযোগ রয়েছে।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক ব্যাংক কর্মকর্তা বলেন, ‘‘অফিসে দায়িত্ব আছে, আবার সন্তানও আছে। সন্তান অসুস্থ হলে ছুটি নেওয়া নিয়ে অনেক সময় বিব্রতকর পরিস্থিতিতে পড়তে হয়। দুই দিক সামলানো সত্যিই কঠিন।’’
নগরীর হাড়িকাব্য রেস্টুরেন্টের মালিক ও শেফ জান্নাতুল ফেরদৌস রাখি বলেন, ‘‘একটা রেস্টুরেন্ট চালানো মানে শুধু রান্না করা না। সকালে বাজার, তারপর রান্না, তারপর কাস্টমার সামলানো এর মাঝেই আমার ছেলে-মেয়েকে স্কুলে দিয়ে আসতে হয়, নিয়ে আসতে হয়। অনেকে জিজ্ঞেস করেন, এত কিছু একসঙ্গে কীভাবে পারেন? আমি বলি, পারতে হয়, কারণ আর কেউ নেই।’’
‘‘মা হওয়ার পর থেকে ঘুম কমে গেছে, নিজের সময় বলে কিছু নেই। রাতে রেস্টুরেন্ট বন্ধ করে বাসায় ফিরি, তখনো মাথায় ঘুরতে থাকে কাল সকালে কী রান্না হবে, ছেলে-মেয়ের পরীক্ষা কবে, তার নতুন জামা কেনা হলো কি না। কিন্তু ছেলে-মেয়ে যখন বলে, আম্মু তুমি সেরা শেফ তখন মনে হয় সব পরিশ্রম সার্থক,’’ বলেন ফেরদৌস রাখি।
মা দিবসে শহরের ব্যস্ত রাস্তাগুলো যেমন থেমে থাকে না, তেমনি থামে না কর্মজীবী মায়েদের ছুটে চলা। তাদের এই নীরব সংগ্রামই নগরজীবনের এক অনুচ্চারিত সত্য।
ঢাকা/মোসাইদ//