ঢাকা     শনিবার   ২৩ মে ২০২৬ ||  জ্যৈষ্ঠ ৯ ১৪৩৩ || ৭ জিলহজ ১৪৪৭ হিজরি

Risingbd Online Bangla News Portal

মৃত সঙ্গীর অপেক্ষায় দেড় ঘণ্টা দাঁড়িয়ে রইল ভেড়ার পাল

মঈনুদ্দীন তালুকদার হিমেল, ঠাকুরগাঁও  || রাইজিংবিডি.কম

প্রকাশিত: ১২:২২, ২২ মে ২০২৬  
মৃত সঙ্গীর অপেক্ষায় দেড় ঘণ্টা দাঁড়িয়ে রইল ভেড়ার পাল

মৃত সঙ্গীর দিকে তাকিয়ে সড়ক ডিভাইডারে অপেক্ষারত ভেড়ার পাল। ঠাকুরগাঁওয়ের স্টেশন রোডের মুন্সীরহাট এলাকা থেকে তোলা ছবি।

রাস্তার কালো পিচের ওপর নিথর হয়ে পড়ে আছে একটি ভেড়া। কোনো দ্রুতগামী গাড়ির ধাক্কায় মুহূর্তেই শেষ হয়ে গেছে তার প্রাণ। কিন্তু, ঘটনার পরের দৃশ্যটি ছুঁয়ে গেছে উপস্থিত সবার হৃদয়। মৃত সঙ্গীকে ফেলে চলে যায়নি পালের বাকি সদস্যরা। রাস্তার মাঝখানে ডিভাইডারে ঠায় দাঁড়িয়ে ছিল প্রায় দেড় ঘণ্টা। 

ঠাকুরগাঁওয়ের সদর উপজেলার মুন্সীর হাট এলাকায় আবেগঘন ও অভূতপূর্ব এ দৃশ্যের সাক্ষী হলেন স্থানীয় বাসিন্দা ও পথচারীরা। মানুষের মাঝে যখন দিনদিন মানবিকতা আর সহানুভূতির অভাব দেখা যাচ্ছে, ঠিক তখনই অনন্য ভালোবাসার দৃষ্টান্ত স্থাপন করল অবলা এই প্রাণী। 

স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, প্রতিদিনের মতোই খামারি মো. ফরিদের ভেড়ার পাল এক সাথে চড়তে বের হয়েছিল। মুন্সীরহাট এলাকায় সড়ক পার হওয়ার সময় দ্রুতগামী যান একটি ভেড়াকে ধাক্কা দিলে ঘটনাস্থলেই সেটি মারা যায়। সাধারণত কোনো দুর্ঘটনার পর চারপাশের মানুষ বা প্রাণীরা ভয়ে এদিক-ওদিক ছুটে পালায়। কিন্তু এক্ষেত্রে ঘটলো সম্পূর্ণ উল্টো, সঙ্গীর মৃত্যুর পরপরই বাকি ভেড়াগুলো তাকে ফেলে চলে যায়নি। বরং মৃত সঙ্গীর অপেক্ষায় দাঁড়িয়ে পড়ে তারা। অবলা প্রাণীদের এমন গভীর মায়া ও ঐক্য দেখে উপস্থিত অনেকেই আবেগাপ্লুত হয়ে পড়েন।

​ঘটনার সময় রাস্তার পাশেই ছিলেন দোকানি মো. মোস্তাক আলী। তিনি ঘটনার বিবরণ দিয়ে বলেন, “হঠাৎ একটা বিকট শব্দ শুনলাম। তাকিয়ে দেখি একটা ভেড়া রাস্তার ওপর ছটফট করে মরে গেল। অবাক করা বিষয় হলো, গাড়িটা চলে যাওয়ার পর পালের বাকি ভেড়াগুলো এদিক-ওদিক ছুটে না পালিয়ে ঠিক রাস্তার ডিভাইডারে এসে জড়ো হলো। তারা মৃত ভেড়াটার দিকে তাকিয়ে দাঁড়িয়ে ছিল।”

​রাস্তায় জটলা দেখে এগিয়ে এসেছিলেন পথচারী সুজন মিয়া। তিনি বলেন, “ভেড়াগুলোকে রাস্তা থেকে সরানোর চেষ্টা করেও লাভ হয়নি। আমরা কয়েকজন মিলে লাঠি উঁচিয়ে, শব্দ করে ভেড়াগুলোকে তাড়ানোর চেষ্টা করেছি, যাতে অন্য কোনো গাড়ি এসে আবার দুর্ঘটনা না ঘটায়। অদ্ভুত ব্যাপার, ওরা ভয় পেয়ে একটুও সরল না। মাটিতে পড়ে থাকা সঙ্গীর দিকে চেয়ে দাঁড়িয়ে ছিল। আমাদের মনে হচ্ছিল, ওরা হয়তো ভাবছে ওদের সঙ্গী আবার উঠে দাঁড়াবে আর ওদের সাথে পালে যোগ দেবে।”

তিনি বলেন, “​এভাবে প্রায় দেড় ঘণ্টারও বেশি সময় ধরে ভেড়ার পালটি রাস্তার মাঝখানেই অবস্থান করে। ফলে সড়কে কিছুটা সময় যানবাহন চলাচলেও বিঘ্ন ঘটে।”

খবর পেয়ে দেড় ঘণ্টা পর ঘটনাস্থলে আসেন ভেড়ার মালিক মো. ফরিদ। তিনি রাস্তা থেকে মৃত ভেড়াটিকে সরিয়ে নেওয়ার পর বাকি ভেড়াগুলো শান্ত হয় এবং তার সঙ্গে রাস্তা ছেড়ে চলে যায়। 

ভেড়াদের এমন আচরণের বিষয়ে জানতে চাওয়া হলে আবেগপ্লুত কণ্ঠে ফরিদ বলেন, “মানুষ মনে করে এরা অবলা প্রাণী, এদের বুদ্ধি বা আবেগ নেই। কিন্তু এদের ভেতরের টান মানুষের চেয়ে কোনো অংশে কম না। আমি ৩০ বছর ধরে ভেড়া পালন করছি। এতদিনের অভিজ্ঞতায় আমি দেখেছি, ভেড়াদের একটা স্বভাব আছে, এরা সবসময় দলবদ্ধ হয়ে চলে। দলের কেউ বিপদে পড়লে বা হারিয়ে গেলে এরা সহজে তাকে ছেড়ে যায় না।”

​তিনি আরো ব্যাখ্যা করেন, “আজকে যেখানে দুর্ঘটনা ঘটেছে, সেখানে ওরা ওদের সঙ্গীর মৃত্যুটা মেনে নিতে পারছিল না। ওরা ভাবছিল, হয়তো ও একটু পরেই উঠে দাঁড়াবে। আমি এসে যখন মৃত ভেড়াটাকে সরিয়ে নিলাম, তখন ওরা বুঝতে পারল যে ওদের সঙ্গী হয়তো আমার হেফাজতে আছে। এরপরই ওরা আমার সঙ্গে রাস্তা থেকে সরে আসে। ওদের এই ভালোবাসা দেখে আমার নিজেরও চোখ ফেটে পানি চলে এসেছে।”

এই বিষয়ে ঠাকুরগাঁও সরকারি কলেজের প্রাণীবিজ্ঞান বিভাগের প্রভাষক প্রাণীবিদ ডালিম কুমার রয় জানান, “পশু-পাখিদের এমন আচরণ মানুষের কাছে অদ্ভুত মনে হলেও, এটি তাদের এক ধরনের আদিম ও শক্তিশালী সামাজিক বন্ধন। হাতি, তিমি, শিম্পাঞ্জি কিংবা কুকুরের মতো গৃহপালিত ও স্তন্যপায়ী প্রাণীদের মধ্যে শোক প্রকাশের তীব্র অনুভূতি থাকে। দলবদ্ধ প্রাণীরা যখন তাদের কোনো সঙ্গীকে হঠাৎ হারিয়ে ফেলে, তখন তারা এক ধরনের মানসিক ধাক্কা বা ‘গ্রিফ’ এর মধ্য দিয়ে যায়। ভেড়াদের ক্ষেত্রে এই দলবদ্ধতা বা হার্ড মেন্টালিটি অত্যন্ত তীব্র। তারা বিপদের মুহূর্তে বিচ্ছিন্ন না হয়ে আরো বেশি একত্রিত হয়, মুন্সীর হাটের এই ঘটনাটি যার স্পষ্ট  উদাহরণ।”

​মুন্সীর হাটের এই ঘটনাটি এখন স্থানীয় মানুষের মুখে মুখে ঘুরছে। প্রকৃতির বুকে প্রাণীদের মধ্যকার এই নিঃস্বার্থ ভালোবাসা ও একাত্মতা আরো একবার প্রমাণ করে দিল- ভাষা না থাকলেও শোক এবং ভালোবাসার অনুভূতি তাদের মাঝেও দৃশ্যমান।

ঢাকা/মাসুদ

সর্বশেষ

পাঠকপ্রিয়