হাওরে ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকের তালিকা যাচাইয়ে জটিলতা, প্রণোদনায় ধীরগতি
রুমন চক্রবর্তী, কিশোরগঞ্জ || রাইজিংবিডি.কম
হাওরাঞ্চলের কৃষকের বছরের একমাত্র আশা বোরো ধানের ভালো ফলন। এবার ফলন ভালো হওয়ায় কৃষকের চোখে-মুখে লেগেছিল খুশির আমেজ। কিন্তু হঠাৎ করেই কৃষকের সেই আনন্দ কেড়ে নিয়েছে প্রকৃতি। বৃষ্টি আর উজানের ঢলে তলিয়ে গেছে প্রায় ১৫ হাজার হেক্টর বোরো ধানের জমি। এতে ক্ষতির পরিমাণ টাকার অঙ্কে দাঁড়িয়েছে প্রায় ২৬০ কোটি টাকা। ফলে দুশ্চিন্তায় দিশেহারা হয়ে পড়েছেন হাওরের কৃষক।
এমন যখন পরিস্থিতি তখন কিছুটা হলেও তিনমাস সরকারি প্রণোদনার আশ্বাস কৃষকের মনে স্বত্বির বাতাস যুগিয়েছে। এতে ক্ষতি পুরোপুরি না মিটলেও পরিবার নিয়ে দুবেলা খেয়েপরে বাঁচার স্বপ্ন দেখছেন তারা। কিন্তু প্রণোদনার জন্য প্রাথমিক তালিকা তৈরির পর যাচাই-বাছাইয়ের কাজে ধীরগতি ও অন্যান্য জটিলতার কারণে কৃষকের সেই স্বপ্নও ফিঁকে হতে শুরু করেছে।
জানা গেছে, চূড়ান্ত তালিকা এখনও প্রস্তুত হয়নি। এমনকি এখনও বাজেট চাওয়া হয়নি ত্রাণ মন্ত্রণালয়ে। এমন পরিস্থিতিতে জেলার ইটনা, মিঠামইন ও অষ্টগ্রাম হাওরের কৃষক রয়েছেন চরম বিপাকে। তারা সরকারের পক্ষ থেকে আর্থিক সহযোগিতার দ্রুত বাস্তবায়ন চান।
অষ্টগ্রাম হাওরের কৃষক আজমল মিয়ার বৃষ্টি আর উজানের ঢলে ক্ষতি হয়েছে প্রায় ৩ একর জমির ধান। তিনি বলেন, ‘‘সরকার যে ক্ষতিপূরণ দিতাছে, হেইড্যা আর কয় টেহা! বড়জোড় দুই, চার, পাঁচ হাজার। কিন্তু আমরার মতো কৃষকের যে লাখ লাখ টেহা ক্ষতি হইছে, হেই ভর্তুকি কি কমানো যাইবো?’’
এমন হাজারো প্রশ্ন ঘুরছে ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের মনে। হতাশায় বিবর্ণ ইটনা হাওরের কৃষক কামরুল ইসলাম। তিনি বলেন, ‘‘ঋণ পরিশোধ করমু না সংসার চালামু? এই চিন্তায় চক্ষে ঘুম আহে না। ধানের দাম নাই, সরকার কইছে কৃষকের পাশে আছে। তিন মাস পরিবার চালাইতে টেহা দিবো, কিন্তু কই? খালি লিস্টি (তালিকা) আর লিস্টি। অমুক কাগজ দেও, তমুক কাগজ দেও। আর পারতাছিনারে ভাই। এইবার অন্তত সরকার আমরারে একটু দেহুক।’’
এ প্রসঙ্গে জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের অতিরিক্ত উপ-পরিচালক কৃষিবিদ মো. শাহীনুল ইসলাম বলেন, ‘‘অতিবৃষ্টি ও উজানের ঢলে হাওরের যে সকল কৃষকের ক্ষতি হয়েছে প্রধানমন্ত্রী তাদের তিনমাসের জন্য প্রণোদনা দেওয়ার আশ্বাস দিয়েছেন। সে মোতাবেক ক্ষতিগ্রস্ত এলাকাগুলোর ইউনিয়নের চেয়ারম্যান ও উপ-সহকারী কৃষি কর্মকর্তারা কৃষকদের তালিকা প্রস্তুত করে প্রত্যেক উপজেলার প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তার কাছে জমা দিয়েছেন।’’
জেলা ত্রাণ ও পুনর্বাসন অফিসের তথ্য অনুযায়ী, কিশোরগঞ্জের হাওরে তিন ক্যাটাগরিতে ৫২ হাজার ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকের প্রাথমিক তালিকা করা হয়েছে। তাদের মধ্যে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকরা পাবেন সাড়ে সাত হাজার টাকা, মাঝারি ক্ষতিগ্রস্তদের দেওয়া হবে পাঁচ হাজার টাকা এবং যাদের তুলনামূলক কম ক্ষতি হয়েছে তারা প্রতি মাসে আড়াই হাজার টাকা করে আগামী তিনমাস পাবেন। তাছাড়া প্রত্যেককে প্রতি মাসে দেওয়া হবে বিশ কেজি করে চাল।
তালিকা প্রস্তুতির ব্যাপারে জেলা ত্রাণ ও পুনর্বাসন কর্মকর্তা মো. বদরুদ্দোজা বলেন, ‘‘তিন ক্যাটাগরিতে তালিকা প্রস্তুত হচ্ছে। সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত, কম ক্ষতিগ্রস্ত এবং আংশিক ক্ষতিগ্রস্ত। প্রথমে একটি তালিকা প্রস্তুত করা হয়েছিল। সেটিকে স্বচ্ছ করতে এখন নতুন করে তালিকা যাচাই-বাছাই করা হচ্ছে। চূড়ান্ত তালিকা প্রস্তুত হলেই বাজেটের জন্য পাঠানো হবে ত্রাণ মন্ত্রণালয়ে। তারপর বরাদ্দ আসলে আমরা তালিকা অনুযায়ী কৃষকদের প্রণোদনা দিতে পারব।’’
জেলায় এ বছর বোরো আবাদ হয়েছে ১ লাখ ৬৮ হাজার হেক্টর জমিতে। যেখানে শুধু হাওরাঞ্চলেই আবাদ হয়েছে ১ লাখ ৪ হাজার হেক্টর। এখন ক্ষতিগ্রস্ত কৃষক তাকিয়ে আছেন সরকারি প্রণোদনা দিকে। অন্তত পরিবার নিয়ে চলার জন্য হলেও দ্রুত প্রণোদনার বাস্তবায়ন চান তারা।
ঢাকা/তারা//
এক মাসের মধ্যে রামিসা হত্যার বিচার হবে: প্রধানমন্ত্রী