ঢাকা     সোমবার   ১৫ জুন ২০২৬ ||  আষাঢ় ১ ১৪৩৩ || ২৯ জিলহজ ১৪৪৭ হিজরি

Risingbd Online Bangla News Portal

জৈনা বাজারে জমে উঠেছে কাঁঠাল বেচাকেনা

গাজীপুর (পূর্ব) প্রতিনিধি || রাইজিংবিডি.কম

প্রকাশিত: ১২:৫৭, ১৫ জুন ২০২৬   আপডেট: ১৩:০১, ১৫ জুন ২০২৬
জৈনা বাজারে জমে উঠেছে কাঁঠাল বেচাকেনা

ছবি: রাইজিংবিডি

গাজীপুরের শ্রীপুর উপজেলার জৈনা বাজারে এখন যেন কাঁঠালের উৎসব। ভোরের প্রথম আলো ফুটতেই বাজারজুড়ে শুরু হয় ব্যস্ততা। দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে আসা পাইকার, স্থানীয় ব্যবসায়ী, শ্রমিক ও কৃষকদের পদচারণায় মুখর হয়ে ওঠে পুরো এলাকা।

আরো পড়ুন:

বাজারের দুই পাশে সারি সারি কাঁঠাল, দরদাম নিয়ে আলোচনা, শ্রমিকদের ব্যস্ত দৌড়ঝাঁপ আর ট্রাকভর্তি ফল দেশের নানা গন্তব্যে পাঠানোর প্রস্তুতি- সব মিলিয়ে জৈনা বাজার এখন মৌসুমী অর্থনীতির এক প্রাণচঞ্চল কেন্দ্র।

ঢাকা-ময়মনসিংহ মহাসড়কের পাশে গড়ে ওঠা এ বাজারে প্রতিদিন হাজার হাজার কাঁঠালের বেচাকেনা হচ্ছে। কোথাও কৃষকরা গাছ থেকে নামানো কাঁঠাল সাজিয়ে রাখছেন, কোথাও চলছে আকার ও মান অনুযায়ী বাছাই। মিষ্টি সুবাসে ভরে উঠেছে পুরো বাজার এলাকা।

স্থানীয় কৃষকদের ভাষ্য, এ বছর আবহাওয়া অনুকূলে থাকায় কাঁঠালের ফলন সন্তোষজনক হয়েছে। গাছে গাছে বড় আকারের কাঁঠাল ধরেছে, উৎপাদনও বেড়েছে আগের তুলনায়। তবে ফলন ভালো হলেও কাঙ্ক্ষিত লাভের মুখ দেখছেন না অনেক চাষি।

মাওনা গ্রামের কাঁঠালচাষি রফিকুল ইসলাম বলেন, “গাছে প্রচুর কাঁঠাল ধরেছে। কিন্তু বাজারে এসে সবসময় ভালো দাম পাওয়া যায় না। উৎপাদনের পর লাভের বড় অংশ বিভিন্ন মধ্যস্বত্বভোগীর কাছে চলে যায়।”

একই ধরনের অভিজ্ঞতার কথা জানান মাওনা উত্তরপাড়া গ্রামের কৃষক আল আমিন। তিনি বলেন, “পরিবহন খরচ বেড়ে যাওয়ায় আয় কমে যাচ্ছে। অনেক সময় বাজার পরিস্থিতির কারণে কম দামে কাঁঠাল বিক্রি করতে বাধ্য হই। কৃষকদের সরাসরি বাজার ব্যবস্থার সঙ্গে যুক্ত করার সুযোগ বাড়ানো দরকার।”

শুধু গাজীপুর নয়, দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে শ্রীপুরের কাঁঠালের সুনাম রয়েছে। তাই মৌসুম এলেই দূর-দূরান্ত থেকে পাইকাররা ভিড় জমান জৈনা বাজারে।

সিলেট থেকে আসা পাইকার সুলতান আহমদ বলেন, “শ্রীপুরের কাঁঠাল আকারে বড় এবং স্বাদে অনন্য। এখান থেকে কাঁঠাল সংগ্রহ করে দেশের বিভিন্ন জেলায় সরবরাহ করি।”

রাজধানী ঢাকা থেকে আসা ব্যবসায়ী ফরিদ হোসেন জানান, চাহিদা ভালো থাকলেও সংরক্ষণ সুবিধার অভাব ব্যবসায়ীদের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ। তিনি বলেন, “কাঁঠাল বেশিদিন সংরক্ষণ করা যায় না। ফলে দ্রুত বিক্রি করতে হয়। পাশাপাশি পরিবহন ব্যয়ও বেড়েছে, যা ব্যবসায়িক ঝুঁকি বাড়াচ্ছে।”

স্থানীয়দের মতে, কাঁঠালের মৌসুম ঘিরে জৈনা বাজারে সৃষ্টি হয় ব্যাপক কর্মসংস্থান। কৃষক, শ্রমিক, পরিবহনকর্মী, আড়তদার, ভ্যানচালক ও ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের অনেকেই এই মৌসুমী বাণিজ্যের ওপর নির্ভরশীল। তবে আধুনিক সংরক্ষণাগার ও প্রক্রিয়াজাতকরণ শিল্পের অভাবে প্রতিবছর উল্লেখযোগ্য পরিমাণ কাঁঠাল নষ্ট হয়ে যায়।

পুষ্টিগুণের দিক থেকেও কাঁঠাল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বলে জানিয়েছেন শ্রীপুর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের আবাসিক মেডিকেল কর্মকর্তা ডা. বিজন মালাকার। তিনি বলেন, “কাঁঠালে ভিটামিন-এ, ভিটামিন-সি, পটাশিয়াম এবং খাদ্যআঁশ রয়েছে। পরিমিত পরিমাণে কাঁঠাল খেলে শরীরের পুষ্টির চাহিদা পূরণ হয় এবং রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়তে সহায়তা করে।”

কৃষি বিভাগও শ্রীপুরের কাঁঠালকে ঘিরে বড় সম্ভাবনার কথা বলছে। শ্রীপুর উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা কৃষিবিদ সুমাইয়া সুলতানা বন্যা বলেন, “এ অঞ্চলের অন্যতম অর্থকরী ফল কাঁঠাল। কৃষকদের প্রশিক্ষণ, উন্নত উৎপাদন ব্যবস্থা এবং বাজারজাতকরণ সুবিধা বাড়াতে কৃষি বিভাগ নিয়মিত কাজ করছে।”

সংশ্লিষ্টদের মতে, আধুনিক সংরক্ষণ ব্যবস্থা, কাঁঠালভিত্তিক প্রক্রিয়াজাত শিল্প এবং রপ্তানিমুখী উদ্যোগ গড়ে তোলা গেলে শ্রীপুরের কাঁঠাল দেশের অর্থনীতিতে আরো বড় অবদান রাখতে সক্ষম হবে। একই সঙ্গে কৃষকরাও তাদের উৎপাদিত ফসলের ন্যায্য মূল্য পাবেন।

স্থানীয়দের ভাষায়, জৈনা বাজার কেবল একটি মৌসুমি ফলের হাট নয়; এটি শ্রীপুরের গ্রামীণ অর্থনীতির স্পন্দন। কাঁঠালের মৌসুম এলেই এই বাজার ঘিরে জেগে ওঠে হাজারো মানুষের জীবিকা, আর জাতীয় ফলের সুবাসে নতুন প্রাণ ফিরে পায় পুরো জনপদ।

ঢাকা/রফিক/ফিরোজ

সম্পর্কিত বিষয়:

সর্বশেষ

পাঠকপ্রিয়