ঢাকা, শুক্রবার, ২৭ চৈত্র ১৪২৬, ১০ এপ্রিল ২০২০
Risingbd
সর্বশেষ:

‘অপরাজেয় বাংলা’ স্বাধীন দেশের এক টুকরো ইতিহাস

জাহিদ হাসান : রাইজিংবিডি ডট কম
     
প্রকাশ: ২০২০-০৩-২৬ ৩:৪৩:৫০ পিএম     ||     আপডেট: ২০২০-০৩-২৬ ৩:৪৩:৫০ পিএম

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতিটি অলিগলিই যেন একেকটি আন্দোলন, একেকটি সংগ্রাম, একেকটি ইতিহাস। ব্রিটিশ শাসনামল থেকে ৫২-এর ভাষা আন্দোলন, ৬৬- এর ছয় দফা, ৬৯-এর গণ-অভ্যুত্থান, ৭১-এর মহান মুক্তিযুদ্ধ, ৯০-এর স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলন, এক- এগারোসহ সব জাতীয় আন্দোলনের সূতিকাগার এই সর্বোচ্চ বিদ্যাপীঠ।

এসব আন্দোলন থেকে উদ্দীপনা নিতে এবং দেশের শ্রেষ্ঠ সন্তানদের স্মরণীয় করে রাখতে সময়ে সময়ে এখানে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে বহু ভাস্কর্য। তেমনই একটি ভাস্কর্য অপরাজেয় বাংলা।

অপরাজেয় বাংলা ‘মুক্তিযুদ্ধে আমি অস্ত্র ধরতে পারিনি। এই ভাস্কর্য নির্মাণ করতে গিয়ে দুই হাত রক্তাক্ত করে দেশের প্রতি আমার ঋণ শোধ করলাম’ নির্মাণ শেষে এভাবেই
অভিব্যক্তি প্রকাশ করেছিলেন ‘অপরাজেয় বাংলা’ ভাস্কর্যের শিল্পী সৈয়দ আবদুল্লাহ খালিদ।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভাস্কর্যের কথা বললে মানসপটে অপরাজেয় বাংলার ছবিই যেন প্রথমে ভেসে ওঠে। দেশের সবচেয়ে পরিচিত ভাস্কর্যগুলোর মধ্যেও এটি একটি। উল্লেখ্য, দেশের কোনো শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে নির্মিত প্রথম ভাস্কর্য অপরাজেয় বাংলা।

তিন মুক্তিযোদ্ধার আবক্ষ ভাস্কর্যটি স্মরণ করিয়ে দেয় মুক্তিযুদ্ধের অগ্নিঝরা দিনগুলো, যে দিনগুলো ছিল বন্দিত্বের গ্লানি মুছে বাংলা মায়ের বক্ষ বিদীর্ণকারী শত্রুদের মূলোৎপাটন। আরো স্মরণ করিয়ে দেয়, স্বাধীনতা সংগ্রামে নারী-পুরুষসহ সর্বস্তরের মানুষের সম্মিলিত প্রতিরোধের কথা।

স্বাধীনতা পরবর্তী সময়ে, বাংলাদেশের আন্দোলনের প্রাণকেন্দ্র ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অবদানকে চিরস্মরণীয় করে রাখতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ (ডাকসু) উদ্যোগী হয়। এরই ধারাবাহিকতায় বটতলা থেকে খানিকটা দূরে তৎকালীন শিল্পী আব্দুল লতিফের নকশায় নির্মিত হয় একটি ভাস্কর্য। কিন্তু রাতের আঁধারে একদল দুর্বৃত্ত ভাস্কর্যটি ভেঙে ফেলে। পরবর্তী সময়ে সেখানেই আবার নতুন ভাস্কর্য নির্মাণের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয় এবং ভাস্কর্য নির্মাণের দায়িত্ব দেওয়া হয় সৈয়দ আবদুল্লাহ খালিদকে।

তিনি প্রথমে মাটি দিয়ে ভাস্কর্যের একটি মডেল তৈরি করেন। মডেলটি সবার পছন্দ হলে ১৯৭৩ সালের এপ্রিল মাসে এর আনুষ্ঠানিক নির্মাণ কাজ শুরু হয়। তখন থেকেই অক্লান্ত পরিশ্রম শুরু করে দেন আবদুল্লাহ খালিদ। তাঁর আর দিন-রাত বলে কিছু থাকে না। মানুষটার মগজে তখন একটাই চিন্তা-ভাস্কর্য তৈরি। রাস্তায় মানুষ, ছাত্র-ছাত্রীরা, পথচারীরা আগ্রহ নিয়ে তাকিয়ে থাকতো। তিনি কাজ থেকে নেমে আসতেন, সবার সাথে খোশগল্প করতেন, আবার কাজে ফিরে যেতেন। এভাবে এগিয়ে যেতে থাকে ভাস্কর্য নির্মাণের কাজ।

কিন্তু অপরাজেয় বাংলা ভাস্কর্যের নাম ‘অপরাজেয় বাংলা’ হলো কীভাবে? ভাস্কর্যটির নাম অপরাজেয় বাংলা হওয়ার কৃতিত্ব সে সময়ের ‘দৈনিক বাংলার’ সাংবাদিক মুক্তিযোদ্ধা সালেহ চৌধুরীর। তিনি ভাস্কর্য নিয়ে সেসময় দৈনিক বাংলাতে একটি প্রতিবেদন লিখেছিলেন, যার শিরোনাম ছিল ‘অপরাজেয় বাংলা’। পরবর্তী সময়ে এ নামটিই সর্বসম্মতিক্রমে গ্রহণ করা হয়।

সৈয়দ আবদুল্লাহ খালিদ কাজ শুরু করার কিছুদিন পরেই ঘটে যায় ইতিহাসের অন্যতম কালো অধ্যায়, ১৫ আগস্টের নির্মম হত্যাকাণ্ড। এরপর ভাস্কর্য নির্মাণের কাজ স্তিমিত হয়ে আসে। শহরের বুকে জায়গা করে নেয় বিধ্বংসী ট্যাংক। সেনাবাহিনীর একটা ট্যাংকের নল সবসময় ওই অপরাজেয় বাংলার দিকে তাক করা থাকতো, এমন একটি ভাব যেন যেকোনো মুহূর্তে গুঁড়িয়ে দেওয়া হবে!

পরবর্তী সময়ে নানা চড়াই-উৎরাই পেরিয়ে ১৯৭৯ সালের জানুয়ারি মাসে পুনরায় ভাস্কর্য নির্মাণের কাজ শুরু হয় এবং ১৬ ডিসেম্বর বিজয় দিবসে সকাল ৯টায় ভাস্কর্যটি উদ্বোধন করা হয়।

‘অপরাজেয় বাংলা’ ভাস্কর্যটির ভিত্তি অত্যন্ত মজবুত। ১৪০০ মাইল বেগের ঝড় মোকাবিলা করতে সক্ষম, ফাউন্ডেশন থাকবে কমপক্ষে হাজার বছর- এমনভাবে তৈরি এটি। ৬ ফুট বেদির উপর নির্মিত এ ভাস্কর্যটির উচ্চতা ১২ ফুট এবং প্রশস্ত ৮ ফুট। ভাস্কর্যটিতে তিনজন তরুণের মূর্তি প্রতীয়মান। এদের মধ্যে দুজন পুরুষ, একজন নারী। মূর্তির সর্ব ডানে রয়েছে ফাস্ট এইড বক্স হাতে কুচি দিয়ে শাড়ি পরা প্রত্যয়ী এক যোদ্ধা নারী সেবিকা। তাঁর পাশে কাঁধে রাইফেলের বেল্ট ধরা, কাছা দেওয়া লুঙ্গি পরনে এক যুবক, যার বা হাতে একটি গ্রেনেড- তিনি বৃহত্তর গ্রাম-বাংলার জনগোষ্ঠীর প্রতিনিধি। আর তার বাঁ-পাশে জিন্সপ্যান্ট পরা শহুরে তরুণ মুক্তিযোদ্ধা, যার হাতে থ্রি-নট-থ্রি রাইফেল এবং চোখে-মুখে স্বাধীনতার দীপ্ত চেতনা।

ফার্স্ট এইড বক্স হাতে সেবিকার ভূমিকায় যিনি মডেল হয়েছিলেন, তিনি হাসিনা আহমেদ। মাঝের মূর্তিটির মডেল বদরুল আলম বেনু। তিনি সৈয়দ আবদুল্লাহ খালিদের একান্ত সহযোদ্ধা এবং বন্ধুও ছিলেন। সবশেষে দাঁড়ানো দু’হাতে রাইফেল ধরা শহুরে তরুণ মুক্তিযোদ্ধা, যার মডেল হয়েছিলেন সৈয়দ হামিদ মকসুদ। তিনি ১৯৭৩ সালে বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র ছিলেন।

বাংলাদেশের টেলিভিশন সাংবাদিকতার পথিকৃৎ খ্যাত প্রয়াত মিশুক মুনিরের ক্যামেরার হাতেখড়ি এই অপরাজেয় বাংলার নির্মাণাধীন ছবি তোলার মাধ্যমে। অপরাজেয় বাংলা নিয়ে মিশুক মনির অসাধারণ একটি কথা বলেছিলেন। ‘অপরাজেয় বাংলা দেশের মানুষের কাছে পৌঁছাতে কোনো লিফলেটের দরকার পড়েনি। ছাত্র ইউনিয়ন, ছাত্রলীগ, বিএনপি হোয়াটএভার ইট ইজ, যাদেরই রাজনৈতিক কোনো বক্তব্য রাখার প্রয়োজন হতো, কোথায় হবে? অপরাজেয় বাংলায়। এই যে একটা ইউনিভার্সাল গ্রহণযোগ্যতা, এটা ৭৮, ৮৫, ৮৮ পর্যায়ক্রমে হয়েছে। এরকম উদাহরণ হয়তো কমই আছে, বিভিন্ন রাজনৈতিক দল একই ভেন্যু, একই ইমেজ, একই ফিলিংস থেকে রিলেট করছে, গ্রেট অ্যাচিভমেন্ট।’

ইট, পাথর আর কংক্রিট দিয়ে নির্মিত এই ভাস্কর্যগুলো শুধু ভাস্কর্যই নয়, প্রতিবাদের সাহসী প্রতীক। ভাস্কর্যগুলোর মাধ্যমে শিক্ষার্থী- দর্শনার্থীরা দেশের জাতীয় আন্দোলন সম্পর্কে জানতে পারেন। তরুণ প্রজন্মের মধ্যে জাগ্রত হয় দেশপ্রেম, নিজের অধিকার আদায়ের চেতনা।

লেখক: শিক্ষার্থী, আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়।

 

ঢাবি/হাকিম মাহি