ঢাকা     বৃহস্পতিবার   ২৩ এপ্রিল ২০২৬ ||  বৈশাখ ১০ ১৪৩৩ || ৫ জিলকদ ১৪৪৭ হিজরি

Risingbd Online Bangla News Portal

ইউরিয়া অপচয় রোধে বাকৃবিতে উদ্ভাবিত ন্যানো প্রযুক্তির সাফল্য

মো লিখন ইসলাম, বাকৃবি প্রতিনিধি || রাইজিংবিডি.কম

প্রকাশিত: ১৬:৪৫, ২৩ এপ্রিল ২০২৬  
ইউরিয়া অপচয় রোধে বাকৃবিতে উদ্ভাবিত ন্যানো প্রযুক্তির সাফল্য

দেশের কৃষিতে দীর্ঘদিন ধরে ইউরিয়া সারের অপচয় একটি বড় সমস্যা হিসেবে দেখা দিয়েছে। এতে যেমন উৎপাদন খরচ বাড়ছে, তেমনি পরিবেশও ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। মাঠে প্রয়োগ করা ইউরিয়ার বড় অংশই গাছ ব্যবহার করতে পারে না—একটি অংশ বাতাসে উড়ে যায়, আরেকটি অংশ মাটির নিচে লিচিং হয়ে পানিদূষণ ও গ্রিনহাউস গ্যাসের ঝুঁকি বাড়ায়। এই প্রেক্ষাপটে সম্ভাবনার নতুন দুয়ার খুলেছে বায়োচার (কার্বন) সমৃদ্ধ ন্যানো ইউরিয়া প্রযুক্তি, যা বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের (বাকৃবি) একদল গবেষক উদ্ভাবন করেছেন। বাংলাদেশ ধান গবেষণা ইনস্টিটিউটের (ব্রি) মাঠ পর্যায়ের পরীক্ষায় এর কার্যকারিতার প্রাথমিক প্রমাণ মিলেছে।

গবেষকরা জানান, এই প্রযুক্তিতে ইউরিয়া সারের কণাকে ২০ থেকে ৫০ ন্যানোমিটার আকারে রূপান্তর করে বায়োচার দিয়ে আবৃত করা হয়েছে। ফলে এটি ধীরে ধীরে নাইট্রোজেন ছাড়ে এবং ফসলের চাহিদা অনুযায়ী দীর্ঘ সময় ধরে পুষ্টি সরবরাহ করে। এর ফলে নাইট্রোজেন ব্যবহারের দক্ষতা ৭৫ থেকে ৮৫ শতাংশ পর্যন্ত বাড়তে পারে। পাশাপাশি অ্যামোনিয়া অপচয় ও গ্রিনহাউস গ্যাস নির্গমন কমে আসে, যা পরিবেশ সুরক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।

আরো পড়ুন:

এই ন্যানো ইউরিয়া ব্যবহারে প্রায় ২০ থেকে ২৫ শতাংশ কম সার ব্যবহার করেও সমান বা বেশি ফলন পাওয়া সম্ভব বলে জানিয়েছেন গবেষকরা। এতে কৃষকের উৎপাদন খরচ কমবে এবং দেশের বৈদেশিক মুদ্রা সাশ্রয়েও ইতিবাচক প্রভাব পড়বে। একই সঙ্গে ধানের ফলন ১০ থেকে ২৫ শতাংশ পর্যন্ত বাড়ার সম্ভাবনা এবং ফসলের গুণগত মান উন্নতির ইঙ্গিতও পাওয়া গেছে।

গবেষণার প্রধান গবেষক, বাকৃবির কৃষিতত্ত্ব বিভাগের অধ্যাপক আহমেদ খায়রুল হাসান বলেন, “প্রতি বছর ইউরিয়া সারে সরকারকে বড় অঙ্কের ভর্তুকি দিতে হয় এবং কৃষকেরাও এই সার বেশি ব্যবহার করেন। এসব বিবেচনায় খরচ কমানো ও পরিবেশ রক্ষার লক্ষ্যেই গবেষণাটি শুরু করা হয়।” প্রাথমিকভাবে মাঠ পর্যায়ে ইতিবাচক ফল মিলেছে বলেও জানান তিনি।

তিনি আরো বলেন, “আরো কিছু পরীক্ষার পর প্রযুক্তিটির কার্যকারিতা সম্পর্কে নিশ্চিতভাবে বলা যাবে। বৃহত্তর পরিসরে উৎপাদন ও মাঠ পর্যায়ে প্রয়োগের পরই এর পূর্ণ সম্ভাবনা যাচাই করা সম্ভব হবে। তবে বিশেষ করে ধান চাষে এই প্রযুক্তি কার্যকর হবে বলে আশা করি।”

গবেষণার সঙ্গে যুক্ত পিএইচডি ফেলো আমজাদ হোসেন জানান, ন্যানো ইউরিয়ার সিনথেসিস ও বৈশিষ্ট্য নির্ধারণে তারা সফল হয়েছেন এবং মাঠ পর্যায়ে প্রয়োগেও ইতিবাচক অগ্রগতি দেখা যাচ্ছে। তার মতে, “ফলন সমান থাকলেও এটি সফল ধরা হবে, কারণ প্রচলিত ইউরিয়া যেখানে তিনবার প্রয়োগ করতে হয়, সেখানে ন্যানো ইউরিয়া একবার প্রয়োগেই কাজ সম্পন্ন করা সম্ভব। এতে কার্বন নিঃসরণ কমবে, মাটির গুণাগুণ বজায় থাকবে এবং কৃষক আর্থিকভাবে লাভবান হবেন।”

মাটির কার্বন সমৃদ্ধতা নিয়ে ব্রি’র মৃত্তিকা বিজ্ঞানী ড. মুহাম্মদ মোজাম্মেল হক বলেন, “প্রচলিত ইউরিয়া ব্যবহারে নাইট্রাস অক্সাইডসহ বিভিন্ন গ্রিনহাউস গ্যাস বেশি নির্গত হয়, যা পরিবেশের জন্য হুমকি। তবে বায়োচার সমৃদ্ধ ইউরিয়া ব্যবহার করলে ২০ থেকে ২২ শতাংশ পর্যন্ত কার্বন নিঃসরণ কমানো সম্ভব, যা মাটির উর্বরতা বাড়াতে সহায়ক হবে।”

কৃষি গবেষণা ফাউন্ডেশনের (কেজিএফ) মৃত্তিকা বিজ্ঞানী ড. মো. মনোয়ার করিম খান জানান, পরীক্ষায় ৮০ শতাংশ ন্যানো ইউরিয়া এবং ১০০ শতাংশ প্রিলড ইউরিয়ার ফলন প্রায় সমান পাওয়া গেছে। ফলে ভবিষ্যতে এটি প্রিলড ইউরিয়ার বিকল্প হিসেবে ব্যবহার করা যেতে পারে, যা কৃষকের জন্য সাশ্রয়ী হবে এবং সরকারের ভর্তুকির চাপও কমাবে। গত বছর কৃষি সারে সরকারের ভর্তুকির পরিমাণ ছিল প্রায় ২৮ হাজার কোটি টাকা।

ব্রি’র গবেষণা উইংয়ের পরিচালক ড. মো. রফিকুল ইসলাম বলেন, “‘প্রিসিশন এগ্রিকালচার’ বা সূক্ষ্ম কৃষি ব্যবস্থা বাস্তবায়নে ন্যানো ইউরিয়া একটি সময়োপযোগী প্রযুক্তি। মাঠ পরীক্ষায় দেখা গেছে, যেখানে প্রচলিত ইউরিয়া বারবার প্রয়োগ করতে হয়, সেখানে ন্যানো ইউরিয়া একবার ব্যবহারেই কাঙ্ক্ষিত উৎপাদন সম্ভব। এতে কৃষকের শ্রম ও খরচ কমবে এবং পরিবেশও সুরক্ষিত থাকবে।”

সার্বিকভাবে, বায়োচার সমৃদ্ধ ন্যানো ইউরিয়া প্রযুক্তি দেশের কৃষিতে সাশ্রয়ী, পরিবেশবান্ধব ও কার্যকর একটি বিকল্প হিসেবে নতুন সম্ভাবনা তৈরি করছে।

ঢাকা/জান্নাত

সর্বশেষ

পাঠকপ্রিয়