RisingBD Online Bangla News Portal

ঢাকা     রোববার   ২৪ জানুয়ারি ২০২১ ||  মাঘ ১০ ১৪২৭ ||  ০৯ জমাদিউস সানি ১৪৪২

জাবির ৫০ বছর: প্রত্যাশা ও বাস্তবতার প্রাসঙ্গিকতা

সাঈদ ইবরাহীম রিফাত || রাইজিংবিডি.কম

প্রকাশিত: ১৭:৫০, ১৩ জানুয়ারি ২০২১   আপডেট: ১৭:৫১, ১৩ জানুয়ারি ২০২১
জাবির ৫০ বছর: প্রত্যাশা ও বাস্তবতার প্রাসঙ্গিকতা

শুরুটা হয়েছিল ঠিক দেশ স্বাধীনের প্রাক্কালে বা তার কিছুটা আগে। মোঘল আমলের রাজধানী জাহাঙ্গীরনগরের নামানুসারে বিশ্ববিদ্যালয়ের নামকরণ করা হয়। নামের শুরুতে মুসলিম থাকলেও ঘটনাক্রমে পরে তা বাদ দেওয়া হয়। বলছিলাম দেশের একমাত্র ‘আবাসিক বিশ্ববিদ্যালয়’ হিসেবে খ্যাত জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের কথা। এটি ১৯৭০ সালে প্রতিষ্ঠা লাভ করলেও আনুষ্ঠানিক যাত্রা শুরু করে ১৯৭১ সালের ১২ জানুয়ারি। গতকাল ছিল প্রাণের বিশ্ববিদ্যালয়ের জন্মদিন। 

তবে এবার বিশ্ববিদ্যালয়ের ৫০ বছর পূর্তিতে ছিল না বেশি সাজ সাজ রব। ছোটখাটো ভার্চুয়াল উদ্যোগে কিছু অনুষ্ঠানের আয়োজন করেছে প্রশাসন। কারণটা অনুমেয়, করোনা মহামারির কারণে প্রাতিষ্ঠানিকভাবে নেই কোনো উদ্যোগ। এছাড়াও, কিছু আক্ষেপ থেকেও যেন বিশ্ববিদ্যালয়টির নেই উদযাপনের কোনো উপলক্ষ। 

তবে যাত্রা শুরুর পর থেকে বিশ্ববিদ্যালয়টির এখন পর্যন্ত যে অর্জনের লক্ষ্যমাত্রা ধরে রাখা হয়েছিল, তা থেকে কিছুটা পিছিয়েই রয়েছে বিশ্ববিদ্যালয়টি। শুরুতে ভাবা হয়েছিল জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের মূল উপজীব্য হবে গবেষণা এবং শিক্ষক-শিক্ষার্থীরা নিরিবিলি পরিবেশে একনিষ্ঠভাবে চালিয়ে যাবেন তাদের শিক্ষা ও গবেষণাবিষয়ক কার্যক্রম। সার্বিকভাবে সেভাবেই এগোলেও প্রত্যাশা পুরোপুরি পূরণ করতে পারেনি এখনো।

প্রাকৃতিক স্নিগ্ধতা ও নৈসর্গিক পরিবেশের পাশাপাশি অতিথি পাখির বিচরণস্থল হিসেবে সুনাম রয়েছে বিশ্ববিদ্যালয়টির। বর্তমানে ছেলে ও মেয়েদের ৮টি করে ১৬টি হলের পাশাপাশি নতুন করে তৈরি হচ্ছে ১০ তলাবিশিষ্ট ৬টি হল। এখানেও ছেলেদের ৩টি ও মেয়েদের ৩টি করে হল। মোট আসনসংখ্যা ৬ হাজার।

ঠিক কী নিয়ে এই সুবর্ণ জয়ন্তীতে মাতামাতি করতে পারেন শিক্ষার্থীরা, এই প্রশ্ন করলে হোঁচট খাবে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন। বিশ্ববিদ্যালয়টি গত কয়েক বছর ধরে হয়ে গেছে নামেমাত্র আবাসিক। কর্মকাণ্ড হয়েছে নানাভাবে প্রশ্নবিদ্ধ। তবে কি কোনো অর্জন নেই এই বিশ্ববিদ্যালয়ের? 

সত্যি কথা হলো, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় নানা কারণে অন্যান্য পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্বকীয় এবং আলাদা বৈশিষ্ট্য নিয়ে মাথা উঁচু করে আছে। দেশের তরুণ প্রজন্মের একটি উল্লেখযোগ্য অংশ জাহাঙ্গীরনগরে পড়বে বলে নিজেদের প্রস্তুত করে। গ্রিক থিয়েটার থেকে অনুপ্রাণিত মুক্তমঞ্চ, সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড, যৌন নিপীড়নবিরোধী আন্দোলন, অনেক কিছুর কারণেই বিশ্ববিদ্যালয়টি বিখ্যাত।

বিশ্ববিদ্যালয়টি ইতোমধ্যে দেশের চারটি গুরুত্বপূর্ণ পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের মধ্যে একটির স্থান দখল করে আছে। ‘সাংস্কৃতিক রাজধানী’ হিসেবে পরিচিত এ বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পাস করে অনেক ব্যক্তিত্ব দেশ দাঁপিয়ে বেড়িয়েছেন। গবেষণা, মিডিয়া, ক্রীড়া ক্ষেত্রেও রয়েছে উল্লেখযোগ্য অবদান। হুমায়ুন ফরিদী, জাকিয়া বারী মম, মুশফিকুর রহিম, মাশরাফি বিন মুর্তজাসহ অনেক ব্যক্তিত্বের নাম উল্লেখযোগ্য।

১৯৭১ সালে বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রসংখ্যা ছিল মাত্র ১৫০ জন। বিভাগ ছিল ৪টি। বর্তমানে ছাত্রসংখ্যা ১৬ হাজারেরও বেশি। রয়েছে ৬টি অনুষদের অধীনে ৩৪টি বিভাগ এবং ৪টি স্বতন্ত্র ইনস্টিটিউট। 

শিক্ষা ও অন্যান্য নানাক্ষেত্রে অবদান রেখে যাচ্ছেন জাহাঙ্গীরনগরের শিক্ষক ও শিক্ষার্থীরা। দেশ ছাপিয়ে বিদেশেও খ্যাতি পাচ্ছেন, সুনাম কুঁড়োচ্ছেন। এর মধ্যে সাম্প্রতিক সময়ে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের পদার্থবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক ড. মামুন ও প্রাণরসায়ন এবং অনুপ্রাণবিজ্ঞান বিভাগের ইব্রাহিম খলিলের নাম উল্লেখযোগ্য। বিশ্বের ২ শতাংশ বিজ্ঞানীর মধ্যে জায়গা করে নিয়েছেন তারা।

তবে, ৫০ বছর পূর্তিতেও আক্ষেপ রয়েছে অনেক। কারণ গত কয়েক দশক ধরে অর্জনের থেকে বিতর্কিত বেশি হয়েছে বিশ্ববিদ্যালয়টি। অন্যান্য পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের মতো প্রকট সেশনজট সঙ্কট, আবাসিক সঙ্কট, ছাত্ররাজনীতির নামে সহিংসতা, সবকিছুতে রাজনীতিকরণ, গবেষণায় অনিয়ম, গবেষণার সংখ্যা কমে যাওয়া, দলীয় পরিচয়ে শিক্ষক নিয়োগ সহ আরও নানা সমস্যায় এই বিশ্ববিদ্যালয়টিও জড়িত।

করোনা সঙ্কটে দেশের অপরাপর বিশ্ববিদ্যালয়ের মতো জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ও চরম স্থবিরতার মাঝে ছিল বেশ কিছু দিন। এর সুবাদে সেশন জট বেড়েছে প্রায় প্রতিটি বিভাগ ও ইনস্টিটিউটে। তাছাড়াও, গত কয়েক বছর ধরে নানারকম বিতর্কিত ইস্যু ও আন্দোলনের কারণে স্থবির হয়েছে বিশ্ববিদ্যালয়টির স্বাভাবিক ধারা। 

২০১৯ সালে উপাচার্যবিরোধী আন্দোলন এবং ২০২০ সালে করোনা মহামারি নানা কারণেই অনেকটা পিছিয়ে দিয়েছে বিশ্ববিদ্যালয়টিকে। নতুন বিভাগ খোলার কারণে তৈরি হয়েছে আবাসন সঙ্কট। যদিও নতুন হল নির্মাণের কাজ চলছে পুরোদমে।

হতাশার বিষয় হলো, সাম্প্রতিককালে র্যাঙ্কিংয়ে অবনতি ঘটেছে বিশ্ববিদ্যালয়টির। শিক্ষার মান যথাযথ থাকলেও সেশন সঙ্কটের কারণে হতাশায় ভুগছেন শিক্ষার্থীরা। যদিও দেশের সার্বিক শিক্ষা পরিস্থিতি বেশ নিম্নগামী, তারপরও জাহাঙ্গীরনগর থেকে অনেক ছাত্র-শিক্ষক নিজেদের দেশে এবং দেশের বাইরে সুপ্রতিষ্ঠিত করতে সক্ষম হয়েছেন।

ইউনিভার্সিটি র্যাংকিংয়ে যুক্তরাষ্ট্রের টাইমস হায়ার এডুকেশনের ওয়েবসাইট অনুযায়ী এশিয়ার সেরা ৪৮৯টি বিশ্ববিদ্যালয়ের মধ্যে নেই জাহাঙ্গীরনগরের নাম। শিক্ষকরা দাবি করছেন এক্ষেত্রে র্যাংকিং সঠিকভাবে করা হয়নি। তবে বিশ্ববিদ্যালয়ের জন্য এটি একটি লজ্জাজনক বিষয়।

সার্বিকভাবে দেশের সবক্ষেত্রেই গুণে-মানে পড়তি চোখে পড়ার মতো। জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ও হয়তো এর ব্যতিক্রম নয়। তবে সবকিছু ছাপিয়ে হয়তো জাহাঙ্গীরনগরও ফিরে পাবে তার জৌলুশ, বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন সাধারণ শিক্ষার্থী হিসেবে আশা করতে দোষ কোথায়? 

লেখক: শিক্ষার্থী, তৃতীয় বর্ষ, সাংবাদিকতা ও গণমাধ্যম অধ্যয়ন বিভাগ, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়।

জাবি/মাহি 

সম্পর্কিত বিষয়:

সর্বশেষ

পাঠকপ্রিয়