মূল্যবোধ ও সাম্প্রদায়িক চেতনায় ক্যাম্পাসজুড়ে সরস্বতীর আরাধনা
ডেস্ক রিপোর্ট || রাইজিংবিডি.কম
বিদ্যা ও জ্ঞানের দেবী সরস্বতীর আরাধনায় দেশের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয় এবার শুধু ধর্মীয় উৎসবেই সীমাবদ্ধ থাকেনি, বরং সামাজিক সচেতনতা, মানবিক মূল্যবোধ ও সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির শক্ত বার্তা তুলে ধরেছে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় ও জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ে রঙিন ও ভিন্ন আঙ্গিকে পালিত হয়েছে সরস্বতী পূজা।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের জগন্নাথ হলে এ বছর সরস্বতী পূজার মণ্ডপটি ছিল ব্যতিক্রমী। ৭৬টি মন্ডপ প্রচলিত নান্দনিকতার থিমে সাজানো। মণ্ডপগুলোতে প্রতীকী শিল্পকর্মের মাধ্যমে তুলে ধরা হয় সহিংসতা, উগ্রতা, গুজবনির্ভর দলবদ্ধ উন্মাদনা ও বিচারহীনতার বিপজ্জনক দিক। গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের উদ্যোগে নির্মিত মণ্ডপে ‘মব জাস্টিস’-বিরোধী পোস্টার, ভাঙা হারমোনিয়াম দিয়ে সাংস্কৃতিক সংগঠনে হামলার প্রতিবাদ, চা শ্রমিকদের ন্যায্য মজুরির দাবির প্রতীক এবং ফিলিস্তিনের প্রতি সংহতি জানাতে জলপাই গাছের ডাল প্রদর্শন করা হয়। আয়োজকদের মতে, ধর্মীয় উৎসব সমাজের অন্যায় ও সংকটের বিরুদ্ধেও সচেতনতার মাধ্যম হতে পারে।
কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ে পূজা উদযাপন পরিষদের উদ্যোগে পঞ্চমী তিথিতে সরস্বতী পূজা অনুষ্ঠিত হয়। সকাল থেকে দিনব্যাপী প্রতিমা স্থাপন, প্রাণ প্রতিষ্ঠা, পুষ্পাঞ্জলি, প্রসাদ বিতরণ, নবীন বরণ ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের মাধ্যমে পূজা সম্পন্ন হয়।
অনুষ্ঠানে উপস্থিত শিক্ষকরা বলেন, সরস্বতী পূজা কেবল ধর্মীয় আচার নয়, বরং জ্ঞান, নৈতিকতা ও বিনয়ের চর্চার এক গুরুত্বপূর্ণ উপলক্ষ।
আয়োজকরা জানান, এই আয়োজন শিক্ষার্থীদের ভ্রাতৃত্ববোধ ও দায়িত্বশীল নাগরিক হিসেবে গড়ে উঠতে অনুপ্রেরণা জোগায়।
এ বিষয়ে কুবির পূজা উদযাপন পরিষদের সাধারণ সম্পাদক আপন বসাক বলেন, “আজকের এই সরস্বতী পূজা কেবল একটি ধর্মীয় আচার নয়, বরং এটি জ্ঞান, নৈতিকতা এবং বিনয় অর্জনের মাধ্যমে আলোকিত মানুষ হওয়ার এক বিশেষ সংকল্প। এই আয়োজন আমাদের শিক্ষাঙ্গনের ভ্রাতৃত্ববোধকে সুদৃঢ় করে এবং আগামী দিনে সমাজ ও দেশের দায়িত্ববান নাগরিক হিসেবে গড়ে উঠতে অনুপ্রেরণা দেয়।”
পূজা উদযাপন পরিষদের সভাপতি সজীব বিশ্বাস বলেন, “প্রতি বছরের ন্যায় এবছরও আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়ে ২০ বছর পূর্তি সরস্বতী পূজোর আয়োজন করা হয়েছে। বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রসাশন, শিক্ষক- শিক্ষার্থীসহ সকলের অংশগ্রহণ ও সহযোগিতায় আমরা এমন একটি আয়োজন করতে পেরেছি। আজকের এই শুভ দিনে আমি ভগবানের কাছে সকলের মঙ্গল কামনা করি।”
চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে ইতিহাসে প্রথমবারের মতো একযোগে ১৩টি পূজামণ্ডপে সরস্বতী পূজা অনুষ্ঠিত হয়। বিভিন্ন অনুষদ, বিভাগ ও হলভিত্তিক মণ্ডপে দিনভর চলে পূজা, পুষ্পাঞ্জলি, ধর্মীয় পাঠ ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান।
শিক্ষার্থীরা জানান, বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে এমন বৃহৎ আয়োজনে সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি ও সাংস্কৃতিক ঐক্যের চিত্র স্পষ্ট হয়ে উঠেছে।
আয়োজকরা জানান, সকালে বিদ্যার দেবী সরস্বতীর আরাধনা ও যজ্ঞের মাধ্যমে পূজার আনুষ্ঠানিক সূচনা হয়। এরপর পুষ্পাঞ্জলি, বেদ ও গীতা পাঠ, প্রসাদ বিতরণ এবং সাংস্কৃতিক পরিবেশনার আয়োজন করা হয়। সন্ধ্যায় অনুষ্ঠিত হবে সন্ধ্যা আরতি। আগামীকাল (২৪ জানুয়ারি) সকালে সরস্বতীর নিরঞ্জনার মধ্য দিয়ে সুরেশ্বরী বন্দনা-২০২৬ এর আনুষ্ঠানিক সমাপ্তি ঘটবে।
রসায়ন বিভাগের ১৯-২০ সেশনের শিক্ষার্থী সুজয় ভট্টাচার্য বলেন, “বিশ্ববিদ্যালয় ইতিহাসে প্রথমবারের মতো এত বড় পূজা হচ্ছে। আমাদের দেবী যে মাতৃস্বরূপ, তার চিত্র তুলে ধরার চেষ্টা করেছি আমাদের মন্ডপে। মা কিভাবে আমাদের সাথে সংযুক্ত, তা ফুটিয়ে তোলার চেষ্টা করেছি।”
মামার সাথে পূজা মন্ডপ ঘুরতে আসা চতুর্থ শ্রেণির শিক্ষার্থী উদিতা দে বলেল, “আজকে আমি প্রথমবার আমার মামার বিশ্ববিদ্যালয় এসেছি এবং সরস্বতী পূজা উপভোগ করছি। আমি ঘুরে ঘুরে প্রত্যেকটি পূজা দেখলাম এবং আমার খুব ভালো লেগেছে।”
এদিকে জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ে ৩৬টি বিভাগ, দুটি ইনস্টিটিউট ও ছাত্রীহলসহ মোট ৩৯টি মণ্ডপে সরস্বতী পূজা উদযাপিত হচ্ছে। আলপনা, আলোকসজ্জা ও ভিন্ন ভিন্ন থিমের নান্দনিক মণ্ডপে মুখর হয়ে ওঠে পুরো ক্যাম্পাস। শিক্ষার্থীদের স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণে এ উৎসব ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে মিলনমেলায় পরিণত হয়েছে। নিরাপত্তা নিশ্চিতে প্রক্টরিয়াল বডি ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনী সার্বক্ষণিক দায়িত্ব পালন করছে।
চারুকলা বিভাগের শিক্ষার্থী পায়েল দাস অনিক বলেন, “বিভাগের শিক্ষার্থীরাই আলাদা আলাদাভাবে প্রায় সব বিভাগের মণ্ডপ সাজসজ্জার দায়িত্ব পালন করেন। পরীক্ষার ব্যস্ততার মধ্যেও আমরা সর্বোচ্চ চেষ্টা দিয়ে কাজ শেষ করেছি।”
গণিত বিভাগের পূজা আয়োজক কমিটির সদস্যসচিব প্রাণেশ মজুমদার বলেন, “আমাদের মণ্ডপে এবার কুঁড়েঘরের থিম নেওয়া হয়েছে। প্রতিমা স্থাপন, প্রসাদ ও পুরোহিতসহ সব প্রস্তুতি সম্পন্ন হয়েছে। উৎসবমুখর পরিবেশে আমরা দেবীর আরাধনা করছি।”
জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় পূজা উদ্যাপন কমিটির সভাপতি অধ্যাপক ড. রবীন্দ্রনাথ মণ্ডল বলেন, “এ বছর ৩৬টি বিভাগ, দুটি ইনস্টিটিউট এবং বেগম ফজিলাতুন্নেছা মুজিব হলের মণ্ডপে সরস্বতী পূজা অনুষ্ঠিত হচ্ছে। শিক্ষার্থীরা আনন্দঘন পরিবেশে পূজা উদযাপন করছে। তবে ইসলামিক স্টাডিজ এবং ইসলামের ইতিহাস ও সংস্কৃতি বিভাগে পূজা হচ্ছে না। তাদের পক্ষ থেকে কোনো আবেদন পাওয়া যায়নি।”
নিরাপত্তা ব্যবস্থার বিষয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টর অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ তাজাম্মুল হক বলেন, “বরাবরের মতো এবারো সর্বোচ্চ নিরাপত্তার সঙ্গে সরস্বতী পূজা পালিত হচ্ছে। পুলিশ ও প্রক্টরিয়াল বডি সার্বক্ষণিক ক্যাম্পাসের নিরাপত্তা তদারকি করছে।”
সার্বিকভাবে দেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে এবারের সরস্বতী পূজা শুধু বিদ্যার দেবীর আরাধনাই নয়, বরং যুক্তিবাদ, মানবিকতা, সামাজিক প্রতিবাদ ও সম্প্রীতির এক শক্ত প্রতীক হিসেবে উঠে এসেছে।
[সংশ্লিষ্ট ক্যাম্পাস প্রতিনিধিদের পাঠানো তথ্য থেকে প্রতিবেদনটি করা হয়েছে]
ঢাকা/সৌরভ/ মিজানুর/লিমন/জান্নাত