এআই নির্ভর প্রজন্ম: মেধার বিকাশ নাকি মানসিক অলসতা!
ডেস্ক রিপোর্ট || রাইজিংবিডি.কম
শুভ কর্মকার
এআই (AI) ব্যবহার করতে বাংলাদেশের কে না জানি! যুগের সাথে তাল মেলাতে সবাই মেশিন লার্নিং সম্পর্কে গভীর জ্ঞান অর্জন ছাড়াই ব্যবহার করছে। স্কুল-কলেজ থেকে শুরু করে বিশ্ববিদ্যালয়, অফিস-আদালত, এমনকি সরকারি কাজেও এখন এআই ব্যবহার পরিলক্ষিত, যেমন শিক্ষার্থীরা অ্যাসাইনমেন্ট লেখার জন্য, ডিবেটাররা স্পিচ তৈরির জন্য, ইউটিউবাররা স্ক্রিপ্ট বানানোর জন্য এবং অনেকে চাকরির সিভি তৈরিতেও এআই ব্যবহার করছে।
পত্রিকার প্রসঙ্গে বলা যায়, অনেক সময় পরিচিত ও প্রতিষ্ঠিত ব্যক্তিদের লেখা অগ্রাধিকার পায়। তাদের ব্যস্ততার মাঝেও নিয়মিত বিভিন্ন পত্রিকায় লেখা প্রকাশিত হতে দেখা যায়। প্রযুক্তির এই যুগে অনেকেই এআই বা মেশিন লার্নিংয়ের সহায়তায় দ্রুত লেখা প্রস্তুত করছেন। তবে নতুন বা সাধারণ লেখকদের জন্য নিয়মিত প্রকাশের সুযোগ পাওয়া এখনো চ্যালেঞ্জের বিষয়। ফলে যোগ্যতা থাকা সত্ত্বেও অনেকের লেখা প্রকাশের অপেক্ষায় থেকে যায়।
তবে এটাও সত্য যে এআই আমাদের জীবনে অনেক সুবিধা নিয়ে এসেছে। তথ্য দ্রুত খুঁজে পাওয়া, অনুবাদ করা, জটিল বিষয় সহজভাবে বোঝানো, প্রোগ্রামিং কোড লেখা, ডাটা বিশ্লেষণ, এমনকি চিকিৎসা ও গবেষণার ক্ষেত্রেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। অনেক সময় একজন শিক্ষার্থী বা নতুন লেখকের জন্য এটা দিকনির্দেশনা হিসেবে কাজ করে।
গ্রামাঞ্চলের একজন শিক্ষার্থীও এখন স্মার্টফোনের মাধ্যমে বিশ্বমানের তথ্য পেতে পারছে, এটি প্রযুক্তির বড় অর্জন।
মেশিন লার্নিং যেমন জীবন সহজ করছে, অন্যদিকে মানুষের কল্পনাশক্তি ও নিজস্ব চিন্তা করার ইচ্ছা ধীরে ধীরে কমিয়ে দিচ্ছে; যা সমাজের জন্য ভয়ংকর হতে পারে। বর্তমানে দেখা যাচ্ছে, অনেক শিক্ষার্থী নিজেরা না পড়ে সরাসরি এআই থেকে উত্তর নিচ্ছে। বক্তৃতা, প্রেজেন্টেশন, এমনকি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের স্ট্যাটাস পর্যন্ত এআই দিয়ে তৈরি হচ্ছে। ফলে মানুষ নিজের মেধা ব্যবহার করার চর্চা কমিয়ে দিচ্ছে।
মেশিন লার্নিং বা আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স আসলে বিভিন্ন ওয়েবসাইট থেকে তথ্য সংগ্রহ করে নিজের মতো করে বিশ্লেষণ করে উত্তর দেয়। ধরুন, আপনি কোনো সমস্যা নিয়ে সমাধান চাইলেন, এটি তথ্যের ভিত্তিতে একটি সমাধান দিলো। কিন্তু, সেই সমাধান আপনার পরিস্থিতির জন্য উপযুক্ত কিনা, তা যাচাই না করেই যদি অনুসরণ করেন, তাহলে লাভের চেয়ে ক্ষতি বেশি হতে পারে। যেমন; স্বাস্থ্য সংক্রান্ত পরামর্শ, আইনি পরামর্শ বা বিনিয়োগ সংক্রান্ত সিদ্ধান্ত শুধু এআই এর ওপর নির্ভর করে নিলে ঝুঁকি থেকে যায়। সম্প্রতি অনেকেই অনলাইনে ভুল চিকিৎসা পরামর্শ বা ভুয়া বিনিয়োগ টিপস অনুসরণ করে ক্ষতির সম্মুখীন হয়েছেন।
এই ভুল ধারণা থেকে আমাদের বেরিয়ে আসা উচিত। এআই কেবল তথ্যের ভিত্তিতে উত্তর দেয়; তাই সবকিছু অন্ধভাবে বিশ্বাস করা যাবে না। বিভিন্ন নির্ভরযোগ্য সূত্র থেকে যাচাই করে তারপর সিদ্ধান্ত নিতে হবে।
আরেকটি বড় বিষয় হলো ব্যক্তিগত তথ্যের নিরাপত্তা। আমরা অনেকেই নিজের অজান্তেই বিভিন্ন প্ল্যাটফর্মে ভোটার আইডি নম্বর, ব্যাংক তথ্য, শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের তথ্য কিংবা ব্যক্তিগত সমস্যার কথা শেয়ার করছি। বর্তমানে সাইবার অপরাধ ও ডাটা হ্যাকিংয়ের ঘটনা বাড়ছে। যদি এসব তথ্য ভুল হাতে পড়ে, তাহলে ব্যক্তিগত জীবনে বড় ধরনের হুমকি তৈরি হতে পারে।
তাই আমাদের উচিত সঠিকভাবে এআই ব্যবহার করা। এআই আমাদের সহায়ক প্রযুক্তি—এটি জ্ঞান অর্জন, গবেষণা ও সৃজনশীলতাকে সমর্থন করার জন্য। কিন্তু, নিজের মেধা ও বিচারবুদ্ধি ছাড়া এর উপর সম্পূর্ণ নির্ভর করা ঠিক নয়। সব তথ্য যাচাই করে বিশ্বাস করা, একাধিক সূত্র থেকে নিশ্চিত হওয়া এবং কখনোই ব্যক্তিগত গোপন তথ্য শেয়ার না করা—এই সচেতনতা গড়ে তুলতে হবে।
আমরা এআই ব্যবহার করবো, কিন্তু এআই যেন আমাদের ব্যবহার না করে—সেদিকে সচেতন থাকতে হবে।
লিখেছেন শুভ কর্মকার, শিক্ষার্থী, ম্যানেজমেন্ট ইনফরমেশন সিস্টেমস্ বিভাগ বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়, রংপুর।
ঢাকা/জান্নাত