ঢাকা     মঙ্গলবার   ১৭ মার্চ ২০২৬ ||  চৈত্র ৪ ১৪৩২ || ২৮ রমজান ১৪৪৭ হিজরি

Risingbd Online Bangla News Portal

ফজলুল হক মুসলিম হল: শতবর্ষের ঐতিহ্য ও সংগ্রামের মহাকাব্য

ই এম সৌরভ, ঢাবি প্রতিনিধি || রাইজিংবিডি.কম

প্রকাশিত: ১৫:৩৪, ১৭ মার্চ ২০২৬   আপডেট: ১৫:৪৯, ১৭ মার্চ ২০২৬
ফজলুল হক মুসলিম হল: শতবর্ষের ঐতিহ্য ও সংগ্রামের মহাকাব্য

কার্জন হলের লাল ইটের আভিজাত্য পেরিয়ে একটু এগোলেই চোখে পড়বে একটি বিশালাকার তোরণ। তার ওপাশেই দাঁড়িয়ে আছে বাঙালির গর্ব ও ইতিহাসের এক নিরব সাক্ষী ফজলুল হক মুসলিম হল। ১৯২১ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার সময় যে তিনটি হল নিয়ে যাত্রা শুরু হয়েছিল, এটি তার ঠিক পরবর্তী পর্যায়ের অন্যতম শ্রেষ্ঠ সংযোজন। অবিভক্ত বাংলার তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেরে বাংলা এ কে ফজলুল হকের নামে নামাঙ্কিত এই হলটি আজ কেবল মেধাবীদের আবাসস্থল নয়, বরং এটি বাংলাদেশের জন্মের ইতিহাসের এক অবিচ্ছেদ্য অংশ।

ইতিহাসের উষালগ্ন ও শেরে বাংলার স্বপ্নের প্রতিফলন

আরো পড়ুন:

১৯৪০ সালের ১ জুলাই এই হলের যাত্রা শুরু হয়। তৎকালীন বাংলার প্রধানমন্ত্রী শেরে বাংলা এ কে ফজলুল হক স্বয়ং এই হলের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেন। মুসলিম ছাত্রদের জন্য উচ্চশিক্ষার পথ সুগম করতে এবং একটি বুদ্ধিবৃত্তিক সমাজ গঠনে তার যে বিশাল অবদান, তারই সম্মানার্থে এই হলের নামকরণ করা হয়। শুরুতে এটি কেবল একটি সাধারণ আবাসিক হল হিসেবে পরিচিতি পেলেও খুব অল্প সময়ের মধ্যেই এটি বাংলার ছাত্র রাজনীতির কেন্দ্রে পরিণত হয়। ১৯৪০-এর দশকের মুসলিম জাতীয়তাবাদ থেকে শুরু করে ১৯৫২-এর ভাষা আন্দোলন, প্রতিটি ঐতিহাসিক বাঁকেই এই হলের ছাত্রদের পদচারণা ছিল অগ্রগণ্য।
স্থাপত্যের নান্দনিকতা ও ইন্দো-সারাসেনিক রীতির অনন্য রূপ

ফজলুল হক হলের মূল ভবনের দিকে তাকালে এক ধরনের রাজকীয় আভিজাত্য চোখে পড়ে। এর স্থাপত্যে মুঘল এবং ইউরোপীয় রীতির এক চমৎকার সংমিশ্রণ দেখা যায়, যাকে স্থাপত্যবিদরা ইন্দো-সারাসেনিক শৈলী বলে থাকেন। হলের প্রশস্ত ও বিশালাকার করিডোরগুলো দিয়ে হাঁটলে মনে হয় যেন ইতিহাসের কোনো পুরনো পাণ্ডুলিপির পাতা দিয়ে হাঁটা হচ্ছে। ভবনের মাঝখানে রয়েছে বিশাল একটি কেন্দ্রীয় খেলার মাঠ বা লন, যা শিক্ষার্থীদের খেলাধুলা এবং সান্ধ্যকালীন আড্ডার প্রাণকেন্দ্র। এছাড়া, ফজলুল হক হলের পুকুরটি কেবল একটি জলাশয় নয়, এটি এই হলের শিক্ষার্থীদের আবেগ ও স্মৃতির এক বিশাল জায়গা। বিকেলের আড্ডা বা পরীক্ষার ক্লান্তিতে এই পুকুর পাড়ই হয়ে ওঠে পরম শান্তির আশ্রয়।

ভাষা আন্দোলনের সূতিকাগার ও তারুণ্যের গর্জন

বায়ান্নর ভাষা আন্দোলনে ফজলুল হক হলের ভূমিকা ইতিহাসের পাতায় স্বর্ণাক্ষরে লেখা থাকবে। যখন রাষ্ট্রভাষা বাংলার দাবিতে ছাত্র সমাজ ঐক্যবদ্ধ হচ্ছিল, তখন এই হলটি ছিল আন্দোলনের অন্যতম প্রধান সমন্বয় কেন্দ্র। ১৯৪৮ সালের ১১ মার্চ রাষ্ট্রভাষা কর্মপরিষদের গুরুত্বপূর্ণ বৈঠকে সভাপতিত্ব করেছিলেন এই হলেরই তৎকালীন ছাত্র শামসুল হক। এমনকি ১৯৫২ সালের ২১শে ফেব্রুয়ারি যখন ১৪৪ ধারা ভাঙার চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়, তখন ফজলুল হক হল সংলগ্ন ঐতিহাসিক আমতলার জমায়েতে এই হলের শিক্ষার্থীদের উপস্থিতি ছিল চোখে পড়ার মতো। ভাষা শহীদদের স্মরণে প্রথম শহীদ মিনার নির্মাণের পরিক্রমাতেও এই হলের আবাসিক শিক্ষার্থীদের অবদান ছিল অনস্বীকার্য।

জ্ঞান ও বিজ্ঞানের আতুঁড়ঘর

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বিজ্ঞান অনুষদ এবং কার্জন হলের খুব কাছে অবস্থিত হওয়ায় এই হলটি মূলত বিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষার্থীদের প্রধান আবাসে পরিণত হয়েছে। পদার্থবিজ্ঞান, রসায়ন, গণিত কিংবা ফার্মেসির মতো গুরুত্বপূর্ণ বিভাগের অনেক খ্যাতনামা অধ্যাপক ও গবেষক এই হলের কক্ষগুলো থেকেই উঠে এসেছেন। হলের নিজস্ব লাইব্রেরিটি বেশ সমৃদ্ধ, যেখানে যেমন রয়েছে দুষ্প্রাপ্য পুরনো বই, তেমনি রয়েছে আধুনিক জ্ঞান-বিজ্ঞানের সমাহার। এছাড়া, শিক্ষার্থীদের কারিগরি দক্ষতা বৃদ্ধিতে এখানে একটি আধুনিক কম্পিউটার ল্যাব কাজ করছে, যা ডিজিটাল বাংলাদেশ গড়ার কারিগর তৈরিতে বিশেষ ভূমিকা রাখছে।

প্রাণের মেলা ও সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড

ফজলুল হক মুসলিম হল ছাত্র সংসদ বা এফএইচএমএসইউ হলো এই হলের প্রাণ। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ বা ডাকসু নির্বাচনের পাশাপাশি এই হলের নিজস্ব সংসদীয় কার্যক্রম শিক্ষার্থীদের নেতৃত্ব বিকাশে সহায়তা করে। প্রতি বছর এখানে নানা উৎসব পালিত হয় যার মধ্যে বার্ষিক ক্রীড়া প্রতিযোগিতা অন্যতম, যেখানে হলের অ্যাথলেটরা তাদের শ্রেষ্ঠত্ব প্রমাণ করেন। এছাড়াও, সাংস্কৃতিক সপ্তাহের আয়োজন করা হয় যেখানে বিতর্ক, কবিতা আবৃত্তি, গান এবং নাটকের মাধ্যমে শিক্ষার্থীদের সৃজনশীল প্রতিভা বিকাশিত হয়। প্রাক্তন ও বর্তমান শিক্ষার্থীদের মেলবন্ধনে আয়োজিত হল পুনর্মিলনী অনুষ্ঠানগুলো তৈরি করে এক আবেগঘন পরিবেশ।
খাবার দাবার ও ডাইনিংয়ের চিরচেনা ঐতিহ্য

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের হলগুলোর মধ্যে ফজলুল হক হলের ডাইনিংয়ের সুনাম দীর্ঘদিনের। সকালের নাস্তা থেকে শুরু করে রাতের ডাইনিং পর্যন্ত শিক্ষার্থীরা একটি বড় পরিবার হিসেবে সবাই একসাথে খাবার গ্রহণ করে। এখানকার ক্যান্টিনের আড্ডাগুলো অনেক বড় বড় রাজনৈতিক তর্কের এবং অনেক গভীর বন্ধুত্বের নীরব সাক্ষী হয়ে আছে। এই সমবেত জীবনযাপন শিক্ষার্থীদের মাঝে একতা ও ভ্রাতৃত্ববোধের শিক্ষা দেয়।

বর্তমান প্রেক্ষাপট ও আগামীর সম্ভাবনা

দীর্ঘ সময়ের পরিক্রমায় হলের প্রাচীন ভবনগুলোতে বর্তমানে কিছুটা সংস্কারের প্রয়োজনীয়তা দেখা দিয়েছে। হলের ক্রমবর্ধমান আবাসন সংকট বর্তমান শিক্ষার্থীদের জন্য একটি বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। তবে বর্তমান হল প্রশাসন এবং বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ হলের ঐতিহাসিক ঐতিহ্য বজায় রেখে আধুনিকায়নের কাজ চালিয়ে যাচ্ছে। প্রশাসনিক কার্যাবলীকে আরো গতিশীল করতে ডিজিটাল ম্যানেজমেন্ট সিস্টেমের আওতায় আনা হচ্ছে হলের কার্যক্রম।

চিরঞ্জীব ফজলুল হক হল

ফজলুল হক মুসলিম হল কেবল ইটের পর ইট সাজানো কোনো ইমারত নয়। এটি একটি চেতনা, একটি বিশ্বাস এবং হাজারো স্বপ্নবাজ তরুণের ঘর। এখান থেকে পড়াশোনা শেষ করে বের হয়ে যাওয়া গ্র্যাজুয়েটরা আজ ছড়িয়ে আছেন দেশ থেকে দেশান্তরে—কেউ আমলা, কেউ বিজ্ঞানী, কেউবা সফল উদ্যোক্তা। কিন্তু তাদের সবার হৃদয়ে গেঁথে আছে সেই লাল দালানের স্মৃতি, পুকুর পাড়ের আড্ডা আর শেরে বাংলার নামের সেই অনন্য গৌরব। আশি বছর পেরিয়েও এই হলটি আজও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মেধা ও মননের প্রতীক হয়ে মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে আছে। এর প্রতিটি ধূলিকণায় মিশে আছে শত বছরের ইতিহাস আর ভবিষ্যতের নতুন কোনো সূর্যোদয়ের গল্প।

কী বলছেন শিক্ষার্থীরা?

বিশ্ববিদ্যালয়ের ২০২২ ২৩ সেশনের শিক্ষার্থী সাইমন বলেন, “ফজলুল হক হল আমাদের কাছে কেবল একটি থাকার জায়গা নয়, বরং এক বিশাল অস্তিত্বের নাম।”

হলের সাধারণ সম্পাদক বা কোনো নেতৃস্থানীয় ছাত্রের ভাষায়, “কার্জন হলের লাল দালানগুলোর ছায়ায় যখন আমরা বড় হই, তখন আমাদের ভেতরে এক ধরনের রাজকীয় দায়বদ্ধতা কাজ করে। শেরে বাংলার নামাঙ্কিত এই হলের প্রতিটি ধূলিকণায় যে বিদ্রোহ আর মেধার ইতিহাস মিশে আছে, তা আমাদের প্রতিনিয়ত অনুপ্রাণিত করে। এই হলের পুকুর পাড়ে বসে কাটানো বিকেলগুলো বা ডাইনিংয়ের সেই ব্যস্ত আড্ডাই আমাদের জীবনের শ্রেষ্ঠ সঞ্চয় হয়ে থাকবে।”

হলের আবাসিক শিক্ষার্থী আক্তার হোসেনের মতে, “বিজ্ঞান অনুষদের ছাত্র হওয়ায় আমাদের পড়াশোনার চাপ একটু বেশি থাকে, আর সেই চাপের মাঝে হলের শান্ত পরিবেশ আমাদের বড় শক্তি। যদিও সময়ের সাথে সাথে আমাদের আবাসন সংকট প্রকট হয়েছে এবং পুরনো কক্ষগুলোর সংস্কার জরুরি হয়ে পড়েছে, তবুও এই হলের যে ভ্রাতৃত্বের সংস্কৃতি, তা আমাদের সকল কষ্ট ভুলিয়ে দেয়। আমরা চাই হলের এই ঐতিহাসিক গাম্ভীর্য বজায় রেখে আধুনিক সুযোগ-সুবিধাগুলো আরো বাড়ানো হোক, যাতে আগামীর মেধাবীরা আরো সুন্দর পরিবেশে গড়ে উঠতে পারে।”

ঢাকা/সৌরভ/জান্নাত

সর্বশেষ

পাঠকপ্রিয়