ঢাকা     সোমবার   ২৫ মে ২০২৬ ||  জ্যৈষ্ঠ ১১ ১৪৩৩ || ৮ জিলহজ ১৪৪৭ হিজরি

Risingbd Online Bangla News Portal

শেষ সূর্যোদয়ের অপেক্ষায় নেইমার: ব্রাজিলের স্বপ্ন আর ফুটবলের সৌন্দর্যের শেষ আশ্রয়

ক্রীড়া ডেস্ক || রাইজিংবিডি.কম

প্রকাশিত: ১৯:৫৫, ২৪ মে ২০২৬   আপডেট: ২১:২৩, ২৪ মে ২০২৬
শেষ সূর্যোদয়ের অপেক্ষায় নেইমার: ব্রাজিলের স্বপ্ন আর ফুটবলের সৌন্দর্যের শেষ আশ্রয়

বিশ্বকাপ মানেই অমরত্বের সন্ধান। কেউ সেখানে কিংবদন্তি হয়ে ওঠে, কেউ হারিয়ে যায় সময়ের কুয়াশায়। আর কারও জন্য এটি হয়ে ওঠে শেষবারের মতো আলো ছোঁয়ার সুযোগ। ২০২৬ বিশ্বকাপ ঠিক তেমনই এক গল্পের নাম- নেইমারের গল্প। এটি শুধু এক ফুটবলারের প্রত্যাবর্তন নয়; এটি ভাঙা ডানায় আবারও আকাশ ছোঁয়ার চেষ্টা, সমালোচনা পেরিয়ে শেষবারের মতো মহিমা ছিনিয়ে আনার লড়াই।

একসময় যাকে পেলের সঙ্গে তুলনা করা হতো, সেই নেইমার জুনিয়র আবার জায়গা করে নিয়েছেন ব্রাজিলের ২৬ সদস্যের বিশ্বকাপ দলে। ফুটবল ইতিহাসের সবচেয়ে দামি খেলোয়াড়দের একজন, যিনি একসময় জাদু দিয়ে বিশ্বকে থামিয়ে দিতেন, তিনি এবার বিশ্বকাপে ফিরছেন এক ভিন্ন রূপে। অজেয় রাজপুত্র হিসেবে নয়, বরং ক্ষতবিক্ষত অথচ লড়াই না-ছাড়া এক যোদ্ধা হিসেবে।

আরো পড়ুন:

কোচ কার্লো আনচেলত্তি যখন দলে তার নাম ঘোষণা করেন, তখন চোখ ভিজে ওঠে নেইমারের। আবেগঘন সেই মুহূর্তে তিনি সবার আগে খবরটি ভাগ করে নেন নিজের শারীরিক পুনর্বাসন বিশেষজ্ঞের সঙ্গে। এই দৃশ্যই বলে দেয়, কতটা দীর্ঘ, কঠিন আর বেদনাময় ছিল তার ফেরার পথ।

একসময় ব্রাজিলের রাস্তাঘাট থেকে উঠে এসে সান্তোসে নিজের প্রতিভার ঝলক দেখিয়েছিলেন নেইমার। কিশোর বয়সেই এতটাই আলোড়ন তুলেছিলেন যে ব্রাজিলের সর্বকালের অন্যতম সেরা ফুটবলার পেলে তার প্রতিভাকে নিজের সঙ্গে তুলনা করেছিলেন। এরপর বার্সেলোনা, তারপর প্যারিসের ক্লাব ফুটবল- সব জায়গায় তার পায়ের জাদু ছিল বিস্ময়ের নাম।

কিন্তু সময়ের সঙ্গে সেই মুকুট ভারী হয়ে ওঠে। চোট, সমালোচনা, হতাশা আর অনুপস্থিতি ধীরে ধীরে তাকে ফুটবলের কেন্দ্রবিন্দু থেকে সরিয়ে দেয়।

২০২৩ সালের অক্টোবরে উরুগুয়ের বিপক্ষে হাঁটুর গুরুতর চোটের পর প্রায় এক বছর মাঠের বাইরে ছিলেন নেইমার। প্রায় দুই বছর ব্রাজিলের দল থেকেও দূরে ছিলেন তিনি। ধীরে ধীরে সুস্থ হয়ে ফিরলেও জাতীয় দলের ডাক আর আসছিল না।

সেই নীরব প্রত্যাবর্তন শুরু হয় সান্তোসে। ইউরোপের অভিজাত ক্লাবগুলোর আকর্ষণের কেন্দ্র থেকে নিজের শৈশবের ক্লাবে ফেরা অনেকের কাছে ছিল পিছু হটা। কিন্তু সেখান থেকেই শুরু হয় নতুন গল্প।

সান্তোসে নিজের ছন্দ ফিরে পেয়ে আবার বিশ্বকে মনে করিয়ে দেন- নেইমারের গল্প এখনও শেষ হয়নি।

ব্রাজিলের ফুটবল পরিচয় বহু বছর তার কাঁধেই ছিল। শুধু অধিনায়কত্ব নয়, সৌন্দর্য, ছন্দ, কল্পনা আর বিশৃঙ্খল সৌন্দর্যের প্রতীক ছিলেন তিনি। যখন ফুটবল ধীরে ধীরে যন্ত্রের মতো হিসাবি হয়ে উঠছিল, তখন নেইমার ছিলেন আনন্দে ভরা খেলার শেষ কয়েকজন দূতের একজন।

এই কারণেই তার ফেরা শুধু দলে জায়গা পাওয়ার গল্প নয়, এটি পুনর্জন্মের গল্প।

ব্রাজিলের জন্য নেইমার এখনও গুরুত্বপূর্ণ- হয়তো ৯০ মিনিটের জন্য নয়, কিন্তু প্রভাব সবসময় সময় দিয়ে মাপা যায় না। কখনও কখনও একজন খেলোয়াড়ের উপস্থিতিই বদলে দেয় ড্রেসিংরুমের বিশ্বাস, সতীর্থদের মানসিকতা, পুরো দলের আবেগ।

ব্রাজিলের ফুটবলাররা নেইমারকে ভালোবাসেন। আর সেটি আন্তর্জাতিক ফুটবলে অনেক বড় বিষয়।

২০২২ সালে যেমন লিওনেল মেসিকে ঘিরে আর্জেন্টিনা নিজেদের ইতিহাস লিখেছিল, তেমনি ব্রাজিলের ড্রেসিংরুমেও নেইমার এক অতীতের বোঝা নন; বরং ফুটবলের পরিচয়ের সেতুবন্ধন।

নেইমার থাকলে ব্রাজিলকে আলাদা লাগে। তার পায়ে এখনও এমন এক ছোঁয়া আছে, যা ম্যাচের গতি বদলে দিতে পারে। এমন এক পাস, যা অন্য কেউ দেখতে পায় না। এমন এক মুহূর্ত, যা আবারও মনে করিয়ে দেয় কেন ব্রাজিল একসময় কল্পনার প্রতীক ছিল।

অবশ্য সময় কারও জন্য থেমে থাকে না। নেইমার হয়তো আর আগের মতো পুরো ম্যাচ শাসন করবেন না। কিন্তু ফুটবলের ইতিহাসে এমন অনেক খেলোয়াড় আছেন, যাদের উপস্থিতিই টুর্নামেন্টের আবেগ বদলে দিয়েছে। ব্রাজিলের এখন প্রয়োজন তার আত্মা, তার সাহস, তার বিশ্বাস। কারণ নেইমার মানে শুধু জয় নয়- নেইমার মানে সম্ভাবনা। আনন্দ। ব্যক্তিত্ব। বিস্ময়।

হয়তো এটি নেইমারের শেষ বিশ্বকাপ। হয়তো শেষবারের মতো তিনি মহিমা ছুঁতে যাচ্ছেন। কিন্তু এই যাত্রা শুধু একজন ফুটবলারের শেষ সুযোগ নয়, এটি হয়তো ফুটবলেরও শেষ কয়েকটি সুন্দর অধ্যায়ের একটি—যেখানে সৌন্দর্য, স্বাধীনতা আর কল্পনার খেলা এখনও বেঁচে আছে।

ফুটবলের রাজপুত্র হয়তো আর আগের মতো অজেয় নন। কিন্তু কখনও কখনও ভাঙা মুকুটও শেষ আলোয় সবচেয়ে বেশি দীপ্তি ছড়ায়। আর সেই আলো নিয়েই বিশ্বকাপের পথে হাঁটছেন নেইমার।

ঢাকা/আমিনুল

সর্বশেষ

পাঠকপ্রিয়