ঢাকা     বুধবার   ১৮ মার্চ ২০২৬ ||  চৈত্র ৫ ১৪৩২ || ২৯ রমজান ১৪৪৭ হিজরি

Risingbd Online Bangla News Portal

নোট-টিকিটে ইতিহাস খোঁজেন সুমন্ত

নিউজ ডেস্ক || রাইজিংবিডি.কম

প্রকাশিত: ১৮:০৯, ১৮ মার্চ ২০২৬  
নোট-টিকিটে ইতিহাস খোঁজেন সুমন্ত

শীতের এক বিকেল। চতুর্থ শ্রেণিতে পড়া সুমন্ত কুমার বাবার পাশে বসে রেডিও শুনছিলেন। হঠাৎ কয়েকজন গ্রামবাসী বিদেশি ব্যাংকনোট নিয়ে আসেন নোটগুলো আসল নাকি জাল, তা যাচাই করতে। রাষ্ট্রায়ত্ত সোনালী ব্যাংকের কর্মী বাবার হাতেই সেদিন প্রথম দেখেন মার্কিন ডলার। ছোট্ট সেই কাগজের নোট কিশোর সুমন্তের মনে রেখে যায় গভীর ছাপ। বাবার কাছ থেকে জানতে পারেন, এটি যুক্তরাষ্ট্রের মুদ্রা। সেই মুহূর্ত থেকেই জন্ম নেয় তার সংগ্রহের নেশা।

নব্বইয়ের দশকে শুরু হয় তার পথচলা, বাতিল হয়ে যাওয়া পাকিস্তানি ধাতব মুদ্রা সংগ্রহ দিয়ে। গ্রামেগঞ্জে ঘুরে, মানুষের সঙ্গে গল্প করতে করতে কখনো পানের বাটা থেকে, কখনো পুরনো টিনের বাক্স ঘেঁটে বেরিয়ে আসত পুরোনো কয়েন। এভাবেই ধীরে ধীরে গড়ে ওঠে তার সংগ্রহ। তার আগ্রহ দেখে বিদেশফেরত আত্মীয়-স্বজনরাও নিয়ে আসতেন নানা দেশের মুদ্রা।

আরো পড়ুন:

রাজশাহীর এই সংগ্রাহক পেশায় একজন আর্ট কলেজের শিক্ষক। তবে তার সংগ্রহ যেন এক বিস্ময়ের ভাণ্ডার। স্বাধীন বাংলাদেশের প্রথম চিঠির খাম, প্রথম ডাকটিকিট, এমনকি মৌর্য সাম্রাজ্যের পাঞ্চমার্ক, সবই আছে তার কাছে। পাশাপাশি রয়েছে সাম্প্রতিক কাগুজে নোট, দেশি-বিদেশি পোস্টকার্ড, বিরল মুদ্রা এবং ইন্দোনেশিয়ার এক লাখ টাকার নোট।

ছোটবেলা থেকেই বিভিন্ন দেশের রেডিও শোনার অভ্যাস ছিল তার। সেই সূত্রে বিভিন্ন আন্তর্জাতিক রেডিওতে চিঠি লিখে পেয়েছেন প্রশংসাপত্র। ডয়েচে ভেলে, বিবিসি বাংলা, এনএইচকে—অনেক মাধ্যম থেকেই এসেছে স্বীকৃতি। এর পাশাপাশি পকেট ক্যালেন্ডার, ডেবিট-ক্রেডিট কার্ড, সিম কার্ড ও নানা ধরনের প্লাস্টিক কার্ড সংগ্রহেও আগ্রহী হয়ে ওঠেন তিনি।

সুমন্ত জানান, নবম-দশম শ্রেণিতে পড়ার সময় থেকেই পত্রমিতালি শুরু করেন তিনি। তখনই মুদ্রা থেকে তার আগ্রহ সরে আসে ডাকটিকিট সংগ্রহে। তার ভাষায়, নতুন ডাকটিকিট বা চিঠি হাতে পাওয়ার আনন্দ অন্য কিছুর সঙ্গে তুলনাহীন।

বিশ্বের প্রথম ডাকটিকিট ‘পেনি ব্ল্যাক’ প্রকাশিত হয় ১৮৪০ সালে এই ইতিহাসও তাকে অনুপ্রাণিত করে। বাংলাদেশের প্রথম ডাকটিকিট (১৯৭১) তার সংগ্রহে রয়েছে। শুধু তাই নয়, সেই প্রকাশ উপলক্ষে ব্যবহৃত ফার্স্ট ডে কভার ও সিলমোহরও তিনি যত্নে সংরক্ষণ করেছেন। তার কাছে ডাকটিকিট মানে শুধু কাগজ নয়, সময়ের দলিল।

টানা ৩১ বছর ধরে এই ভালোবাসার পথেই হেঁটে চলেছেন তিনি। ফিলাটেলি অর্থাৎ ডাকটিকিট সংগ্রহ নিয়ে তার গভীর আগ্রহ। তিনি বরেন্দ্র ফিলাটেলিক সোসাইটির সদস্য, যেখানে সংগ্রহের পাশাপাশি প্রকাশনার মাধ্যমে ঐতিহ্য সংরক্ষণের কাজও করা হয়।

তার সংগ্রহে রয়েছে এমন কিছু ডাকটিকিট, যেগুলোর প্রথম সংস্করণ মাত্র ১,৫০০ সেটে মুদ্রিত হয়েছিল। এছাড়া, ‘ফেলা বাংলা’ নামে পরিচিত একটি বিরল ডাকটিকিটও আছে। কম সংখ্যায় মুদ্রিত বা প্রিন্টিং ত্রুটিযুক্ত ডাকটিকিটই তার কাছে সবচেয়ে মূল্যবান।

২০২১ সালের ১৭ মার্চ, বাংলাদেশ ডাক বিভাগ প্রথমবারের মতো চার রঙের খাম প্রকাশ করে। সুমন্তের সংগ্রহে রয়েছে সেই খামের একটি বিরল সংস্করণ; যেখানে চারটি রঙই অনুপস্থিত, অর্থাৎ ‘মিসিং কালার’ খাম। তার মতে, এটি দেশের একমাত্র কপি হতে পারে।
তিনি জানান, এই খামটি একটি প্রদর্শনীতে সেরা হিসেবে স্বীকৃতি পেয়েছে। খামটির সত্যতা যাচাই করা যায় এর নিরাপত্তা বৈশিষ্ট্যের মাধ্যমে, এতে UV কালি রয়েছে, যদিও চারটি রঙ ছাপা হয়নি।

রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা বিভাগ থেকে পড়াশোনা করা সুমন্ত শুধু সংগ্রাহক নন, একজন ডিজাইনারও। বাংলাদেশ ডাক বিভাগের জন্য তিনি প্রায় ৩৪টি ডাকটিকিটের নকশা করেছেন, পাশাপাশি বিভিন্ন দেশের যৌথ ইস্যু স্ট্যাম্পও ডিজাইন করেছেন।

তার সংগ্রহে রয়েছে কিছু বিরল কাগুজে নোটও—যেমন ১০০ টাকার নোটের কাগজে ছাপা পাঁচ টাকা, বা ২০ টাকার কাগজে ছাপা দুই টাকা। তার কাছে থাকা একটি পাঁচ টাকার নোটের বর্তমান মূল্য প্রায় ৮ হাজার টাকার বেশি, কারণ এটি ভুল করে ১০০ টাকার কাগজে ছাপা হয়েছিল—যা অত্যন্ত দুর্লভ।

সুমন্ত কুমারের বিশ্বাস, ইতিবাচক নেশা মানুষকে নেতিবাচকতা থেকে দূরে রাখে। তার কাছে সংগ্রহ শুধু শখ নয়—এ যেন ইতিহাসকে ছুঁয়ে থাকার এক নিরবচ্ছিন্ন চেষ্টা। ছোট্ট এক টুকরো কাগজেও তিনি খুঁজে পান সময়ের স্পন্দন।

[ফিচারটি লিখেছেন বরেন্দ্র বিশ্ববিদ্যালয়ের জার্নালিজম, কমিনিকেশন এন্ড মিডিয়া স্টাডিজ বিভাগের শিক্ষার্থী সুস্মিতা ভট্টাচার্য্য, মোসা: সানোয়ারা খাতুন, ঐশ্বর্য মন্ডল তন্দ্রা, নাফিজা রব্বানী অর্পিতা, মো: মাসুদ রানা, প্রিয়া কর্মকার, মো. সিফাতউল্লাহ]

ঢাকা/জান্নাত

সম্পর্কিত বিষয়:

সর্বশেষ

পাঠকপ্রিয়