লক্ষ্যচ্যুত ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয় ফিরবে যেভাবে
তানিম তানভীর, ইবি প্রতিনিধি || রাইজিংবিডি.কম
তানিম তানভীর
ইসলামী শিক্ষার সাথে আধুনিক শিক্ষার সমন্বয় সাধন করে দক্ষ মানবসম্পদ তৈরির ব্রত নিয়ে যাত্রা শুরু করে দেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের সর্বোচ্চ বিদ্যাপীঠ কুষ্টিয়ার ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়। ১৯৭৯ সালের ২২ নভেম্বরে তৎকালীন রাষ্ট্রপতি শহীদ জিয়াউর রহমান এর ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করলেও এর পিছনে রয়েছে ৭৬ বছরের দীর্ঘ আন্দোলন-সংগ্রাম। তবে প্রতিষ্ঠার ৪৭ বছরেও মূল লক্ষ্য থেকে বিচ্যুত বিশ্ববিদ্যালয়টি।
অনেকের ধারণা, আধুনিকতার সাথে তাল মিলিয়ে খোলা হয়েছে ত্রিশটির বেশি জেনারেল ডিপার্টমেন্ট, অন্যদিকে ইসলাম বিষয়ক রয়েছে মাত্র তিনটি বিভাগ, যা প্রতিষ্ঠার উদ্দেশ্যের সঙ্গে অসামঞ্জস্যপূর্ণ। এ কারণে বিশ্ববিদ্যালয় তার লক্ষ্য অর্জনে ব্যর্থ। অথচ এটি অবান্তর ও অযৌক্তিক চিন্তাপ্রসূত ধারণা। কেননা বিদ্যমান কারিকুলামে বিশ্ববিদ্যালয়টিতে নতুন করে আরো ৫০টি ইসলাম বিষয়ক বিভাগ চালু হলেও তাতে তার লক্ষ্য পূরণ করা সম্ভব নয়। এতে যুগের পর যুগ পেরোলেও প্রতিষ্ঠানটি লক্ষ্যচ্যুতই থাকবে। তাই এ দুর্দশা থেকে মুক্তিলাভে ও বিশ্ববিদ্যালয়টির প্রতিষ্ঠার উদ্দেশ্য পূরণে অন্যতম উপায় হলো- প্রত্যেকটি বিভাগের নির্ধারিত শিক্ষাক্রমের কোর্সে ইসলামী শিক্ষা ও আধুনিক শিক্ষা সমন্বয় করা।
সমন্বয়ের প্রক্রিয়া নিয়ে বিস্তর আলোচনার সুযোগ রয়েছে। এর মধ্যে অন্যতম হলো- ইসলামী জ্ঞান ( কুরআন, হাদিস, উসূলে ফিকহ, আকিদা, ইসলাহী চিন্তা) এবং আধুনিক জ্ঞান (বিজ্ঞান, প্রযুক্তি, অর্থনীতি, সমাজবিজ্ঞান, আইন, ভাষা) এই দুই ধারাকে পৃথক সিলেবাসে না পড়িয়ে সমন্বয় সাধন করা। যেমন- কোনো শিক্ষার্থী চারুকলা বিভাগে অধ্যয়নরত হলে তার প্রত্যেকটি কোর্সের নির্ধারিত কনটেক্সটে (বিষয়বস্তু) ইসলামী দৃষ্টিভঙ্গি কি তা নিয়েও আলোচনা থাকবে। তেমনি ধর্মতত্ত্বের বিভাগের প্রত্যেকটি কোর্সে নির্ধারিত বিষয়বস্তু বৈজ্ঞানিক দৃষ্টিভঙ্গি কি তা নিয়েও আলোচনা থাকবে। এক্ষেত্রে বিশ্ববিদ্যালয়ের এক বিভাগের শিক্ষক অন্য বিভাগে শিক্ষাদান বা উভয় ধারা সম্পর্কে গভীর জ্ঞানসম্পন্ন শিক্ষক নিয়োগ নিশ্চিত করতে হবে। জ্ঞানার্জনের এই কাঠামোই প্রমাণ করবে বাংলাদেশের অন্যান্য বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বরূপের ভিন্নতা। আর ঠিক এ লক্ষ্যকে সামনে রেখেই ৭৬ বছরের দীর্ঘ আন্দোলন-সংগ্রামের বাস্তবরূপ দিয়েছেন রাষ্ট্রপতি শহীদ জিয়াউর রহমান।
এ স্বরূপ বাস্তবায়নে ভিন্ন মতাবলম্বী শিক্ষার্থীদের নিয়ে জটিলতা হতে পারে বলে অনেকেই ধারণা করেন। তবে, প্রশাসনিক স্বদিচ্ছা ও সরকারের উদ্যোগে সকল সমস্যার যৌক্তিক সমাধান সম্ভব। এক্ষেত্রে ভর্তি প্রক্রিয়া ও কারিকুলামে আমূল পরিবর্তন আনা অস্বীকার্য। সম্প্রতি বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনকে ইসলামিক স্টাডিজ ও বাংলাদেশ স্ট্যাডিজ দুটি কোর্স বাধ্যতামূলক করার প্রক্রিয়ায় হাঁটতে দেখা যায়। এতে ইসলামিক স্টাডিজ কোর্স বাধ্যতামূলক সিদ্ধাতে ভিন্ন মতাবলম্বীরা কোনোভাবেই সন্তুষ্ট নয়। প্রশাসনের এ সিদ্ধান্ত প্রক্রিয়াগতভাবে একপ্রকার একাডেমিক চুরি। যা দীর্ঘমেয়াদী ঝুঁকির প্রেক্ষাপট তৈরি করবে। প্রশাসন যদি প্রত্যেক বিভাগে কোর্সটিকে অন্য কোর্সের সাথে সমন্বয় করে পাঠদানের ব্যবস্থা করে তাহলে এ অসন্তোষের জায়গা থাকে না।
তবে, ভিন্ন মতাবলম্বীরা যে দৃষ্টিভঙ্গিতে সরব তার অন্যতম যুক্তি হলো- এক ধর্মের শিক্ষার্থীকে অন্য ধর্মের কোর্স কেন চাপিয়ে দেওয়া হবে? এই দৃষ্টিভঙ্গি সন্দেহাতীতভাবে প্রবলেমেটিক। কেননা উদাহরণস্বরপ- আইন বিভাগে হিন্দু আইন কোর্স পাঠদান করা হয়। এতে সকল ধর্মের শিক্ষার্থীরা তা বাধ্যতামূলক কোর্স হিসেবে পড়ছে। এক্ষেত্রে মুসলমান শিক্ষার্থীরা কখনো এটিকে হিন্দুধর্ম চাপিয়ে দেওয়ার মতো দৃষ্টিভঙ্গি লালন করে না। এর কারণ যেকোনো ধারার জ্ঞানার্জন মানুষকে ধর্মান্তরিত করে না বরং জানার পরিধিকে বিস্তৃত করে। এক্ষেত্রে জানা এবং মানার পার্থক্যের দৃষ্টিভঙ্গি লালনই সমাধানের পথকে সুগম করবে।
এছাড়া, অনেকে মনে করছেন- বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার প্রথম দিন থেকেই অর্গানোগ্রামে থাকা ‘তুলনামূলক ধর্মতত্ত্ব’ অনুষদের অধীনে ৩টি নতুন বিভাগ চালুর ঘোষণা, অনুষদ ভবন’ এর প্রতিষ্ঠাকালীন নাম ‘থিওলজি অ্যান্ড ইসলামিক স্টাডিজ অনুষদ ভবনে ফিরিয়ে দেওয়া ও তার অধীনে ‘কম্পারেটিভ তাফসির’ ও ‘আস-সিরাহ আস-নববিয়্যাহ’ নামের দুটি নতুন বিভাগ সংযুক্তই
ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয় তার লক্ষ্য পূরণের পথে এগোনোর নামান্তর। যা বাস্তব বিবর্জিত ও স্থূলচিন্তার প্রতিফলন। কেননা এ বিভাগগুলোতেও আধুনিক শিক্ষার সমন্বয়ে পাঠক্রম সংযোজন না হলে বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বরূপে ফেরা অসম্ভব।
আল-কুরআন অ্যান্ড ইসলামিক স্টাডিজ বিভাগের অধ্যাপক আ.ব.ম সাইফুল ইসলাম সিদ্দিকী বলেন, “ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ে যত ইসলামিক বিভাগই খোলা হোক না কেন, তা ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয় হয়ে যায় না। এর প্রকৃত স্বরূপ হলো সাধারণ জ্ঞান ও ঐশী জ্ঞানের সমন্বয়। এখানে সেই সমন্বয় অনুপস্থিত। ফলে শিক্ষার্থীরা কুরআন পড়তে জানে না, ইসলামের মৌলিক জ্ঞানও পায় না, আর পাঠ্যক্রমে ইসলামী দৃষ্টিভঙ্গি যুক্ত করার কাজ হয়নি।”
বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক নকীব মোহাম্মদ নসরুল্লাহ বলেন, “ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার মূল লক্ষ্য ছিল ইসলামী শিক্ষা ও আধুনিক শিক্ষার সমন্বয়ে একটি কার্যকর ‘কম্বাইন্ড এডুকেশন সিস্টেম’ গড়ে তোলা। কিন্তু, শুরু থেকে পরিকল্পনা ও কর্মপরিকল্পনায় কিছু ত্রুটির কারণে আমরা ধারাবাহিক অগ্রগতি অর্জন করতে পারিনি। এই ব্যর্থতার দায় কোনো একক ব্যক্তির নয় বরং রাষ্ট্রের নীতি, সমাজের কাঠামো এবং সকলের সম্মিলিত ত্রুটির ফল।”
ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার পিছনে রয়েছে সুদীর্ঘ ইতিহাস। বাংলার মুসলমানদের জন্য একটি স্বতন্ত্র বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রথম দাবি ওঠে ১৯০৩ সালে। ১৮৫৭ সালে প্রতিষ্ঠিত কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় ক্রমান্বয়ে হিন্দু-প্রবাহিত হয়ে পড়লে একে হিন্দু বিশ্ববিদ্যালয় আখ্যা দিয়ে মুসলমানদের জন্য পৃথক একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের দাবি তোলেন ‘নবনূর’ পত্রিকার সম্পাদক সৈয়দ এমদাদ আলী, সৈয়দ আমীর আলী, সৈয়দ নওয়াব আলী চৌধুরী প্রমুখ। ১৯২১ সালে সে দাবির প্রেক্ষিতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠাকালে ইসলামিক স্টাডিজ অনুষদের সংযুক্তির কথা থাকলেও তা বিভাগেই সীমাবদ্ধ থাকে।
সরকার মূল উদ্দেশ্য থেকে সরে গেলে দাবির বাস্তবায়নে আবারও সোচ্চার হন দেশের খ্যাতনামা আলেমগণ। মওলানা আকরম খাঁ ও মনিরুজ্জামান ইসলামাবাদীর নেতৃত্বে দাবি আদায়ে কাজ করতে থাকে ‘আঞ্জুমানে ওলামায়ে বাঙ্গালা’। ১৯২০ সালে মনিরুজ্জামান ইসলামাবাদী ব্যক্তিগত উদ্যোগে চট্টগ্রামে ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার উদ্দেশ্যে ফান্ডও গঠন করেন। যার সাথে একাত্মতা জানিয়েছিলেন মাওলানা শামসুল হক ফরিদপুরী, আব্দুল হামীদ খান ভাসানীসহ প্রথম সারির আলেমসমাজ।
১৯২৯ এ ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার দাবি উত্থাপন করেন কলকাতা আলিয়ার ছাত্রসংগঠন ‘জমিয়তে তালাবায়ে আরাবিয়া’। পরে ১৯৩৯ এ শের-ই-বাংলা এ.কে ফজলুল হকের গড়া ‘মাদরাসা শিক্ষা কমিটি’ ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার ঘোষণা দেন। ১৯৪১ সালে মাওলা বক্স কমিটি, ১৯৪৬-৪৭ সালে সৈয়দ মোয়াজ্জেম উদ্দীন হোসেন কমিটি, ১৯৪৯ সালে মওলানা আকরম খাঁ কমিটি, ১৯৫৭ সালে আতাউর রহমান খান কমিশন, ১৯৫৮ সালের এস.এম শরীফ শিক্ষা কমিশন ও ১৯৬৩ সালের ড. এস.এম হোসাইন কমিশন ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার সুপারিশ করে।
স্বাধীনতার পর ড. কুদরত-ই- খোদা শিক্ষা কমিশন গঠিত হলেও দেশের শিক্ষা ব্যবস্থায় ইসলামী শিক্ষা সমন্বয়ের কোন উদ্যোগ নেওয়া হয়নি। ১৯৭৪ সালে মওলানা ভাসানী সন্তোষে ব্যক্তিগত উদ্যোগে বেসরকারিভাবে ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয় নামে একটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলেন। পরবর্তীতে মেজর জেনারেল জিয়াউর রহমান রাষ্ট্রপতি হওয়ার পর এদেশের জনগণের দীর্ঘদিনের দাবির যৌক্তিকতা ও গুরুত্ব উপলব্ধি করে ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার সিদ্ধান্ত নেন এবং ১৯৭৬ সালের ১ ডিসেম্বর সরকারিভাবে ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার ঘোষণা দেন। সর্বোপরি ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয় এমন প্রতিষ্ঠান যা হবে সারা বাংলাদেশের ইসলামিক চিন্তা, গবেষণা ও আধুনিক জ্ঞান বিজ্ঞানের মিলনস্থল।
প্রতিষ্ঠানটির শিক্ষাক্রম প্রধানত ইসলামী দৃষ্টিভঙ্গির হাব হিসেবে কাজ করবে। যেখানে ধর্মীয় বিষয়াবলির পাশাপাশি আধুনিক বিজ্ঞান, অর্থনীতি, সমাজবিজ্ঞান, কলা, আইন-সহ সব ক্ষেত্রেই ইসলামী চিন্তার পুনর্গঠন সমানভাবে প্রতিফলিত হবে। যেখানে আধুনিক ও ধর্মীয় দুই ধারার শিক্ষার্থীরা একত্রে সমন্বিত শিক্ষাক্রম একই পরিবেশে পড়ার সুযোগ পাবে। আর এর জন্য প্রধান করণীয় কারিকুলামের আমূল পরিবর্তন ও তা যথাযথ বাস্তবায়ন। অন্যথায় আগামী একশো বছরেও এ বিশ্ববিদ্যালয়ের লক্ষ্য অর্জন সম্ভব নয়।
ঢাকা/জান্নাত
বিমানবন্দরে নিরাপত্তা জোরদার, বাড়ছে নজরদারি: স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী