ঢাকা     বৃহস্পতিবার   ০৪ জুন ২০২৬ ||  জ্যৈষ্ঠ ২১ ১৪৩৩ || ১৮ জিলহজ ১৪৪৭ হিজরি

Risingbd Online Bangla News Portal

উদ্বোধনের আগেই ফাটল

পুরোনো হলে ঝুঁকি, নতুন হলেও স্বস্তি নেই রাবি শিক্ষার্থীদের

ফাহমিদুর রহমান ফাহিম, রাবি প্রতিনিধি || রাইজিংবিডি.কম

প্রকাশিত: ১৫:০২, ২ জুন ২০২৬   আপডেট: ১৫:১২, ২ জুন ২০২৬
পুরোনো হলে ঝুঁকি, নতুন হলেও স্বস্তি নেই রাবি শিক্ষার্থীদের

রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের (রাবি) ঝুঁকিপূর্ণ ঘোষিত শেরেবাংলা ফজলুল হক হল থেকে কিছু শিক্ষার্থীকে সম্প্রতি নির্মাণাধীন নতুন আবাসিক ভবনে স্থানান্তর করা হয়েছে। তবে শিক্ষার্থীরা সেখানে গিয়ে ভবনের বিভিন্ন দেয়াল ও পিলারে ফাটল দেখতে পেয়েছেন। মেরামতের পরও কিছু স্থানে আবার পলেস্তারা খসে পড়ায় ভবনটির নির্মাণমান ও নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ দেখা দিয়েছে।

বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ সম্প্রতি শেরেবাংলা ফজলুল হক হল ও মন্নুজান হলকে ঝুঁকিপূর্ণ ঘোষণা করে। এর পরিপ্রেক্ষিতে শেরেবাংলা হলের কিছু আবাসিক শিক্ষার্থীকে নির্মাণাধীন ১০ তলা আবাসিক ভবনে অস্থায়ীভাবে স্থানান্তর করা হয়। কিন্তু নতুন ভবনেও ফাটল দেখা দেওয়ায় শিক্ষার্থীদের মধ্যে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে।

আরো পড়ুন:

এর আগে ২০২৪ সালের ৩০ জানুয়ারি নির্মাণাধীন ভবনটির মিলনায়তনের ছাদ ঢালাইয়ের সময় ধসে পড়ে। ওই ঘটনায় অন্তত নয়জন আহত হন। বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিকল্পনা ও উন্নয়ন দপ্তর সূত্রে জানা গেছে, নির্মাণাধীন ১০ তলা আবাসিক হল এবং ২০ তলাবিশিষ্ট একাডেমিক ভবনের নির্মাণকাজ করছে রূপপুরের ‘বালিশ-কাণ্ডে’ আলোচিত ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান ‘মজিদ সন্স কনস্ট্রাকশন লিমিটেড’। এর মধ্যে প্রায় ৭০ কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত হচ্ছে আবাসিক হল এবং ১৫৩ কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত হচ্ছে বিজ্ঞান অনুষদের ২০ তলাবিশিষ্ট ভবন।

তবে, নির্ধারিত সময়ের মধ্যে কোনো ভবনের কাজই শেষ করতে পারেনি প্রতিষ্ঠানটি। নির্মাণকাজ চলাকালে বিদ্যুৎস্পৃষ্ট হয়ে দুই শ্রমিকের মৃত্যু হয়েছে। এছাড়া, ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের মালামালবাহী ট্রাকের চাপায় হিমেল নামে এক শিক্ষার্থীর মৃত্যুর ঘটনাও ঘটে। বিভিন্ন সময় প্রতিষ্ঠানটির বিরুদ্ধে অনিয়ম ও অব্যবস্থাপনার অভিযোগও উঠেছে।

প্রায় ২৪ হাজার বর্গমিটার আয়তনের এই আবাসিক হলে প্রায় ১ হাজার ১০০ শিক্ষার্থীর আবাসনের ব্যবস্থা রাখা হয়েছে। চারটি আধুনিক লিফট, একটি বড় মসজিদ, প্রায় ৩০০ আসনের অডিটোরিয়াম, লাইব্রেরি, ইনডোর গেমস রুম, জিমনেশিয়াম, রিডিং রুম এবং গ্রিন জোনসহ বিভিন্ন সুবিধা রাখা হয়েছে ভবনটিতে।

পূর্ববর্তী প্রশাসন হলটির নাম নির্ধারণ করেছিল ‘শহীদ এএইচএম কামরুজ্জামান হল’। তবে জুলাই আন্দোলনের পর শিক্ষার্থীদের দাবির মুখে এটি ‘সাকিব-রায়হান হল’ নামে পরিচিতি পেতে শুরু করে। পরে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন হলটির চূড়ান্ত নাম ঘোষণা করে ‘বিজয় ৭১ হল’।

প্রায় ৭৪ কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত এই হলটি গত বছরের ডিসেম্বরেই শিক্ষার্থীদের জন্য উন্মুক্ত করার কথা জানিয়েছিলেন বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিকল্পনা ও উন্নয়ন দপ্তরের পরিচালক এস. এম. ওবায়দুল ইসলাম। কিন্তু ২০২১ সালের সেপ্টেম্বরে শুরু হওয়া নির্মাণকাজের মেয়াদ একাধিকবার বাড়ানো হলেও পাঁচ বছরেও এটি পুরোপুরি চালু করা সম্ভব হয়নি। এর মধ্যেই বিভিন্ন স্থানে ফাটল দেখা দেওয়ায় নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে ভবনের নিরাপত্তা নিয়ে।

হলের আবাসিক শিক্ষার্থী ও হল সংসদের সহবিতর্ক ও সাহিত্য সম্পাদক শাহরিয়ার হাসান বলেন, “শেরেবাংলা হলে ফাটল দেখা দেওয়ায় আমাদের অস্থায়ীভাবে নতুন হলে স্থানান্তর করা হয়েছে। কিন্তু এখানে এসেও বিভিন্ন স্থানে ফাটল দেখতে পাচ্ছি। এটি নির্মাণকাজে অনিয়ম ও দুর্নীতির প্রতিফলন বলে মনে হচ্ছে। বিষয়টি দ্রুত তদন্ত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া উচিত।”

হল সংসদের নির্বাহী সম্পাদক শাহিব বিল্লাহ বলেন, “পুরোনো হলে ফাটল দেখা দেওয়ায় নিরাপত্তার জন্য আমাদের নতুন হলে স্থানান্তর করা হয়েছে। অথচ উদ্বোধনের আগেই এখানেও ফাটল দেখা দিয়েছে। এতে নিরাপত্তা নিয়ে শঙ্কা তৈরি হয়েছে। নির্মাণকাজে গাফিলতি ও ত্রুটি রয়েছে বলে মনে হচ্ছে। বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের কাছে বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে তদন্ত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার আহ্বান জানাই।”

বাংলাদেশ ছাত্রপক্ষ, রাবি শাখার সভাপতি ও হলের আবাসিক শিক্ষার্থী মো. গোলাম মোস্তফা বলেন, “নতুন হলে আসার পর থেকেই বিভিন্ন স্থানে ফাটল দেখতে পাচ্ছি। এমনকি মেরামতের পরও পলেস্তারা খসে পড়ছে। বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন দ্রুত বিষয়টি তদন্ত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেবে বলে আশা করছি।”

অভিযোগের বিষয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী মো. মিনহাজুল আলম বলেন, “ফাটলগুলো মূলত তাপমাত্রাজনিত কারণে হয়ে থাকতে পারে। আমরা সংশ্লিষ্ট স্থানগুলো কেটে পরীক্ষা করে দেখব। তবে এগুলো মেরামতযোগ্য এবং আমরা বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে দেখছি।”

বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিকল্পনা ও উন্নয়ন দপ্তরের পরিচালক এস. এম. ওবায়দুল ইসলাম বলেন, “ভবনের কাঠামোগত নিরাপত্তার জন্য তাৎক্ষণিক কোনো ঝুঁকি রয়েছে বলে মনে হচ্ছে না। বিম ও দেয়ালের সংযোগস্থল কিংবা ভিন্ন অংশে করা প্লাস্টারের কারণে এ ধরনের ফাটল দেখা দিতে পারে। তবে আমরা বিষয়টি খতিয়ে দেখছি। ইতোমধ্যে প্রকৌশলীদের একটি দল সরেজমিনে পরিদর্শন করেছে।”

এর আগে ঝুঁকিপূর্ণ ঘোষিত দুটি হল পরিদর্শন শেষে বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক মো. ফরিদুল ইসলাম বলেন, “সাম্প্রতিক ভূমিকম্পের পর আমরা বিশেষজ্ঞদের মাধ্যমে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতিটি হলের ঝুঁকির মাত্রা নিরূপণ করব। তাদের প্রতিবেদনের ভিত্তিতে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে। নির্মাণাধীন নতুন হলের কাজে কোনো ধরনের গাফিলতির প্রমাণ পাওয়া গেলে অবশ্যই তদন্ত কমিটি গঠন করা হবে এবং তদন্ত প্রতিবেদনের ভিত্তিতে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”

নতুন হলটির উদ্বোধন কবে হতে পারে, এমন প্রশ্নের জবাবে উপাচার্য বলেন, “উদ্বোধনের নির্ধারিত সময় ইতোমধ্যে পেরিয়ে গেছে। এখন সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে আলোচনা করে যত দ্রুত সম্ভব শিক্ষার্থীদের জন্য আবাসনের ব্যবস্থা নিশ্চিত করা হবে। তবে কাজ দ্রুত শেষ করার নামে কোনো ধরনের গাফিলতি মেনে নেওয়া হবে না।”

প্রসঙ্গত, ২০২২ সালের ২ জানুয়ারি ১০ তলা হলটির সামনে ফলক উন্মোচনের মাধ্যমে নির্মাণকাজের আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন করেন রাজশাহী সিটি করপোরেশনের সাবেক মেয়র এএইচএম খায়রুজ্জামান লিটন। এর আগে ২০১৮ সালের ২৯ সেপ্টেম্বর ভবনটির ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেন সাবেক রাষ্ট্রপতি মো. আবদুল হামিদ।

ঢাকা/জান্নাত

সর্বশেষ

পাঠকপ্রিয়