ঢাকা     শনিবার   ০৪ ফেব্রুয়ারি ২০২৩ ||  মাঘ ২১ ১৪২৯

পুঁজিবাজারে পুঁজি বাড়াতে রাষ্ট্রীয় উদ্বৃত্ত তহবিল চায় বিএসইসি

নুরুজ্জামান তানিম || রাইজিংবিডি.কম

প্রকাশিত: ১৯:৫০, ২৬ নভেম্বর ২০২২  
পুঁজিবাজারে পুঁজি বাড়াতে রাষ্ট্রীয় উদ্বৃত্ত তহবিল চায় বিএসইসি

সাম্প্রতিক সময়ে দেশীয় অর্থনীতিতে টালমাটাল পরিস্থিতি বিরাজ করছে। এর নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে পুঁজিবাজারেও। ফলে, ক্রমেই গতি হারিয়ে ফেলছে পুঁজিবাজার। তবে, দেশের অর্থনীতি ও পুঁজিবাজার পরিস্থিতি সামাল দিতে সরকারের পাশাপাশি সক্রিয় আছে নিয়ন্ত্রক সংস্থা বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (বিএসইসি)।

এরই ধারাবাহিকতায় বিভিন্ন মন্ত্রণালয়, বিভাগ, সংস্থা ও প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তাদের পুঁজিবাজারে বিনিয়োগ সম্পর্কে সচেতন করার মাধ্যমে পুঁজির যোগান বাড়ানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এ সিদ্ধান্ত পুঁজিবাজারে গতি ফেরাতে সহায়ক ভূমিকা রাখবে বলে মনে করে অধ্যাপক শিবলী রুবাইয়াত-উল-ইসলামের নেতৃত্বাধীন বিএসইসি।

সম্প্রতি মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের গাইডলাইন অনুসরণ করে প্রণীত বিএসইসির বার্ষিক কর্মসম্পাদন চুক্তি (এপিএ) ২০২২-২৩ এর আওতায় এ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে বলে বিএসইসি সূত্রে জানা গেছে। ওই সিদ্ধান্তের আলোকে ফাইন্যান্সিয়াল লিটারেসি বিভাগের কাছে চিঠি দিয়েছে বিএসইসির এপিএ টিম।

বিএসইসি’র চিঠিতে উল্লেখ করা হয়, গত ১৯ অক্টোবর কমিশনের এপিএ টিমের বৈঠক হয়েছে। বৈঠকে পুঁজিবাজার বিষয়ে সচেতনতা বৃদ্ধি এবং পুঁজি বৃদ্ধির জন্য সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণলয়, বিভাগ ও যেসব সংস্থার কাছে উদ্বৃত্ত তহবিল আছে সেসব মন্ত্রণালয়/বিভাগ/সংস্থা/প্রতিষ্ঠান যেমন: অর্থ মন্ত্রণালয়ের আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগ, অর্থ বিভাগ, জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর), বাণিজ্য মন্ত্রণালয়, রেজিস্টার অব জয়েন্ট স্টক কোম্পানিজ অ্যান্ড ফার্মস (আরজেএসসি), বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম কর্পোরেশন (বিপিসি), ঢাকা ইলেকট্রিক সাপ্লাই কোম্পানি লিমিটেড (ডেসকো), ঢাকা ইলেক্ট্রিক সাপ্লাই অথোরিটি (ডেসা), ঢাকা ওয়াসা, বিভিন্ন শিক্ষা বোর্ড, রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (রাজউক), ন্যাশনাল হাউজিং কর্তৃপক্ষ (এনএইচএ), বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌ-পরিবহন কর্তৃপক্ষ (বিআইডব্লিউটিএ), বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌ-পরিবহন করপোরেশন (বিআইডব্লিউটিসি), বাংলাদেশ কেমিক্যাল ইন্ডাস্ট্রিজ কর্পোরেশন (বিসিআইসি), চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষ (সিপিএ), খুলনা বন্দর কর্তৃপক্ষ (কেপিএ), বিভিন্ন সিটি কর্পোরেশন থেকে ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের নিয়ে এক বা একাধিক সেমিনার/কর্মশালা আয়োজন করার জন্য কমিশনের ফাইন্যান্সিয়াল লিটারেসি বিভাগকে অনুরোধ করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। এ বিষয়ে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য কমিশনের ফাইন্যান্সিয়াল লিটারেসি বিভাগকে বিশেষভাবে অনুরোধ জানানো হালো।

সারা দেশে করোনা পরিস্থিতির মধ্যে ২০২০ সালের ১৭ মে বিএসইসির চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব নেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক অধ্যাপক শিবলী রুবাইয়াত-উল ইসলাম। তার হাতকে শক্তিশালী করতে সরকার কমিশনার হিসেবে দায়িত্ব দেয় একই বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক অধ্যাপক শেখ শামসুদ্দিন আহমেদ, অধ্যাপক মিজানুর রহমান ও সাবেক শিল্প সচিব আব্দুল হালিমকে। তাদের নেতৃত্বে ২০২১ সালের অক্টোবর পর্যন্ত পুঁজিবাজারে টানা উত্থান লক্ষ করা গেছে। এ সময়ে দেশের প্রধান পুঁজিবাজার ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের (ডিএসই) সাধারণ সূচক ৪ হাজার থেকে বেড়ে দাঁড়ায় ৭ হাজার ৩০০ পয়েন্টে। লেনদেন ১০০ কোটি টাকা থেকে বেড়ে দাঁড়ায় ৩ হাজার কোটি টাকার বেশি। ফলে, বিনিয়োগকারীদের মধ্যে ফেরে আশার আলো। এর পরেই পুঁজিবাজারে দেখা দেয় ছন্দপতন। ইউক্রেন-রাশিয়া যুদ্ধের কারণে বিশ্ব অর্থনীতির টানাপড়েনের মধ্যে বাংলাদেশের পুঁজিবাজার গতি হারিয়ে ফেলে। এর পর থেকে এখন পর্যন্ত পুঁজিবাজার ফিরে পায়নি তার ছন্দ।

এ পরিস্থিতি মোকাবিলায় বিএসইসির পক্ষ থেকে বেশকিছু উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়, যা আগে কোনো কমিশন গ্রহণ করেনি। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো—দীর্ঘদিন বন্ধ থাকা বেশ কয়েকটি কোম্পানিকে উৎপাদনে ফিরিয়ে মূল পুঁজিবাজারে যুক্ত করা, পুঁজিবাজার থেকে অর্থ সংগ্রহ করে হাওয়া হয়ে যাওয়া কোম্পানিগুলোকে ডি লিস্টিংয়ের আওতায় এনে বিনিয়োগকারীদের টাকা ফিরিয়ে দেওয়া, অলস পড়ে থাকা অদাবিকৃত লভ্যাংশ দিয়ে পুঁজিবাজার স্থিতিশীলতা তহবিল গঠন করা, মিথ্যা ও অসত্য তথ্য দিয়ে পুঁজিবাজার থেকে অর্থ সংগ্রহের পরিকল্পকারী কোম্পানির প্রাথমিক গ্রণপ্রস্তাবের (আইপিও) আবেদন বাতিল করা, বিনিয়োগকারীদের স্বার্থ সংরক্ষণে কোম্পানিগুলোকে বোনাস লভ্যাংশের পরিবর্তে নগদ লভ্যাংশ দিতে বাধ্য করা, পুঁজিবাজারে ধারাবাহিক পতন ঠেকাতে শেয়ারের সর্বনিম্ন দর (ফ্লোর প্রাইস) বেঁধে দেওয়া, ওভার দ্য কাউন্টার (ওটিসি) মার্কেট বাতিল করে স্মল ক্যাপিটাল প্ল্যাটফর্ম (এসএমই) চালু করা এবং অল্টারনেটিভ ট্রেডিং বোর্ড (এটিবি) চালুর উদ্যোগ নেওয়া, ব্যাংকের বিনিয়োগসীমার গণনার ক্ষেত্রে শেয়ারের বাজার মূল্যের পরিবর্তে ক্রয়মূল্যে নির্ধারণের মাধ্যমে দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগের সুযোগ তৈরি হওয়া, মিউচুয়াল ফান্ডগুলোকে শৃঙ্খলায় আনা, বন্ড মার্কেট উন্নয়নের পাশাপাশি ইসলামী গ্রিন সুকুক ও সরকারি ট্রেজারি বন্ডেরও লেনদেন শুরু করা, প্রোরাটার ভিত্তিতে সবার জন্য আইপিওর শেয়ার নিশ্চিতকরণ এবং পুঁজিবাজারে কারসাজি রোধে জড়িতদের নিয়মিত শাস্তির অওতায় আনা ও বিভিন্ন বিধি-বিধান সংশোধন করা।

এসব পরিবর্তন ও চেষ্টার পরও দেশের পুঁজিবাজার তার কাঙ্ক্ষিত গতিতে ছুটতে পারছে না। তবে, কমিশন মনে করে, ইউক্রেন-রাশিয়া যুদ্ধের অবসান ঘটলেই শিগগিরই দেশের পুঁজিবাজার গতি ফিরে পাবে। তাই, এ পরিস্থিতিতেও পুঁজিবাজারে পুঁজির যোগান বাড়াতে নতুন নতুন উদ্যোগ নিচ্ছে বিএসইসি।

এনটি/রফিক

সর্বশেষ

পাঠকপ্রিয়