ঢাকা     মঙ্গলবার   ২৬ মে ২০২৬ ||  জ্যৈষ্ঠ ১২ ১৪৩৩ || ৯ জিলহজ ১৪৪৭ হিজরি

Risingbd Online Bangla News Portal

গভর্নরের সঙ্গে বৈঠক

ঋণের সুদহার কমানোসহ ১২ প্রস্তাব ব্যবসায়ীদের

জ্যেষ্ঠ প্রতিবেদক || রাইজিংবিডি.কম

প্রকাশিত: ২১:০৯, ৬ এপ্রিল ২০২৬  
ঋণের সুদহার কমানোসহ ১২ প্রস্তাব ব্যবসায়ীদের

রপ্তানি উন্নয়ন তহবিল (ইডিএফ) বৃদ্ধি করা, একক ঋণসীমা বিদ্যমান বৃদ্ধি করে ২৫ শতাংশ করা, ঋণের সুদহার এক অঙ্কে রাখা, খেলাপি ঋণের নিয়ম কিছুটা শিথিল করাসহ বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নরের কাছে ১২টি প্রস্তাব দিয়েছে ব্যবসায়ীদের শীর্ষ সংগঠন ফেডারেশন অব বাংলাদেশ চেম্বারস অফ কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রি (এফবিসিসিআই)।

সোমবার (৬ এপ্রিল) বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নরের সঙ্গে এফবিসিসিআইর প্রশাসক মো. আবদুর রহিম খানের নেতৃত্বে ব্যবসায়ী প্রতিনিধিদলের বৈঠকের এসব প্রস্তাবনা দেয় হয়।

আরো পড়ুন:

বৈঠকে বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নরের নিকট এফবিসিসিআই লিখিত প্রস্তাব দিয়েছে। লিখিত প্রস্তাবে বলা হয়, বৈশ্বিক অর্থনৈতিক পরিস্থিতির কারণে শিল্পের কাঁচামাল ও মূলধনী যন্ত্রপাতির মূল্য, জ্বালানি খরচ এবং পরিবহন ব্যয় উল্লেখযোগ্য হারে বেড়েছে। এতে উৎপাদন ও ব্যবসা পরিচালনার ব্যয় বৃদ্ধি পেয়েছে। একই সঙ্গে আন্তর্জাতিক বাজারে পণ্যের চাহিদা কমে যাওয়ায় দেশের শিল্প ও রপ্তানি খাতও চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েছে। মধ্যপ্রাচ্যের চলমান যুদ্ধের কারণে জ্বালানি সরবরাহ, রেমিট্যান্স প্রবাহ এবং সামগ্রিক অর্থনৈতিক কার্যক্রমেও নেতিবাচক প্রভাব পড়ার আশঙ্কা রয়েছে।বিদ্যমান পরিস্থিতিতে দেশের বিনিয়োগ ও ব্যবসা-বাণিজ্য সহায়ক পরিবেশকে আরো  সূদৃঢ় ও জোরদার করা জরুরি হয়ে পড়েছে।

বর্তমান পরিস্থিতিতে দেশের অর্থনৈতিক কার্যক্রমকে সুদৃঢ় ও বেগবান করতে বেসরকারি খাতের পক্ষ থেকে বেশ কিছু প্রস্তাবনা ও সুপারিশ তুলে ধরেছে এফবিসিসিআই। 

প্রস্তাবনাগুলোর মধ্যে রয়েছে  
ব্যাংকিং খাতের শৃঙ্খলা, সুদের হার স্থিতিশীল রাখা, বৈদেশিক মুদ্রার (ডলার) যোগান স্বাভাবিক রাখা, ক্ষতিগ্রস্ত শিল্প কারখানার জন্য পলিসি সহায়তা, বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবাহ নিশ্চিতকরণ, অনাদায়ী/খেলাপি ঋণ (এনপিএল) কমিয়ে আনা, স্বল্প মেয়াদি ঋণের মেয়াদ বৃদ্ধি করা, অবাধ রেমিট্যান্স প্রবাহ, শিল্পের ব্যাংকিং সমস্যা সমাধানের জন্য বিশেষ কমিটি, গ্রীণ ফাইন্যান্সিং জোরদারকরণ, গ্রাহক ঋণসীমা বর্ধিতকরণ, এসএসমই ও নারী উদ্যোক্তাদের জন্য ব্যাংকিং সুবিধা সম্প্রসারণ।

ব্যাংকিং খাতের শৃঙ্খলা: ব্যাংকিং খাতের সংস্কার ও সুশাসন প্রতিষ্ঠা বর্তমান সরকারের একটি অন্যতম নির্বাচনী অঙ্গীকার। বিগত সরকারের (আওয়ামী লীগ সরকার) সময় দেশ থেকে প্রায় ২৩৪ বিলিয়ন মার্কিন ডলার বিদেশে পাচার হয়েছে যা অর্থনীতিতে রক্তক্ষরণের সৃষ্টি করেছে। বর্তমান পরিস্থিতিতে এই পাচারকৃত অর্থ ফিরিয়ে আনা, ব্যাংকিং খাতে শৃংখলা নিশ্চিত করার লক্ষ্যে ব্যাংক মার্জার বা একীভূত করার ক্ষেত্রে আমানতকারী ও সাধারণ ব্যবসায়ীদের স্বার্থ রক্ষার বিষয়টি বিবেচনায় নেওয়ার জন্য অনুরোধ জানিয়েছে এফবিসিসিআই।

সুদের হার স্থিতিশীল রাখা: বর্তমান বিশ্ব অর্থনৈতিক পরিস্থিতিতে দেশীয় পণ্যের প্রতিযোগীতা সক্ষমতা ধরে রাখা, বিনিয়োগের স্বার্থে এবং মূল্যস্ফিতি নিয়ন্ত্রণে সুদের হার স্থিতিশীল রাখা জরুরি। সুদের হার মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণের অন্যতম পন্থা হলেও আর্থিক খাত, রাজস্ব খাত ও বাজার ব্যবস্থাপনার পরিপূর্ণ সমন্বয় ছাড়া মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব নয়। দেশের অর্থনীতির স্বার্থে সুদের হার ক্রমান্বয়ে কমিয়ে সিঙ্গেল ডিজিটে নামিয়ে আনার প্রস্তাব দিয়েছে  এফবিসিসিআই।

বৈদেশিক মুদ্রার (ডলার) যোগান স্বাভাবিক রাখা: আমদানি-রপ্তানি ও উৎপাদন কার্যক্রম নিরবচ্ছিন্ন রাখার স্বার্থে বাজারে বৈদেশিক মুদ্রার (ডলার) যোগান স্বাভাবিক রাখার পাশাপাশি বৈদেশিক মুদ্রার বিনিময় হার স্থিতিশীল রাখার অনুরোধ জানিয়েছে এফবিসিসিআই।

ক্ষতিগ্রস্ত শিল্প কারখানার জন্য পলিসি সহায়তা: ক্ষতিগ্রস্ত শিল্প কারখানা ও বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানগুলোর স্বার্থে প্রয়োজনীয় পলিসি সহায়তা প্রদান করার প্রস্তাব। ক্ষতিগ্রস্ত ব্যবসায়ীদের জন্য ঋণ পুনঃতফশীলকরণ, সহজ শর্তে ঋণ প্রদান, ইনসেনটিভ প্যাকেজ প্রভৃতি পলিসি সহায়তা, বিশেষ করে খঋণ পুনঃতফশীলকরণের মেয়াদ তিন মাসের ছলে ছয় করার প্রস্তাব।

বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবাহ নিশ্চিতকরণ: বর্তমান সরকার প্রায় ২৩ লাখ কোটি টাকার ঋণের বোঝা নিয়ে যাত্রা শুরু করেছে। ২০২৫ সালে সরকারি খাতে ঋণের প্রবৃদ্ধি ছিল ৩২ শতাংশের  বেশী। অন্যদিকে গত ৮ মাস ধরে বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবাহের প্রবৃদ্ধি গড়ে ৬ শতাংশের  মধ্যে সীমাবদ্ধ রয়েছে। সরকারি খাতের ঋণের প্রবাহ যথাসাধ্য কমিয়ে আনতে হবে যাতে উৎপাদন খাত ব্যাহত না হয়।

অনাদায়ী/খেলাপী ঋণ (এনপিএল) কমিয়ে আনা: অনাদায়ী/ খেলাপী ঋণ দেশের অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে বিশাল অন্তরায়। অনাদায়ী/খেলাপী ঋণের পরিমাণ অবশ্যই কমিয়ে আনতে হবে। এফবিসিসিআই কখনো ইচ্ছাকৃত ঋণখেলাপীদের পক্ষে নয়। তবে পরিস্থিতির কারণে অনিচ্ছাকৃতভাবে যারা ঋণ খেলাপী হয়েছেন তাদের অর্থনীতিতে পুনর্বাসনে নীতিগত সহায়তা প্রদান করা যেতে পারে। সাথে ইচ্ছাকৃত ঋণখেলাপীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার মাধ্যমে খেলাপী ঋণের পরিমাণ কমিয়ে আনার প্রস্তাব দিয়েছে এফবিসিসিআই।

স্বল্প মেয়াদি ঋণের মেয়াদ বৃদ্ধিকরণ: উৎপাদনকারীদেরকে সুরক্ষার লক্ষ্যে স্বল্প মেয়াদি ঋণগুলোর মেয়াদ যুক্তিসঙ্গত হারে বৃদ্ধি করার প্রস্তাব করেছ সংগঠনটি।

অবাধ রেমিট্যান্স প্রবাহ: প্রবাসীদের রেমিট্যান্স দেশের অর্থনীতিতে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। বর্তমান পরিস্থিতিতে প্রবাসীদের রেমিট্যান্সের অবাধ প্রবাহ নিশ্চিত করতে ইনসেনটিভ দেওয়া যেতে পারে। সেই সাথে জনশক্তি রপ্তানি বাড়াতে বিদেশগামীদের আর্থিক সহায়তা বা স্বল্প সুদ ও সহজ শর্তে ঋণ দেওয়া যেতে পারে।

শিল্পের ব্যাংকিং সমস্যা সমাধানের জন্য বিশেষ কমিটি: উৎপাদন ও রপ্তানিমুখী শিল্প প্রতিষ্ঠানসমূহ সময় সময় বিভিন্ন ধরনের ব্যাংকিং সমস্যার সম্মুখীন হয়ে থাকে যা ত্বরিৎ সমাধান হওয়া জরুরি। বিশেষ করে ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পের ব্যাংকিং সমস্যা দ্রুত সমাধানের জন্য বাংলাদেশ ব্যাংকে একজন সম্মানিত ডেপুটি গভর্নরের নেতৃত্বে একটি কমিটি গঠন করা যেতে পারে।

গ্রীণ ফাইন্যান্সিং জোরদারকরণ: চলমান মধ্যপ্রাচ্য সংকটের কারনে জ্বালানি আমদানির জন্য সরকারকে ৪.৮০ বিলিয়ন মার্কিন ডলার অতিরিক্ত ব্যয় করতে হবে। আমদানিকৃত জ্বালানির ব্যবহার সাশ্রয়ের জন্য গ্রীন এনার্জি হিসেবে সোলার এনার্জির ব্যবহারকে উৎসাহিত করতে স্বল্প সুদে ঋণ প্রদানের বিষয়টি বিবেচনায় নেওয়া যেতে পারে।

গ্রাহক ঋণসীমা বর্ধিতকরণ: বর্তমান গ্রাহক ঋণসীমা ১৫ শতাংশ থেকে বৃদ্ধি করে ২৫ শতাংশ করার প্রস্তাব করছি।

ইডিএফ ফান্ডের পরিসর বিস্তৃতিকরণ: রপ্তানি উন্নয়নের স্বার্থে রপ্তানি উন্নয়ন তহবিল (ইডিএফ) পরিমাণ বৃদ্ধি ও সব রপ্তানি খাতের জন্য উন্মুক্ত রাখা, বৈদেশিক মুদ্রার (ডলার) একটি আপতকালীন ফান্ড গঠনের প্রস্তাব করেছে এফবিসিসিআই।

এসএসমই ও নারী উদ্যোক্তাদের জন্য ব্যাংকিং সুবিধা সম্প্রসারণ: বাংলাদেশের মতো উন্নয়নশীল দেশের সার্বিক অর্থনীতির উন্নয়নে ক্ষুদ্র ও মাঝারী উদ্যোক্তাদের ভূমিকা অনস্বীকার্য। ক্ষুদ্র আকারে বিনিয়োগের মাধ্যমে অর্থনৈতিক উন্নয়নে মহিলা উদ্যোক্তারাও ব্যাপকভাবে এগিয়ে আসছে। এসএমই ও মহিলা উদ্যোক্তাদের জন্য ব্যাংকিং সুবিধা সম্প্রসারণ করার প্রস্তাব করছি।

বৈঠক শেষে ব্যবসায়িরা সাংবাদিকদের বলেন, “আমরা কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নিকট বেশ কিছু প্রস্তাব দিয়েছি। সঠিক নীতি সহায়তা, কার্যকর তদারকি এবং ব্যাংকিং খাতে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনতে পারলে দেশের অর্থনীতি আবারো গতি ফিরে পাবে এবং বিনিয়োগ পরিবেশ শক্তিশালী হবে।”

এফবিসিসিআইর প্রশাসক মো. আবদুর রহিম খান জানান, দেশের বৈদেশিক মুদ্রার সরবরাহ এখন স্থিতিশীল রয়েছে। তবে মধ্যপ্রাচ্যের ভূরাজনৈতিক উত্তেজনার কারণে ভবিষ্যতে ডলার বাজারে চাপ তৈরি হতে পারে। এ কারণে আগাম প্রস্তুতি হিসেবে রপ্তানি উন্নয়ন তহবিল বৃদ্ধি করার জন্য এফবিসিসিআই এর পক্ষ থেকে প্রস্তাব করা হয়েছে।

ঢাকা/নাজমুল/এসবি

সম্পর্কিত বিষয়:

সর্বশেষ

পাঠকপ্রিয়