ঢাকা     বৃহস্পতিবার   ২৬ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ ||  ফাল্গুন ১৪ ১৪৩২ || ৮ রমজান ১৪৪৭ হিজরি

Risingbd Online Bangla News Portal

বাংলাদেশ ব্যাংকের পর দৃষ্টি এবার পুঁজিবাজার নিয়ন্ত্রক সংস্থায়  

নুরুজ্জামান তানিম || রাইজিংবিডি.কম

প্রকাশিত: ১৬:৪৯, ২৬ ফেব্রুয়ারি ২০২৬   আপডেট: ১৭:১৯, ২৬ ফেব্রুয়ারি ২০২৬
বাংলাদেশ ব্যাংকের পর দৃষ্টি এবার পুঁজিবাজার নিয়ন্ত্রক সংস্থায়  

নির্বাচিত সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর বাংলাদেশ ব্যাংকসহ দেশের আর্থিক খাতের শীর্ষ পদে পরিবর্তনের ধারাবাহিকতায় এবার আলোচনার কেন্দ্রে উঠে এসেছে পুঁজিবাজার নিয়ন্ত্রক সংস্থার নেতৃত্ব। এই সংস্থার চেয়ারম্যান পদেও কি পরিবর্তন আসছে- সেদিকে নজর বিনিয়োগকারী ও বাজার সংশ্লিষ্টদের।

২০২৪ সালের ৫ আগস্ট রাজনৈতিক পট পরিবর্তনের পর অন্তর্বর্তী সরকার আর্থিক খাতের কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ পদে নতুন নিয়োগ দিয়েছিল। সেই ঝটকায় কেন্দ্রীয় ব্যাংকের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছিল অর্থনীতিবিদ আহসান এইচ মনসুরকে। একই সময়ে পুঁজিবাজার নিয়ন্ত্রক সংস্থা বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশনের (বিএসইসি) চেয়ারম্যানের দায়িত্ব দেওয়া হয় খন্দকার রাশেদ মাকসুদকে।

আরো পড়ুন:

নির্বাচনে নিরঙ্কুশ জয় নিয়ে বিএনপি সরকার গঠনের পর থেকে আর্থিক খাতে পুনর্বিন্যাস শুরু হয়েছে। মনসুরকে সরিয়ে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের গভর্নর পদে বসানো হয়েছে মো. মোস্তাকুর রহমানকে।

বিএনপির নির্বাচনি ইশতেহারে পুঁজিবাজারকে ঢেলে সাজানো এবং বাজারকে গতিশীল ও শক্তিশালী করার অঙ্গীকার দিয়ে সুস্পষ্ট রূপরেখা তুলে ধরা হয়েছে। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান তার দলের দেওয়া অঙ্গীকার বাস্তবায়নে কাজ শুরু করেছেন। 

নতুন করে গুছিয়ে কাজ শুরু করতে বিএসইসির শীর্ষ পদেও কি বদল আনছে সরকার? তাই যদি হয়, তাহলে কে হচ্ছেন নতুন চেয়ারম্যান? এই আলোচনা এখন পুঁজিবাজার-সংশ্লিষ্টদের মধ্যে শোনা যাচ্ছে।

এ বিষয়ে ইঙ্গিতপূর্ণ বক্তব্য দিয়েছেন অর্থমন্ত্রী আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী। গত বুধবার (২৫ ফেব্রুয়ারি) সচিবালয়ে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‍“নতুন সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর নিজেদের কর্মসূচি বাস্তবায়নের প্রয়োজনে বিভিন্ন জায়গায় পরিবর্তন আনা হচ্ছে, যা একটি স্বাভাবিক প্রক্রিয়া। প্রয়োজনে আরো পরিবর্তন হবে।”

অর্থমন্ত্রীর এই বক্তব্যের পর বিনিয়োগকারী মহলে ধারণা জোরালো হয়েছে, পুঁজিবাজার নিয়ন্ত্রক সংস্থার চেয়ারম্যান পদেও পরিবর্তন আসতে পারে।

বিএসইসির নতুন চেয়ারম্যানের দৌড়ে যারা আলোচনায়
সরকার দায়িত্ব নেওয়ার এক সপ্তাহ পার না হতেই নিয়ন্ত্রক সংস্থার শীর্ষ পদে সম্ভাব্য ব্যক্তিদের নাম নিয়ে আলোচনা শুরু হয়েছে। সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, ইতোমধ্যে চেয়ারম্যান পদে অন্তত ছয়জনের নাম সুপারিশ আকারে সরকারের উচ্চপর্যায়ে পৌঁছেছে। এই তালিকায় বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক, কমিশনে কাজের অভিজ্ঞতাসম্পন্ন ব্যক্তি, বহির্বিশ্বের পুঁজিবাজারে অভিজ্ঞ ব্যক্তি, বাজারের অংশীজনেরও নাম রয়েছে।

আলোচনায় থাকা ব্যক্তিদের মধ্যে রয়েছেন বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান পলিসি এক্সচেঞ্জ বাংলাদেশের চেয়ারম্যান ও প্রধান নির্বাহী মাশরুর রিয়াজ। আন্তর্জাতিক সংস্থা বিশ্বব্যাংকে কাজের অভিজ্ঞতা রয়েছে এই অর্থনীতিবিদের।

দেশের প্রধান শেয়ারবাজার ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের (ডিএসই) সাবেক জ্যেষ্ঠ সহ-সভাপতি ও ব্রোকারদের সংগঠন ডিএসই ব্রোকার্স অ্যাসোসিয়েশনের (ডিবিএ) সভাপতি সাইফুল ইসলামের নাম শোনা যাচ্ছে। দেশ-বিদেশে প্রায় পঁচিশ বছর ধরে পুঁজিবাজার নিয়ে কাজ করার অভিজ্ঞতা থাকায় তাকে বিএসইসির শীর্ষ পদে শক্তিশালী প্রার্থী হিসেবে দেখা হচ্ছে।

শিক্ষা খাত থেকেও কয়েকজনের নাম আলোচনায় রয়েছে। তাদের মধ্যে আছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের হিসাববিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক মো. আল-আমিন। তিনি পুঁজিবাজার সংস্কার সুপারিশ টাস্কফোর্সের সদস্য ছিলেন। পুঁজিবাজার নিয়ে দীর্ঘ ২৬ বছরে অভিজ্ঞতা রয়েছে তার। এছাড়া একই প্রতিষ্ঠানের অধ্যাপক ড. মো. মোর্শেদ হাসান খানের নাম রয়েছে।

পুঁজিবাজার সংশ্লিষ্ট সম্ভাব্য প্রার্থীদের মধ্যে আলোচনা রয়েছেন ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের (ডিএসই) চেয়ারম্যান মমিনুল ইসলাম ও পরিচালক মিনহাজ মান্নান ইমন। এছাড়া চট্টগ্রাম স্টক এক্সচেঞ্জের (সিএসই) পরিচালক এবং লংকা বাংলা সিকিউরিটিজের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মোহাম্মদ নাসির উদ্দিন চৌধুরী।

নিয়ন্ত্রক সংস্থার অভিজ্ঞতা থাকা ব্যক্তিদের মধ্যে আলোচনায় আছেন সাবেক কমিশনার এটিএম তারিকুজ্জামান। তিনি দুই দশকের বেশি সময় সংস্থায় কাজ করেছেন।

এছাড়া আন্তর্জাতিক পুঁজিবাজারে কাজের অভিজ্ঞতাসম্পন্ন হেজ তহবিল প্রতিষ্ঠান টাইবোর্ন ক্যাপিটালের সহ-প্রতিষ্ঠাতা তানভীর গনির নাম আলোচনায় রয়েছে।

নতুন সরকারের পুঁজিবাজার ভাবনা
বিএনপির নির্বাচনি প্রতিশ্রুতিতে পুঁজিবাজার সংস্কারের কথা জোরালোভাবে তুলে ধরা হয়। সেখানে পুঁজিবাজার সংস্কারে ব্যাপক উদ্যোগ এবং নিয়ন্ত্রক সংস্থায় যোগ্য ব্যক্তিদের নিয়োগের প্রতিশ্রুতিও দেওয়া হয়। অন্যান্য প্রতিশ্রুতির মধ্যে রয়েছে- বাজারে স্বচ্ছতা বৃদ্ধি, কারসাজি দমন, শক্তিশালী বন্ড বাজার গঠন, প্রবাসীদের বিনিয়োগ সুবিধা, নতুন প্রযুক্তির ব্যবহার এবং ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের জন্য সহজে পুঁজিবাজারে প্রবেশের ব্যবস্থা। পাশাপাশি পুঁজিবাজারে ব্লক চেইন প্রযুক্তি ব্যবহার ও বিদেশি বিনিয়োগ বৃদ্ধি, পুঁজিবাজারে প্রবেশাধিকার সহজলভ্য করা, স্টার্ট-আপ ও এসএমই খাতের জন্য ‘ডিজিটাল আইপিও এক্সপ্রেস’ ব্যবস্থা চালু করা, পুঁজিবাজার ট্রাইব্যুনাল গঠন এবং শিক্ষার্থীদের মধ্যে পুঁজিবাজারসংক্রান্ত শিক্ষার প্রসার নিয়েও অঙ্গীকার রয়েছে বিএনপির।

এ বিষয়ে পেশাজীবী সাংবাদিকদের সংগঠন ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটির (ডিআরইউ) সঙ্গে মতবিনিময়ে সরকারপ্রধান তারেক রহমান পুঁজিবাজার নতুনভাবে সাজানোর ইঙ্গিত দিয়েছেন বলে জানা গেছে।

অর্থমন্ত্রী আমীর খসরু গত ২০ ফেব্রুয়ারি চট্টগ্রামে সাংবাদিকদের বলেন, “শেয়ারবাজারে বড় ধরনের পরিবর্তনের পরিকল্পনা রয়েছে, যা বাস্তবায়িত হলে বাজারে নতুন গতি আসতে পারে।”

পুঁজিবাজারে আস্থা ফেরানোর চ্যালেঞ্জ
বাজার সংশ্লিষ্টদের মতে, শুধু ব্যক্তি পরিবর্তন নয়, নেতৃত্বে স্বচ্ছতা, জবাবদিহিতা ও স্বার্থসংঘাতমুক্ত সিদ্ধান্ত নিশ্চিত করা জরুরি। দীর্ঘদিন ধরে আস্থাহীনতায় ভোগা পুঁজিবাজারে স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনতে শক্তিশালী নীতিগত অবস্থান প্রয়োজন। বর্তমান সরকার যদি দক্ষ নেতৃত্ব ও কার্যকর সংস্কার বাস্তবায়ন করতে পারে, তাহলে বিনিয়োগকারীদের আস্থা ধীরে ধীরে ফিরে আসতে পারে।

তবে কেবল নিয়ন্ত্রক সংস্থার পদক্ষেপে পুঁজিবাজারের স্থায়ী পুনরুদ্ধার সম্ভব নয়। এ জন্য সরকারের সর্বোচ্চ নীতিনির্ধারণী পর্যায় থেকে সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন। বিশেষ করে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান ও অর্থমন্ত্রী আমীর খসরুর সরাসরি তদারকি, নীতিগত সহায়তা ও কাঠামোগত সংস্কার ছাড়া বাজারে টেকসই আস্থা ফিরিয়ে আনা কঠিন হবে।

এখন দেখার বিষয় সরকার শেষ পর্যন্ত পুঁজিবাজারের নেতৃত্ব কাদের হাতে তুলে দেয় সরকার। তারা কতটা দ্রুত বাজারে শৃঙ্খলা ও আস্থা ফিরিয়ে আনতে পারেন। কারণ দেশের অর্থনীতিতে দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগ ও শিল্পায়নের জন্য শক্তিশালী পুঁজিবাজার অপরিহার্য।

ঢাকা/রাসেল

সর্বশেষ

পাঠকপ্রিয়