Risingbd Online Bangla News Portal

ঢাকা     সোমবার   ০৮ মার্চ ২০২১ ||  ফাল্গুন ২৩ ১৪২৭ ||  ২৩ রজব ১৪৪২

টাঙ্গাইলের খেশ শাড়িতে উদ্যোক্তা নিগার ফাতেমা

মিফতাউল জান্নাতী সিনথিয়া || রাইজিংবিডি.কম

প্রকাশিত: ১২:০৮, ২০ জানুয়ারি ২০২১   আপডেট: ১২:৩১, ১১ ফেব্রুয়ারি ২০২১
টাঙ্গাইলের খেশ শাড়িতে উদ্যোক্তা নিগার ফাতেমা

নিগার ফাতেমা, পৈতৃক বাড়ি ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় হলেও জন্ম ও বেড়ে ওঠা পুরান ঢাকায়। বাবা-মায়ের দ্বিতীয় সন্তান নিগার। আমেরিকান ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি বাংলাদেশ (AIUB) থেকে ইঞ্জিনিয়ারিংয়ে অনার্স-মাস্টার্স শেষ করেন তিনি।

নিগার ফাতেমা পূর্বে শিক্ষকতা পেশায় নিয়োজিত ছিলেন। বর্তমানে তিনি একজন দেশি পণ্যের ই-কমার্স উদ্যোক্তা। তার উদ্যোগের নাম আরিয়াস কালেকশন। তিনি একজন অনলাইন উদ্যোক্তা। অনলাইনে তার ফেসবুক পেজের সব পণ্যের মধ্যে দেশের ঐতিহ্য খেশ পণ্যই অন্যতম। তিনি তার উদ্যোগের গল্প বলেছেন রাইজিংবিডিতে। সাক্ষাৎকারটি নিয়েছেন পত্রিকার উদ্যোক্তা পাতার সহ-সম্পাদক মিফতাউল জান্নাতি সিনথিয়া। 

রাইজিংবিডি: ব্যবসার শুরুর দিকের গল্পটা যদি বলতেন?

নিগার ফাতেমা: ব্যবসার শুরুটা অবশ্যই সহজ ছিল না। আমি একটি ইংলিশ মিডিয়াম স্কুলে চাকরি করতাম। বাচ্চাকে দেখাশোনা করার জন্য চাকরি ছেড়ে দিলাম। দেখা গেলো কিছু দিন যাওয়ার পর এক ধরনের হতাশা চলে আসে, ঠিক সেখান থেকেই নিজের একটি আইডেন্টিটি ও পরিচিতি পাওয়ার লক্ষ্যে ফেসবুকে একটি ব্যবসায়ীক পেজ চালু করি। খুব বেশি চিন্তাভাবনা করে এটি করিনি।  এনিয়ে আমার তেমন লেখাপড়া বা পূর্ব অভিজ্ঞতাও ছিল না। তবে আমি নিজেকে ভাগ্যবান বলে মনে করি এই জন্য যে, উইর (উইমেন অ্যান্ড ই-কমার্স ফোরাম) উপদেষ্টা রাজীব আহমেদ স্যার যেদিন উই গ্রুপে এক্টিভ হন অর্থাৎ ১৮ অগাস্ট ২০১৯, সেদিন আমিও প্রথম উই গ্রুপে যোগ দেই। তাই অনেক কিছুই সহজ হয়ে গেছে।

রাইজিংবিডি: কোন ধরনের পণ্য নিয়ে কাজ করছেন?

নিগার ফাতেমা: আমি মূলত টাঙ্গাইল জেলার ঐতিহ্যবাহী পণ্য খেশ কাপড় নিয়ে কাজ করছি। খেশের শাড়ি, পাঞ্জাবি এসব ছাড়াও খেশের ব্যাগ, খেশের শাল এসব পণ্য ইনোভেশন করার চেষ্টা করছি। 

রাইজিংবিডি: কোন ধরনের চিন্তা ভাবনা থেকে খেশ পণ্য নিয়ে কাজ করার পরিকল্পনা ছিল?

নিগার ফাতেমা: আমি সবসময় চেয়েছি এমন কিছু পণ্য নিয়ে কাজ করতে, খুব বেশি লোক বা সবাই যে পথে হাঁটেন। এর অন্যতম কারণ হচ্ছে ছোটবেলা থেকেই আমি দেশীয় শাড়ি  সঙ্গে পরিচিত ছিলাম, আমার মা-বাবার সঙ্গে বিভিন্ন জায়গায় যেতাম।  মায়ের শাড়ির প্রতি  অন্যরকম ভালোবাসা ছিল। তার জন্য অনেক শাড়ি চিনেছি। আর এই ভাবেই খেশ শাড়ির  সঙ্গে পরিচয়। 

একইসঙ্গে এই খেশ কাপড়ের উদ্ভাবন কিন্তু হয়েছিল বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের প্রতিষ্ঠিত শান্তিনিকেতনে তার ছাত্রদের মধ্য থেকে। এটি পশ্চিম বাংলায় ছিল। এক সময় এটি  বাংলাদেশের তাঁতিদের মধ্যে ছড়িয়ে পড়ে। এই গল্পটাও আমাকে অনেক আকৃষ্ট করে। তাই উইতে যোগ দেওয়ার পরে যখন রাজীব আহমেদ স্যারের সঙ্গে পরিচয় হলো, তখন তিনি এ নিয়ে আমাকে ব্যাপকভাবে উৎসাহিত করেন। তিনি সবসময় বলতেন, তিনি চান আমি যেন সবসময় খেশকে সবার সঙ্গে পরিচিত করার উদ্যোগ নেই। বিক্রি এক সময় হবে।  ঠিক তাই হয়েছে, আমি প্রথম কয়েকমাস শুধু খেশ নিয়ে উইতে পোস্ট দিয়েছি। এরপর ধীরে ধীরে বিক্রি বেড়ে গেছে।

রাইজিংবিডি: ব্যবসার শুরুটা কি অনলাইনেই, নাকি অন্য কোনো উপায়ে ছিল?

নিগার ফাতেমা: ব্যবসার শুরুটা অনলাইন কেন্দ্রিক ছিল। আমি আগেই বলেছি যে আমি স্কুলে চাকরি করতাম। তা ছাড়ার পরে মনে হলো যে ঘরে বসে এমন কী কাজ করা যায়। তখন মনে হলো, ঘরে বসে ফেসবুকের মাধ্যমে অনলাইনে কিছু বিক্রি করাটাই সবচেয়ে ভালো কাজ হবে।

রাইজিংবিডি: কাজ করতে গিয়ে কখনো সমস্যার সম্মুখীন হয়েছেন?

নিগার ফাতেমা: সেই অর্থে আমি কোনো ধরনের বিব্রতকর পরিস্থিতির মুখোমুখি হইনি। আমি আগেই বলেছি যে, আমি যেইদিন উই গ্রুপে জয়েন্ট করি, ঠিক সেইদিন থেকে রাজীব স্যার গ্রুপে এক্টিভ হবার সিদ্ধান্ত নেন। দুইমাস কি তিন মাসের মধ্যেই তার সঙ্গে আমার খুব ভালো পরিচয় গড়ে ওঠে।  ওই সময় আসলে উইতে তেমন বেশি মেম্বার ছিল না। খুব এক্টিভ বা রেগুলার ও সিরিয়াস মেম্বারদের সংখ্যা খুব কম ছিল। আমি নিয়মিত উইর ইভেন্টগুলোতে যেতাম।  ক্লাবমিক্সে স্যার অন্যদের নিয়ে মাঝে মাঝে যে মিটিং করতেন, সেখানেও চলে যেতাম। এভাবে তার সঙ্গে পরিচয় হয়। যেহেতু ই-কমার্স অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ ই-ক্যাবের ফাউন্ডার প্রেসিডেন্ট তিনি।  তাই তার ই-কমার্স সেক্টরে অনেক বছরের অভিজ্ঞতা রয়েছে উদ্যোক্তাদের নিয়ে কাজ করার। আমি আসলেই ভাগ্যবান যে বিব্রতকর পরিস্থিতিতে পড়ার বদলে সবসময় তার গাইডেন্স পেয়েছি।

রাইজিংবিডি: নতুন উদ্যোক্তারা এই পেশায় আসতে চাইলে তাদের জন্য আপনার পরামর্শ কী?

নিগার ফাতেমা: নতুন উদ্যোক্তাদের জন্য আমার পরামর্শ আসলে দুইটি। প্রথমত, আপনি  ই-কমার্সের বিভিন্ন দিক নিয়ে জানার চেষ্টা করেন। এই জন্য আমি বলবো উই গ্রুপে এক্টিভ হওয়ার জন্য। পাশাপাশি ডিজিটাল স্কিলস ফর বাংলাদেশ গ্রপেও এক্টিভ থাকার জন্য। ডিজিটাল স্কিলস গ্রুপের ভালো দিক হচ্ছে, এখানে কোনো বিক্রির ব্যাপার নেই।  কিন্তু ই-কমার্সের সঙ্গে সম্পর্কিত ও ইনফরমেশন টেকনোলজি বা আইটির বেসিক নিয়ে অনেক পোস্ট আছে। কেউ যদি আসলে একটা মাস সময় দেয় ডিজিটাল স্কিলস গ্রুপে, তাহলে তার এদিকে অনেক বেশি তথ্য জানা হয়ে যাবে। 

আরেকটি ব্যাপার হচ্ছে, আপনি যে পণ্য নিয়ে কাজ করছেন, সেদিকে আপনাকে আসলে যথেষ্ট পরিমাণে জানতে হবে। আমি বেশ কয়েক বছর ধরে খেশ নিয়ে জানার চেষ্টা করেছি ও জানতে আগ্রহী ছিলাম। এখনো মাঝে মাঝে জানার জন্য টাঙ্গাইল চলে যাই। করোনার মধ্যে হয়তো তেমন যাওয়া হচ্ছে না, তবে করোনার আগে আমি নিয়মিত টাঙ্গাইল গিয়েছি। সেখানে আমি তাঁতিদের সঙ্গে সরাসরি কথা বলেছি, তাদের কাজ দেখেছি ও খেশ পণ্যের বিভিন্ন দিক সম্পর্কে জানার চেষ্টা করেছি।

রাইজিংবিডি: উদ্যোক্তা জীবন সফল হতে কাদের ভূমিকা বেশি ছিল?

নিগার ফাতেমা: আমি অবশ্যই রাজীব স্যারের কথা বারবার উল্লেখ করেছি এই সাক্ষাৎকারে। সেই সঙ্গে আমি ধন্যবাদ জানাতে চাই আমার স্বামীকে। তিনি যথেষ্ট উদার মনের একজন মানুষ।  উদ্যোক্তা হওয়ার ব্যাপারে কোনো কাজে কখনো বাঁধা দেননি। বরং উৎসাহিত করার চেষ্টা করেছেন।  সেই সিদ্ধেশ্বরী বা বসুন্ধরা থেকে বাচ্চাসহ মোহাম্মদপুর বা ধানমন্ডিতে আসার জন্য সব ধরনের সাপোর্ট দিয়েছেন। কখনো টাকা-পয়সার ব্যাপারে আটকে গেলে বিনা দ্বিধায় তার কাছে আমি সাহায্য চাইতে পারি।  আমার স্বামী না চাইতেও অনেক সময় নিজে থেকে এগিয়ে আসেন সাপোর্ট করার ব্যাপারে। আমার বাবা ও চাচা দুইজনেই ব্যবসায়ী।  তারাও সাপোর্ট করে গেছেন ব্যবসার ক্ষেত্রে বিভিন্ন পরামর্শ দিয়ে। আমার মাও আমাকে সবসময় উৎসাহ দেন।

রাইজিংবিডি: বর্তমান প্রেক্ষাপটে আপনার ব্যবসা নিয়ে পরিকল্পনা কী?

নিগার ফাতেমা: খেশ পণ্যকে পরিচিত করার ব্যাপারে আমি প্রায় দেড় বছর কষ্ট করেছি। এর সুফল এখন দেখতে পাচ্ছি। গত মাসেই দুইশর মতো খেশ শাল বিক্রি করতে পেরেছি। আমি যেটা দেখতে চাই, সেটা আমার ব্যবসা অনেক বড় না হলেও মোটামুটি মাঝারি মাপের হবে। অনেক মানুষ খেশের ব্যাপারে জানতে পারবে। আমি দেখতে চাই যে, দেশের ৬৪টি জেলায় আমার উদ্যোগের মাধ্যমে খেশের শাড়ি, পাঞ্জাবি, থ্রি-পিস এসব বিক্রি হবে।

রাইজিংবিডি: আপনার উদ্যোগের সফলতার কথা জানতে চাই।

নিগার ফাতেমা: আমার উদ্যোগ এখনো ঠিক অতটা সফল নয়। তবে আমি চেষ্টা করছি।  রাজীব স্যার যখন বলেছিলেন দেশি পণ্যের ই-কমার্স নিয়ে একটি সিলেবাস করার জন্য, আমি সেদিকেও সময় দিয়েছিলাম। এজন্য দুইমাস আমার বিজনেস প্রায় বন্ধ রেখেছি। ফলে ব্যাপক পরিচিতি পেয়েছি। আমার লাভ বা লোকসান ও আয়-ব্যয় যাই হোক না কেন, তার থেকে বেশি পরিচিতি পেয়েছি ই-কমার্স ইন্ডাস্ট্রিতে। বিশেষ করে দেশি পণ্যের ই-কমার্স ইন্ডাস্ট্রিতে। গত এক বছরে আমি পত্রিকা, নিউজ ওয়েবসাইট, রেডিও-টেলিভিশন সব জায়গায় ইন্টারভিউ দিয়েছি।  আমার কথা না হলেও মনে হয় লাখো লোক জানেন।

রাইজিংবিডি: উদ্যোক্তা জীবনের শুরু কতদিন ধরে এবং রেভিনিউ কেমন?

নিগার ফাতেমা: দুই বছর ধরে আমার উদ্যোক্তা জীবন চলছে এবং রেভিনিউ হচ্ছে ২০ লাখের কাছাকাছি।

রাইজিংবিডি: মূল্যবান সময় দেওয়ার জন্য ধন্যবাদ আপনাকে।

নিগার ফাতেমা: ধন্যবাদ রাইজিংবিডিকে।

ঢাকা/টিপু

সম্পর্কিত বিষয়:

সর্বশেষ

পাঠকপ্রিয়