ঢাকা     শনিবার   ০৪ ফেব্রুয়ারি ২০২৩ ||  মাঘ ২১ ১৪২৯

বঙ্গবন্ধুর মৃত্যুর খবর শুনে স্ট্রোক করে মারা যান তিনি

হাসান মাহামুদ || রাইজিংবিডি.কম

প্রকাশিত: ০৭:১৮, ১৮ আগস্ট ২০১৭   আপডেট: ০৫:২২, ৩১ আগস্ট ২০২০
বঙ্গবন্ধুর মৃত্যুর খবর শুনে স্ট্রোক করে মারা যান তিনি

বাংলা আন্দোলন জাদুঘরে ভাষা সৈনিক শওকত আলীর ছবির সামনে তার দুই নাতনি। ছবিতে বঙ্গবন্ধু ও শওকত আলী। ছবিটি শওকত আলীর ছেলের ফেসবুক পেজ থেকে নেওয়া। ইনসেটে শওকত আলী

হাসান মাহামুদ : ‘আব্বা, মা ও রেণুর কাছে কয়েকদিন থেকে সেপ্টেম্বর মাসে ঢাকা এলাম। পূর্বে দু’একবার এসেছি বেড়াতে। পথঘাট ভাল করে চিনি না। আত্মীয়স্বজন, যারা চাকরিজীবী, কে কোথায় আছেন, জানি না। ১৫০ নম্বর মোগলটুলীতে প্রথমে উঠব ঠিক করলাম। শওকত মিয়া মোগলটুলী অফিসের দেখাশোনা করে। মুসলিম লীগের পুরানা কর্মী। আমার বন্ধুও। ঘোড়ার গাড়ি ঠিক করলাম, ১৫০ নম্বর মোগলটুলীতে পৌঁছে দিতে। দেখলাম, রসিক গাড়ওয়ান মোগলটুলী লীগ অফিস চেনে। আমাকে বলল, ‘আপনি লীগ অফিসে যাইবেন, চলেন সাব আমি চিনি।’ শামসুল হক সাহেব ও শওকত সাহেব আমাকে পেয়ে খুবই খুশী। শওকত আমাকে নিয়ে কি যে করবে ভেবেই পায় না। তার একটা আলাদা রুম ছিল। আমাকে তার রুমেই জায়গা দিল। আমি তাকে শওকত ভাই বলতাম। সে আমাকে মুজিব ভাই বলত।’

উপরের কথাগুলো জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের। অসমাপ্ত আত্মজীবনীতে বঙ্গবন্ধু নিজের সাংগঠনিক কার্যক্রমের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে থাকা শওকত আলীর কথা এভাবেই লিখেছেন। বঙ্গবন্ধু সবসময় শওকত আলীকে সম্মোধন করতেন শওকত মিয়া হিসেবে।

শওকত আলীর বাড়ি (তখনকার ১৫০, চক মোগলটুলি) ছিল ভাষা আন্দোলনের সময় অসংখ্য সাংগঠনিক কাজকর্ম এবং সভার কেন্দ্রস্থল। বাড়িটি ঐতিহাসিক দিক থেকে অনেক গুরুত্ব বহন করে। এই বাড়িটি ছিল ভাষা আন্দোলন, স্বাধিকার ও স্বাধীনতা আন্দোলনের কর্মী বাহিনীর মিলনক্ষেত্র। এমনকি বঙ্গবন্ধু রাজনৈতিক জীবনের শুরুর দিকে এই বাড়িতে এসে উঠতেন।

‘ভাষা’ আমাদের শুধুমাত্র চিন্তা-চেতনা, মনন ও অন্তরের ভাব-ভাবনা প্রকাশের বাহন নয়, এর সঙ্গে জড়িয়ে থাকে দেশ ও জাতির আত্মপরিচয়, সমাজ, সংস্কৃতি, অর্থনীতি, রাজনীতিসহ সকল ক্ষেত্রে নিজস্ব স্বকীয়তা। শত শত বছর ধরে বাংলা ভাষা প্রকাশ করে যাচ্ছে বাঙালী জাতির অস্তিত্ব, স্বকীয়তা। এই ভাষার অধিকার আদায়ের সঙ্গে জড়িয়ে আছে অমূল্য প্রাণ বিসর্জন, অসংখ্য বীর, অজস্র রক্ত আর অগণিত আবেগ। তেমনি এক বীরের নাম শওকত আলী।

শওকত আলী একজন রাজনীতিবিদ এবং বাংলা ভাষা আন্দোলনের একজন অন্যতম নেতা। তিনি আওয়ামী মুসলিম লীগের একজন প্রতিষ্ঠাতা। যা পরে আওয়ামী লীগ এবং বর্তমানে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ নামে পরিচিত। তিনি তিনটি রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদেরই সদস্য ছিলেন। এছাড়াও ১৯৫০ সালে তিনি ঢাকা নগর আওয়ামী লীগ প্রতিষ্ঠার অন্যতম উদ্যোক্তা ছিলেন।

সবচেয়ে বড় পরিচয়, তিনি ‘বঙ্গবন্ধুর শওকত ভাই’, বঙ্গবন্ধুর শওকত মিয়া। এমনকি ১৫ আগস্ট কালো রাতে সংগঠিত বঙ্গবন্ধুর বর্বর হত্যাকর তিনদিন পর মারা যান ‘বঙ্গবন্ধুর শওকত ভাই’। তিনদিন আগে জাতীয় শোক দিবস পালন করা হলো বঙ্গবন্ধুর ৪২তম মৃত্যুবার্ষিকীতে। আজ ১৮ আগস্ট বঙ্গবন্ধুর এই সহকর্মীরও ৪২তম মৃত্যুবার্ষিকী।

বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান তার ‘অসমাপ্ত আত্মজীবনী’ গ্রন্থে বেশ কয়েকবার লিখেছেন শওকত আলী সম্পর্কে। বঙ্গবন্ধু নানা বিশেষণে আখ্যায়িত করেছেন রাজনীতির জন্য নিবেদিত প্রাণ এই সহযাত্রীর কথা। বঙ্গবন্ধু লিখেছেন,

রেণু (বেগম ফজিলাতুন্নেসা) আমাকে বিদায় দেওয়ার সময় নীরবে চোখের পানি ফেলছিল। আমি ওকে বোঝাতে চেষ্টা করলাম না, একটা চুমা দিয়ে বিদায় নিলাম। পরের দিন সকালে মুন্সিগন্জ পৌঁছালাম। জাহাজে একজন ছাত্রলীগ কর্মীর সাথে দেখা হয়ে গেল। সে সবকিছু জানত, তার কাছে আমাদের দুইজনের মালপত্র দিয়ে বললাম, ১৫০ নম্বর মোগলটুলীতে শওকত মিয়ার কাছে চুপ করে পোঁছে দিতে। নারায়ণগন্জে দিনের বেলায় নামলে আর ঢাকা যেতে হবে না, সোজা জেলখানায়। পরোপকারী শওকত মিয়া যেন আমার জন্য থাকার বনদোবস্ত করে রাখে। আর যদি পারে সন্ধ্যার সময় যেন নারায়ণগঞ্জে খান সাহেব ওসমান আলীর বাড়িতে আসে। খান সাহেবের বড় ছেলে শামসুজ্জোহাকেও (শামীম ওসমানের বাবা) খবর দিতে বলো। সন্ধ্যায় যেন সে বাড়িতে থাকে। সন্ধ্যার পরে নারায়ণগঞ্জ পৌঁছে রিকশা নিয়ে সোজা খান সাহেবের বাড়িতে পৌঁছালাম। আমরা ভিতরের রুমে বসে চা-নাস্তা খেলাম। জোহা সাহেব এসেই ট্যাক্সি ভাড়া করে আনল, আমাদের তুলে দিল। শওকত মিয়ার জন্য একটু দেরিও করেছিলাম। আমরা ঢাকা রওয়ানা করার কয়েক মিনিট পরে শওকত মিয়াও নারায়ণগন্জ এসে পৌঁছাল এবং আমাদের চলে যাবার খবর পেয়ে আবার ঢাকায় ছুটল। আমরা পথে ট্যাক্সি ছেড়ে দিয়ে রিক্সা নিয়ে মোগলটুলী পৌঁছালাম। দেখি আমাদের মালপত্র পৌঁছে গেছে। শওকত মিয়াও এসে পৌঁছে গেছে। শওকত মিয়া আমাকে জড়িয়ে ধরে বলল, ‘মুজিব ভাই, কি করে লাহোরে পৌঁছালেন, আর কি করে ফিরে এলেন, বলুন শুনি।’ আমি বললাম, প্রথমে বলেন, মওলানা সাহেব (ভাসানী) ও হক সাহেব (শেরে বাংলা) কেমন আছেন? কে কে জেলে আছে। আওয়ামী লীগের খবর কি? শওকত মিয়া যা বলল তাতে দু:খই পেলাম, কিন্তু অখুশি হলাম না। আওয়ামী লীগে যে ভদ্রলোকদের মওলানা সাহেব কার্যকরী কমিটির সভ্য করেছিলেন তাঁদের মধ্য থেকে প্রায় বার-তেরজন পদত্যাগ করেছেন ভয় পেয়ে। যাঁরা অনেকদিনের পুরানা নেতা ছিলেন, তাঁরা শুধু পদত্যাগই করেন নাই, বিবৃতি দিয়ে পদত্যাগ করেছেন, যাতে গ্রেফতার না হতে হয়। শওকত মিয়া আমার জন্য থাকার বন্দোবস্ত করেছে।’
 

শওকত আলী ১৯১৮ সালের ২০ এপ্রিল তৎকালীন ইস্ট বাংলায় ঢাকার গেন্ডারিয়ায় বিশিষ্ট সুন্নি মুসলিম পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। তার পিতা শমসের আলী ছিলেন একজন বিশিষ্ট ব্যবসায়ী এবং তার মা মেহেরুননেসা খাতুন ছিলেন গৃহিনী। শওকত আলী মাত্র দু’বছর বয়সে তার মাকে হারান। তিনি মুসলিম হাই স্কুলে লেখাপড়া করেন। উচ্চ বিদ্যালয়ে পড়ালেখা শেষ করার পর তিনি জগন্নাথ কলেজে ভর্তি হন এবং এই কলেজ থেকে বি কম ডিগ্রি লাভ করেন। এরপর তিনি উচ্চশিক্ষার জন্য ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হন। কিন্তু রাজনৈতিক সম্পৃক্ততার কারণে তা সম্পন্ন করতে পারেননি। ঠিক যেমনটি রাজনৈতিক সম্পৃক্ততার কারণে সমস্যায় পড়তে হয়েছিল বঙ্গবন্ধুকেও। 

সম্ভ্রান্ত মুসলিম পরিবারের সন্তান শওকত আলী ছাত্র জীবন থেকেই জড়িত ছিলেন রাজনীতির সঙ্গে। ভাষা আন্দোলনের সূচনালগ্ন থেকেই তিনি সক্রিয়ভাবে এই আন্দোলনে অংশগ্রহণ করেন এবং নেতৃত্ব দেন। ১৯৪৭ সালের প্রথম রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদ, ১৯৪৮ সালের দ্বিতীয় রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদ এবং ১৯৫২ সালের সর্বদলীয় রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদের কেন্দ্রীয় কার্যকরী কমিটির সদস্য ছিলেন তিনি। ভাষা আন্দোলনে তার সাহসী ভূমিকা ছিল প্রশংসনীয়। ১৯৪৮ সালের ১১ মার্চ ভাষা আন্দোলনের ইতিহাসে প্রথম হরতাল সফল করতে শওকত আলী অত্যন্ত সাহসের পরিচয় দেন।

শেখ মুজিবুর রহমান, তাজউদ্দীন আহমদ, মোহাম্মদ তোয়াহা, নঈমুদ্দিন আহমদ, শওকত আলী, আবদুল মতিন, শামসুল হক প্রমুখ যুব নেতার কঠোর সাধনার ফলে বাংলা ভাষার আন্দোলন সমগ্র পূর্ব বাংলায় একটি গণআন্দোলন হিসেবে ছড়িয়ে পড়েছিল। জনসভা, মিছিল আর স্লোগানে সমগ্র বাংলাদেশ কেঁপে উঠেছিল।

অধ্যাপক আবুল কাশেমের নেতৃত্বে প্রথম রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদ ‘তমদ্দুন মজলিশের রাষ্ট্রভাষা উপ-কমিটি’ নামে গঠিত হয়। শওকত আলী এই কমিটিরও একজন সদস্য ছিলেন।

জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের অত্যন্ত কাছের মানুষ, ঘনিষ্ঠ বন্ধু ও বিশ্বস্ত সহযোদ্ধা ছিলেন এই শওকত আলী। ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে নৃশংসভাবে হত্যা করা হয়েছে- এই দুঃসংবাদ শুনেই তিনি স্ট্রোকে আক্রান্ত হন। চিকিৎধীন অবস্থায় তিনদিন পর ১৮ আগস্ট তিনি হলি ফ্যামিলি হাসপাতালে মৃত্যুবরণ করেন। তাকে জুরাইন কবরস্থানে সমাহিত করা হয়।

ব্যক্তিগত জীবনে ১৯৬০ সালে শওকত আলীর সাথে রহিমা খাতুনের বিয়ে সম্পন্ন হয়, রহিমা খাতুন ঢাকার ফজলুল হক মহিলা কলেজের উপাধ্যক্ষ এবং নারী অধিকার বাস্তবায়ন সংঘের সভাপতি ছিলেন। তার তিন পুত্র এবং একটি মেয়ে রয়েছে।

ভাষা আন্দোলনে তার কৃতিত্বপূর্ণ ও গৌরবময় অবদানের জন্য সরকার শওকত আলীকে ২০১১ সালে মরণোত্তর ‘একুশে পদকে’ ভূষিত করে এবং ঢাকা সিটি করপোরেশন মহান ভাষা আন্দোলনে অসামান্য অবদানের স্বীকৃতি স্বরূপ ২০১০ সালে শওকত আলীর নামে ধানমন্ডির ৪/এ সড়কটির নামকরণ করে। তিনি জাতির গর্বিত সন্তানদের একজন।

ভাষা আন্দোলনের ধারাবাহিকতায়ই আজকের স্বাধীন বাংলাদেশের জন্ম। দীর্ঘ ৬৫ বছরেও ভাষা আন্দোলনের বীর সৈনিকদের সঠিক কোনো তালিকা প্রণয়ন করা যায়নি। ফলে জাতীয় এসব বীরের অবদান পরিপূর্ণভাবে কখনোই সামনে আসেনি। এমনকি ভাষা সৈনিকদের পরিবারের সদস্যরাও কোনো রকম সুযোগ-সুবিধা পাননি। বর্তমানে অনেক ক্ষেত্রে বাংলার বিকৃত উচ্চারণ লক্ষ করা যায়। এসব বিকৃতি রোধের যেমন প্রয়োজন, তেমনি এসব ভাষা সৈনিকদের সঠিক মর্যাদা এবং তাদের পরিবারকেও প্রাপ্য সুযোগ-সুবিধা দেওয়া সময়ের দাবি। 

লেখক : সাংবাদিক।



রাইজিংবিডি/ঢাকা/১৮ আগস্ট ২০১৭/হাসান/শাহনেওয়াজ

রাইজিংবিডি.কম

সর্বশেষ

পাঠকপ্রিয়