মঙ্গল : পরাক্রম ও বৈচিত্র্য
শাহিদুল ইসলাম || রাইজিংবিডি.কম
শাহিদুল ইসলাম : চেঙ্গিস খান, পৃথিবীর ইতিহাসে পরাক্রমশালী মঙ্গোলীয় সম্রাট। মঙ্গোলিয়ান ভাষাভাষী জনগোষ্ঠী মঙ্গলদের প্রকৃত উত্থান এবং বিস্তার তার হাত ধরেই। ১৩ শতকে তার কর্তৃত্বেই সকল মঙ্গোলিয়ান ভাষাভাষী জনগোষ্ঠী একত্রিত হয় এবং এক বিশাল শক্তিশালী সেনাবাহিনী গড়ে তোলে।
চেঙ্গিস খানের দক্ষতায় এই বাহিনী এশিয়ার পূর্ব ও মধ্য অঞ্চলের এক বিশাল এলাকা দখল করে কাস্পিয়ান সাগর থেকে জাপান সাগর পর্যন্ত বিস্তৃত মঙ্গল সম্রাজ্য গড়ে তোলে। মঙ্গোল জাতিগোষ্ঠী হচ্ছে পূর্ব-মধ্য এশিয়ার একটি প্রাচীন জনগোষ্ঠী।
অনেকগুলো জাতিগোষ্ঠী একত্রিত হয়ে মঙ্গোল জাতির উদ্ভব হয়েছে। অষ্টম শতকে মঙ্গোলদের প্রথম পরিচয় পাওয়া যায়। এশিয়ার মধ্যাঞ্চলের দেশ মঙ্গোলিয়ার আদি অধিবাসী। এ ছাড়াও চীনের জিনজিয়াংসহ রাশিয়ায়ও অনেক মঙ্গোল বাস করে।
মঙ্গোলদের কিছু অভিন্ন আদি বৈশিষ্ট্য এবং ঐতিহ্য রয়েছে, যা তাদেরকে সবার চেয়ে আলাদা করে তুলেছে। জনবসতিহীন দুর্গম মঙ্গোলিয়ার মতোই মঙ্গলরাও রহস্যময়। তারা মঙ্গোলিয়ান ভাষায় কথা বলে। বর্তমানে মঙ্গোলিয়ার রাষ্ট্রীয় ভাষা মঙ্গোলিয়ান এবং সেখানকার প্রায় ৩০ লাখ মানুষ এই ভাষায় কথা বলে। এ ছাড়া সমগ্র চীনজুড়ে এই ভাষা ব্যবহার করে প্রায় ৬০ লাখ আদিবাসী মঙ্গোল। মঙ্গোলদের পূর্বপুরুষদের বলা হয় প্রটো মঙ্গল।
তাদের আদি ধর্ম ছিল শ্যামানিজম। শ্যামানিজম হলো এক ধরনের তান্ত্রিকতা। শ্যামান বলতে গুণীন বা ওঁঝা বোঝায়। এ ছাড়া মঙ্গোলরা পূর্বপুরুষের আত্মার পূজা-অর্চনাও করত । মঙ্গোলদের একটি বৃহৎ অংশের ধর্ম ছিল তেনগ্রিবাদ। তেনগ্রি ছিলেন আকাশদেবতা। মঙ্গোলদের মতে, তেনগ্রি দেবতাই ছিল সব কিছুর নিয়ন্ত্রণকর্তা। তবে তারা অন্য ধর্মের প্রতি সহনশীল ছিলেন। ধীরে ধীরে মঙ্গোলরা কনফুসিয়াজম এবং দাওইজম বিশ্বাসের সংস্পর্শে আসতে থাকে এবং পরে বৌদ্ধধর্ম গ্রহণ করে। বর্তমান মঙ্গোলদের অধিকাংশই বৌদ্ধ। তবে এখনো মঙ্গোলদের মধ্যে অনেকেই আদি ধর্মে বিশ্বাস করে এবং অল্পসংখ্যক মঙ্গোল আছে, যারা ইসলাম ও খ্রিষ্ট ধর্মাবলম্বী।
মঙ্গোলরা যুদ্ধবিদ্যায় অত্যন্ত পারদর্শী ছিল। সেই সঙ্গে তাদের সেনাপতি চেঙ্গিস খান ছিলেন পৃথিবীর ইতিহাসে অন্যতম দক্ষ ও সাহসী ব্যক্তিত্ব। প্রায় অপ্রতিরোধ্য এক বিপুলসংখ্যক সৈন্যবাহিনীর অধীশ্বর ছিলেন চেঙ্গিস খান । যে বাহিনী ছিল সুশৃঙ্খল, তাদের ‘চেইন অব কমান্ড’ ছিল অটুট, ছিল তুখোড় গতিশীলতা আর উদ্ভাবনী সামরিক রণকৌশলে পূর্ণ।
মঙ্গোল সৈন্যবাহিনীর বৈশিষ্ট্য ছিল হঠাৎ-ই আক্রমন করে বসা। মঙ্গোল সৈন্যরা প্রতিপক্ষকে সামনে-পিছনে উভয় দিক থেকে আক্রমন করে পর্যুদস্ত করে ফেলত। মঙ্গোলরা শত্রুদের হারানোর পর তাদের যুদ্ধাস্ত্র ও রণকৌশল নিয়ে গবেষণা করতো এবং প্রয়োজনে সেগুলো ব্যবহার করে নিজেদের যুদ্ধবিদ্যাকে আরো উন্নত করে তুলত।
মঙ্গোলরা ঘোড়ায় চড়া শুরু করত তাদের শৈশবকাল থেকে। জীবনের একটি দীর্ঘসময় কেটে যেত ঘোড়ার পিঠে। শিশুকাল থেকে ঘোড়ায় চড়ার কারণে তাদের পা ধনুকের মত বেকে যেত। এমনও হতো- ১০০ পা যেতেও তারা ঘোড়ায় চড়ে বসত।
ইতিহাসবিদের মতে, যুদ্ধে মঙ্গোলরা তাদের খর্বাকৃত দেহ কাঠামো, কদর্যতা, আর দুর্গন্ধ থেকে উদ্ভূত ত্রাস পুরোপুরি কাজে লাগাত। দৈহিক আকৃতির দিক দিয়ে মঙ্গোলরা ছিল খর্বাকৃতি, পাতলা কোমর, ছোট পা এবং বড় মাথাবিশিষ্ট।
প্রথা অনুযায়ী তাদের কাপড় ধোয়া নিষেধ ছিল। তাদের গায়ের দুর্গন্ধের অন্যতম কারণ ছিল তাদের খাদ্যাভ্যাস। বছরের একটা নির্দিষ্ট সময় তারা শুধু ঘোড়ার দুধ পান করত। যখন যুদ্ধ যাত্রায় থাকত, তখন দুধ দোয়ার সময়ের অভাবে চলন্ত অবস্থায় ঘোড়ার গলার রগ কেটে মুখ লাগিয়ে রক্তপান করত। রক্ত ঝরা অব্যাহত থাকলে তা তারা থলিতে জমিয়ে রাখত। ইঁদুর, বিড়াল, কুকুর, সাপ কোনো কিছুই মঙ্গোল সেনাদের খাদ্য তালিকা থেকে বাদ যেত না। টক দুধে ভেজানো রান্না করা ছুঁচোজাতীয় প্রাণী খুব পছন্দ ছিল মঙ্গোল সেনাদের। তারা পারিবারিক প্রথায় বিশ্বসী ছিল। বিয়ে করত একাধিক। তৎকালীন রীতি অনুযায়ী, চেঙ্গিস খানেও বহু স্ত্রী ছিল। তবে প্রথম স্ত্রী বোরতেই ছিলেন প্রধান। তারই গর্ভে চেঙ্গিস খান-এর জোচি, জাগাতাই, ওগোদেই এবং তোলুই নামে চারটি পুত্র জন্মেছিল।
বর্তমানে সারা বিশ্বে মঙ্গোলদের সংখ্যা সর্বোচ্চ ৯০ লাখের মতো। এদের অধিকাংশই বাস করে আধুনিক মঙ্গোলিয়া রাষ্ট্রে এবং বাকিরা বসবাস করে চীন, রাশিয়া, কিরঘিজস্থান এবং আফগানিস্তানের বিভিন্ন অঞ্চলে। বর্তমানে মঙ্গোলরা অনেক ছোট ছোট উপগোত্রে বিভক্ত হয়ে বিভিন্ন অঞ্চলে আবাসস্থল গড়ে তুলছে। কিছু মঙ্গোল অভিবাসন করে ইউরোপ, আমেরিকা, কোরিয়া, চেক রিপাবলিকসহ বিভিন্ন দেশে বসবাস করছে।
রাইজিংবিডি/ঢাকা/২১ আগস্ট ২০১৬/রাসেল পারভেজ
রাইজিংবিডি.কম
কালশীর বস্তির আগুন নিয়ন্ত্রণে