Risingbd Online Bangla News Portal

ঢাকা     বৃহস্পতিবার   ২৮ অক্টোবর ২০২১ ||  কার্তিক ১২ ১৪২৮ ||  ২০ রবিউল আউয়াল ১৪৪৩

Risingbd Online Bangla News Portal

পুকুর পাড়ে পেলাম ‘কালোবুক দামা’র দেখা

শামীম আলী চৌধুরী || রাইজিংবিডি.কম

প্রকাশিত: ১২:২৪, ২৫ জুন ২০২১   আপডেট: ১৫:০১, ২৫ জুন ২০২১
পুকুর পাড়ে পেলাম ‘কালোবুক দামা’র দেখা

লেখক ছবিটি সাতছড়ি জাতীয় উদ্যান থেকে তুলেছেন

পূণ্যিপুকুর পাড়ে দেখা মিললো ‘কালোবুক দামা’র। শুকনো মৌসুমে পাখিদের আহার ও গোসলের জন্য প্রচুর পানির প্রয়োজন পড়ে। অথচ এই সময় বনজুড়ে পানির হাহাকার পড়ে যায়। পাখিরা পানির খোঁজে হন্যে হয়ে ছুটে বেড়ায়। অনেক পাখি আছে যেগুলোর দিনে বেশ কয়েকবার পানির সংস্পর্শে যেতে হয়। অথচ পানির প্রচণ্ড অভাব।

যেখানে সামান্য পানি পাওয়া যায় পাখি ও বন্যপশু সেখানেই বিচরণ করে। সাতছড়ি বনের ভিতর পূন্যিপুকুর নামে একটি পুকুর আছে। শীতের মৌসুমে হরেক প্রজাতির আবাসিক ও পরিযায়ী পাখির প্রয়োজনীয় পানির একমাত্র উৎস এই পুকুর। পুকুরটি বার্ড ফটোগ্রাফারদের কাছেও খুব প্রিয়। এর মূল কারণ একই জায়গায় বসে নানা প্রজাতির পাখির ছবি তোলা যায়।

২০২০ সালে ফটোগ্রাফাররা পূন্যিপুকুর ছাড়াও আরেকটি পুকুরের সন্ধান পান। অনেকে নতুন পুকুর বা বড় পুকুর নামেই জানে। গত মার্চ মাসে এই বড় পুকুরে পাখির ছবি তুলতে গিয়েছিলাম। সেখানে বেশ কয়েকজন ফটোগ্রাফারের দেখা পেলাম। আমিও সুবিধামত একটি জায়গা বেছে বসলাম। বিকেল ৫ টার পর পাখিদের আনোগোনা শুরু হয়। কালোঝুটি বুলবুল, সাদাগলা বুলবুল, খয়রা মাথা সুইচোরা, সাদাবুক মাছরাঙ্গা, ভীমরাজ, সবুজ ঘুঘু ছাড়াও বেশ কিছু পরিয়ায়ী পাখির দেখা মিললো। পাখির ছবি তুলছিলাম আর বানরদের গাছের ডালে ঝুলে পানি খাওয়ার কসরৎ দেখছিলাম।

এমন সময় একটি পাখি পুকুর পাড়ে উড়ে এসে বসলো। চোখ চলে গেল সেই পাখির দিকে। প্রথমে ভাবলাম কমলা দামা। ক্যামেরার ভিউ ফাইন্ডারে দেখতে পেলাম অন্য প্রজাতির একটি পাখি। পাশে থাকা একজন ফটোগ্রাফার জানতে চাইলেন পাখিটির পরিচয়। আমি তাকে বললাম ছবি তুলতে থাকো। পরে পরিচয় জানা যাবে। ক্যামেরা তাক করে অনবরত শাটার চাপলাম। বেশ কিছু ছবি তুললাম। পরে পাখিটির পরিচয় জানলাম যে, এটি একটি পরিযায়ী পাখি। শীত মৌসুমে আমাদের দেশে আসে। গত এপ্রিল মাসে ঢাকার জাতীয় উদ্যানে পাখিটির আবারও দেখা পেলাম। এবার কালোবুক দামার ভালো কিছু ফ্রেম ও ছবি পেলাম।

কালোবুক দামা Turdus বংশের এবং Turdidae পরিবারের অন্তর্ভুক্ত ২২ সে.মি. দৈর্ঘ্য এবং ৭৫ গ্রাম ওজনের পাখি। প্রজননকালে পুরুষপাখির পিঠ ধূসর থাকে। মাথা, ঘাড়ের পেছনের অংশ, গলা ও বুক পুরো কালো রঙের হয়। পেটের উপরের অংশ ও বগল লালচে। পেটের নিচের অংশ সাদা। প্রজননকালে মেয়েপাখির পিঠ কালচে-জলপাই রঙ ধারণ করে। গলার পাশ থেকে নিচের ঠোঁটের অংশে কালচে ডোরা। গলায় সাদা লম্বা দাগ থাকে।  বুকের নিচের অংশ ও বগল কমলা।  চোখের রঙ বাদামি। ঠোঁট, পা ও পায়ের পাতা হলুদ রঙের হয়।

কালোবুক দামা সাধারণত চিরসবুজ বন, ছোট ছোট ঝোঁপ ও সুন্দরবনে বিচরণ করে। স্বভাবের দিক থেকে এরা খুব লাজুক পাখি। শীতের সময় নীরব থাকে। এরা বনতলে ঝরাপাতা উল্টে খাবার সংগ্রহ করে। খাদ্যতালিকায় রয়েছে পোকা, ছোট ছোট শামুক ও রসালো বুনো ফল।  গ্রীষ্মকালে মধুর সুরে গান গায়। এপ্রিল থেকে জুলাই মাস এদের প্রজননকাল। প্রজননকালে গাছের ডালে ঘাস, মূল ও কাঁচা পাতা দিয়ে বাটির মতো বাসা বানায়। এরা বাসায় কাঁদামাটি দিয়ে লেপে রাখে। নিজেদের বানানো বাসায় মেয়েপাখি ৩-৪টি ডিম পাড়ে। নিজেরাই ডিমে তা দিয়ে ছানা ফুটায়। উভয়ে মিলে ছানাদের পরিচর্যা করে।

কালোবুক দামা বাংলাদেশের বিরল পরিযায়ী পাখি। শীত মৌসুমে ঢাকা, খুলনা  ও সিলেট বিভাগের চিরসবুজ বনে পাওয়া যায়। এ ছাড়াও ভারত, চীন, মিয়ানমার, থাইল্যান্ড ও ভিয়েতনামসহ দক্ষিণ, পূর্ব ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় এদের বৈশ্বিক বিস্তৃতি রয়েছে।

কালোবুক দামা বিশ্বে বিপদগ্রস্ত বলে বিবেচিত হলেও বাংলাদেশে বিপদমুক্ত। বাংলাদেশে বন্যপ্রাণী আইনে এই প্রজাতিকে সংরক্ষিত ঘোষণা দেওয়া হয়নি।

ইংরেজি নাম: Black-breasted Thrush.
বৈজ্ঞানিক নাম: Turdus dissimilis (Blyth, 1847)

হাসনাত/তারা

সম্পর্কিত বিষয়:

ঘটনাপ্রবাহ

সর্বশেষ

পাঠকপ্রিয়