ঢাকা     বুধবার   ২৬ জানুয়ারি ২০২২ ||  মাঘ ১২ ১৪২৮ ||  ২২ জমাদিউস সানি ১৪৪৩

গানের অতুলপ্রসাদ

শাহ মতিন টিপু || রাইজিংবিডি.কম

প্রকাশিত: ১২:৩৯, ২৬ আগস্ট ২০২১  
গানের অতুলপ্রসাদ

‘মোদের গরব, মোদের আশা, আ মরি বাংলা ভাষা!/ তোমার কোলে, তোমার বোলে, কতই শান্তি ভালবাসা!/ কি যাদু বাংলা গানে!- গান গেয়ে দাঁড় মাঝি টানে,/ এমন কোথা আর আছে গো!/ গেয়ে গান নাচে বাউল, গান গেয়ে ধান কাটে চাষা।’

হৃদয় ছুঁয়ে যাওয়া এই গানের অতুলপ্রসাদকে আমরা ক’জন জানি! পুরো নাম অতুলপ্রসাদ সেন। একাধারে তিনি গীতিকার, সুরকার ও গায়ক।

অতুলপ্রসাদের ৮৭তম মৃত্যুবার্ষিকী আজ। ১৯৩৪ সালের ২৬ আগস্ট তিনি প্রয়াত হন। বর্ণাঢ্য ও বৈচিত্রময় জীবনের অতুল প্রসাদের জন্ম ১৮৭১ সালের ২০ অক্টোবর ঢাকায়।  পৈতৃক বাড়ি ছিল দক্ষিণ বিক্রমপুরে।  বাবার নাম রামপ্রসাদ সেন এবং মায়ের নাম হেমন্তশশী।

‘উঠ গো ভারতলক্ষ্মী’, ‘মোদের গরব মোদের আশা, আ মরি বাংলা ভাষা’, ‘হও ধরমেতে ধীর, হও করমেতে বীর’, ‘বলো বলো বলো সবে, শত–বীণা-বেণু-রবে’— অতুলপ্রসাদের গান কোন বাঙালি গায়নি? গান-বাঁধার উপলক্ষগুলিও মনে রাখার মতো। বিলেতে ইংরেজ গায়িকার গান শুনে লিখেছিলেন ‘প্রবাসী চল রে, দেশে চল’। লোকমান্য তিলক কারারুদ্ধ হয়েছেন, দেশ জুড়ে প্রতিবাদ। অতুলপ্রসাদের বাড়িতে সে দিন অতিথি বিপিনচন্দ্র পাল ও শিবনাথ শাস্ত্রী। তাঁদের সামনেই গাইলেন ‘কঠিন শাসনে করো মা শাসিত’। ১৯১৩ সালে রবীন্দ্রনাথের নোবেলজয়ের পর অতুলপ্রসাদের নিজস্ব গুরুবন্দনা ছিল ‘মোদের গরব মোদের আশা’-র দু’টি কলি: ‘বাজিয়ে রবি তোমার বীণে/ আনল মালা জগৎ জিনে...’ শান্তিনিকেতনে স্বয়ং রবীন্দ্রনাথ তাঁকে শোনাচ্ছেন ‘মোর সন্ধ্যায় তুমি সুন্দরবেশে এসেছ, তোমায় করি গো নমস্কার...’ আর প্রত্যুত্তরে অতুলপ্রসাদ গাইছেন, ‘ওগো আমার নবীন সাথী, ছিলে তুমি কোন বিমানে?’ রবীন্দ্রনাথ লখনউয়ে এসেছেন, তার জন্মবার্ষিকীর সংবর্ধনা সভায় অতুলপ্রসাদ নিজে গান লিখে, তরুণ পাহাড়ী সান্যালকে সেই গান তুলিয়ে, গাইয়েছেন— ‘এসো হে এসো হে ভারতভূষণ..

আবার ‘কে ডাকে আমারে/ বিনা সে সখারে রহিতে মন নারে!’, ‘সবারে বাস্‌ রে ভালো, নইলে মনের কালো ঘুচবে না রে’, ‘নীচুর কাছে নীচু হতে শিখলি না রে মন, তুই সুখি জনের করিস পূজা, দুঃখীর অযতন’, ‘পরের শিকল ভাঙিস পরে, নিজের নিগড় ভাঙ রে ভাই... সার ত্যজিয়ে খোসার বড়াই! তাই মন্দির মসজিদে লড়াই। / প্রবেশ করে দেখ রে দু’ভাই— অন্দরে যে একজনাই।’ এ সবই হচ্ছে অতুলপ্রসাদের গান।  মুগ্ধ করার মতোই গানের কথা তার। যা মুগ্ধতা ছড়িয়ে যাচ্ছে যুগের পর যুগ।

অতি অল্পবয়সেই বাবাকে হারিয়েছিলেন অতুলপ্রসাদ। এরপর মাতামহ কালীনারায়ণ গুপ্তের কাছে প্রতিপালিত হন। তার বিধবা মা হেমন্তশশী দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জন দাশ-এর জ্যাঠামশাই দুর্গামোহন দাশকে বিবাহ করেন। এতে তিনি মানসিকভাবে অত্যন্ত আঘাত পান। তখন তিনি প্রবেশিকা পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়ে কলেজে ভর্তি হওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন।

এরপর মামাদের অনুরোধে কলকাতার প্রেসিডেন্সি কলেজে (এখন বিশ্ববিদ্যালয়) ভর্তি হন। ১৮৯০ সালে বিলেত যান ব্যারিস্টারি পড়ার জন্য, তার মামারা তাকে বিলেত যাবার ব্যবস্থা করেন। এই যাত্রার পিছনে অলক্ষ্যে সহযোগিতা করেন তার সৎপিতা দুর্গামোহন দাশ। জানতে পেরে তিনি দুর্গামোহন দাশের সাথে দেখা করেন এবং এর ভিতর দিয়ে তার মা এবং সৎপিতার সাথে সুসম্পর্ক গড়ে উঠে।

ইংল্যান্ডে যেতে জাহাজে বসে তিনি রচনা করেছিলেন ‘উঠ গো ভারতলক্ষ্মী’ গানটি। লন্ডনে গিয়ে তিনি আইন শিক্ষা করেন এবং আইন পরীক্ষায় সফলভাবে উত্তীর্ণ হন। এই সময় তার বড় মামা কৃষ্ণগোবিন্দ সপরিবারে লন্ডনে যান। অতুলপ্রসাদ নিয়মিতভাবে লন্ডনের মামাবাড়িতে যাওয়া-আসা শুরু করেন। এই সূত্রে তার মামাতো বোন হেমকুসুমের সাথে ঘনিষ্ঠতা জন্মে। হিন্দু রীতিতে এই বিবাহ অসিদ্ধ তাই পারিবারিক চাপের মুখে পড়েন। এ কারণে পুনরায় বিলাত যান এবং স্কটল্যান্ডের রীতি অনুসারে বিয়ে করেন।

উনিশ শতকের শেষ থেকে বিশ শতকের মাঝামাঝি সময় পর্যন্ত রবীন্দ্রপ্রতিভার প্রভাববলয়ের মধ্যে বিচরণ করেও যারা বাংলা কাব্যগীতি রচনায় নিজেদের বিশেষত্ব প্রকাশ করতে সক্ষম হন, অতুলপ্রসাদ ছিলেন তাদের অন্যতম। সমকালীন গীতিকারদের তুলনায় অতুলপ্রসাদের সঙ্গীতসংখ্যা সীমিত হলেও তিনি বাংলা সঙ্গীত-জগতে এক স্বতন্ত্র আসন লাভ করেন। তার গানগুলি অতুলপ্রসাদের গান নামে প্রতিষ্ঠা পায়।  গানের জন্য চিরকাল বাঙালির হৃদয়ে বেঁচে রইবেন অতুল প্রসাদ সেন।

বাংলা সঙ্গীতে অতুলপ্রসাদই প্রথম ঠুংরির চাল সংযোজন করেন। এ ছাড়া রাগপ্রধান ঢঙে বাংলা গান রচনা তার থেকেই শুরু হয়। ছোটবেলায় ঢাকা ও ফরিদপুরে বাউল, কীর্তন ও মাঝি-মাল্লাদের ভাটিয়ালি গানের মূর্ছনা অতুলপ্রসাদের হৃদয়ে স্থায়ী আসন লাভ করেছিল। সে সুরের অভিজ্ঞতার আলোকে রচিত তার বাউল ও কীর্তন ঢঙের গানগুলিতে বাংলার প্রকৃতিকে খুঁজে পাওয়া যায়।

অসম্ভব দানশীল অতুলপ্রসাদ জীবনের উপার্জিত অর্থের অধিকাংশই ব্যয় করেছিলেন জনকল্যাণে। এমন কী তিনি তার বাড়িটিও দান করে গিয়েছিলেন। মৃত্যুর আগে তিনি তার লেখা সমস্ত গ্রন্থের স্বত্ব বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের কল্যাণে দান করে যান।

ঢাকা/টিপু

সর্বশেষ

পাঠকপ্রিয়