ঢাকা     বৃহস্পতিবার   ৩০ মে ২০২৪ ||  জ্যৈষ্ঠ ১৬ ১৪৩১

রোজার সূচনা ও ইতিহাস

প্রকাশিত: ১৫:০৩, ২৩ মার্চ ২০২৩   আপডেট: ১২:২৯, ২৪ মার্চ ২০২৩
রোজার সূচনা ও ইতিহাস

ইসলামের পঞ্চ-স্তম্ভের অন্যতম একটি হলো রোজা। মহান আল্লাহ তা’আলা আমাদের উপর রমযানের রোজা ফরজ করেছেন। রোজা শুধু আমাদের উপর ফরজ করেছেন তা কিন্তু নয় বরং আমাদের পূর্ববর্তী সকলের উপরই রোজার বিধান ছিল। 

মহান রাব্বুল আলামিন আমাদের আদি পিতা হযরত আদম (আ.) এর ওপর রোজার বিধান আরোপ করে মানব ইতিহাসে সর্বপ্রথম রোজার প্রচলন শুরু করেন। আমাদের পূর্ববর্তী সকল নবী ও উম্মতের উপরও রোজার বিধান আরোপ করা হয়েছিল। 

এ সম্পর্কে মহান আল্লাহ তা’আলা পবিত্র কোরআনে ইরশাদ করেন, হে ঈমানদারগণ! তোমাদের উপর রোজা ফরজ করা হয়েছে, যেরূপ ফরজ করা হয়েছিল তোমাদের পূর্ববর্তীদের উপর। যাতে তোমরা খোদাভীরু হতে পারো। (সূরা বাকারা, আয়াত-১৮৩)

এ আয়াতের ব্যাখ্যায় আল্লামা আলূসী (র.) স্বীয় তাফসীর গ্রন্থ ‘রুহুল মাআনী’-তে উল্লেখ করেছেন যে, উপরোক্ত আয়াতে ‘মিনক্বাবলিকুম’ দ্বারা হযরত আদম (আ.) থেকে শুরু করে হযরত ঈসা (আ.) পর্যন্ত সকল নবী-রাসূলের জামানা বুঝানো হয়েছে।

কোরআন ও হাদীস গবেষণা করলে রোজার ইতিহাস সম্পর্কে যতদূর জানা যায়, মহান আল্লাহ তা’আলা হযরত আদম (আ.) কে জান্নাতে প্রেরণ করে একটি গাছের ফল খেতে নিষেধাজ্ঞা জারী করে বিশেষ এক ধরনের রোজা রাখার নির্দেশ প্রদান করলেন। 

এ ব্যাপারে দয়াময় আল্লাহ তা’আলা মহাগ্রন্থ আল-কোরআনে ইরশাদ করেন, হে আদম! তুমি এবং তোমার স্ত্রী জান্নাতে বসবাস করতে থাক এবং সেখানে যা চাও, যেখান থেকে চাও, পরিতৃপ্তসহ খেতে থাক, কিন্তু তোমরা এ গাছের নিকটে যেও না। (যদি যাও বা তার ফল ভক্ষণ করো) তাহলে জালিমদের অন্তর্ভুক্ত হয়ে যাবে। (সূরা বাকারা, আয়াত-৩৫)

মুফাস্সিরীনে কেরাম বলেন, এটাই ছিল মানব ইতিহাসের প্রথম রোজা। 

হযরত আদম (আ.) ও হযরত হাওয়া (আ.) শয়তানের প্ররোচনার শিকার হয়ে ঐ গাছের ফল ভক্ষণ করেছিলেন এবং এর পরিণামে মহান আল্লাহ তা’আলা তাদেরকে ভূপৃষ্ঠে পাঠিয়ে দিলেন। অতঃপর তারা উক্ত ভুলের জন্য যারপরনাই অনুতপ্ত হন, তাওবা ইস্তেগফার করেন এবং এর কাফ্ফারাস্বরূপ ধারাবাহিক চল্লিশ বছর রোজা রেখেছিলেন।

হযরত আদম (আ.) এর পর অন্য সকল নবী-রাসূলের জামানায়ও রোজার বিধান ছিল। তবে তাদের রোজা পালনের পদ্ধতি ভিন্নতর ছিল। হযরত নূহ (আ.) এর উপরও রোজা ফরজ ছিল। রাসূলুল্লাহ (সা.) ইরশাদ করেছেন, হযরত নূহ (আ.) ১লা শাওয়াল ও ১০ জিলহজ ব্যতীত সারা বছর রোজা রাখতেন। (ইব্নে মাযাহ) 

হযরত মুসা (আ.)-র উপর তাওরাত কিতাব অবতীর্ণ হওয়ার পূর্বে তিনি ৩০ দিন রোজা রেখেছিলেন। অতঃপর মহান আল্লাহ তা’আলা তাঁর ওপর ওহী নাযিল করলেন এবং আরো ১০ দিন রোজা রাখার নির্দেশ প্রদান করলেন। হযরত ইদ্রিস (আ.) বছরজুড়ে প্রতিদিন রোজা রাখতেন। হযরত দাউদ (আ.) একদিন পরপর রোজা রাখতেন। 

মহানবী (সা.) মদীনায় আগমন করার পর শুধু আশুরার রোজা রাখতেন। হযরত ইবনে আব্বাস (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ (সা.) মদীনায় হিজরত করে দেখলেন, মদীনার ইহুদীরা মুহাররমের ১০ তারিখে রোজা রাখে। তিনি তাদের জিজ্ঞাসা করলেন, আজকে তোমরা কিসের রোজা রাখছো? উত্তরে তারা বললো, আজ সেই দিন যেদিন মহান আল্লাহ তা’আলা হযরত মুসা (আ.) ও তার কওমকে ফিরাউনের কবল থেকে মুক্ত করেছিলেন আর ফিরাউনকে সদলবলে নীল দরিয়ায় ডুবিয়ে মেরেছিলেন। ফলে শুকরিয়াস্বরূপ এই দিন মুসা (আ.) রোজা রেখেছিলেন। তাই আমরাও এই দিন রোজা রাখি। অতঃপর রাসূলুল্লাহ (সা.) বললেন, আমরা তোমাদের থেকে মুসা (আ.) অনুসরণের অধিক হকদার। এরপর তিনি আশুরার দিন রোজা রাখলেন এবং সাহাবায়ে কেরামদের রোজা রাখার নির্দেশ প্রদান করলেন। (বুখারী, মুসলিম)

সর্বোপরি ১০-শে শাবান দ্বিতীয় হিজরীতে মহান আল্লাহ তা’আলা রমযানের রোজা ফরজ মর্মে পবিত্র কোরআনে আয়াত নাযিল করেন। মহান আল্লাহ তা‘আলা আমাদের মাহে রমযানের রোজা সঠিকভাবে পালনের মাধ্যমে তাঁর নৈকট্য হাসিল করার তাওফিক দান করুন। আমীন।

অবশেষে ‘মাহে রমযানের আহ্বান’ নিয়ে আমার রচিত একটি ছড়া পাঠকদের খেদমতে উপস্থাপন করলাম:  

বছর ঘুরে আসছে আবার
রমযানেরই দিন,
রাখবে রোজা পড়বে নামাজ
সকল মানব জিন।

বুঝবে সবাই গরিব-দুঃখীর
ক্ষুধার কেমন জ্বালা,
সবাই চাইবে অর্জিত হোক
জান্নাতেরই মালা।
     
লেখক: মুফাস্‌সিরে কুরআন ও ইসলামী গবেষক 

শাহেদ/তারা

সম্পর্কিত বিষয়:

সর্বশেষ

পাঠকপ্রিয়