ঢাকা     মঙ্গলবার   ১৭ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ ||  ফাল্গুন ৪ ১৪৩২

Risingbd Online Bangla News Portal

জাতীয় সংসদ ভবন নির্মাণের নেপথ্যের গল্প

সাতসতেরো ডেস্ক || রাইজিংবিডি.কম

প্রকাশিত: ১০:১৯, ১৭ ফেব্রুয়ারি ২০২৬   আপডেট: ১০:২৮, ১৭ ফেব্রুয়ারি ২০২৬
জাতীয় সংসদ ভবন নির্মাণের নেপথ্যের গল্প

জাতীয় সংসদ ভবন| ছবি: প্যারামেটিক আর্কিটেকচার থেকে নেওয়া

বাংলাদেশের স্থাপত্য ইতিহাসে এক অনন্য বিস্ময়ের নাম জাতীয় সংসদ ভবন। লুই ইসাডোর কান এই অনন্য স্থাপনার নকশা করেছিলেন। তবে পছন্দসই উপকরণ না পাওয়ায় লুইয়ের কিছু নান্দনিক পরিকল্পনা বদলাতে হয়েছিল। যাইহোক, আপনি নিশ্চয় জানেন যে, জাতীয় সংসদ ভবন নির্মাণের কাজ শুরু হয়েছিলো পাকিস্তান শাসনামলে। এটির কাজ শেষ হয় ১৯৭৩ সালে, অর্থাৎ ততদিনে বাংলাদেশ বিশ্ব মানচিত্রে একটি স্বাধীন দেশ হিসেবে নিজের নাম লিখিয়েছে। জাতীয় সংসদ ভবন নির্মাণের উদ্যোগ নিয়েছিল পাকিস্তান। কেন এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছিলো, কি কি আছে জাতীয় সংসদ ভবনে; চলুন বিস্তারিত জানা যাক।

সময়টা ১৯৫৮ সাল, সে সময় আইয়ুব খান পাকিস্তানের রাজধানী করাচি থেকে ইসলামাবাদে স্থানান্তর করেন। একই সময়ে পূর্ব পাকিস্তানে একটি ‘দ্বিতীয় রাজধানী’ গড়ে তোলার পরিকল্পনা নেওয়া হয়। স্থান নির্ধারণ করা হয় ঢাকার শেরেবাংলা নগর এলাকায়, যার নামকরণ করা হয়েছিল ‘আইয়ুব নগর’।

আরো পড়ুন:

৮৪০ একর জমির ওপর নতুন শহর গড়ার এই বিশাল পরিকল্পনার জন্য তৎকালীন পাকিস্তানের সেরা স্থপতিদের নাম চাওয়া হয়। প্রখ্যাত স্থপতি মাজহারুল ইসলাম প্রস্তাব করেন তিনটি আন্তর্জাতিক নাম—ল্য করব্যুজিয়ে, আলভার আইতো এবং লুই আই কান। বয়স ও ব্যস্ততার কারণে করব্যুজিয়ে ও আইতো সরে দাঁড়ান। প্রস্তাবটি গ্রহণ করেন লুই ইসাডোর কান। যিনি লুই আই কান নামে অধিক পরিচিত।

১৯৬২ সালে মৌখিক চুক্তির পর কান ঢাকায় আসেন। লাল ইট, নদী, সবুজ প্রকৃতি, আলো-ছায়ার খেলা—সব মিলিয়ে বাংলার রূপ ও সৌন্দর্য তাকে মুগ্ধ করে। পাল যুগের পাহাড়পুর থেকে ব্রিটিশ আমলের আহসান মঞ্জিল—লাল ইটের ঐতিহ্যকে মাথায় রেখেই জাতীয় সংসদ নির্মাণের পরিকল্পনা শুরু করেন লুই।
জাতীয় সংসদ ভবনের আওতায় লুইয়ের পরিকল্পনায় ছিল ন্যাশনাল অ্যাসেম্বলি, সুপ্রিম কোর্ট, জনপ্রতিনিধিদের আবাসন, সরকারি কর্মকর্তাদের বাসস্থান, প্রেসিডেন্ট প্যালেস, হাসপাতাল, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ও স্টেডিয়াম। এই সব কিছু মিলিয়ে বিশ্বনন্দিত এই স্থপতি একটি পূর্ণাঙ্গ প্রশাসনিক শহরের রূপরেখা সামনে এনেছিলেন। ১৯৬৩ সালের ১২ মার্চ কান তার প্রথম মাস্টারপ্ল্যান উপস্থাপন করেন। উপস্থাপনায় মুগ্ধ হয়ে তৎকালীন সরকার দ্রুত চুক্তি স্বাক্ষর করে।  ১৯৬৪ সালে সংসদ ভবনের মূল নকশা জমা দেন কান। ১৯৬৫ সালে শুরু হয় নির্মাণকাজ। ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের কারণে নির্মাণকাজ বন্ধ ছিল।

তবে একাধিক পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে ১৯৭৩ সালে যে পরিকল্পনা চূড়ান্ত রূপ পায়, তাতে মূলত টিকে থাকে সংসদ ভবন, লেক, হাসপাতাল এবং কিছু আবাসিক অংশ। লুই কানের স্বপ্নের পূর্ণাঙ্গ শহর আর বাস্তবে রূপ পায়নি। পরে আবার শুরু হয়ে ১৯৮৩ সালে শেষ হয়।

নকশার কেন্দ্রবিন্দু
ভবনটিতে রয়েছে মোট নয়টি ব্লক। অষ্টভুজাকৃতির কেন্দ্রীয় ব্লকটি মূল হলরুম, যার চারপাশে আটটি আলাদা অংশ। উত্তর, দক্ষিণ, পূর্ব ও পশ্চিমে চারটি অফিস ব্লক, পশ্চিমে মন্ত্রী ও আমলাদের চেম্বার এবং দক্ষিণে নামাজের ঘর, যা সামান্য পশ্চিমমুখী। লুই কানের ধারণা ছিল—নামাজঘরের নিচ দিয়ে প্রবেশ করলে সংসদ সদস্যদের মনে পবিত্রতার অনুভূতি জাগ্রত হবে। দক্ষিণ প্লাজায় ঈদের জামাতও অনুষ্ঠিত হয়। উত্তর দিকে রয়েছে প্রেসিডেন্টস প্লাজা।

রোমান স্থাপত্য থেকে অনুপ্রাণিত ছিলেন কান। রোমের প্যানথিয়নের মতো ওপর থেকে আলো প্রবেশের ব্যবস্থা করেছেন। তার বিখ্যাত উক্তি—“সূর্য নিজেও জানে না সে কত সুন্দর, যতক্ষণ না সে একটি ভবনের গায়ে পড়ে।” ভবনের দেয়ালে কাটা ত্রিভুজ ও বৃত্তাকার জ্যামিতিক নকশা আলো-ছায়ার অপূর্ব দৃশ্য সৃষ্টি করে। স্ক্রিন ওয়াল বাইরের রোদ-বৃষ্টি সরাসরি প্রবেশ ঠেকালেও আলো ও বাতাস প্রবাহ নিশ্চিত করে।

অ্যাসেম্বলি হল
অষ্টভুজাকৃতির মূল হলরুমে ৩৫০ জন সংসদ সদস্যের বসার ব্যবস্থা। পশ্চিম পাশে স্পিকারের আসন। ৭০ ফুট উঁচু হলের ওপরে পাতলা কংক্রিটের শেল কাঠামো, যার ওপর দিয়ে প্রতিফলিত আলো নেমে আসে দেয়াল বেয়ে। পুরো ভবনে প্রচলিত কলাম ব্যবহার করা হয়নি। তবু আলো পড়লে দেয়ালে কলামের ছায়া স্পষ্ট হয়—স্থাপত্যের এক অনন্য ভ্রম। কিন্তু তার আগেই ১৯৭৪ সালে ফিলাডেলফিয়ায় মৃত্যুবরণ করেন লুই আই কান। সংসদ ভবনই ছিল তার নকশা করা শেষ প্রকল্প।

পিডব্লিউডির হিসাব অনুযায়ী, নির্মাণব্যয় ছিল প্রায় ২০০ কোটি টাকা—যুদ্ধবিধ্বস্ত বাংলাদেশের জন্য বিশাল অঙ্ক। মোট বিনিয়োগের সাত শতাংশ লুই ইসাডোর কানকে দিতে হয়েছিলো।

প্রখ্যাত স্থপতি ফ্রাঙ্ক লয়েড রাইট বলেছিলেন, “একটি ভবন তার সময়ের কথা বলবে।”

শেষ কথা, জাতীয় সংসদ ভবনের মূল যে নকশা সেটি বাংলাদেশ ২০১৬ সালে হাতে পেয়েছে। ৪০টি বাক্সে মূল নকশার চারটি করে সেট যুক্তরাষ্ট্রের পেনসিলভানিয়া বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ঢাকায় আনা হয়েছে। সেই নকশা অনুযায়ী অনেক কিছুই বাস্তবায়ন করা যায়নি, আবার অনেক কিছু নকশাতে নেই কিন্তু যোগ করা হয়েছে তারপরেও জাতীয় সংসদ আমাদের ঐতিহ্য, গৌরবের সাক্ষী।

তথ্যসূত্র: সমতটে সংসদ বাংলাদেশের স্থাপত্য সংস্কৃতি লুই কা’ন ও সংসদ ভবন, মীর মোবাশ্বের আলী ও প্যারামেটিক আর্কিটেকচার

ঢাকা/লিপি

সর্বশেষ

পাঠকপ্রিয়