রোজায় যেভাবে ধৈর্য, সংযম ও সহনশীলতার অনুশীলন করতে হবে
মুফতি আতাউর রহমান || রাইজিংবিডি.কম
মুমিন বান্দা পবিত্র রমজান মাসে সিয়াম সাধনার মাধ্যমে যেসব উত্তম গুণ অর্জন করে তার অন্যতম ধৈর্য ও সহনশীলতা।
মহানবী (সা.) রমজানকে ধৈর্যের মাস আখ্যা দিয়েছেন। আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘ধৈর্যের মাসের রোজা, প্রত্যেক মাসের তিনদিনের রোজা অন্তরের ক্রোধ-বিদ্বেষ দূর করে।’ (মুসনাদে আহমদ, হাদিস : ২০৭৩৮)
আল্লামা ইবনে রজব হাম্বলি (রহ.) লেখেন, সবরের সর্বোত্তম প্রথম প্রকার হলো রোজা। কেননা তার ভেতর সবরের তিন প্রকারের সমন্বয় ঘটে। গবেষক আলেমরা বলেন, ধৈর্য তিন প্রকার:
১. আল্লাহর আনুগত্য করার জন্য ধৈর্য ধারণ করা
২. গুনাহ থেকে বাঁচার জন্য ধৈর্য ধারণ করা
৩. দুঃখ, কষ্ট ও বিপদে ধৈর্য ধরা।
সিয়াম সাধনার ভেতর তিন প্রকার ধৈর্য পাওয়া যায়। কেননা রোজাদার ব্যক্তি আল্লাহর নির্দেশ পালনের জন্য এবং তাঁর অবাধ্যতা থেকে বাঁচতে ক্ষুধা ও তৃষ্ণার কষ্ট সহ্য করে। এই বিবেচনায় রোজাদার ব্যক্তি ধৈর্যশীলদের অন্তর্ভুক্ত। আর পবিত্র কোরআনে ধৈর্যশীলদের ব্যাপারে ইরশাদ হয়েছে, ‘নিশ্চয়ই আল্লাহ ধৈর্যশীলদের জন্য সীমাহীন প্রতিদান দেন।’ (সুরা ঝুমার, আয়াত : ১০)
ধৈর্য ও সবর মহান আল্লাহর একটি প্রিয় গুণ। পবিত্র কোরআনের ৪৫টি সুরায় ধৈর্যের আলোচনা করা হয়েছে। সবর শব্দটি ব্যবহৃত হয়েছে ১০৩ বার। হাদিসেও বিভিন্ন কাজে ধৈর্য ধারণের পৃথক পৃথক পুরস্কার ঘোষণা করা হয়েছে। তাই ধৈর্য ধারণের এই মাসে ধৈর্য, সংযম ও সহনশীলতার অনুশীলন করা আবশ্যক। যে ব্যক্তি সিয়াম সাধনার মাধ্যমে সংযমের অনুশীলন করবে তাঁর ব্যাপারে আল্লাহর ঘোষণা হলো, ‘আদম সন্তানের সব আমল তার জন্য, শুধু রোজা ছাড়া। কেননা রোজা আমার জন্য এবং আমিই তার প্রতিদান দেই।’ (সহিহ বুখারি, হাদিস : ৫৯২৭)
মহানবী (সা.) রমজান মাসকে ধৈর্যের মাস বলেছেন। আর পবিত্র কোরআনে বলা হয়েছে, ‘তোমরা ধৈর্য ও নামাজের মাধ্যমে সাহায্য প্রার্থনা কর। নিশ্চয়ই তা আল্লাহভীরু ছাড়া অন্যদের জন্য গুরুতর বিষয়।’ (সুরা বাকারা, আয়াত : ৪৫)
এর দ্বারা প্রমাণ হয়, রোজা আল্লাহর সাহায্য লাভের মাধ্যম। ইতিহাস সাক্ষী বদরসহ অসংখ্য যুদ্ধে মুসলমানরা রমজানে বিজয় লাভ করে এবং এসব যুদ্ধে তারা রোজা রাখার মাধ্যমে আল্লাহর সাহায্য লাভ করেছিল। একই সঙ্গে মুসলিম বাহিনী যুদ্ধের ময়দানে ধৈর্য, সহ্য ও দৃঢ়তার পরিচয় দিয়েছিল। অনেকে শুধু কষ্ট সহ্য করাকেই ধৈর্য মনে করে। কিন্তু সবচেয়ে বড় ধৈর্যের বিষয় হলো কুপ্রবৃত্তি দমন করা এবং পাপ পরিহার করা। আর এটাই রমজানের অন্যতম উদ্দেশ্য।
মহানবী (সা.) বলেছেন, ‘যে ব্যক্তি মিথ্যা বলা ও সে অনুযায়ী আমল বর্জন করেনি, তার এ পানাহার পরিত্যাগ করায় আল্লাহর কোনো প্রয়োজন নেই।’ (সহিহ বুখারি, হাদিস : ১৯০৩)
রমজান রোজাদারকে সহনশীল করে তোলে। ফলে সে অন্যের অন্যায় ও অবিচার পর্যন্ত উপেক্ষা করে। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেন, ‘রোজা ঢালস্বরূপ। তোমাদের মধ্যে কেউ যখন রোজা পালন করে, তখন সে যেন অশ্লীল বাক্য ব্যবহার না করে এবং উচ্চঃস্বরে কথা না বলে ও কারো ওপর রাগান্বিত না হয়। যদি কেউ তাকে গালি দেয় বা গায়ে পড়ে ঝগড়া করতে আসে, তখন সে যেন বলে, আমি রোজা পালন করছি।’ (সুনানে নাসায়ি, হাদিস : ২২১৭)
রোজা শুধু অন্যের প্রতি সহনশীল হতে শেখায় না, বরং অন্যের মন্দ আচরণ থেকে আত্মরক্ষারও উপায়স্বরূপ। মারিয়াম (আ.)-কে সমাজের কুৎসিত প্রশ্ন ও অন্যায় আচরণ থেকে বাঁচতে বলা হয়েছিল, ‘মানুষের মধ্যে কারো যদি তুমি দেখো তখন বোলো, আমি দয়াময়ের উদ্দেশে রোজা তথা মৌনতা অবলম্বনের মানত করেছি। সুতরাং আজ আমি কিছুতেই কোনো মানুষের সঙ্গে বাক্যালাপ করব না।’ (সুরা মারিয়াম, আয়াত : ২৬)
আল্লাহ সবাইকে সিয়াম সাধনার মাধ্যমে ধৈর্য ধারণের তাওফিক দিন। আমিন।
ঢাকা/শাহেদ