ঢাকা     বুধবার   ১০ জুন ২০২৬ ||  জ্যৈষ্ঠ ২৭ ১৪৩৩ || ২৪ জিলহজ ১৪৪৭ হিজরি

Risingbd Online Bangla News Portal

রামপালের কলা এখন কালের ইতিহাস

শেখ মো. রতন || রাইজিংবিডি.কম

প্রকাশিত: ১০:০৮, ৭ অক্টোবর ২০১৪   আপডেট: ০৫:২২, ৩১ আগস্ট ২০২০
রামপালের কলা এখন কালের ইতিহাস

রামপালের কলার এক সময় সুখ্যাতি ছিল

শেখ মো. রতন, মুন্সীগঞ্জ : এক সময় মুন্সীগঞ্জ-বিক্রমপুর তথা রামপালের কলার দেশ-বিদেশে সুখ্যাতি ছিল। দেশের চাহিদা মিটিয়ে এই কলা বিদেশেও যেত। রামপালের কলা এতটাই সুস্বাদু ছিল যে, খাবার পর এর স্বাদ বেশ কিছু সময় মুখে লেগে থাকত। এলাকার কলা চাষ উপযোগী উর্বর মাটি ছিল এর অন্যতম কারণ। রামপালের প্রতিটি বাড়িতেই ছিল কলার বাগান। এক চিলতে ফাঁকা জায়গা পেলেই কলা চাষীরা জায়গাটুকু কাজে লাগাতেন। এখন অবশ্য চাষীদের মধ্যে কলা চাষে তেমন একটা আগ্রহ লক্ষ্য করা যায় না। এলাকায় নেই কোনো কলাবাগান। বাড়ির পেছনের অংশে, মাঠ কিংবা প্রান্তরে সারি সারি সবুজ কলাগাছ আর দেখা যায় না। অথচ এই এলাকায় এক সময় কলা চাষীদের সঙ্গে তাদের সোহাগী বধূরাও বাড়ির আঙিনা কিংবা পেছন-বাড়িতে কম করে হলেও কলা চাষ করতেন। সেসব আজ ইতিহাসের অংশ হয়ে গেছে। আর এ কারণেই মুন্সীগঞ্জের ঐতিহ্যবাহী রামপালের কলা এখন কালের ইতিহাস।


মুন্সীগঞ্জ শহরের দেওভোগ এলাকার হাজী জহিরউদ্দিনের বাড়ির চারপাশে এক সময় শুধু কলাগাছ ছিল। দূর থেকে পুরো বাড়িটাকে কলাবাগান মনে হতো। বাড়ির পেছনে কিংবা সামনে কোথাও তিল পরিমান ফাঁকা জায়গা তিনি রাখতেন না। তবে তিনি কিন্তু শখের বশে ওই কলা চাষ করতেন। এখন তিনি নেই। আছে তার বাড়ি। আছে ছেলেমেয়ে, নাতী-নাতনী। তার অবর্তমানে উত্তরসূরীদের কেউই তার শখ ধরে রাখতে পারেননি। হাজী জহিরউদ্দিনের সঙ্গে সঙ্গে যেন হারিয়ে গেছে রামপালের কলা।


রামপাল মুন্সীগঞ্জ জেলা সদরের এক অজপাড়া-গাঁ। এখানকার বাসিন্দারা অর্থের জন্য নয়, কলা চাষ করতেন মনের আনন্দে। তবে ঠিক কবে থেকে এলাকায় কলার আবাদ শুরু হয় তা জানা না গেলেও খোঁজ নিয়ে জানা যায় ১৯৮০ সাল পর্যন্ত এলাকায় কলার চাষ হতো। এরপর থেকেই শুরু হয় কলা চাষে ভাটার কাল। যা এখনও বর্তমান।

 

অথচ এক সময় নানু-দাদুর গল্পে রামপালের কলার কথা শোনা যেত। সেই গল্পে রামপালের কলার সুঘ্রাণ মিশে থাকতো। গল্প যিনি বলতেন তার চোখে-মুখে ফুটে উঠত গৌরব। এখনও অবশ্য গল্পে রামপালের সাগর কলার কথা শোনা যায় কিন্তু সেখানে কোনো গৌরব নেই, বরং গল্পে ফুটে ওঠে দীর্ঘশ্বাস। ঐতিহ্য হারিয়ে ফেলার হাহাকার।
এক সময় মুন্সীগঞ্জ জেলার বেশ নাম-ডাক ছিল। সদর উপজেলার রামপালের সাগর কলার কথা তো আগেই বলেছি। এই কলা পরিচিত ছিল দেশের মানুষের কাছে। মুন্সীগঞ্জ থেকে দেশের বিভিন্ন এলাকায় কলা যেত নদী পথে। কারণ দক্ষিণবঙ্গ ও রাজধানী ঢাকার নৌ-যোগাযোগের ট্রানজিট পয়েন্ট নদীবেষ্টিত মুন্সীগঞ্জ। পদ্মা-মেঘনা-ধলেশ্বরী পরম মমতায় জড়িয়ে রেখেছে এই জেলা শহরটিকে। ঝালকাঠি, বরিশাল, খুলনা, চাঁদপুরসহ দক্ষিণাঞ্চলের মানুষ ঢাকা যাতায়াত করতেন মুন্সীগঞ্জের বুকের ওপর দিয়ে। বড় বড় লঞ্চ, ষ্টিমারগুলো যখন মুন্সীগঞ্জ লঞ্চঘাটে ভিড়তো বা ঘাটে আসার অপেক্ষা করতো তখন ডিঙ্গি নৌকায় ফেরি করে রামপালের সাগর কলা বিক্রি হতো। ডিঙ্গি নৌকায় বিক্রেতারা কলা সাজিয়ে ফেরি করতো। তারা কলা উঁচিয়ে ধরে হাক ডাক করে লঞ্চ যাত্রীদের দৃষ্টি আকর্ষণের চেষ্টা করতো। তখন অনেকেই আগ্রহ নিয়ে রামপালের কলা কিনতেন। কেউ আবার আত্মীয়-স্বজনের বাড়িতেও কলা নিয়ে যেতেন।


দ্বিতীয় কলকাতা হিসেবে মীরকাদিম নদী বন্দরের খ্যাতি ছিল। এই বন্দরেও শত শত কোষা-নৌকায় রামপালের কলা বিক্রি করা হতো। দেশের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে আসা পাইকারী ক্রেতারা এখান থেকেই কলা কিনে নিয়ে যেতেন। তখন অজস্র সাগর কলা এবং পাকা কলার সুমধুর ঘ্রাণে নদী ঘাটে অন্য রকম এক পরিবেশ বিরাজ করতো। লঞ্চযাত্রী এবং নিম্ন আয়ের মানুষদের সকালের নাস্তা ছিল এই কলা এবং পাউরুটি। একই চিত্র দেখা যেত জেলার বিভিন্ন এলাকার অলি-গলিতে গড়ে ওঠা ছোট-বড় চায়ের স্টলগুলোতেও। রুটি বা বিস্কুটের সঙ্গে সাগর কলাই ছিল গ্রাহকের প্রথম পছন্দ। গৃহস্থের বাড়ি অতিথি এলে তাকেও এই কলা দিয়ে আপ্যায়ন করা হতো। অতিথি বিদায়কালেও কলা তাদের সঙ্গে দিয়ে দেয়া হতো। এটা ছিল এলাকার ঐতিহ্য।


মুন্সীগঞ্জ কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর থেকে পাওয়া তথ্য মতে মাত্র ৫ বছর আগেও জেলায় ৫৭৫.৯৫ একর জমিতে কলা চাষ হতো। কলা চাষের জমিতে অধিক লাভজনক ফসল চাষে আগ্রহী হওয়ার কারণেই রামপালের কলা এখন বিলুপ্তির পথে। রামপাল ইউনিয়নের রগুরামপুর এলাকার মো. আউয়াল বেপারীর এ প্রসঙ্গে বলেন, আমাদের পরিবারের সবাই এক সময় কলা চাষ করতো। কলা চাষের ধরনও ছিল অসাধারণ! সে সময় কলা চাষ বেশ লাভজনকও ছিল। কতো রকমের কলা যে ছিল : সবরি কলা, কবরি কলা, সাগর কলা, চাপা কলা ও আনাজি কলা ।  কিন্তু ছিচকে চোরের উপদ্রপ ও সরকারি পৃষ্ঠপোষকতার অভাবে এক সময় কলা চাষের আয়োজেন ভাটা পড়ে। এক পর্যায়ে কলা চাষ বন্ধ করে দিই। এখন সেই জমিতে নানা প্রজাতির সবজি চাষ করি।


কালের আবর্তে যেখানে কলার চাষ করা হতো সেখানে আজ মৌসুমী ফসলের চাষ হচ্ছে । রামপাল বাজারের ব্যবসায়ী রমিজউদ্দিন শেখ ও আমজাদ শেখ জানান, তারাও এক সময় কলা চাষী ছিলেন । তাদের কলা দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলে বিক্রির জন্য পাইকার ও খুচরা বিক্রেতারা নিয়ে যেতেন।  এখন তাদের জমিতে সবজির চাষ হয়। এখন কলার বাগান দখল করে নিয়েছে পানের বরজ। তবে ঐতিহ্য যেন হারিয়ে না যায় সে জন্য পানের বরজের আশেপাশে তিন-চারটি কলা গাছ লাগিয়েছেন।
কলা চাষে আগ্রহ কমে আসার কারণ জানতে চাইলে তারা নানারকম রোগ এবং চোরের উপদ্রপের কথা বলেন। তাছাড়া প্রতিবছর বন্যাতেও কলাবাগান নষ্ট হয়। এ জন্য সরকারের পৃষ্ঠপোষকতা পাওয়া যায় না। ফলে কলা চাষীরা হতাশ হয়ে অন্য ফসল চাষ করছে। হারিয়ে যাচ্ছে রামপালের সাগর কলার ঐতিহ্য।


রাইজিংবিডি/ঢাকা/৭ অক্টোবর ২০১৪/তাপস রায়                                         


 

রাইজিংবিডি.কম

সর্বশেষ

পাঠকপ্রিয়