ক্ষমতায় বিএনপি: সমর্থকদের আশা ‘আগামীর বাংলাদেশ হবে আরো উন্নত’
আন্তর্জাতিক ডেস্ক || রাইজিংবিডি.কম
বাংলাদেশে দীর্ঘ দুই দশক পর ক্ষমতায় ফিরেছে বিএনপি। গত বৃহস্পতিবার (১২ ফেব্রুয়ারি) ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে নিরঙ্কুশ বিজয় অর্জন করে দলটি আবার সরকার গঠন করতে যাচ্ছে।
সমর্থকরা প্রত্যাশা করছেন, বিএনপি বিজয়ী হওয়ার মাধ্যমে বাংলাদেশ নতুন এক মোড়ে পৌঁছেছে- যেখানে দেশ আরো ভালো হবে।
কাতারভিত্তিক সংবাদমাধ্যম আল-জাজিরার এক প্রতিবেদনে এসব তথ্য উঠে এসেছে। সংসদীয় নির্বাচনের পরেরদিন শনিবার (১৪ ফেব্রুয়ারি) বিকেলে ঢাকার গুলশানে রিকশায় বিএনপির পতাকা লাগিয়ে ঘুুরছিলেন রিকশাচালক আনোয়ার পাগলা। তিনি বিএনপির একজন কট্টর সমর্থক।
তিনি আল জাজিরাকে বলেন, “মানুষ আমাকে পাগল বলে কারণ আমি এই দলটিকে আমার জীবনের সবকিছু মনে করি। কিন্তু তাতে কিছু যায় আসে না। আমরা জিতেছি এবং বাংলাদেশ এখন আরও ভালো হবে।”
শনিবার নির্বাচন কমিশন নবনির্বাচিত সংসদ সদস্যদের গেজেট প্রকাশ করেছে, যা নির্বাচনি প্রক্রিয়ার চূড়ান্ত আনুষ্ঠানিক সিলমোহর। মধ্য-ডানপন্থি বিএনপির নেতৃত্বাধীন জোট ৩০০টি আসনের মধ্যে ২১২টি আসন পেয়েছে। তাদের প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী ও বাংলাদেশের বৃহত্তম ধর্মভিত্তিক দল জামায়াতে ইসলামীর নেতৃত্বাধীন জোট পেয়েছে ৭৭টি আসন।
এই নির্বাচন এমন এক সময়ে অনুষ্ঠিত হলো যার দেড় বছর আগে দেশব্যাপী এক গণআন্দোলনে সাবেক আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতাচ্যুত হয়েছিল এবং রাজপথে ১ হাজার ৪০০ মানুষ নিহত হয়েছিল। দমন-পীড়নের নেতৃত্ব দেওয়া সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা দেশ ছেড়ে পালানোর পর থেকে বাংলাদেশ একটি অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের অধীনে ছিল।
বাংলাদেশের পরবর্তী প্রধানমন্ত্রী হতে যাওয়া বিএনপির তারেক রহমান শুক্রবার (১৩ ফেব্রুয়ারি) সমর্থকদের অভিবাদন জানিয়ে বলেন, তিনি তাদের দেওয়া ‘ভালোবাসার জন্য কৃতজ্ঞ’। নির্বাচনি প্রচারণাজুড়ে তারেক রহমান বাংলাদেশে গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারের প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন।
বিএনপির নির্বাচন পরিচালনা কমিটির মুখপাত্র মাহদী আমিন বলেন, তারেক রহমান প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন যে প্রধানমন্ত্রী হিসেবে তিনি নাগরিকদের অধিকার ও স্বাধীনতা রক্ষা করবেন।
বৃহস্পতিবারের ভোটগ্রহণ মূলত শান্তিপূর্ণ ছিল। ভোট গণনায় ‘অসংগতি ও কারচুপির’ অভিযোগ আনলেও শনিবার (১৪ ফেব্রুয়ারি) জামায়াত নির্বাচনের ফলাফল মেনে নিয়েছে।
বিএনপি সম্প্রতি তাদের সাবেক চেয়ারপারসন খালেদা জিয়াকে হারিয়েছেন- যিনি তারেক রহমানের মা এবং দুইবারের প্রধানমন্ত্রী ছিলেন। গত ৩০ ডিসেম্বর তিনি মৃত্যুবরণ করেন।
খালেদা জিয়া ১৯৯১ এবং ২০০১ সালে দলকে ক্ষমতায় নিয়ে গিয়েছিলেন। দুই দশক পর তার ছেলে বিএনপিকে আবার সরকারে ফিরিয়ে আনলেন।
শুক্রবার (১৩ ফেব্রুয়ারি) বিকেলে গুলশানে দলীয় কার্যালয়ে উল্লসিত ভিড়ের মধ্যে দাঁড়িয়ে ছিলেন বিএনপি কর্মী কামাল হোসেন। আবেগাপ্লুত হয়ে তিনি বিগত বছরগুলোর দমন-পীড়নের কথা স্মরণ করেন।
তিনি বলেন, “দীর্ঘদিন আমার মনে হতো শেখ হাসিনার শাসন কখনোই শেষ হবে না।” ২০২৪ সালের জুলাই মাসের অভ্যুত্থানের কথা উল্লেখ করে তিনি আরো বলেন, “এখন জনগণ আমাদের এই ম্যান্ডেট দিয়েছে। আমরা বাংলাদেশকে ফিরে পেয়েছি।”
কামাল বলেন, নতুন সরকারের অগ্রাধিকার হওয়া উচিত কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং মুদ্রাস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ করা। “দ্রব্যমূল্য আমাদের কষ্ট দিচ্ছে এবং অনেক শিক্ষিত যুবক বেকার। সরকারকে অবিলম্বে এ বিষয়ে পদক্ষেপ নিতে হবে,” বলেন তিনি।
নির্বাচনি ফল নিয়ে হতাশা প্রকাশ করে গত শুক্রবার রাজধানীর মগবাজারে আব্দুস সালাম নামে জামায়াতের এক সমর্থক বলেন, “ভোট গণনা প্রক্রিয়ায় ইঞ্জিনিয়ারিং হয়েছে এবং গণমাধ্যম জামায়াত জোটের বিরুদ্ধে পক্ষপাতদুষ্ট ছিল।” তার মতে, একটি সুষ্ঠু প্রক্রিয়া হলে তারা আরও আসন পেতেন।
অন্যদিকে, জার্মানিতে থাকা জামায়াত সমর্থক মুয়াজ আবদুল্লাহর মতে, জামায়াতের পরাজয় ছিল সাংগঠনিক ব্যর্থতা। তিনি বলেন, “অনেক নির্বাচনি এলাকায় জামায়াত ভালো প্রচারণা চালায়নি। এমনকি বেশ কিছু জায়গায় তাদের সঠিক পোলিং এজেন্টও ছিল না।”
বিএনপি ও জামায়াত দীর্ঘদিনের মিত্র হলেও এই নির্বাচনে তারা একে অপরের প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে লড়েছে। প্রচারণার সময় বিক্ষিপ্ত সহিংসতা এবং কয়েক মাস ধরে পাল্টাপাল্টি বক্তব্য দেখা গেছে।
দলীয় কার্যালয়ের বাইরে বিএনপি কর্মী সুজন মিয়া সমঝোতামূলক সুরে বলেন, “আমরা কোনো শত্রুতা চাই না। আমাদের উচিত দেশ গড়ার দিকে নজর দেওয়া।”
রাজনৈতিক বিশ্লেষক এবং ‘জবান’ ম্যাগাজিনের সম্পাদক রেজাউল করিম রনি, যিনি বিএনপির প্রচারণা ঘনিষ্ঠভাবে পর্যবেক্ষণ করেছেন, তিনি মনে করেন বিএনপির এই বিজয় বাংলাদেশে উগ্র ডানপন্থি রাজনীতির উত্থান নিয়ে উদ্বেগ প্রশমিত করবে।
তিনি যুক্তি দেন, “এই নির্বাচনের মাধ্যমে মানুষ এক অর্থে দেশের রাজনীতিকে সেই ঝুঁকি থেকে মুক্ত করেছে।”
তবে রনি সতর্ক করে দিয়ে বলেন, আসল পরীক্ষা এখন শুরু। তিনি বলেন, “চ্যালেঞ্জ হলো সুশাসন, আইন-শৃঙ্খলা এবং জননিরাপত্তা নিশ্চিত করা- এবং একটি অধিকারভিত্তিক রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করা,” যা ২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থানের মূল আকাঙ্ক্ষা ছিল।
আটলান্টিক কাউন্সিলের দক্ষিণ এশিয়া বিষয়ক সিনিয়র ফেলো মাইকেল কুগেলম্যান বলেন, বিএনপির বিজয় ‘পরিবর্তনের রাজনীতির জন্য একটি ধাক্কা হতে পারে যা ২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থানের পর থেকে বাংলাদেশকে অনুপ্রাণিত করেছে।’
তিনি বলেন, “বিএনপি বিগত সময়ে দুর্নীতির অভিযোগে জর্জরিত। এটি এমন কিছু আদর্শের প্রতিফলন ঘটায় যা জেন-জি প্রতিবাদকারীরা প্রত্যাখ্যান করেছিল।”
কুগেলম্যান আরো বলেন, ‘নতুন সরকারকে এখন জনগণ এবং বিরোধী দল উভয়ের কাছ থেকেই পুরোনো রাজনৈতিক অভ্যাস ত্যাগ করার চাপের মুখে পড়তে হবে।”
তিনি বলেন, “যদি নতুন সরকার আবার দমনমূলক বা প্রতিশোধমূলক রাজনীতিতে ফিরে যায়, তাহলে সংস্কারপন্থিরা হতাশ হবেন এবং গণতান্ত্রিক প্রচেষ্টা পিছিয়ে যাবে।”
ঢাকা/ফিরোজ