নোয়াখালীতে ‘ধর্ষণের’ অভিযোগ নিয়ে ধোঁয়াশা
নোয়াখালী প্রতিনিধি || রাইজিংবিডি.কম
ফাইল ফটো
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া নোয়াখালীর হাতিয়ায় গৃহবধূকে ধর্ষণের ঘটনা নিয়ে ধোঁয়াশা সৃষ্টি হয়েছে। ভুক্তভোগীর প্রতিবেশীরা বলছেন, ওই রাতে এ ধরনের ঘটনা তারা জানেন না। পুলিশ বলছে, তারা অনুসন্ধানে জেনেছেন, যে সময়ে ধর্ষণের ঘটনা ঘটেছে বলে দাবি করা হচ্ছে ওই সময়ে অভিযুক্ত হাসপাতালে ভর্তি ছিলেন। এ ঘটনায় এখনও কোনো লিখিত অভিযোগ বা মামলা হয়নি।
এ দিকে ভুক্তভোগী ভিডিও বার্তায় দাবি করেন, ১২ ফেব্রুয়ারি জাতীয় নির্বাচনে শাপলা কলি প্রাতীকে ভোট দেওয়ায় পরদিন শুক্রবার রাতে স্থানীয় কয়েকজন যুবক ঘরে ঢুকে তাকে ও তার স্বামীকে পিটিয়ে জখম করে। এরপর তার স্বামীকে একটি কক্ষে বেঁধে রেখে তাকে গোসলখানায় নিয়ে জোরপূর্বক আবদুর রহমান নামে এক ব্যক্তি ধর্ষণ করেন। পরে তিনি নোয়াখালী জেনারেল হাসপাতালে ভর্তি হন।
অভিযুক্ত আবদুর রহমান এক ভিডিও বার্তায় বলেন, “আমার বিরুদ্ধে আনা অভিযোগটি মিথ্যা। শুক্রবার বিকালে এনসিপির লোকজন আমাকে আক্রমণ করে আহত করে। আমি স্থানীয়ভাবে চিকিৎসা নিয়ে রাত ৮টার দিকে নোয়াখালী জেনারেল হাসপাতালে ভর্তি হই। তাহলে রাত ১১টায় কীভাবে আমি ধর্ষণ করলাম বুঝতেছি না।”
অভিযোগকারী যেখানে বসবাস করেন সেখানকার পাহারাদার নুর উদ্দিন বলেন, ‘‘আমরা ঘটনা শোনার পর ওই নারীর ঘরে যাই। আশপাশের প্রতিবেশীদের সঙ্গে কথা বলি। ঘরে হামলা বা নির্যাতনের কোনো প্রমাণ পাইনি।’’
নাম প্রকাশ না করার শর্তে অভিযোগকারীর কয়েকজন প্রতিবেশী জানান, এ ধরনের ঘটনা তারা জানেন না। হামলা বা ধর্ষণের মতো ঘটনা এই এলাকায় হলে বাসিন্দারা সবাই টের পেতেন। যিনি অভিযোগ করেছেন, তার বিরুদ্ধে এর আগেও অনেক অভিযোগ রয়েছে বলে তারা দাবি করেন।
এ দিকে নোয়াখালী জেনারেল হাসপাতাল সূত্র জানায়, ওই নারী শনিবার সন্ধ্যায় হাসপাতালে এস জানান, তার ওপর হামলা হয়েছে। জরুরি বিভাগের চিকিৎসক ডা. মোস্তাফিজুর রহমান তাকে ভর্তি করেন। কিন্তু রাত ১১টায় তিনি বলেন, তাকে ধর্ষণ করা হয়েছে। তখন রোগীকে শারীরিক পরীক্ষার জন্য গাইনি বিভাগে পাঠানো হয়। গাইনি বিভাগের চিকিৎসকরা পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত জানাবেন।
এ প্রসঙ্গে নোয়াখালী জেনারেল হাসপাতালের তত্ত্বাবধায়ক ডা. ফরিদ উদ্দিন আহমেদ বলেন, “পুলিশের কাছ থেকে এখনো শারীরিক পরীক্ষার জন্য চাহিদাপত্র চাওয়া হয়নি। চাহিদাপত্র আসলে পরীক্ষা করা হবে।”
আজ রবিবার দুপুরে ভুক্তভোগীর স্বামী জসীমকে ফোন দেন এই প্রতিবেদক। পরিচয় জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘‘আমি তার (ভুক্তভোগীর) ভাই।’’ প্রতিবেদক ‘‘কেমন ভাই?’’ প্রশ্ন করলে তিনি বলেন, ‘‘প্রতিবেশী ভাই। আপনি কে?’’ এরপর প্রতিবেদক পরিচয় দিলে তিনি ফোন কেটে দেন। এরপর থেকেই তার ফোন বন্ধ পাওয়া যায়।
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে নোয়াখালী-৬ আসনে বিএনপিপ্রার্থী ও দলের কেন্দ্রীয় সাংগঠনিক সম্পাদক মাহবুবের রহমান শামীমের কাছে এ প্রসঙ্গে জানতে চাইলে তিনি বলেন, “এ ধরনের ঘটনা ঘটেছে কিনা প্রশাসনকে জিজ্ঞেস করেন। এ বিষয়ে আমার কিছু জানা নেই।”
“একটি মহল বিএনপিকে রাজনৈতিকভাবে হেয় করার জন্য এ ধরনের প্রচার চালাচ্ছে,” বলেন হাতিয়া উপজেলা বিএনপির সাবেক সভাপতি আলাউদ্দিন।
এ দিকে উল্লিখিত আসনে মাহবুবের রহমান শামীমের হারিয়ে জয়ী হয়েছেন ১১ দলীয় জোটের প্রার্থী ও জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) সিনিয়র যুগ্ম মুখ্য সমন্বয়ক হান্নান মাসউদ। তিনি বলেন, “হাতিয়ার মানুষ বাংলাদেশ থেকে বিচ্ছিন্ন একটি দ্বীপে বসবাস করে। এখানে মাহবুবের রহমান শামীমের নির্দেশে নব্য বিএনপির লোকজন তাণ্ডব চালাচ্ছে। আমি উনার সঙ্গে দেখা করতে চেয়েছিলাম। আমার সব এজেন্টের বাড়ি বাড়ি গিয়ে হামলা করা হচ্ছে। এই ধর্ষণের ঘটনা তারই একটি অংশ।’’
‘‘হাতিয়ার মানুষের ধৈর্যের বাঁধ ভেঙে গেলে পরিস্থিতি ভয়াবহ রূপ নেবে,” হুঁশিয়ার করে নবনির্বাচিত এই সংসদ সদস্য বলেন, ‘‘আগামীর সরকার ও বর্তমান সরকারকে এসবের দায়িত্ব নিতে হবে। আমি সংসদে এসব বিষয় তুলে ধরব।’’
নোয়াখালীর অতিরিক্ত পুলিশ সুপার আবু তৈয়ব মো. আরিফ হোসেন বলেন, “স্যোশাল মিডিয়ায় সংবাদটি দেখার পর আমরা একজন এএসপি ও একজন পরিদর্শককে ঘটনাস্থলে পাঠাই। স্থানীয় লোকজন জানায়, ধর্ষণের কোনো ঘটনা তাদের জানা নেই। তবে, কিছু মারামারি হয়েছে।”
“ওই নারী যার বিরুদ্ধে অভিযোগ করেছেন, আমরা অনুসন্ধান করে জানতে পারি, তিনি যে সময়ের কথা বলছেন, সে সময় ওই ব্যক্তি হাসপাতালে চিকিৎসাধীন ছিলেন। আমরা এখনো পর্যন্ত কোনো লিখিত অভিযোগ বা মামলা পাইনি,” বলেন আবু তৈয়ব।
ঢাকা/সুজন/মাসুদ