ঢাকা     শনিবার   ১৪ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ ||  ফাল্গুন ১ ১৪৩২

Risingbd Online Bangla News Portal

সংসদ সদস্যদের শপথ পড়ানোর ‘তিন দিনের’ আইন মানলে শপথ কবে?

সাহিদুল ইসলাম ভূঁইয়া || রাইজিংবিডি.কম

প্রকাশিত: ০৮:৩৬, ১৪ ফেব্রুয়ারি ২০২৬   আপডেট: ০৮:৫৮, ১৪ ফেব্রুয়ারি ২০২৬
সংসদ সদস্যদের শপথ পড়ানোর ‘তিন দিনের’ আইন মানলে শপথ কবে?

প্রধান নির্বাচন কমিশনার এ এম এম নাসির উদ্দিন।

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ২৯৯টি আসনে নির্বাচন হলেও ২৯৭টি আসনের ফলাফল ঘোষণা করেছে নির্বাচন কমিশন (ইসি)। আদালতের আদেশ থাকায় চট্টগ্রাম-২ ও চট্টগ্রাম-৪ আসনের ফলাফল ঘোষণা থেকে বিরত রয়েছে ইসি। 

বেসরকারিভাবে ফল ঘোষণার পর শুক্রবার রাতে ১৩ ফেব্রুয়ারি তারিখের সরকারি গেজেটে চূড়ান্ত বিজয়ী প্রার্থীদের তালিকা প্রকাশ করেছে ইসি। এখন অপেক্ষা নতুন সংসদ সদস্য এবং মন্ত্রিসভার সদস্যদের শপথ পাঠ করানো। তবে এই ক্ষেত্রে আইনি জটিলতায় শপথ গ্রহণ হতে পারে সোমবার বা মঙ্গলবার। তার আগে আইনের কারণেই সম্ভব নয়। 

আরো পড়ুন:

সাংবিধানিক আইন ও জাতীয় সংসদের কার্যপ্রণালি বিধিতে কী বলা আছে?

সাংবিধানিক বিধান অনুযায়ী, গেজেট প্রকাশের তারিখ থেকে পরবর্তী তিন দিনের মধ্যে স্পিকার বা তার মনোনীত ব্যক্তি নবনির্বাচিত সংসদ সদস্যদের শপথ পাঠ করাবেন। তবে চব্বিশের গণঅভ্যুত্থান-পরবর্তী পরিস্থিতিতে প্রকাশ্যে দেখা যায়নি দ্বাদশ সংসদের স্পিকার ড. শিরীন শারমিন চৌধুরীকে। ডেপুটি স্পিকার জুলাই অভ্যুত্থানের মামলায় কারাগারে। অন্তর্বর্তী সরকার আগেই জানিয়ে দিয়েছে, স্পিকারদের ছাড়াই শপথ পড়ানোর সুযোগ আছে আইনে। 

আইন অনুযায়ী, স্পিকার বা ডেপুটি স্পিকারের অনুপস্থিতিতে নবনির্বাচিত সংসদ সদস্যদের শপথ পড়ানোর দায়িত্ব পড়ে প্রধান নির্বাচনের কাঁধে। ফলে আইনি ক্রমানুযায়ী তালিকায় এখন প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) এ এম এম নাসির উদ্দিনের নাম।

বাংলাদেশের সংবিধানের ১৪৮ অনুচ্ছেদে এই বিষয়ে স্পষ্ট বিধান রয়েছে। সেখানে বলা হয়েছে, সাধারণ নির্বাচনের ফলাফল ‘সরকারি গেজেটে প্রজ্ঞাপিত’ হওয়ার তারিখ থেকে পরবর্তী তিন দিনের মধ্যে নির্বাচিত সদস্যদের শপথ গ্রহণ সম্পন্ন করতে হবে। প্রচলিত রীতি অনুযায়ী অতীতে নবনির্বাচিত সংসদ সদস্যদের শপথ পড়িয়েছেন জাতীয় সংসদের স্পিকার। স্পিকার অনুপস্থিত থাকলে ডেপুটি স্পিকার এই দায়িত্ব পালন করেছেন।

সংবিধানে স্পষ্ট বলা আছে, স্পিকার বা ডেপুটি স্পিকার পদত্যাগ করলেও তাদের উত্তরসূরি কার্যভার গ্রহণ না করা পর্যন্ত তারা পদে বহাল আছেন বলে গণ্য হবেন। সেই হিসেবে নবনির্বাচিত সংসদ সদস্যদের শপথ পড়ানোর সাংবিধানিক দায়িত্ব স্পিকারের ওপরই বর্তায়।

সংবিধানের ১৪৮ অনুচ্ছেদে বিকল্প ব্যবস্থাও উল্লেখ আছে। অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে, “সংসদ সদস্যদের সাধারণ নির্বাচনের ফলাফল সরকারি গেজেটে প্রজ্ঞাপিত হইবার তারিখ হইতে পরবর্তী তিন দিনের মধ্যে এই সংবিধানের অধীন এতদুদ্দেশ্যে নির্দিষ্ট ব্যক্তি বা তদুদ্দেশ্যে অনুরূপ ব্যক্তি কর্তৃক নির্ধারিত অন্য কোনো ব্যক্তি যে কোনো কারণে নির্বাচিত সদস্যদের শপথ পাঠ পরিচালনা করিতে ব্যর্থ হইলে বা না করিলে, প্রধান নির্বাচন কমিশনার উহার পরবর্তী তিন দিনের মধ্যে উক্ত শপথ পাঠ পরিচালনা করিবেন, যেন এই সংবিধানের অধীন তিনিই ইহার জন্য নির্দিষ্ট ব্যক্তি।”

অর্থাৎ অনুচ্ছেদটি দুটি ধাপ নির্ধারণ করেছে- প্রথমত, রাষ্ট্রপতি সংবিধান অনুযায়ী শপথ পাঠ করানোর জন্য একজন নির্দিষ্ট ব্যক্তি মনোনীত করতে পারেন। সেই ব্যক্তি গেজেট প্রকাশের পরবর্তী তিন দিনের মধ্যে শপথ পড়াবেন।

দ্বিতীয়ত, যদি নির্ধারিত ব্যক্তি বা রাষ্ট্রপতির মনোনীত কেউ ওই তিন দিনের মধ্যে শপথ পড়াতে ব্যর্থ হন বা না পড়ান, তাহলে তার পরবর্তী তিন দিনের মধ্যে প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) শপথ পাঠ পরিচালনা করবেন। এ ক্ষেত্রে সংবিধান অনুযায়ী সিইসি নিজেই নির্দিষ্ট ব্যক্তি হিসেবে গণ্য হবেন। 

বর্তমান রাজনৈতিক বাস্তবতায় রাষ্ট্রপতির মনোনীত ব্যক্তিকে দিয়ে শপথ পড়ানো হবে না বলে আলোচনা রয়েছে। সেক্ষেত্রেও শেষ বিকল্প হিসেবে নাম আসে সিইসির। 

জাতীয় সংসদের কার্যপ্রণালি বিধি অনুযায়ী, বিদায়ী স্পিকার অথবা তার অনুপস্থিতিতে বিদায়ী ডেপুটি স্পিকারের সামনে সংসদ সদস্যরা নির্ধারিত ফরমে শপথ নেবেন ও স্বাক্ষর করবেন। উভয়েই অনুপস্থিত থাকলে, বিদায়ী স্পিকারের মনোনীত কোনো ব্যক্তির সামনে শপথ গ্রহণের বিধান রয়েছে। সে ক্ষেত্রে স্পিকার শিরীন শারমিন চৌধুরীর মনোনয়ন প্রয়োজন হবে। বিকল্প হিসেবে প্রধান নির্বাচন কমিশনারের (সিইসি) মাধ্যমে শপথ পড়ানোর বিষয়টিও আলোচনায় এসেছে।

আইন বিশ্লেষকেরা আরো একটি গুরুত্বপূর্ণ জটিলতার কথা বলছেন। সংবিধানের ১২৩(৩) অনুচ্ছেদে সাধারণ নির্বাচনে বিজয়ীদের শপথের প্রসঙ্গ রয়েছে। সেখানে বলা হয়েছে, সংসদের মেয়াদ পূর্তিজনিত কারণে ভেঙে গেলে ভাঙার আগের ৯০ দিনের মধ্যে এবং অন্য কোনো কারণে ভেঙে গেলে পরবর্তী ৯০ দিনের মধ্যে নির্বাচন আয়োজন করতে হবে। কিন্তু এবারের নির্বাচন সেই সময়সীমার মধ্যে অনুষ্ঠিত হয়নি।

২০২৪ সালের ৫ আগস্ট গণঅভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে আওয়ামী লীগ সরকারের পতন ঘটে এবং পরদিন দ্বাদশ জাতীয় সংসদ ভেঙে দেওয়া হয়। প্রায় দেড় বছর পর, ১১ ডিসেম্বর ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের তফসিল ঘোষণা করা হয়। প্রাথমিক প্রজ্ঞাপনে সংবিধানের ১২৩ অনুচ্ছেদের উল্লেখ থাকলেও পরে তা সংশোধন করে বাদ দেওয়া হয়। সংশোধিত প্রজ্ঞাপনে কেবল সংবিধানের ৬৫ অনুচ্ছেদের অধীনে সংসদ গঠনের প্রয়োজনীয়তার কথা উল্লেখ করে গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশ, ১৯৭২ অনুসারে নির্বাচন আয়োজনের ঘোষণা দেওয়া হয়।

সংশ্লিষ্টদের মতে, পরিবর্তিত রাজনৈতিক বাস্তবতায় এক ধরনের রাজনৈতিক ঐকমত্যের ভিত্তিতেই ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন সম্পন্ন হয়েছে। ফলে শপথ গ্রহণ-সংক্রান্ত বিদ্যমান জটিলতাও রাজনৈতিক সমঝোতার মাধ্যমে সমাধান করা সম্ভব। সাংবিধানিক বিধান, প্রক্রিয়াগত সীমাবদ্ধতা ও রাজনৈতিক বাস্তবতার সমন্বয়ে একটি গ্রহণযোগ্য পথ বের করাই এখন প্রধান চ্যালেঞ্জ।

এ বিষয়ে নির্বাচন কমিশনার আব্দুর রহমানেল মাছউদ সংবিধানের ১৪৮ অনুচ্ছেদের ব্যাখ্যা দিয়ে বলেন, “গেজেট প্রকাশের তিন দিনের মধ্যে স্পিকার বা ডেপুটি স্পিকার শপথ পড়াতে না পারলে তিন দিনের পরবর্তী তিন দিনের মধ্যে প্রধান নির্বাচন কমিশনার শপথ পড়াবেন। এটা আইনের ভাষা। যেহেতু বর্তমানে স্পিকার ও ডেপুটি স্পিকার নেই, সেক্ষেত্রে তিন দিন অতিক্রমের পর প্রধান নির্বাচন কমিশনারই শপথ পড়াবেন- এটাই আমরা বুঝি।”

সাংবিধানিক বিধান অনুযায়ী এখন নজর রয়েছে গেজেট প্রকাশের তারিখ থেকে গণনা করা সময়সীমার দিকে। নির্ধারিত সময়ের মধ্যে শপথ পাঠ সম্পন্ন না হলে সিইসির মাধ্যমেই নতুন সংসদ সদস্যদের শপথ গ্রহণের প্রক্রিয়া সম্পন্ন হবে।

তবে প্রধান উপদেষ্টার কার্যালয় যত দ্রুত সম্ভব ক্ষমতা হস্তান্তর করতে চায়। সে ক্ষেত্রে তিন দিনের আইনি বাধ্যবাধকতারও কোনো বিকল্প আছে কিনা, সেটিও ভাবছে সরকার। 

যেহেতু ১৩ ফেব্রুয়ারি গেজেট হয়েছে, ফলে তার তিন দিন পর সোম বা মঙ্গলবার নবনির্বাচিত সংসদ সদস্যদের শপথ ও নতুন মন্ত্রীদের শপথ গ্রহণ অনুষ্ঠান হতে পারে।  

ঢাকা/রাসেল

সর্বশেষ

পাঠকপ্রিয়