ভোটে হেরেও মাঠে আলোচনায় যারা
মোহাম্মদ আলী || রাইজিংবিডি.কম
(উপরে বাঁ থেকে) আমিনুল হক, হারুনুর রশীদ, এমএ কাইয়ুম এবং ((নিচে বাঁ থেকে) সাবিরা সুলতানা মুন্নি, সাইফুল হক ও রাশেদ খাঁন।
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিএনপির এমন কয়েকজন প্রার্থী পরাজিত হয়েছেন, যাদের জাতীয় পর্যায়ে ‘নামডাক’ রয়েছে। তাদের মধ্যে কাউকে কাউকে নিয়মিত টিভি ক্যামেরায় দেখা যায়; তবে ভোটের মাঠে তারা জাদু দেখাতে পারেননি অথবা নিজ নিজ নির্বাচনি এলাকার জনগণ তাদের জনপ্রতিনিধি হিসেবে বেছে নেননি। দু-একজন আবার কারচুরি-অনিয়ম করে হারিয়ে দেওয়ার অভিযোগও তুলেছেন।
বৃহস্পতিবার (১২ ফেব্রুয়ারি) সারা দিন ভোটগ্রহণ শেষে যখন ফলাফল ঘোষণা হয়, তাদের খবর ছড়িয়ে পড়ে বেশি, কারণ তারা হেরে গেছেন।
চাঁপাইনবাবগঞ্জ-৩ আসনে বিএনপি চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা ও সাবেক সংসদ সদস্য হারুনুর রশীদ হারুনের খবরটি বেশি আলোচনায় ছিল। তিনি তার নির্বাচনি এলাকায় ভোটারের রায়ে পরাজিত হয়েছেন। তাকে হারিয়ে জয়ী হয়েছেন নুরুল ইসলাম বুলবুল, যিনি জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থী।
দাঁড়িপাল্লা প্রতীকে বুলবুলকে জনপ্রতিধি হিসেবে বেছে নিয়েছেন ১ লাখ ৮৯ হাজার ৬১৩ জন নাগরিক; তার বিপরীতে ধানের শীষ প্রতীকে হারুনকে রায় দিয়েছেন ১ লাখ ২৬ হাজার ৯৯৭ ভোট। দুজনের ব্যবধান প্রায় ৬৩ হাজার ভোটের।
যশোর-২ আসনে বিএনপির প্রার্থী সাবিরা সুলতানা মুন্নি ছিলেন আলোচিত প্রার্থী। এবার নারী প্রার্থীদের খরার মধ্যেও তার প্রার্থী হওয়ার সুযোগ বলতে গেলে সারা দেশের মানুষের নজরে ছিল। ব্যক্তিগত জীবনের নানা প্রতিকূলতা কাটিয়ে রাজনীতিতে আসা মুন্নির পরাজয় স্থানীয়ভাবেও ব্যাপক আলোচনার জন্ম দিয়েছে।
ঢাকা-১৬ আসনে জাতীয় ফুটবল দলের সাবেক গোলরক্ষক ও বিএনপি নেতা আমিনুল হক সামান্য ভোটের ব্যবধানে হেরে গেছেন। রাজনৈতিক অঙ্গনে দীর্ঘদিন সক্রিয় থাকলেও জনরায়ে হেরে গেছেন তিনি।
একইভাবে ঢাকা-১৪ আসনে বিএনপির প্রার্থী সানজিদা ইসলাম তুলিও অল্প ব্যবধানে পরাজিত হয়েছেন। আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে ‘গুম হওয়া’ ব্যক্তিদের স্বজনদের নিয়ে তার গড়ে তোলা ‘মায়ের ডাক’ দেশে-বিদেশে পরিচিত পায়। তবে মিরপুরের শাহ আলী ও দারুসসালাম থানার বাসিন্দারা তাদের জনপ্রতিনিধি হিসেবে তাকে বেছে নেননি, এটিই চরম সত্য।
ঢাকা-১১ আসনে বিএনপির প্রার্থী এম এ কাইয়ুম জাতীয় নাগরিক পার্টির প্রার্থী জুলাই গণঅভ্যুত্থানে নেতা নাহিদ ইসলামের কাছে হেরে গেছেন। নাহিদ ৯৩ হাজার ৮৭২ ভোট পেয়ে বিজয়ী হয়েছেন; আর কাইয়ুম পেয়েছেন ৯১ হাজার ৮৩৩ ভোট। হাড্ডাহাড্ডি লড়াই হয়েছে তাদের। রামপুরা ও বাড্ডার মানুষ নাহিদকে তাদের জনপ্রতিনিধি হিসেবে বেশি পছন্দ করেছেন।
ঢাকা-১২ আসনে আলোচিত বামপন্থি নেতা সাইফুল হকের পরাজয়কে ‘লিটমাস্ট টেস্ট’ বলা যায়। বামপন্থিদের জনসম্পৃক্তর ঘাটতি হিসেবে তার পরাজয়কে দেখা হচ্ছে। বিপ্লবী ওয়ার্কার্স পার্টির প্রতিষ্ঠাতাদের অন্যতম সাইফুল হক অবশ্য ভোট কাটাকাটির জটিল সমীকরণে পড়ে গিয়েছিলেন। এই আসনে বিএনপির বিদ্রোহী প্রার্থী ছিলেন সাইফুল আলম নীরব। বিএনপির ভোট ভাগাভাগি হয়ে যাওয়া ফাঁক গলে বেরিয়ে গেছেন জামায়াতের প্রার্থী- এমনই অভিমত ওই আসনের ভোটারদের।
গণঅধিকার পরিষদের সাধারণ সম্পাদক রাশেদ খাঁনকে ধানের শীষ প্রতীকে লড়াই করার জন্য নিজ দল থেকে ছেড়ে আসতে হয়। প্রতীকের জন্য দল ত্যাগ করলেও ঝিনাইদহ-৪ আসনের বিএনপির নেতাকর্মীরা তাকে ‘মেনে’ নেননি। ফলে বিএনপির কেন্দ্রীয় সিদ্ধান্তে রাশেদ প্রার্থী হলেও তার বিরুদ্ধে ব্রিদ্রোহী হয়ে ভোটের মাঠে নেমে পড়েন বিএনপির একাংশের নেতাকর্মীরা। ফলে ঢাকা-১২ আসনে মতো নিশ্চিত পরাজয় বরণ করতে হয়েছে তাকে।
ঝিনাইদহ-৪ আসনেও ঢাকা-১২ আসনের প্রতিফলন দেখা গেছে। বিএনপির বিদ্রোহীর সঙ্গে রাশেদের লড়াই জমে ওঠায় আখেরে জয়ের মালা পরেছেন জামায়াতের প্রার্থী মো. আবু তালিব। ১ লাখ ৪ হাজার ৩২ ভোট পেয়ে নির্বাচিত হন। বিএনপির বিদ্রোহী স্বতন্ত্র প্রার্থী মো. সাইফুল ইসলাম ফিরোজ পেয়েছেন ৭৭ হাজার ১০৪ ভোট। আর ৫৫ হাজার ৬৭০ ভোট পেয়ে রাশেদ সেখানে তৃতীয় অবস্থানে। দুজনের ভোট এক করলে জামায়াতের চেয়ে অনেক বেশি ভোটে জয় হতো বিএনপির।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, এবারের নির্বাচনে ভোটারদের আচরণে বড় পরিবর্তন দেখা গেছে। দলীয় পরিচয়ের পাশাপাশি স্থানীয় জনপ্রিয়তা, প্রার্থীর গ্রহণযোগ্যতা এবং বিদ্রোহী প্রার্থীদের অংশগ্রহণ অনেক আসনের ফলাফল নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে।
ঢাকা/রাসেল